আল্লামা দেলোয়ার হোসাইন সাঈদী

দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী (২ ফেব্রুয়ারি ১৯৪০ – ১৪ আগস্ট ২০২৩) ছিলেন বাংলাদেশের একজন বিশিষ্ট ইসলামি পণ্ডিত, প্রখ্যাত বক্তা, রাজনৈতিক নেতা এবং সাবেক সংসদ সদস্য। তিনি দীর্ঘ সময় ধরে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান ইসলামি রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে-আমীর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। জাতীয় সংসদে পিরোজপুর-১ আসন থেকে পরপর দুইবার (১৯৯৬ ও ২০০১) সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া এই ব্যক্তিত্ব তাঁর সাবলীল ও আকর্ষণীয় বক্তব্য দানের ক্ষমতার জন্য দেশ-বিদেশে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর ভূমিকা নিয়ে তীব্র বিতর্ক, পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তাঁর বিচার এবং আমৃত্যু কারাদণ্ডের রায় বাংলাদেশের সমসাময়িক রাজনীতি ও বিচারিক ইতিহাসে একটি অত্যন্ত আলোচিত ও স্পর্শকাতর অধ্যায়।

প্রারম্ভিক ও পারিবারিক জীবন

জন্ম ও বংশ পরিচয়

দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী ১৯৪০ সালের ২ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের অন্তর্ভুক্ত পিরোজপুরের ইন্দুরকানী উপজেলার বালিপাড়া ইউনিয়নের সাঈদখালি গ্রামে এক মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ইউসুফ শিকদার ছিলেন গ্রামের একজন আলেম ও গৃহস্থ এবং মাতা গুলনাহার বেগম।

শিক্ষা জীবন

সাঈদীর প্রাথমিক ধর্মীয় শিক্ষা শুরু হয় তাঁর পিতার প্রতিষ্ঠিত স্থানীয় একটি মাদ্রাসায়। প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মীয় শিক্ষার উদ্দেশ্যে তিনি ১৯৬২ সালে বিখ্যাত ছারছিনা আলিয়া মাদ্রাসায় ভর্তি হন। পরবর্তীতে তিনি খুলনা আলিয়া মাদ্রাসায় স্থানান্তরিত হন এবং সেখান থেকে তাঁর উচ্চতর ধর্মীয় শিক্ষা সম্পন্ন করেন। তিনি বাংলা ভাষার পাশাপাশি আরবি ও উর্দু ভাষায় গভীর পারদর্শিতা অর্জন করেছিলেন।

পারিবারিক জীবন

ব্যক্তিগত জীবনে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী শেখ সালেহা বেগমের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। এই দম্পতির চার সন্তান (পুত্র):

  • রফিক বিন সাঈদী: তিনি ২০১২ সালে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন।
  • শামীম সাঈদী
  • মাসঊদ সাঈদী: যিনি বর্তমানে তাঁর পিতার রাজনৈতিক ও সামাজিক উত্তরাধিকারের সাথে যুক্ত।
  • নাসিম সাঈদী

এছাড়াও বাংলাদেশের বিশিষ্ট ইসলামি ব্যক্তিত্ব মাওলানা কামালুদ্দীন জাফরী তাঁর বেয়াই (আত্মীয়)। ধর্মীয় শিক্ষা সমাপ্তির পর সাঈদী স্থানীয়ভাবে ব্যবসা শুরু করেন এবং আশির দশক থেকে একজন ইসলামি আলেম বা মাওলানা হিসেবে সমাজে সুপরিচিত হয়ে ওঠেন।

১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধ ও বিতর্ক

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর তৎকালীন ভূমিকা নিয়ে পরবর্তী সময়ে তীব্র আইনি ও রাজনৈতিক বিতর্কের সৃষ্টি হয়।

