বিসমিল্লাহির রহমানির রাহিম
ইসলামী ইতিহাসের স্বর্ণযুগে যে কতিপয় মনীষী জ্ঞান, সাধনা, বীরত্ব এবং দানশীলতার এক অপূর্ব সমন্বয় ঘটিয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয় হলেন ইমাম আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক (রহ.)। তিনি ছিলেন একাধারে মুহাদ্দিছ, ফক্বীহ, সুফি, মুজাহিদ, কবি, এবং সফল ব্যবসায়ী। হাদীছ শাস্ত্রে তাঁর অগাধ পাণ্ডিত্যের কারণে তাঁকে ‘আমীরুল মুমিনীন ফিল হাদীছ’ (হাদীছ বিশ্বকোষের সেনাপতি) উপাধিতে ভূষিত করা হয়। ইমাম ইবনু হিববান তাঁর সম্পর্কে যথার্থই বলেছেন: “ইবনুল মুবারকের মাঝে এমন সব কল্যাণকর বৈশিষ্ট্যের সমাবেশ ঘটেছিল, तत्कालीन যুগে সারা দুনিয়ার কোনো আলেমের মাঝে যার সমাবেশ ঘটেনি।”
নিচে এই মহান ইমামের জীবন, কর্ম ও আদর্শ বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
১. জন্ম, বংশপরিচয় ও পারিবারিক পটভূমি
ইমাম আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক ১১৮ হিজরি (৭৩৬ খ্রিষ্টাব্দ) মোতাবেক উমাইয়া খলিফা হিশাম ইবনে আব্দুল মালিকের শাসনামলে খোরাসানের (বর্তমান তুর্কমেনিস্তান) বিখ্যাত ‘মার্ভ’ (Merv) শহরে জন্মগ্রহণ করেন।
তাঁর পিতা ‘মুবারক’ ছিলেন তুর্কি বা ভারতীয় বংশোদ্ভূত একজন গোলাম (মুক্তদাস বা মাওলা), যিনি হামাদানের বনু হানযালা গোত্রের একজন আরবের অধীনে কাজ করতেন। তাঁর মাতা ছিলেন খাওয়ারিজমের বাসিন্দা। দাসত্বের জীবন হলেও তাঁর পিতা ছিলেন অত্যন্ত পরহেযগার ও আমানতদার।
পিতার সততার এক ঐতিহাসিক ঘটনা:
মুবারক দীর্ঘদিন যাবত তাঁর মালিকের একটি ডালিম বা আনারের বাগানের দেখাশোনার দায়িত্বে ছিলেন। একদিন বাগানের মালিক এসে তাঁকে বললেন, “আমাকে কয়েকটি মিষ্টি আনার পেড়ে দাও।” মুবারক কয়েকটি আনার এনে দিলেন, কিন্তু সেগুলো ভাঙার পর দেখা গেল টক। মালিক ক্ষুব্ধ হয়ে আবার মিষ্টি আনার চাইলেন। মুবারক দ্বিতীয় ও তৃতীয়বারও যে আনার এনে দিলেন, সেগুলোও টক বের হলো। মালিক রেগে গিয়ে বললেন, “তুমি দীর্ঘকাল এই বাগানের মালি, অথচ জানো না কোন গাছের ফল মিষ্টি আর কোনটার টক?”
