মোহাম্মাদ আহমেদ ফারিস

মোহাম্মাদ আহমেদ ফারিস (Muhammad Ahmed Faris) ছিলেন সিরিয়ার প্রথম এবং একমাত্র মহাকাশচারী এবং আরব বিশ্বের দ্বিতীয় মহাকাশচারী। তিনি একাধারে একজন দক্ষ সামরিক পাইলট, মহাকাশ গবেষক এবং পরবর্তীতে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের সময় একজন বিশিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বে পরিণত হন।

নিচে এই বীর এবং ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের জীবন ও কর্ম বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

১. জন্ম ও প্রারম্ভিক জীবন

মোহাম্মাদ ফারিস ১৯৫১ সালের ২৬ মে সিরিয়ার বিখ্যাত ও ঐতিহাসিক শহর আলেপ্পোতে (Aleppo) জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর শৈশব ও কৈশোর কাটে আলেপ্পোতেই। ছোটবেলা থেকেই আকাশের প্রতি তাঁর এক প্রবল আকর্ষণ ছিল, যা তাঁকে পরবর্তীতে সামরিক বাহিনীতে যোগ দিতে উদ্বুদ্ধ করে।

২. সামরিক ক্যারিয়ার

১৯৭৩ সালে তিনি আলেপ্পোর সামরিক বিমান চালনা একাডেমি (Military Pilot學院) থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেন। এরপর তিনি সিরিয়ার বিমান বাহিনীতে (Syrian Air Force) একজন পাইলট হিসেবে যোগ দেন। কঠোর পরিশ্রম এবং চমৎকার উড্ডয়ন দক্ষতার কারণে তিনি দ্রুত পদোন্নতি পান এবং সিরিয়ান বিমান বাহিনীর একজন কর্নেল (Colonel) পদে উন্নীত হন।

৩. মহাকাশ যাত্রা (ইন্টারকসমস প্রোগ্রাম)

১৯৮৫ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের “ইন্টারকসমস” (Intercosmos) মহাকাশ কর্মসূচির আওতায় মহাকাশচারী পদের জন্য সিরিয়া থেকে প্রার্থী খোঁজা শুরু হয়। প্রায় ৫০ জন দক্ষ পাইলটের মধ্য থেকে কঠোর পরীক্ষা ও স্ক্রিনিংয়ের মাধ্যমে মোহাম্মাদ ফারিস এবং তাঁর ব্যাকআপ হিসেবে মুনির হাবিবকে নির্বাচিত করা হয়।

এরপর তিনি রাশিয়ার মস্কোর কাছে অবস্থিত বিখ্যাত ‘স্টার সিটি’-তে (Star City) প্রায় দুই বছর অত্যন্ত কঠোর ও জটিল মহাকাশ প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন।

ঐতিহাসিক মহাকাশ মিশন:

  • উড্ডয়ন: ১৯৮৭ সালের ২২ জুলাই সোভিয়েত ইউনিয়নের সয়ুজ টিএম-৩ (Soyuz TM-3) মহাকাশযানে চড়ে তিনি আরও দুজন সোভিয়েত মহাকাশচারী (আলেকজান্ডার ভিক্টোরেঙ্কো এবং আলেকজান্ডার লাভিকিন) সহ মহাকাশের উদ্দেশ্যে রওনা হন।
  • গবেষণা ও মির স্টেশন: মহাকাশযানটি সফলভাবে তৎকালীন বিখ্যাত মহাকাশ স্টেশন ‘মির’ (Mir)-এর সাথে যুক্ত হয়। মহাকাশে অবস্থানকালে তিনি মহাকাশ স্টেশন থেকে সিরিয়ার ওপর দিয়ে যাওয়ার সময় দেশের ভূখণ্ড, মাটি এবং আবহাওয়ার চমৎকার সব ছবি তোলেন। একই সাথে তিনি মহাকাশে মেডিসিন, মেটেরিয়াল সায়েন্স এবং রিমোট সেন্সিংয়ের ওপর বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালান।
  • প্রত্যাবর্তন: মহাকাশে ৭ দিন ২৩ ঘণ্টা এবং ৫ মিনিট অবস্থান করার পর, ১৯৮৭ সালের ৩০ জুলাই তিনি সয়ুজ টিএম-২ (Soyuz TM-2) মহাকাশযানে করে পৃথিবীতে সফলভাবে ফিরে আসেন।