অভিযোগের প্রেক্ষাপট

অভিযোগকারী ও রাষ্ট্রপক্ষের দাবি অনুযায়ী, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় ৩০ বছর বয়সী সাঈদী বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিলেন এবং পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে সক্রিয়ভাবে সমর্থন করেন। যুদ্ধকালীন গঠিত আধাসামরিক বাহিনী ‘রাজাকার’-এর সক্রিয় সদস্য হিসেবে পিরোজপুর অঞ্চলে হত্যা, লুণ্ঠন, অগ্নিসংযোগ এবং সংখ্যালঘু হিন্দুদের জোরপূর্বক ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত করার মতো মানবতাবিরোধী অপরাধে তিনি যুক্ত ছিলেন বলে অভিযোগ করা হয়।

সাঈদীর পক্ষের যুক্তি

সাঈদীর পরিবার ও তাঁর আইনজীবীদের পক্ষ থেকে এই অভিযোগগুলো কঠোরভাবে অস্বীকার করা হয়। তাঁর পুত্র মাসঊদ সাঈদীর দাবি অনুযায়ী, ১৯৭১ সালে সাঈদী পিরোজপুরেই ছিলেন না; বরং ১৯৬৯ সাল থেকেই তিনি সপরিবারে যশোরে বসবাস করছিলেন। ট্রাইব্যুনালে তাঁর আইনজীবীরা যুক্তি দেখান যে, ১৯৭১ সালে পিরোজপুর অঞ্চলে অপরাধের সাথে জড়িত ‘দেলাওয়ার হোসাইন শিকদার’ ওরফে ‘দেইল্যা রাজাকার’ এবং মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী এক ব্যক্তি নন। প্রকৃত ‘দেইল্যা রাজাকার’কে স্বাধীনতা যুদ্ধের পরপরই মুক্তিযোদ্ধারা আটক করে হত্যা করেছিল এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে সাঈদীর ওপর এই পরিচয় চাপানো হয়েছে।

রাজনৈতিক জীবন ও সংসদীয় রাজনীতি

জামায়াতে ইসলামীতে অন্তর্ভুক্তি

স্বাধীনতার পর, ১৯৭৯ সালে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীতে যোগদান করেন। তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতার কারণে তিনি দ্রুত দলের শীর্ষ নেতৃত্বে চলে আসেন:

  • ১৯৮২: জামায়াতে ইসলামীর ‘রুকন’ (শপথধারী সদস্য) পদ লাভ।
  • ১৯৮৯: কেন্দ্রীয় মজলিশে শূরা সদস্য মনোনীত।
  • ১৯৯৬: দলের সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারণী ফোরাম ‘কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ’-এর সদস্য।
  • ২০০৯ – ২০২৩: আমৃত্যু বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ‘নায়েবে-আমীর’ (সহ-সভাপতি) হিসেবে দায়িত্ব পালন।

ওয়াজ-মাহফিলের মাধ্যমে দেশব্যাপী জনপ্রিয়তা

১৯৮০-এর দশকের প্রথম দিক থেকে সাঈদী দেশব্যাপী সুনির্দিষ্ট পঞ্জিকা অনুযায়ী সাধারণ মানুষের উদ্দেশ্যে ইসলামি ওয়াজ-মাহফিল ও পবিত্র কোরআনের তাফসির করা শুরু করেন। তাঁর চমৎকার বাচনভঙ্গি, সুর ও শব্দচয়ন এবং সমসাময়িক বিষয়ের সাথে ধর্মীয় ব্যাখ্যার সমন্বয় করার ক্ষমতার কারণে তিনি দ্রুত দেশজুড়ে বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। তাঁর তাফসির মাহফিলগুলোতে লক্ষাধিক মানুষের সমাগম ঘটত।

সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া (১৯৯৬ ও ২০০১)

