ডক্টর মরিস বুকাইলী

ডক্টর মরিস বুকাইলী (Dr. Maurice Bucaille) বিংশ শতাব্দীর একজন প্রখ্যাত ফরাসি চিকিৎসক, গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্ট এবং বিশ্বখ্যাত লেখক। আধুনিক বিজ্ঞানের আলোতে পবিত্র কুরআন ও বাইবেলের তুলনামূলক বিশ্লেষণের মাধ্যমে তিনি মুসলিম বিশ্বসহ পুরো পৃথিবীতে এক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন। বিজ্ঞান ও ধর্মের মধ্যকার সম্পর্ক নিয়ে তাঁর চিন্তাধারা এবং বিখ্যাত গ্রন্থ ‘বাইবেল, কুরআন ও বিজ্ঞান’ তাঁকে আন্তর্জাতিকভাবে সমধিক পরিচিতি এনে দেয়।

জন্ম ও প্রাথমিক জীবন

মরিস বুকাইলী ১৯২০ সালের ১৯ জুলাই ফ্রান্সের পন্ট-ল’ইভেক (Pont-l’Évêque) নামক স্থানে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর শৈশব ও প্রাথমিক শিক্ষাজীবন ফ্রান্সেই কাটে। তিনি অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিলেন এবং উচ্চশিক্ষার জন্য চিকিৎসা বিজ্ঞানকে (Medicine) বেছে নেন।

ডক্টর মরিস বুকাইলী (১৯২০-১৯৯৮). Source: Reuters Photographer / REUTERS

চিকিৎসা জীবন ও রাজপরিবারের সান্নিধ্য

পড়াশোনা শেষ করে তিনি ফ্রান্সে একজন সার্জন এবং গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্ট (পরিপাকতন্ত্র বিশেষজ্ঞ) হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৪৫ থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত তিনি চিকিৎসা পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। একজন দক্ষ চিকিৎসক হিসেবে অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি ব্যাপক সুনাম অর্জন করেন।

তাঁর এই চিকিৎসা খ্যাতির কারণে তিনি সৌদি আরবের তৎকালীন বাদশাহ ফয়সাল এবং মিশরের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাতসহ মধ্যপ্রাচ্যের বহু রাজপরিবার ও উচ্চপদস্থ ব্যক্তিত্বের ব্যক্তিগত চিকিৎসক (Family Physician) হিসেবে দায়িত্ব পালন করার সুযোগ পান। এই সুবাদে মুসলিম বিশ্বের সংস্কৃতি এবং ইসলামের সাথে তাঁর ঘনিষ্ঠ পরিচয় ঘটে।

ফারাও মমি গবেষণা ও জীবনের টার্নিং পয়েন্ট

১৯৭৫ সালে মিশরের তৎকালীন সরকার প্রাচীন মিশরের প্রভাবশালী ফারাও (যাকে হযরত মুসা আ.-এর সমসাময়িক ‘ফেরাউন’ বলে ধারণা করা হয়) দ্বিতীয় রামিসেস-এর মমিটি নষ্ট হয়ে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা করতে এবং এর ক্ষয়ের কারণ অনুসন্ধানের জন্য ফ্রান্সে পাঠায়।

ফ্রান্স সরকার এই মমিটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিৎসার জন্য যে মেডিকেল টিম গঠন করে, ডক্টর মরিস বুকাইলী ছিলেন সেই বৈজ্ঞানিক দলের প্রধান।

গবেষণার চমকপ্রদ ফলাফল: মমিটি সূক্ষ্মভাবে পরীক্ষা করার সময় বুকাইলী দেখতে পান যে, মমিটির ভেতরের হাড়গুলো মারাত্মকভাবে ভাঙা ছিল, যা কোনো প্রচণ্ড আঘাত বা পানিতে ডুবে যাওয়ার ইঙ্গিত দেয়। সবচেয়ে বড় কথা, মমিটির শরীরে লবণের অবশিষ্টাংশ পাওয়া যায়। যা থেকে চিকিৎসকদের এই দলটি নিশ্চিত হন যে, এই ব্যক্তিটি সাগরে ডুবে মারা গিয়েছিল এবং মৃত্যুর পর পরই তার লাশ পানি থেকে উদ্ধার করে মমি করা হয়েছিল।

