ড. ইউসুফ আল কারযাভী

আধুনিক বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী ইসলামী চিন্তাবিদ, ফকীহ, লেখক এবং আন্তর্জাতিক ইসলামী আন্দোলনের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন ড. ইউসুফ আল-কারযাভী (আরবি: يوسف عبد الله القرضاوي; ইংরেজিতে: Yusuf al-Qaradawi)। তিনি মুসলিম উম্মাহর সমসাময়িক সমস্যাগুলোর শরয়ী সমাধানের জন্য ‘ফিকহুল ওয়াকিয়াহ’ বা ‘সমসাময়িক ফিকহ’ (Contemporary Fiqh) চর্চায় এক যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করেছেন। তাকে বিংশ ও একবিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইসলামী ফকীহ বা আইনজ্ঞ হিসেবে গণ্য করা হয়।

নিচে তার জীবন, কর্ম, চিন্তা এবং অবদান বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো:


১. জন্ম ও জন্মস্থান

ড. ইউসুফ আল-কারযাভী ১৯২৬ খ্রিস্টাব্দের ৯ সেপ্টেম্বর মিশরের নীল নদ ডেল্টা অঞ্চলের আল-গারবিয়া গভর্নরেটের অন্তর্গত সাফাত তুরাব (Saft Turab) গ্রামে একটি সাধারণ ও ধর্মপ্রাণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।


২. শৈশব ও শিক্ষা জীবন

শৈশবেই কারযাভী তার পিতাকে হারান এবং চাচা কর্তৃক লালিত-পালিত হন। তার শিক্ষা জীবন অত্যন্ত উজ্জ্বল এবং কঠোর সাধনায় ঘেরা ছিল:

  • হিফজুল কুরআন: মাত্র সাড়ে নয় বছর বয়সে তিনি পবিত্র কুরআন সম্পূর্ণ মুখস্থ করেন।
  • আল-আজহারের শিক্ষা: এরপর তিনি মিশরের ঐতিহ্যবাহী দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ‘আল-আজহার’ এর তানতা ইনস্টিটিউটে ভর্তি হন। সেখান থেকে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা সমাপ্ত করেন।
  • উচ্চশিক্ষা (কায়রো বিশ্ববিদ্যালয় ও আল-আজহার): ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দে তিনি আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের উসুলুদ-দ্বীন (Principles of Religion) অনুষদ থেকে উচ্চতর ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দে একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আরবি ভাষা ও সাহিত্যের শিক্ষকতার লাইসেন্স লাভ করেন।
  • মাস্টার্স ও পিএইচডি: ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দে তিনি উলুমুল কুরআন ও সুন্নাহ (কুরআন ও সুন্নাহ বিজ্ঞান) বিষয়ে স্নাতকোত্তর (MA) সম্পন্ন করেন এবং ১৯৭৩ খ্রিস্টাব্দে একই অনুষদ থেকে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ডক্টরেট (Ph.D) ডিগ্রি লাভ করেন। তার পিএইচডি গবেষণার বিষয় ছিল “যাকাত এবং সামাজিক সমস্যা সমাধানে এর ভূমিকা” (ফিকহুয যাকাত), যা পরবর্তীতে ইসলামী অর্থনীতির ইতিহাসে একটি ক্লাসিক গ্রন্থ হিসেবে স্বীকৃতি পায়।

৩. কর্মজীবন ও কাতার হিজরত

মিশরে রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং তৎকালীন সমাজতান্ত্রিক সরকারের নিপীড়নের কারণে ১৯৬১ খ্রিস্টাব্দে ড. কারযাভী কাতারে হিজরত করেন।

  • কাতারে অবদান: কাতারে আসার পর তিনি সেখানকার সেকেন্ডারি রিলিজিয়াস ইনস্টিটিউটের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেন। ১৯৭৭ খ্রিস্টাব্দে তিনি কাতার বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘শরীয়াহ অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ’ অনুষদ প্রতিষ্ঠা করেন এবং এর ডিন (Dean) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
  • আন্তর্জাতিক নেতৃত্ব: তিনি বিশ্ববিখ্যাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন অব মুসলিম স্কলারস (International Union of Muslim Scholars – IUMS)-এর প্রতিষ্ঠাতা এবং দীর্ঘদিনের সভাপতি ছিলেন। এছাড়াও ইউরোপীয় ফতোয়া কাউন্সিলের (European Council for Fatwa and Research) প্রধান হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেন।

৪. চিন্তাধারা ও ফিকহী দৃষ্টিভঙ্গি

ড. ইউসুফ আল-কারযাভীর চিন্তাধারার মূল ভিত্তি ছিল “আল-ওয়াসাতিয়্যাহ” বা ভারসাম্যপূর্ণ মধ্যপন্থা

  • তিনি চরমপন্থা (Extreme Radicalism) এবং শিথিলতা (Laxity)—উভয়েরই ঘোর বিরোধী ছিলেন।
  • তিনি প্রাচীন ফিকহী ঐতিহ্যকে ধারণ করার পাশাপাশি আধুনিক যুগের সমস্যাবলিকে যুগের উপযোগিতা এবং সহজীকরণের (তাকফীফ ও তাইসীর) নীতিতে সমাধান করার পক্ষে ছিলেন।
  • তার ফতোয়া ও চিন্তাধারা বিশ্বজুড়ে ‘সংখ্যালঘু মুসলিম ফিকহ’ (Fiqh of Muslim Minorities) গঠনে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছে, যা অমুসলিম দেশে বসবাসরত মুসলিমদের জীবনযাত্রাকে সহজ করেছে।