মুবারক শান্তভাবে উত্তর দিলেন, “আমি তো কোনোদিন এই বাগানের ফল চেখে দেখিনি, তাই টক-মিষ্টির পার্থক্য জানি না।” মালিক অবাক হয়ে বললেন, “কেন খাওনি?” মুবারক বললেন, “আপনি আমাকে বাগান পাহারা দেওয়ার অনুমতি দিয়েছেন, ফল খাওয়ার অনুমতি তো দেননি।”
পিতার এই অনন্য সততা ও খোদাভীতিতে মুগ্ধ হয়ে মালিক নিজের কন্যার সাথে মুবারকের বিয়ে দেন। আর এই বরকতময় দম্পতির ঔরসেই জন্ম নেন ইতিহাসের মহান আলোকবর্তিকা আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক।
২. শৈশব ও প্রখর স্মৃতিশক্তি
ইবনুল মুবারক (রহ.) ছোটবেলা থেকেই অসাধারণ মেধার অধিকারী ছিলেন। তাঁর সহপাঠী ছাখর (রহ.) বর্ণনা করেন, তাঁরা যখন মক্তবে পড়তেন, তখন একদিন এক মজলিসে এক ব্যক্তি বেশ দীর্ঘ একটি বক্তৃতা দেন। আলোচনা শেষ হলে শিশু ইবনুল মুবারক তাঁর বন্ধুকে বলেন, “আমি পুরো বক্তব্যটি মুখস্থ করে ফেলেছি।” উপস্থিত এক ব্যক্তি এটি শুনে পরীক্ষা করার জন্য তাঁকে শুনাতে বললে, তিনি হুবহু পুরো দীর্ঘ বক্তৃতাটি মুখস্থ শুনিয়ে দেন। এই প্রখর হিজফ বা মুখস্থ করার ক্ষমতাই তাঁকে পরবর্তীতে হাদীছ সংকলনে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়।
৩. ইলম অন্বেষণ ও শিক্ষকবৃন্দ
জ্ঞান অর্জনের জন্য তিনি তৎকালীন মুসলিম বিশ্বের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে অক্লান্ত সফর করেছেন। ইমাম আহমাদ ইবনুল হাম্বল (রহ.) বলেছেন, “ইলম অন্বেষণের উদ্দেশ্যে ইবনুল মুবারকের চেয়ে বেশি সফর আর কেউ করেনি।”
তিনি মার্ভ, বাগদাদ, কুফা, বসরা, মক্কা, মদিনা, শাম (সিরিয়া), মিসর ও ইয়েমেন সফর করেন। সে যুগের মহান সব ইমামদের সান্নিধ্য লাভ করেন তিনি। তাঁর প্রধান শিক্ষক ও শায়খদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন:
- ইমাম আবূ হানীফা (রহ.): ফিকহ শাস্ত্রে তিনি ইমাম আবূ হানীফার বিশেষ অনুরাগী ও ছাত্র ছিলেন।
- ইমাম মালিক ইবনে আনাস (রহ.): মদিনায় অবস্থানকালে তিনি ইমাম মালিকের নিকট থেকে সম্পূর্ণ ‘মুয়াত্তা’ মুখস্থ করেন এবং তা বর্ণনা করেন।
- ইমাম সুফিয়ান আস-সাওরী (রহ.)
- ইমাম আওযাঈ (রহ.)
ইমাম আওযাঈ একবার তাঁর এক ছাত্রকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “তুমি কি ইবনুল মুবারককে দেখেছ?” ছাত্রটি ‘না’ বললে তিনি বলেছিলেন, “যদি তুমি তাঁকে দেখতে, তবে তোমার চোখ শীতল হয়ে যেত।”
৪. হাদীছ ও ফিকহ শাস্ত্রে অবদান
ইমাম ইবনুল মুবারক ছিলেন হাদীছ যাচাই-বাছাই ও সংরক্ষণের অন্যতম পুরোধা। তিনি খোরাসান অঞ্চলে প্রথম হাদীছ চর্চা ও প্রসারের ধারা তৈরি করেন। ইমাম বুখারী, ইমাম মুসলিমসহ পরবর্তী যুগের প্রায় সব মহান মুহাদ্দিছ তাঁর বর্ণিত হাদীছ অত্যন্ত নির্ভরযোগ্যতার সাথে গ্রহণ করেছেন।
ফিকহ বা ইসলামী আইনশাস্ত্রে তিনি স্বাধীন ইজতিহাদের যোগ্যতা রাখতেন, তবে তাঁর আইনি চিন্তায় ইমাম আবূ হানীফার সুগভীর প্রভাব ছিল। হানাফি মাযহাবের প্রথম স্তরের ফকীহদের তালিকায় তাঁর নাম সম্মানের সাথে উচ্চারিত হয়।
রচিত গ্রন্থাবলী:
তিনি অত্যন্ত প্রথশযশা লেখক ছিলেন। তাঁর বেশ কিছু বিখ্যাত গ্রন্থ ইসলামের ইতিহাসে আকর গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত:
১. কিতাবুয যুহদ ওয়ার রাকাতক (Kitab al-Zuhd wa al-Raqaiq): এটি আত্মশুদ্ধি, দুনিয়াবিমুখতা ও হৃদয়ের কোমলতা নিয়ে রচিত অন্যতম প্রাচীন ও বিখ্যাত হাদীছ গ্রন্থ।
২. কিতাবুল জিহাদ (Kitab al-Jihad): জিহাদের ফজিলত ও যুদ্ধকালীন নীতিমালা সংক্রান্ত প্রথম সারির সংকলন।
৩. কিতাবুল আরবাঈন (Kitab al-Arba’een)
৪. তাফসীরুল কুরআন (Kitab Tafsir al-Qur’an)
৫. রণাঙ্গনের বীর মুজাহিদ
ইমাম ইবনুল মুবারক কেবল কলমের সৈনিক বা মসজিদের কোণের ইবাদতকারী ছিলেন না; তিনি ছিলেন রণাঙ্গনের এক অকুতোভয় বীর। তিনি প্রায়ই রোমান সীমান্তে (তারসুস ও আল-মাসিসা) মুসলিম সীমান্ত পাহারায় (রিবাত) এবং প্রত্যক্ষ জিহাদে অংশ নিতেন।
আত্মপরিচয় গোপন রাখার এক অনন্য ঘটনা:
আবদাহ বিন সুলায়মান বর্ণনা করেন, একবার রোমানদের বিরুদ্ধে এক যুদ্ধে দুই বাহিনী মুখোমুখি হলে রোমানদের পক্ষ থেকে এক শক্তিশালী যোদ্ধা মল্লযুদ্ধের আহ্বান জানায়। মুসলিমদের পক্ষ থেকে একজন সাধারণ সৈনিক সামনে এগিয়ে যান এবং রোমান বীরকে পরাস্ত ও হত্যা করেন। এরপর একে একে আরও কয়েকজন রোমান যোদ্ধাকে তিনি ধুলোয় লুটিয়ে দেন।
এই মুসলিম বীরের বীরত্ব দেখে চারপাশ থেকে সৈন্যরা তাঁকে দেখার জন্য ভিড় জমায়। তিনি নিজের মুখমণ্ডল কাপড়ে ঢেকে রেখেছিলেন যেন কেউ তাঁকে চিনতে না পারে। আবদাহ বিন সুলায়মান বলেন, “আমি জোর করে তাঁর কাপড়ের প্রান্ত ধরে টান দিলে দেখি—তিনি আর কেউ নন, আমাদের ইমাম আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক!” পরিচয় প্রকাশ পেয়ে যাওয়ায় ইমাম অত্যন্ত লজ্জিত হন এবং আবদাহকে কসম দেন যাতে তাঁর জীবিতাবস্থায় এই ঘটনা কাউকে না বলা হয়। লোকদেখানো বা রিয়া থেকে তিনি নিজেকে কতটা দূরে রাখতেন, এটি তার এক জাজ্বল্যমান প্রমাণ।
৬. ব্যবসা, দানশীলতা ও সমাজসেবা
তিনি মনে করতেন, পরনির্ভরশীলতা ইবাদতের একাগ্রতা নষ্ট করে। তাই তিনি হালাল উপায়ে কাপড়ের ব্যবসা করতেন এবং প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ অর্থ উপার্জন করতেন। তবে এই উপার্জনের পুরোটাই তিনি উলামা, গরীব এবং আল্লাহর পথের মুজাহিদদের পেছনে ব্যয় করতেন। তিনি বলতেন, “যদি এই সব নেককার আলেম ও ফুকাহাগণ না থাকতেন, তবে আমি ব্যবসাই করতাম না।”
হজ্জ কাফেলার দায়িত্ব গ্রহণ:
প্রতি বছর যখন মার্ভ শহর থেকে মানুষ হজ্জে যাওয়ার ইচ্ছা পোষণ করত, তারা ইবনুল মুবারকের সাথে কাফেলাবদ্ধ হতে চাইত। ইমাম শর্ত দিতেন, “তোমাদের সবার খরচের টাকা আমার কাছে জমা দিতে হবে।” তিনি সবার টাকা একটি বক্সে তালাবদ্ধ করে রাখতেন।
এরপর পুরো সফরে তিনি নিজ খরচে সবাইকে রাজকীয় খাবার খাওয়াতেন, সবচেয়ে ভালো সওয়ারির ব্যবস্থা করতেন এবং হজ্জ শেষে মক্কা-মদিনা থেকে সবার পরিবারের জন্য চমৎকার সব উপহার কিনে দিতেন। মার্ভে ফিরে এসে তিনি সেই বক্সটি খুলে যার যার টাকা অক্ষত অবস্থায় তাকে ফেরত দিয়ে দিতেন!