যখন তিনি এই বৈজ্ঞানিক সত্যটি জানতে পারেন, তখন তাঁর এক মুসলিম সহকর্মী তাঁকে জানান যে, মুসলমানদের পবিত্র গ্রন্থ কুরআনে প্রায় ১৪০০ বছর আগেই স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে—ফেরাউন সাগরে ডুবে মারা গেছে এবং পরবর্তী প্রজন্মের জন্য তার লাশ অক্ষত রাখা হবে (সূরা ইউনুস, আয়াত: ৯২)। এই ঘটনা ডক্টর বুকাইলীকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। তিনি ভাবেন, যেখানে আধুনিক বিজ্ঞান মাত্র আজ উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে এটি আবিষ্কার করল, সেখানে চৌদ্দশত বছর আগে মরুভূমির বুকে একজন উম্মী (নিরক্ষর) মানুষের পক্ষে এটি কীভাবে জানা সম্ভব? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে তিনি পবিত্র কুরআন নিয়ে ব্যাপক গবেষণা শুরু করেন।

আরবি ভাষা শিক্ষা ও কুরআন নিয়ে গবেষণা

কুরআনের অনুবাদ পড়ে সন্তুষ্ট হতে না পেরে ডক্টর বুকাইলী সরাসরি মূল আরবি ভাষা শেখার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি প্যারিস ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়ে অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে গভীর মনোযোগ দিয়ে আরবী ভাষা ও ব্যাকরণ শিক্ষা সম্পন্ন করেন। এরপর তিনি মূল আরবী টেক্সট ধরে ধরে বিজ্ঞান সম্পর্কিত কুরআনের আয়াতগুলো নিয়ে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে গবেষণা শুরু করেন।

তিনি আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান, ভূগর্ভবিজ্ঞান, ভ্রূণতত্ত্ব (Embryology) এবং সমুদ্রবিজ্ঞানের সাথে কুরআনের আয়াতগুলোর তুলনা করে দেখতে পান যে, কুরআনের একটি আয়াতও আধুনিক প্রমাণিত বিজ্ঞানের সাথে সাংঘর্ষিক নয়।

কালজয়ী গ্রন্থ: বাইবেল, কুরআন ও বিজ্ঞান

১৯৭৬ সালে তিনি তাঁর দীর্ঘ গবেষণার ফসল হিসেবে ফরাসি ভাষায় একটি বই প্রকাশ করেন, যার ইংরেজি নাম “The Bible, The Qur’an and Science” (বাংলায় অনূদিত: বাইবেল, কুরআন ও বিজ্ঞান)।

ঐশী গ্রন্থ ও আধুনিক বিজ্ঞানের মেলবন্ধন. Source: Pascal Deloche / Godong / Getty Images

এই বইটি প্রকাশের পর সারা বিশ্বে বেস্ট-সেলার বা সর্বাধিক বিক্রিত বইয়ের তালিকায় স্থান করে নেয় এবং পৃথিবীর প্রায় সব প্রধান ভাষায় এটি অনূদিত হয়। বইটিতে তিনি মূলত তিনটি মূল বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন:

আলোচনার বিষয়ডক্টর মরিস বুকাইলীর পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ
ওল্ড টেস্টামেন্ট (তৌরাত)বৈজ্ঞানিক ও ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে পরীক্ষা করে তিনি দেখান যে, এতে বহু মানবীয় সংযোজন ও বৈজ্ঞানিক অসঙ্গতি রয়েছে (যেমন: সৃষ্টির বয়স ও নূহের প্লাবনের ব্যাপ্তি)।
নিউ টেস্টামেন্ট (ইঞ্জিল)চর্তুবিধ সুসমাচারের (Gospels) ঐতিহাসিক সত্যতা বিশ্লেষণ করে দেখান যে, এগুলো যীশুর সমসাময়িক কালে লেখা হয়নি এবং এর মাঝেও পরস্পরবিরোধী তথ্য রয়েছে।
পবিত্র কুরআনতিনি বিস্ময়ের সাথে প্রমাণ করেন যে, কুরআনে উল্লিখিত বৈজ্ঞানিক তথ্যগুলো (যেমন: মহাবিশ্বের সম্প্রসারণ, ভ্রূণের ক্রমান্বয় বিকাশ) আধুনিক বিজ্ঞানের সাথে হুবহু মিলে যায় এবং এতে কোনো বৈজ্ঞানিক ভুল নেই।