জনপ্রিয়তাকে পুঁজি করে তিনি সংসদীয় রাজনীতিতে প্রবেশ করেন।

  1. ১৯৯৬ (সপ্তম জাতীয় সংসদ): পিরোজপুর-১ আসন থেকে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তিনি প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য (MP) নির্বাচিত হন।
  2. ২০০১ (অষ্টম জাতীয় সংসদ): এই নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) মিলে চার দলীয় ঐক্যজোট গঠন করে। সাঈদী একই আসন থেকে পুনরায় জোটের প্রার্থী হিসেবে বিপুল ভোটে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত তিনি এই আসনের প্রতিনিধিত্ব করেন।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিতর্ক ও ভূ-রাজনীতি

সাঈদীর কট্টর ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ইস্যুতে তাঁর বক্তব্য পশ্চিমা বিশ্বে ও কূটনৈতিক মহলে ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয়।

আফগানিস্তান যুদ্ধের সমালোচনা (২০০১)

২০০১ সালে আমেরিকার টুইন টাওয়ারে ৯/১১ হামলার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রবাহিনী আফগানিস্তানের তালেবান সরকার উৎখাত এবং আল-কায়েদা নির্মূলে সামরিক অভিযান শুরু করে। সাঈদী এই অভিযানের তীব্র নিন্দা ও সমালোচনা করেন। তিনি একটি স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে পশ্চিমা শক্তির হস্তক্ষেপের ঘোর বিরোধিতা করেন।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘নো ফ্লাই’ তালিকা (২০০৪)

পশ্চিমা বিশ্ব এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি সাঈদীর উগ্র ও চরমপন্থী মতাদর্শের প্রচারণার অভিযোগে ২০০৪ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘টেরোরিস্ট স্ক্রিনিং সেন্টার’ (TSC) তাঁকে তাদের ‘নো ফ্লাই’ (No-Fly List) তালিকাভুক্ত করে, যার ফলে তাঁর মার্কিন আকাশসীমা ব্যবহার বা সে দেশে প্রবেশ নিষিদ্ধ হয়।

যুক্তরাজ্য ভ্রমণ ও ব্রিটিশ গণমাধ্যমের প্রতিক্রিয়া (২০০৬)

২০০৬ সালের জুলাই মাসে লন্ডনে ও লুটনে আয়োজিত ইসলামি সমাবেশে বক্তব্য দেওয়ার জন্য সাঈদী যুক্তরাজ্য সফর করেন। তাঁর এই সফরটি ব্রিটিশ রাজনীতিতে তুমুল বিতর্কের সৃষ্টি করে। বেশ কয়েকজন ব্রিটিশ সংসদ সদস্য এই সফরের বিরোধিতা করেন। ব্রিটিশ পত্রিকা দি টাইমস একটি অভ্যন্তরীণ ইমেইল ফাঁস করে দেখায় যে, ব্রিটিশ সরকারের একজন উপদেষ্টা এরিক টেইলর সতর্ক করেছিলেন যে সাঈদীর অনুসারীদের আচরণ বিশৃঙ্খলা তৈরি করতে পারে।

২০০৬ সালের ১৩ জুলাই ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমে “হু স্পিকস ফর মুসলিম? (Who speaks for Muslim?)” শিরোনামে একটি তথ্যচিত্র প্রচারিত হয়, যেখানে সাঈদীকে চরমপন্থী মতাদর্শের প্রচারক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। তবে ব্রিটিশ-বাংলাদেশি সম্প্রদায়ে তাঁর বিশাল অনুসারী ভিত্তি থাকায় ১৪ জুলাই পূর্ব লন্ডন মসজিদে তাঁর পূর্বনির্ধারিত বক্তব্য প্রদানকে ব্রিটেনের মুসলিম কাউন্সিল সমর্থন করে।

ধর্মীয় বিদ্বেষের অভিযোগ ও বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা

ব্রিটিশ গণমাধ্যমগুলো যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে সাঈদীর ভিসা বাতিলের অনুরোধ জানিয়েছিল এই অভিযোগে যে, তিনি বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায় এবং আহমদিয়াদের বিরুদ্ধে উস্কানিমূলক ও বিদ্বেষ ছড়ানোর কাজে লিপ্ত।