৭. আধ্যাত্মিকতা, কাব্যের ভাষা ও যুহদ (দুনিয়াবিমুখতা)
ইমাম ইবনুল মুবারক ছিলেন যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি। তাঁর কবিতাগুলো ছিল মূলত আখিরাত-মুখী, আত্মশুদ্ধি এবং আল্লাহর প্রেমে সিক্ত। তিনি খলিফাদের বিলাসবহুল জীবন পছন্দ করতেন না এবং রাজদরবার থেকে দূরে থাকতেন।
তাঁর সমকালীন বিখ্যাত সুফি ফুদাইল ইবনে ইয়াযায যখন মক্কায় ইবাদতে মগ্ন ছিলেন, তখন ইমাম ইবনুল মুবারক রোমান সীমান্তে জিহাদের ময়দান থেকে তাঁকে সম্বোধন করে একটি বিখ্যাত কবিতা লিখে পাঠিয়েছিলেন, যার প্রথম লাইনটি ছিল:
“ওহে মক্কা-মদিনার ইবাদতকারী! তুমি যদি আমাদের (জিহাদের ময়দানের) অবস্থা দেখতে, তবে বুঝতে যে তোমার ইবাদত কেবল খেলামাত্র!”
এই কবিতা পড়ে ফুদাইল ইবনে ইয়াযায কেঁদে ফেলেছিলেন এবং তাঁর সত্যতা স্বীকার করেছিলেন।
৮. মৃত্যু ও চিরবিদায়
জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে এবং উম্মাহর সেবায় জীবন বিলিয়ে দিয়ে এই মহান ইমাম ১৮১ হিজরিতে (৭৯৭ খ্রিষ্টাব্দ) মাত্র ৬৩ বছর বয়সে আব্বাসীয় খলিফা হারুন উর রশীদের শাসনামলে ফোরাত নদীর তীরে অবস্থিত ‘হীত’ (Hit) নামক স্থানে ইন্তেকাল করেন। রোমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ থেকে ফেরার পথেই তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন।
তাঁর মৃত্যুর সংবাদ যখন খলিফা হারুন উর রশীদের কাছে পৌঁছায়, খলিফা আক্ষেপ করে বলেছিলেন, “আজ পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ আলেম বিদায় নিলেন।”
ইমাম ইবনুল মুবারকের জীবনী থেকে আমাদের শিক্ষণীয়:
- হালাল উপার্জন: দ্বীনের কাজ করার জন্য দুনিয়ার বুকে কারও মুখাপেক্ষী না হয়ে সৎ ব্যবসা করা যে সুন্নাহ—তা তিনি প্রমাণ করেছেন।
- লৌকিকতাহীনতা (ইখলাস): দান বা বীরত্ব কোনো ক্ষেত্রেই নিজের নাম জাহির করার মানসিকতা তাঁর ছিল না।
- জ্ঞান ও কর্মের সমন্বয়: তিনি কেবল কিতাবী আলেম ছিলেন না, বরং কিতাবের ইলমকে বাস্তব জীবনে জিহাদ ও সমাজসেবার মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছিলেন।
আল্লাহ তাআলা ইমাম আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারককে জান্নাতুল ফিরদাউসের উচ্চ মাকাম দান করুন এবং আমাদের তাঁর আদর্শ অনুসরণের তাওফিক দিন। আমীন।
তার লিখিত কিছু বইয়ের লিংক :
০১. জান্নাতের ছায়াপথ
লেখক : ইমাম আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক (রহঃ)
০২. মুমিনের পাথেয় (কিতাবুয যুহদের অনুবাদ) (দুই খণ্ড)
লেখক : ইমাম আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক (রহঃ)