এই বইটির মাধ্যমে তিনি একটি নতুন তত্ত্বের জন্ম দেন, যাকে পরবর্তীতে পশ্চিমা বিশ্বে ‘বুকাইলীজম’ (Bucailleism) বলা হতো। এর অর্থ হলো—আধুনিক বিজ্ঞানের সাথে ওহীর বা ঐশী বাণীর সামঞ্জস্যতা নিরূপণ করা।

তাঁর অন্যান্য উল্লেখযোগ্য বই:

  • What is the Origin of Man? (মানুষের উৎস কী? – যেখানে তিনি ডারউইনের বিবর্তনবাদের বৈজ্ঞানিক ত্রুটিগুলো তুলে ধরেন এবং কুরআন-বাইবেলের আলোকে মানুষের সৃষ্টিতত্ত্ব আলোচনা করেন)।
  • Mummies of the Pharaohs: Modern Medical Investigations (ফারাওদের মমি: আধুনিক চিকিৎসা অনুসন্ধান)।

ইসলাম গ্রহণ বিতর্ক

ডক্টর মরিস বুকাইলীর ইসলাম গ্রহণ নিয়ে বিশ্বজুড়ে দীর্ঘকাল ধরে বিতর্ক রয়েছে। অনেক মুসলিম গবেষক এবং জীবনীকার দাবি করেন যে, মমি গবেষণা এবং কুরআন নিয়ে পড়াশোনা শেষে তিনি গোপনে বা প্রকাশ্যে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন।

তবে ফরাসি অ্যাকাডেমিক ও তাঁর পারিবারিক ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলোর মতে, তিনি নিজেকে একজন একশ্বরবাদী হিসেবে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন এবং তিনি ইসলামকে ঐশী গ্রন্থ হিসেবে মনে-প্রাণে বিশ্বাস করলেও প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মান্তরের বিষয়টি সবসময় ব্যক্তিগত বা পর্দার আড়ালে রেখেছিলেন। তবে ইসলাম ও কুরআনের প্রতি তাঁর গভীর শ্রদ্ধা এবং একে আল্লাহর বাণী হিসেবে প্রমাণ করার অবদান অনস্বীকার্য।

সম্মাননা ও স্বীকৃতি

বিজ্ঞান ও সাহিত্যের এই অনন্য অবদানের জন্য ডক্টর মরিস বুকাইলী ফ্রান্সের সর্বোচ্চ সম্মানসূচক সাহিত্য পুরস্কার ‘অ্যাকাডেমি ফরাসি পুরস্কার’ (Prix de l’Académie Française) লাভ করেন। এছাড়া ১৯৮৮ সালে আমেরিকার ওহিও স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে তাঁকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করা হয়।

মৃত্যু

১৯৯৮ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি ফ্রান্সের প্যারিসে এই মহান বিজ্ঞানী, চিকিৎসক ও চিন্তাবিদ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুর পর তাঁর রেখে যাওয়া সাহিত্য ও বৈজ্ঞানিক গবেষণা আজ অবধি কোটি কোটি মানুষকে সত্যের সন্ধান দিয়ে যাচ্ছে।

তার লিখিত কিছু বই :

০১. আল কুরআন এক মহাবিস্ময়

লেখিকা : মুয়াল্লীমা মোরশেদা বেগম



০২. কুরআন ও আধুনিক বিজ্ঞান

লেখিকা : মুয়াল্লীমা মোরশেদা বেগম



০৩.বাইবেল কুরান ও বিজ্ঞান

লেখিকা : মুয়াল্লীমা মোরশেদা বেগম



"বাংলা ইসলামিক বইয়ের বিশাল পিডিএফ (PDF) আর্কাইভ"