পরবর্তীতে ২০০৯ সালের ২৪ জুলাই ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন কর্মকর্তারা সাঈদীকে বিদেশ ভ্রমণে বাধা দেন। এর বিরুদ্ধে সাঈদী হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করলে সরকারের পক্ষ থেকে আদালতে যুক্তি দেওয়া হয় যে, সাঈদী ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার বিপক্ষে ছিলেন এবং তিনি বিদেশে গিয়ে সরকারের যুদ্ধাপরাধী বিচারের উদ্যোগের বিরুদ্ধে নেতিবাচক প্রচারণা চালাতে পারেন।

আইনি সংকট, গ্রেফতার ও বিচার প্রক্রিয়া

২০১০ সালের গ্রেফতার

২০১০ সালের ২১ মার্চ বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশনের মহাসচিব সৈয়দ রেজাউল হক চাঁদপুরী বাদী হয়ে সাঈদীর বিরুদ্ধে “ইসলাম ধর্মের অনুভূতির ওপর আঘাত হানা”র অভিযোগে একটি মামলা দায়ের করেন। এই মামলার প্রেক্ষিতে ২০১০ সালের ২৯ জুন ঢাকার শাহীনবাগের বাসা থেকে পুলিশ দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে গ্রেফতার করে। পরবর্তীতে তাঁকে যুদ্ধাপরাধের মামলায় শ্যোন অ্যারেস্ট দেখানো হয়।

যুদ্ধাপরাধের অভিযোগসমূহ

২০১১ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাঈদীর বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে গণহত্যা, ধর্ষণ, লুণ্ঠন, অগ্নিসংযোগ ও জোরপূর্বক ধর্মান্তরকরণের মোট ২০টি সুনির্দিষ্ট অপরাধের চার্জ গঠন করা হয়। এর পাশাপাশি ১৯৭১ সালে পিরোজপুরের তৎকালীন সাব-ডিভিশনাল পুলিশ অফিসার (SDPO) ফায়জুর রহমান (বিখ্যাত লেখক হুমায়ূন আহমেদের পিতা) হত্যাকাণ্ডে তাঁর সম্পৃক্ততার অভিযোগ আনা হয়। ১৯৯৪ সালের গণতদন্ত কমিটি এবং ২০০৯ সালে মানিক পশারী ও বীর মুক্তিযোদ্ধা মহিউদ্দীন আলম হাওলাদার কর্তৃক পিরোজপুরের আদালতে দায়ের করা মামলাগুলোও এই বিচারের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।

ট্রাইব্যুনালের রায় ও ফাঁসির আদেশ (২০১৩)

২০১৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি বিচারপতি এ টি ATM ফজলে কবীরের নেতৃত্বে গঠিত তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ সাঈদীর মামলার রায় ঘোষণা করে।

  • প্রমাণিত অভিযোগ: ২০টি অভিযোগের মধ্যে ৮টি অভিযোগ (৬, audit, ৭, ৮, ১০, ১১, ১৪, ১৬, ১৯ নম্বর) সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়।
  • দণ্ড: এর মধ্যে ৮ ও ১০ নম্বর অভিযোগে (যাতে গণহত্যা ও হত্যার সংশ্লিষ্টতা ছিল) ট্রাইব্যুনাল সাঈদীকে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড (ফাঁসি) প্রদান করে। বাকি প্রমাণিত অভিযোগগুলোতে আলাদা কোনো সাজা ঘোষণা করা হয়নি এবং অপর ১২টি অভিযোগ থেকে তাঁকে খালাস দেওয়া হয়।

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও সহিংসতা

সাঈদীর ফাঁসির রায় ঘোষণার পর দেশজুড়ে নজিরবিহীন রাজনৈতিক সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। জামায়াতে ইসলামী ও এর অঙ্গসংগঠনগুলো দেশব্যাপী তীব্র প্রতিবাদ, হরতাল ও বিক্ষোভ শুরু করে, যা একপর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাথে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে রূপ নেয় এবং বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটে।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এই বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (HRW) এবং অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বিচারপদ্ধতির স্বচ্ছতা ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড নিয়ে সমালোচনা করে। কয়েকটি আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক সংস্থা এই বিচারকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং ‘ভুল পরিচয়ের মামলা’ (Case of mistaken identity) বলে অভিহিত করে।

