মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী বাংলাদেশের রাজনীতি ও ইসলামি আন্দোলনের ইতিহাসে অন্যতম এক প্রভাবশালী এবং দীর্ঘ সময় ধরে আলোচিত-সমালোচিত ব্যক্তিত্ব। তিনি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমীর, সাবেক মন্ত্রী এবং একজন বিশিষ্ট ইসলামি পণ্ডিত ছিলেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ এবং পরবর্তী রাজনৈতিক পট পরিবর্তনে তার ভূমিকা অত্যন্ত গভীর। নিচে তার জীবন ও কর্মের বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরা হলো।
১. জন্ম ও জন্মস্থান
মতিউর রহমান নিজামী ১৯৪৩ সালের ২৯ অক্টোবর পাবনা জেলার সাঁথিয়া উপজেলার মনমথপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। গ্রামীণ ও ঐতিহ্যবাহী মুসলিম পারিবারিক পরিবেশে তার শৈশব অতিবাহিত হয়।
২. পিতামাতা
তার পরিবার ছিল অত্যন্ত সাধারণ এবং ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ।
- পিতা: তার পিতা লুৎফর রহমান খান ছিলেন একজন ধার্মিক ও নিভৃতচারী মানুষ।
- মাতা: তার মাতা জহুরা বেগম ছিলেন একজন গৃহিণী। পিতামাতার ধর্মীয় অনুশাসন ও নৈতিক শিক্ষার প্রভাব নিজামীর পরবর্তী শিক্ষাজীবন ও আদর্শিক অবস্থানে প্রকাশ পেয়েছিল।
৩. পড়াশোনা
মতিউর রহমান নিজামীর শিক্ষাজীবন মূলত মাদ্রাসা শিক্ষা ও ইসলামি জ্ঞানচর্চাকেন্দ্রিক ছিল। তিনি দেশের শীর্ষস্থানীয় দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে উচ্চতর ডিগ্রি লাভ করেন।
- প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা: তিনি স্থানীয় মাদ্রাসায় প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করার পর পাবনার শিবপুর আলিয়া মাদ্রাসা থেকে দাখিল এবং কামিল পরীক্ষা সম্পন্ন করেন।
- উচ্চশিক্ষা: পরবর্তীতে তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের অন্যতম শ্রেষ্ঠ দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঢাকার মাদ্রাসা-ই-আলিয়া (ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসা) থেকে ১৯৬৩ সালে কামিল (হাদিস ও ফিকহ শাস্ত্র) ডিগ্রি লাভ করেন।
- সাধারণ শিক্ষা: মাদ্রাসার শিক্ষার পাশাপাশি তিনি সাধারণ ধারার শিক্ষাতেও অংশ নেন এবং ১৯৬৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক (বিএ) ডিগ্রি অর্জন করেন।
৪. কর্মজীবন ও রাজনৈতিক উত্থান
শিক্ষাজীবন শেষ করে মতিউর রহমান নিজামী পুরোপুরি ইসলামি রাজনীতি ও সমাজসেবায় আত্মনিয়োগ করেন। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি অত্যন্ত তুখোড় বক্তা ও সংগঠক হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
- ছাত্র রাজনীতি: তিনি জামায়াতে ইসলামীর তৎকালীন ছাত্র সংগঠন ‘ইসলামী ছাত্রসংঘ’-এ যোগ দেন। তার সাংগঠনিক দক্ষতার কারণে তিনি ১৯৬৬ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তান ইসলামী ছাত্রসংঘের সভাপতি এবং পরবর্তীতে নিখিল পাকিস্তান ইসলামী ছাত্রসংঘের কেন্দ্রীয় সভাপতি (নাজেমে আলা) নির্বাচিত হন।
- মূল রাজনীতিতে প্রবেশ: স্বাধীনতার পর বেশ কিছু সময় রাজনীতিতে বিরতি থাকার পর ১৯৭0-এর দশকের শেষের দিকে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশে পুনরায় রাজনৈতিক কার্যক্রম শুরু করলে তিনি দলে সক্রিয় হন। তিনি দীর্ঘ সময় জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল (সাধারণ সম্পাদক) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
