অধ্যাপক ড. নূরুল ইসলাম:

বাংলাদেশ তথা মুসলিম বিশ্বের সমকালীন ইসলামী চিন্তাবিদ, প্রথিতযশা শিক্ষাবিদ ও সমাজ সংস্কারক হিসেবে অধ্যাপক ড. নূরুল ইসলাম এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। ইসলামের তাত্ত্বিক রূপকে সমাজ ও বাস্তব জীবনের আলোকে ব্যাখ্যা করে তিনি অসংখ্য মননশীল গ্রন্থ রচনা করেছেন। বিশেষ করে “সমাজ সংস্কারে নারীর ভূমিকা” এবং “ইসলামী পুনর্জাগরণ: পথ ও পদ্ধতি” বই দুটির মাধ্যমে তিনি আধুনিক মুসলিম মানস গঠনে অনন্য ভূমিকা পালন করেছেন।


১. জন্ম ও জন্মস্থান

অধ্যাপক ড. নূরুল ইসলাম বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে বাংলাদেশের এক ঐতিহ্যবাহী মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর শৈশব ও কৈশোর কেটেছে গ্রামীণ ও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ পরিবেশে। জন্মসূত্রে তিনি বাংলাদেশের মাটির সন্তান হলেও তাঁর কাজের পরিধি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বিস্তৃত। তাঁর জন্মস্থানটি ছিল তৎকালীন পূর্ব বাংলার একটি জ্ঞানচর্চাকেন্দ্রিক জনপদ, যা তাঁর প্রাথমিক মনস্তাত্ত্বিক গঠনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল।

২. পিতামাতা ও পারিবারিক পটভূমি

তিনি এমন একটি পরিবারে বেড়ে উঠেছেন যেখানে দ্বীনি শিক্ষা ও নৈতিক মূল্যবোধকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেওয়া হতো। তাঁর পিতা ছিলেন একজন ধর্মপ্রাণ এবং মহৎ হৃদয়ের মানুষ, যিনি ড. নূরুল ইসলামকে ইসলামের বুনিয়াদি শিক্ষায় দীক্ষিত করেন। অন্যদিকে তাঁর মাতা ছিলেন আদর্শ গৃহিণী ও অত্যন্ত খোদাভীরু নারী। মাতার কাছ থেকেই তিনি সমাজ ও পরিবারে নারীর গুরুত্ব এবং তাদের অধিকারের বিষয়টি গভীরভাবে উপলব্ধি করতে শেখেন, যা পরবর্তীতে তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ “সমাজ সংস্কারে নারীর ভূমিকা” রচনায় মূল অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে।

৩. পড়াশোনা ও শিক্ষাজীবন

ড. নূরুল ইসলামের শিক্ষাজীবন ছিল অত্যন্ত কৃতিত্বপূর্ণ এবং বৈচিত্র্যময়। তিনি দেশীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে অত্যন্ত সফলতার সাথে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। এরপর তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য মাদরাসা ও সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমন্বিত ধারায় পড়াশোনা করেন।

ইসলামের মূল উৎসগুলোকে সরাসরি বোঝার জন্য তিনি আরবি ভাষার ওপর গভীর পাণ্ডিত্য অর্জন করেন। পরবর্তীতে তিনি উচ্চতর গবেষণা ও পিএইচডি (PhD) ডিগ্রির জন্য আন্তর্জাতিক মানের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। মধ্যপ্রাচ্য ও প্রাচ্যের নামকরা স্কলারদের অধীনে তিনি পবিত্র কুরআন, সুন্নাহ এবং ইসলামী ফিকহ (আইনশাস্ত্র) বিষয়ে দীর্ঘ গবেষণা করেন। ইংরেজি এবং আরবি—উভয় ভাষাতেই তাঁর অসাধারণ দক্ষতা ছিল, যা তাঁকে পশ্চিমা আধুনিক দর্শন ও ঐতিহ্যবাহী ইসলামী জ্ঞানের সমন্বয় করতে সাহায্য করেছে।

৪. কর্মজীবন

শিক্ষাজীবন শেষ করে ড. নূরুল ইসলাম শিক্ষকতাকে তাঁর জীবনের মূল পেশা হিসেবে বেছে নেন। তিনি দেশের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগে দীর্ঘকাল অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

শিক্ষাদানের পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সেমিনার, সিম্পোজিয়াম ও থিংক-ট্যাংক (গবেষণা প্রতিষ্ঠান)-এর সাথে যুক্ত ছিলেন। একজন আদর্শ শিক্ষক হিসেবে তিনি হাজার হাজার শিক্ষার্থীকে আধুনিক বিশ্বের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ইসলামের শাশ্বত রূপের পাঠ দান করেছেন। শুধু শ্রেণীকক্ষেই নয়, প্রশাসনিক বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে তিনি শিক্ষাব্যবস্থা সংস্কারেও অবদান রেখেছেন।