তাঁর এই ঐতিহাসিক অর্জনের পর সোভিয়েত ইউনিয়ন তাঁকে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ‘হিরো অব দ্য সোভিয়েত ইউনিয়ন’ (Hero of the Soviet Union) এবং ‘অর্ডার অব লেনিন’ (Order of Lenin) খেতাবে ভূষিত করে। সিরিয়ায় ফেরার পর তিনি জাতীয় বীরে পরিণত হন।

৪. ভিন্নমত ও সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ (২০১২)

মহাকাশ থেকে ফেরার পর মোহাম্মাদ ফারিস সিরিয়ার বিমান বাহিনীতে উচ্চপদে দায়িত্ব পালন করেন এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রসারে কাজ করতে চান। তবে তৎকালীন আসাদ সরকারের (প্রথমে হাফিজ আল-আসাদ এবং পরে বাশার আল-আসাদ) কঠোর ও একনায়কতান্ত্রিক ব্যবস্থার কারণে তিনি কিছুটা কোণঠাসা অনুভব করেন।

২০১১ সালে সিরিয়ায় যখন গণতন্ত্রের দাবিতে আন্দোলন শুরু হয় এবং আসাদ সরকার সাধারণ জনগণের ওপর সশস্ত্র দমন-পীড়ন শুরু করে, তখন ফারিস তা মেনে নিতে পারেননি। ২০১২ সালের ৪ আগস্ট তিনি আসাদ সরকারের সামরিক বাহিনীর পদ ত্যাগ করেন এবং সপরিবারে তুরস্কের উদ্দেশ্যে সিরিয়া ত্যাগ করেন। তিনি সিরিয়ার বিরোধী দলীয় জোটের (Syrian Opposition) সাথে যুক্ত হন এবং বাশার আল-আসাদের স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে বিশ্ব দরবারে সোচ্চার ভূমিকা পালন করেন।

৫. নির্বাসিত জীবন ও শেষ দিনগুলো

দেশ ছাড়ার পর তিনি তুরস্কে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। সেখানে তিনি সিরিয়ার শরণার্থীদের অধিকার এবং বিজ্ঞান-মহাকাশ গবেষণার প্রচারণায় যুক্ত ছিলেন। তিনি প্রায়ই বলতেন, “মহাকাশ থেকে পৃথিবীকে দেখলে কোনো সীমানা দেখা যায় না, সেখানে কোনো যুদ্ধ নেই। পৃথিবীটা সবার জন্য এক সুন্দর জায়গা।”

২০২৪ সালের ১৯ এপ্রিল তুরস্কের গাজিয়ানটেপ (Gaziantep) শহরের একটি হাসপাতালে দীর্ঘ অসুস্থতার পর ৭২ বছর বয়সে এই মহান মহাকাশচারী শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

সংক্ষেপে মোহাম্মাদ ফারিস:

  • পরিচয়: সিরিয়ার প্রথম এবং একমাত্র মহাকাশচারী।
  • মিশন: সয়ুজ টিএম-৩ (১৯৮৭ খ্রিষ্টাব্দ)।
  • উপাধি: হিরো অব দ্য সোভিয়েত ইউনিয়ন, সিরিয়ার জাতীয় বীর।
  • ঐতিহাসিক গুরুত্ব: তিনি আরব বিশ্বের বিজ্ঞান ও মহাকাশ গবেষণার ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় নাম। একই সাথে নিজের দেশের মানুষের অধিকারের পক্ষে দাঁড়ানোর জন্য তিনি রাজনৈতিকভাবেও সমান সমাদৃত।

তার লিখিত কিছু বইয়ের লিংক :

০১. প্রোডাক্টিভ রামাদান

লেখক :  মোহাম্মাদ ফারিস ও উস্তাদ আলী হাম্মুদা



০২. প্রোডাক্টিভ মুসলিম

লেখক :  মোহাম্মাদ ফারিস



"বাংলা ইসলামিক বইয়ের বিশাল পিডিএফ (PDF) আর্কাইভ"