সুপ্রিম কোর্টের আপিল ও আমৃত্যু কারাদণ্ড (২০১৪)

ট্রাইব্যুনালের ফাঁসির রায়ের বিরুদ্ধে সাঈদীর আইনজীবীরা খালাস চেয়ে এবং রাষ্ট্রপক্ষ অন্য অভিযোগগুলোর সাজার দাবিতে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করেন। ২০১৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ বহুল আলোচিত এই আপিলের রায় ঘোষণা করে। আপিল বিভাগ সামগ্রিক তথ্য-প্রমাণ ও আইনি দিক পর্যালোচনা করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দেওয়া ফাঁসির আদেশ পরিবর্তন করে সাঈদীকে ‘আমৃত্যু কারাদণ্ড’ (ন্যাচারাল লাইফ ইমপ্রিজনমেন্ট) প্রদান করে।

সাহিত্যিক অবদান ও গ্রন্থাবলি

রাজনীতি ও ধর্মীয় বক্তৃতার পাশাপাশি দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী একজন লেখক হিসেবেও সক্রিয় ছিলেন। তিনি ইসলামি আকিদা, সমাজব্যবস্থা, সমসাময়িক রাজনীতি এবং পবিত্র কোরআনের তাফসির বিষয়ক বহু গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁর প্রকাশিত উল্লেখযোগ্য গ্রন্থাবলির তালিকা নিচে দেওয়া হলো:

তাফসির ও কোরআন বিষয়ক গ্রন্থ

  • তাফসীরে সাঈদী – সূরা আল-ফাতিহা
  • তাফসীরে সাঈদী – সূরা লূকমান
  • তাফসীরে সাঈদী – সূরা আল-আসর
  • তাফসীরে সাঈদী – আমপারা
  • বিষয়ভিত্তিক তাফসীরুল কোরআন (১ম ও ২য় খণ্ড)
  • পবিত্র কোরআনের মু’জিজা
  • মানবতার মুক্তি সনদ মহাগ্রন্থ আল-কোরআন
  • আল কোরআনের মানদণ্ডে সফলতা ও ব্যর্থতা
  • আল-কোরআনের দৃষ্টিতে মহাকাশ ও বিজ্ঞান
  • আল-কোরআনের দৃষ্টিতে ইবাদাতের সঠিক অর্থ

ইসলামি জীবনবিধান ও সমাজনীতি

  • আখিরাতের জীবনচিত্র
  • দুর্নীতি মুক্ত সমাজ গড়ার মূলনীতি
  • সন্ত্রাস ও জঙ্গীবাদ দমনে ইসলাম
  • শিশুর প্রশিক্ষণ পদ্ধতি
  • চরিত্র গঠনে নামাযের অবদান
  • জান্নাত লাভের সহজ আমল
  • হাদীসের আলোকে সমাজ জীবন
  • দ্বীন প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে ধৈর্যের অপরিহার্যতা
  • দ্বীনে হক-এর প্রতি দাওয়াত না দেয়ার পরিণতি
  • রাসূলুল্লাহর (সাঃ) মোনাজাত
  • সীরাতে সাইয়্যেদুল মুরসালীন

রাজনৈতিক ও সমসাময়িক চিন্তাধারা

  • আমি কেন জামায়াতে ইসলামী করি
  • ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ ঘোষণার দাবী ও প্রাসঙ্গিক ভাবনা
  • কাদিয়ানীরা কেন মুসলমান নয়
  • ঈমানের অগ্নিপরীক্ষা
  • খোলা চিঠি
  • নন্দিত জাতি নিন্দিত গন্তব্যে