- জামায়াতে ইসলামীর আমীর: ২০০০ সালে অধ্যাপক গোলাম আযম সক্রিয় রাজনীতি থেকে অবসর নিলে মতিউর রহমান নিজামী বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর (প্রধান) নির্বাচিত হন এবং মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত এই পদে আসীন ছিলেন।
- সংসদ সদস্য ও মন্ত্রিত্ব: তিনি পাবনা-১ (সাঁথিয়া-বেড়া) আসন থেকে ১৯৯১ এবং ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০১-২০০৬ মেয়াদে চারদলীয় ঐক্যজোট সরকারের আমলে তিনি প্রথমে কৃষি মন্ত্রী এবং পরবর্তীতে শিল্প মন্ত্রী হিসেবে অত্যন্ত সততার সাথে দায়িত্ব পালন করেন বলে তার অনুসারীরা দাবি করেন।

১৯৭১ সালের ভূমিকা ও বিতর্ক
অধ্যাপক গোলাম আযমের মতো মতিউর রহমান নিজামীর জীবনেরও সবচেয়ে বড় বিতর্কিত অধ্যায় হলো ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ। পাকিস্তানের অখণ্ডতা বজায় রাখার পক্ষে অবস্থান নিয়ে তিনি স্বাধীনতার বিরোধিতা করেন। তৎকালীন ছাত্রসংঘের প্রধান হিসেবে আল-বদর বাহিনী গঠনে এবং বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডে তার প্রত্যক্ষ নেতৃত্ব ও উসকানি ছিল বলে প্রবল অভিযোগ ওঠে।
৫. ইসলামে কৃতিত্ব ও অবদান
বাংলাদেশে মওদুদীবাদী ইসলামি রাষ্ট্রচিন্তা ও আন্দোলনের প্রসারে মতিউর রহমান নিজামীর ভূমিকা অনন্য ছিল।
- সাংগঠনিক সুদৃঢ়করণ: জামায়াতে ইসলামীকে বাংলাদেশের একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার পেছনে তার প্রশাসনিক ও সাংগঠনিক দক্ষতা কাজ করেছে।
- আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সংযোগ: তিনি বিশ্বের বিভিন্ন মুসলিম দেশের ইসলামি স্কলার এবং সংস্থাগুলোর সাথে নিবিড় যোগাযোগ রক্ষা করতেন। আন্তর্জাতিক মুসলিম থিংক ট্যাংকগুলোতে তার যাতায়াত ছিল এবং তিনি ‘রাবেতা আল-আলম আল-ইসলামী’-এর কেন্দ্রীয় সদস্য ছিলেন। বিশ্বসেরা ৫০০ প্রভাবশালী মুসলিম ব্যক্তিত্বের তালিকায়ও তার নাম অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল।
- যুব সমাজ গঠন: ছাত্র সংগঠনকে আধুনিক জ্ঞান ও ইসলামের সমন্বয়ে একটি সুশৃঙ্খল ক্যাডারে রূপান্তরে তিনি দীর্ঘ সময় চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছেন।
৬. তার লিখনী (গ্রন্থাবলী)
রাজনীতি ও সাংগঠনিক কাজের পাশাপাশি মতিউর রহমান নিজামী ইসলামি জীবনব্যবস্থা ও সমাজ বিনির্মাণের লক্ষ্যে বেশ কিছু বই রচনা করেছেন। তার উল্লেখযোগ্য কয়েকটি বই হলো:
- ইসলামের কল্যাণ রাষ্ট্রীয় রূপরেখা: ইসলামি শাসনব্যবস্থায় একটি রাষ্ট্র কীভাবে জনগণের কল্যাণ সাধন করতে পারে, তার তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক আলোচনা।
- ইসলামি আন্দোলনের কর্মীদের প্রাথমিক দায়িত্ব: সংগঠনের তৃণমূল কর্মীদের করণীয় ও আদর্শিক চরিত্র গঠনের দিকনির্দেশনা।
- কুরআনের আলোকে মুমিনের জীবন: পবিত্র কুরআনের আয়াতের আলোকে মুসলিমদের প্রাত্যহিক ও সামাজিক কর্তব্য।
- তাকওয়া ও এর দাবি: ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গুণ ‘তাকওয়া’ বা খোদাভীতি নিয়ে আলোচনা।
৭. শেষ জীবন ও বর্তমান অবস্থা