৫. ইসলামে কৃতিত্ব ও অবদান

ইসলামী শিক্ষা এবং মুসলিম উম্মাহর জাগরণে ড. নূরুল ইসলামের অবদান অনস্বীকার্য। তাঁর প্রধান কৃতিত্ব হলো তিনি ঐতিহ্যবাহী ইসলামী জ্ঞানকে আধুনিক প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।

  • নারীর ক্ষমতায়ন ও সমাজ সংস্কার: তিনি পশ্চিমা নারীবাদী ধারণার অন্ধ অনুকরণ না করে, ইসলামের সীমারেখার মধ্যে থেকে কীভাবে নারীরা সমাজ গঠনে নেতৃত্ব দিতে পারে তা দেখিয়েছেন।
  • দাওয়াতি সংস্কার: তিনি প্রচলিত আবেগসর্বস্ব প্রচারণার বাইরে গিয়ে যুক্তি, বিজ্ঞান ও সমকালীন দর্শনের আলোকে ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব তুলে ধরেছেন।

৬. তাঁর লিখনী ও সাহিত্যকর্ম

ড. নূরুল ইসলামের লিখনী ছিল ধারালো, তথ্যবহুল ও সমসাময়িক। তাঁর রচিত গ্রন্থের সংখ্যা অনেক। এর মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী দুটি গ্রন্থের সংক্ষিপ্ত পরিচয় নিচে দেওয়া হলো:

  • সমাজ সংস্কারে নারীর ভূমিকা: এই বইটিতে তিনি পবিত্র কুরআন ও হাদিসের আলোকে প্রমাণ করেছেন যে, ইসলাম নারীকে কেবল চার দেয়ালের মাঝে বন্দী রাখেনি, বরং সমাজ গঠনে এবং সুস্থ সংস্কৃতি বিনির্মাণে নারীর ভূমিকা অপরিহার্য। সমকালীন প্রেক্ষাপটে মুসলিম নারীদের করণীয় কী, তা তিনি অত্যন্ত চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।
  • ইসলামী পুনর্জাগরণ: পথ ও পদ্ধতি: (ইংরেজি মূল ভাব: Islamic Revival: Path and Method)। এই গ্রন্থে তিনি উগ্রপন্থা পরিহার করে কীভাবে বুদ্ধিবৃত্তিক ও নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে সমাজে ইসলামী মূল্যবোধের পুনর্জাগরণ ঘটানো যায়, তার একটি বাস্তবসম্মত রোডম্যাপ বা রূপরেখা তৈরি করেছেন।

এছাড়াও তাঁর বেশ কিছু প্রবন্ধ আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে, যেখানে তিনি ইসলামোফোবিয়া (ইসলাম ভীতি) দূরীকরণে এবং আন্তঃধর্মীয় সংলাপে জোর দিয়েছেন।

৭. বর্তমান অবস্থা

অধ্যাপক ড. নূরুল ইসলাম বর্তমানে তাঁর বর্ণাঢ্য কর্মজীবনের সোনালী সময়ে অবস্থান করছেন। ঘরে বসেই তিনি নতুন নতুন বই লিখছেন এবং দেশ-বিদেশের তরুণ গবেষকদের দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন। তাঁর বয়স বাড়লেও ইসলামের প্রতি তাঁর অনুরাগ এবং মেধা উম্মাহর কল্যাণে এখনও একইভাবে নিয়োজিত রয়েছে।



তার লিখিত কিছু বইয়ের লিংক :

০১. ইসলামী পুনর্জাগরণ পথ ও পদ্ধতি

লেখক : ড. নূরুল ইসলাম



০২. ইসলামে নারীর উত্তরাধিকার

লেখক : ড. নূরুল ইসলাম



০৩. ইসলামে হাদিসের গুরুত্ব ও মর্যাদা

লেখক : ড. নূরুল ইসলাম



০৪. ইসলামের দৃষ্টিতে মনুাফাখোরী, মজুদদারী ও পণ্যে ভেজাল

লেখক : ড. নূরুল ইসলাম



০৫. ইহসান ইলাহী যহীর

লেখক : ড. নূরুল ইসলাম



০৬. তারাবীহ ও ই‘তিকাফ

অনুবাদক : ড. নূরুল ইসলাম



০৭. ভারতীয় উপমহাদেশের আহলেহাদীছগণের অগ্রণী ভূমিকা

অনুবাদক : ড. নূরুল ইসলাম



০৮. শারঈ ইমারত

অনুবাদক : ড. নূরুল ইসলাম



০৯. সমাজ সংস্কারে নারীর ভূমিকা

লেখক : ড. নূরুল ইসলাম



"বাংলা ইসলামিক বইয়ের বিশাল পিডিএফ (PDF) আর্কাইভ"