৫. ইসলামে অবদান ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব

বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে ইসলামের বার্তা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিতে মিডিয়াকে সবচেয়ে কার্যকরভাবে ব্যবহার করেছিলেন ড. কারযাভী।

  • ‘আল-শরীয়া ওয়াল হায়াত’: কাতারভিত্তিক গণমাধ্যম আল-জাজিরা (Al Jazeera) টেলিভিশনে তার সাপ্তাহিক অনুষ্ঠান ‘আল-শরীয়া ওয়াল হায়াত’ (শরীয়াহ ও জীবন) ছিল মুসলিম বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় অনুষ্ঠান, যা কোটি কোটি দর্শক নিয়মিত দেখতেন।
  • ইসলামঅনলাইন: ইন্টারনেটের শুরুর দিকে মুসলমানদের জন্য তথ্য ও ফতোয়ার নির্ভরযোগ্য উৎস হিসেবে তিনি IslamOnline.net ওয়েবসাইটটি প্রতিষ্ঠা করেন।
  • পুরস্কার ও সম্মাননা: ইসলামে অনন্য অবদানের জন্য তিনি মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ‘কিং ফয়সাল আন্তর্জাতিক পুরস্কার’ (King Faisal International Prize), ‘ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক (IDB) পুরস্কার’ এবং ‘দুবাই আন্তর্জাতিক পবিত্র কুরআন পুরস্কার’-সহ অসংখ্য আন্তর্জাতিক সম্মাননায় ভূষিত হন।


৬. উল্লেখযোগ্য গ্রন্থাবলী (রচনাবলী)

ড. কারযাভী তার দীর্ঘ জীবনে প্রায় ১২০টিরও বেশি গ্রন্থ রচনা করেছেন। তার বইগুলো বিশ্বের প্রায় প্রতিটি প্রধান ভাষায় অনূদিত হয়েছে। তার কয়েকটি যুগান্তকারী বই হলো:
১. হালাল ও হারামের বিধান (Al-Halal wal-Haram fil-Islam) – সাধারণ মুসলিমদের প্রাত্যহিক জীবনের গাইডবুক হিসেবে বিশ্বখ্যাত।
২. ইসলামে যাকাতের বিধান (Fiqh al-Zakat) – যাকাত ব্যবস্থার ওপর আধুনিক যুগের সবচেয়ে বিস্তারিত ও প্রামাণ্য গ্রন্থ।
৩. ইসলামী পুনর্জাগরণ: সমস্যা ও সম্ভাবনা (Islamic Awakening Between Rejection and Extremism)
৪. সমসাময়িক ফতোয়া (Fatawa Mu’asirah)
৫. ইসলামের অর্থনৈতিক চতুর্দশ শতাব্দী
৬. রাসূলের সুন্নাহ: বুঝ ও প্রয়োগের নীতিমালা (How to Approach the Sunnah)


৭. ইন্তিকাল (মৃত্যু)

মুসলিম উম্মাহর এই মহান রাহবার ২০২২ খ্রিস্টাব্দের ২৬ সেপ্টেম্বর ৯৬ বছর বয়সে কাতারের দোহায় ইন্তিকাল করেন। তার মৃত্যুতে সমগ্র মুসলিম বিশ্বে শোকের ছায়া নেমে আসে এবং মক্কা-মদিনাসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের উলামায়ে কেরাম তাকে বিংশ শতাব্দীর অন্যতম “মুজাদ্দিদ” বা দ্বীনের সংস্কারক হিসেবে স্মরণ করেন। দোহায় ইমাম মুহাম্মদ বিন আব্দুল ওয়াহাব মসজিদে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয় এবং কাতারে তাকে দাফন করা হয়।

তার লিখিত কিছু কিতাব হলো :

০১. ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থা তত্ত্ব ও প্রয়োগ

লেখক : ড. ইউসুফ আল কারযাভী



০২. ইসলাম ও চরমপন্থা

লেখক : ড. ইউসুফ আল কারযাভী



০৩. ইসলাম ও শিল্পকলা

লেখক : ড. ইউসুফ আল কারযাভী



০৪. ইসলামী পুনর্জাগরণ সমস্যা ও সম্ভাবনা

লেখক : ড. ইউসুফ আল কারযাভী



০৫. আধুনিক যুগ ইসলাম কৌশল ও কর্মসূচী

লেখক : ড. ইউসুফ আল কারযাভী



০৬. ইসলামে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা

লেখক : ড. ইউসুফ আল কারযাভী



০৭. ইসলামে এবাদতের পরিধি

লেখক : ড. ইউসুফ আল কারযাভী



০৮. ইসলামে দারিদ্র বিমোচন

লেখক : ড. ইউসুফ আল কারযাভী



০৯. ইসলামে হালাল হারামের বিধান

লেখক : ড. ইউসুফ আল কারযাভী



১০. ইসলামের যাকাতের বিধান দুই খণ্ড

লেখক : ড. ইউসুফ আল কারযাভী



১১. জেরুজালেম বিশ্ব মুসলিম সমস্যা

লেখক : ড. ইউসুফ আল কারযাভী



১২.সুন্নাহর সান্নিধ্যে

লেখক : ড. ইউসুফ আল কারযাভী


"বাংলা ইসলামিক বইয়ের বিশাল পিডিএফ (PDF) আর্কাইভ"