মতিউর রহমান নিজামীর জীবনের শেষ অধ্যায়টি ছিল চরম নাটকীয় এবং আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সমাপ্ত।
- গ্রেফতার ও বিচার: ২০১০ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (ICT) গঠিত হলে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে ২০১০ সালের জুনে তাকে গ্রেফতার করা হয়। (এর পাশাপাশি তিনি বহুল আলোচিত ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলারও অন্যতম আসামি ছিলেন এবং তাতেও মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হন)।

- ফাঁসির রায়: ২০১৪ সালের ২৯ অক্টোবর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ১৯৭১ সালে মানবতাবিরোধী অপরাধ, বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড এবং গণহত্যার দায়ে তাকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করে। পরবর্তীতে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগেও এই রায় বহাল থাকে।
- মৃত্যু: আইনি সমস্ত প্রক্রিয়া এবং পুনর্বিবেচনার (Review) আবেদন খারিজ হওয়ার পর, ২০১৬ সালের ১১ মে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে রাত ১২টা ১০ মিনিটে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ফাঁসি কার্যকরের মাধ্যমে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। মৃত্যুর পর তার মরদেহ গ্রামের বাড়ি পাবনার মনমথপুরে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।
অধ্যাপক গোলাম আযমের মতোই মতিউর রহমান নিজামীও বাংলাদেশের ইতিহাসে এক চরম দ্বিধাবিভক্ত ব্যক্তিত্ব। জামায়াত অনুসারীদের কাছে তিনি একজন ‘শহীদ’ এবং অনন্য ইসলামি নেতা; পক্ষান্তরে, বাংলাদেশের সিংহভাগ মানুষের কাছে তিনি ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধ ও বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের মূল খলনায়কদের একজন।
তার লিখিত কিছু কিতাব উপস্থাপন করা হলো :
০১. আল কুরআনের পরিচয়
লেখক : মতিউর রহমান নিজামী
০২. আল্লাহর নৈকট্য লাভের উপায়
লেখক : মতিউর রহমান নিজামী
০৩. ইনফাক ফি সাবিলিল্লাহ
লেখক : মতিউর রহমান নিজামী
০৪. ইসলাম ও আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ
লেখক : মতিউর রহমান নিজামী
০৫.ইসলাম ও সন্ত্রাসবাদ
লেখক : মতিউর রহমান নিজামী
০৬. ইসলামী আন্দোলন ও সংগঠন
লেখক : মতিউর রহমান নিজামী
০৭. ইসলামী আন্দোলন সমস্যা ও সম্ভাবনা
লেখক : মতিউর রহমান নিজামী
০৮. এক পরাশক্তির অন্যায় যুদ্ধ আতঙ্কিত করেছে বিশ্বের মানুষকে
লেখক : মতিউর রহমান নিজামী
০৯. কারাগারের স্মৃতি
লেখক : মতিউর রহমান নিজামী
১০. কুরআনের আলোকে মুমিনের জীবন
লেখক : মতিউর রহমান নিজামী
১১. দ্বীন প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব
লেখক : মতিউর রহমান নিজামী
১২. নারী সমাজে দাওয়াত ও সংগঠন সম্প্রসারণের উপায়
লেখক : মতিউর রহমান নিজামী
১৩. মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর জাতীয় সংসদে বক্তৃতামালা
লেখক : মতিউর রহমান নিজামী
১৪. মুসলিম উম্মাহর দায়িত্ব ও কর্তব্য
লেখক : মতিউর রহমান নিজামী
১৫. রাজনীতি ও রাজনৈতিক দলের সংস্কার
লেখক : মতিউর রহমান নিজামী
১৬. রাজনীতির স্বার্থে ধর্ম বনাম ধর্ম ভিত্তিক রাজনীতি
লেখক : মতিউর রহমান নিজামী