ভ্রমণকাহিনী ও অন্যান্য

  • নীল দরিয়ার দেশে
  • দেখে এলাম অবিশ্বাসীদের করুণ পরিণতি
  • নিজ পরিবারবর্গের প্রতি আমার অসিয়্যত
  • শিশু-কিশোরদের প্রশ্নের জবাবে
  • মহিলা সমাবেশে প্রশ্নের জবাবে (১ম ও ২য় খণ্ড)
  • আল্লামা সাঈদী রচনাবলী (১ম, ২য় ও ৩য় খণ্ড)

মৃত্যু ও পরবর্তী অভিযোগ

অসুস্থতা ও মৃত্যু (২০২৩)

কারাবন্দী অবস্থায় ২০২৩ সালের ১৩ আগস্ট রবিবার গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী হঠাৎ হৃদরোগে আক্রান্ত হন। কারাগার কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে প্রথমে তাঁকে গাজীপুরের শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য ওই রাতেই তাঁকে ঢাকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (BSMMU) হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় পরদিন, ২০২৩ সালের ১৪ আগস্ট রাত ৮টা ৪০ মিনিটে ৮৩ বছর বয়সে তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

জানাজা ও দাফন

১৪ আগস্ট রাতে তাঁর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে ঢাকার বিএসএমএমইউ হাসপাতাল প্রাঙ্গণে বিপুলসংখ্যক অনুসারী জড়ো হন এবং একপর্যায়ে সেখানে উত্তেজনা ও সংঘর্ষের সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে তাঁর মরদেহ পিরোজপুরে নিয়ে যাওয়া হয়। ১৫ আগস্ট ২০২৩ তারিখে পিরোজপুরের সাঈদী ফাউন্ডেশন প্রাঙ্গণে বিশাল জনসমাগমে তাঁর জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয় এবং সেখানেই পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে সমাহিত করা হয়।

দৈনিক ইনকিলাক পত্রিকা  ১৬ আগস্ট ২০২৩

মৃত্যুর কারণ নিয়ে পরিবারের দাবি (২০২৪)

দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মৃত্যুকে স্বাভাবিক হৃদরোগজনিত মৃত্যু হিসেবে সরকারিভাবে ঘোষণা করা হলেও, দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ২০২৪ সালের ১ অক্টোবর তাঁর সেজো ছেলে মাসুদ সাঈদী একটি চাঞ্চল্যকর দাবি উত্থাপন করেন। তিনি অভিযোগ করেন যে, তাঁর পিতা কাশিমপুর কারাগারে সম্পূর্ণ সুস্থ ছিলেন। তৎকালীন শেখ হাসিনা সরকার রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার জন্য সুপরিকল্পিত উপায়ে এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অবহেলার মাধ্যমে চিকিৎসার নামে তাঁকে হত্যা (মেডিকেল মার্ডার) করেছে। এই দাবিটি সাঈদীর অনুসারী ও রাজনৈতিক মহলে নতুন করে আলোচনার জন্ম দেয়।

উপসংহার

মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর জীবনটি ছিল অত্যন্ত বহুমাত্রিক এবং বৈপরীত্যে ভরা। একদল মানুষের কাছে তিনি ছিলেন সুমধুর কণ্ঠের কোরআনের ব্যাখ্যাকার, জনপ্রিয় জননেতা এবং বিদগ্ধ লেখক; অন্যদিকে সমালোচক ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের কাছে তিনি ছিলেন একাত্তরের বিতর্কিত ভূমিকার জন্য দণ্ডিত এক ব্যক্তিত্ব। তবে বাংলাদেশের ধর্মীয় রাজনীতি, ইসলামি বক্তৃতার সংস্কৃতি (ওয়াজ মাহফিল) এবং সমসাময়িক ইতিহাসে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর প্রভাব ও তাঁর চলে যাওয়ার ঘটনাটি দীর্ঘকাল ধরে একটি আলোচিত বিষয় হিসেবে টিকে থাকবে।

তার লিখিত কিছু বইয়ের লিংক :

০১. আল্লামা সাঈদী রচনাবলী

লেখক : দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী



০২. আখিরাতের জীবনচিত্র

লেখক : দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী



০৩. আমি কেন জামায়াতে ইসলামী করি

লেখক : দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী



০৪. আল কুরআনের মানদন্ডে সফলতা ও ব্যর্থতা

লেখক : দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী



০৫. আল-কুরআনের দৃষ্টিতে ইবাদাতের সঠিক অর্থ

লেখক : দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী



০৬. আল-কুরআনের দৃষ্টিতে মহাকাশ ও বিজ্ঞান

লেখক : দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী



০৭. আল্লামা দেলোয়ার হোসেন সাঈদী বিরুদ্ধে আহলুল হাদীস আলেমদের বিষেদগারের জবাব

লেখক : দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী



০৮. আল্লাহ কোথায় আছেন

লেখক : দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী



০৯. আল্লাহ মৃতদেহ নিয়ে কি করবেন

লেখক : দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী



১০. ইসলাম পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান

লেখক : দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী



১১. ইসলামী সংগঠনে আনুগত্য পরামর্শ ইহতিসাব

লেখক : দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী



১২. ঈমানের অগ্নিপরিক্ষা

লেখক : দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী



১৩. কাদিয়ানীরা কেন মুসলিম নয়

লেখক : দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী



১৪. কুরআন প্রেমিক দেশবাসীর প্রতি আমার খোলা চিঠি

লেখক : দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী



১৫. চরিত্র গঠনে নামাযের অবদান

লেখক : দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী



১৬. জাতীয় সংসদে সাঈদী

লেখক : দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী



১৭. জাতীয় সংসদের ভাষণ ও বিভিন্ন সাক্ষাৎকার

লেখক : দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী



১৮. জান্নাত লাভের সহজ আমল

লেখক : দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী



১৯. দুর্নীতি মুক্ত সমাজ গড়ার মূলনীতি

লেখক : দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী



২০. দেখে এলাম অবিশ্বাসীদের করুণ পরিণতি

লেখক : দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী



২১. দ্বীন প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে ধৈর্যের অপরিহার্যতা

লেখক : দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী



২২. দ্বীনে হক-এর প্রতি দাওয়াত না দেয়ার পরিণত

লেখক : দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী



২৩. ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ ঘোষণার দাবী ও প্রাসঙ্গিক ভাবনা

লেখক : দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী



২৪. নন্দিত জাতি নিন্দিত গন্তব্যে

লেখক : দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী



২৫. নারী অধিকারের সনদ

লেখক : দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী



২৬. নিজ পরিবারবর্গের প্রতি আমার অসিয়্যত

লেখক : দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী



২৭. নীল দরিয়ার দেশে

লেখক : দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী



২৮. পবিত্র কোরআনের মুজিজা

লেখক : দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী



২৯. মহিলা সমাবেশে প্রশ্নের জবাব

লেখক : দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী



৩০. মানবতার মুক্তি সনদ মহাগ্রন্থ আল কোরআন

লেখক : দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী



৩১. রাসূলুল্লাহর সাঃ মোনাজাত

লেখক : দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী



৩২. শিশুর প্রশিক্ষণ পদ্ধতি

লেখক : দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী



৩৩. সন্ত্রাস ও জঙ্গীবাদ দমনে ইসলাম

লেখক : দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী


৩৫. সীরাতে সাইয়্যেদুল মুরসালীন

লেখক : দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী



৩৫. হাদীসের আলোকে সমাজ জীবন

লেখক : দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী


"বাংলা ইসলামিক বইয়ের বিশাল পিডিএফ (PDF) আর্কাইভ"