এ জেড এম শামসুল আলম

বাংলাদেশের প্রশাসনিক ইতিহাস এবং ইসলামী ব্যাংকিং ও জ্ঞানচর্চার পরিমণ্ডলে এজেডএম শামসুল আলম (আজম শামসুল আলম) একটি অত্যন্ত সুপরিচিত ও শ্রদ্ধেয় নাম। তিনি একাধারে সরকারের একজন সফল সাবেক সচিব, ইসলামী অর্থনীতি ও ব্যাংকিং খাতের দূরদর্শী উদ্যোক্তা এবং একজন উচ্চমানের গবেষক ও লেখক। সরকারি প্রশাসনের সর্বোচ্চ স্তরে থেকেও তিনি আজীবন ইসলামের সঠিক চেতনা ও নৈতিকতা সমাজে ছড়িয়ে দিতে কাজ করে গেছেন।

জন্ম ও শৈশব

এজেডএম শামসুল আলম বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী এবং শিক্ষা-দীক্ষায় অগ্রসর জেলা কুমিল্লায় এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশব থেকেই তিনি অত্যন্ত মেধাবী ও সমাজ-সচেতন ছিলেন। তাঁর এই মেধা ও সুউচ্চ নৈতিক মূল্যবোধ গঠনে পারিবারিক ধর্মীয় পরিবেশ গভীর ভূমিকা রেখেছিল, যা পরবর্তী সময়ে তাঁর কর্মজীবন ও সাহিত্য সাধনায় স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।

গৌরবোজ্জ্বল প্রশাসনিক কর্মজীবন (আমলাতন্ত্র)

তিনি বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের একজন শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা হিসেবে সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ও নীতিনির্ধারণী পদে অত্যন্ত দক্ষতা, সততা ও সুনামের সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন:

  • সচিব হিসেবে অবসর: তিনি বাংলাদেশ সরকারের ‘সচিব’ (Secretary) হিসেবে সরকারি চাকরি থেকে গৌরবময় অবসর গ্রহণ করেন।
  • বাংলাদেশ জনপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (BPATC): প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের দক্ষ করে গড়ে তোলার শীর্ষ প্রতিষ্ঠান বিপিএটিসি (BPATC)-এর রেক্টর হিসেবে তিনি ১১ জানুয়ারি ১৯৯০ থেকে ৩১ জুলাই ১৯৯০ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন।
  • যমুনা বহুমুখী সেতু কর্তৃপক্ষ: বাংলাদেশের মেগা প্রজেক্টের শুরুর দিকে তিনি যমুনা বহুমুখী সেতু কর্তৃপক্ষের নির্বাহী পরিচালক (Executive Director) হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।

বাংলাদেশে ইসলামী ব্যাংকিং ও অর্থনীতির অগ্রদূত

সরকারি চাকুরির গণ্ডি পেরিয়ে তিনি বাংলাদেশের সাধারণ মানুষকে সুদমুক্ত ও শরীয়াহভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সুফল দিতে এগিয়ে আসেন।

  • আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠা: ১৯৯৫ সালে একদল বিশিষ্ট উদ্যোক্তাকে সাথে নিয়ে তিনি দেশের অন্যতম শীর্ষ সারির বেসরকারি ব্যাংক ‘আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক পিএলসি’ প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি এই ব্যাংকের প্রথম ও প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন এবং ব্যাংকটির শক্তিশালী ভিত্তি গড়ে তোলেন।
  • বীমা খাতে অবদান: ব্যাংকিংয়ের পাশাপাশি ইসলামী ইন্স্যুরেন্স ব্যবস্থার প্রসারেও তিনি ভূমিকা রাখেন। তিনি ‘ইসলামী কমার্শিয়াল ইন্স্যুরেন্স পিএলসি’-এর পরিচালনা পর্ষদের উপদেষ্টা এবং একজন স্বাধীন (Independent) পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

ইসলামিক ফাউন্ডেশন ও জাতীয় অবদান

তিনি দেশের বৃহত্তম ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ‘ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ’-এর মহাপরিচালক (DG) হিসেবে ২০০৩ সালের অক্টোবর মাসে দায়িত্ব গ্রহণ করেন (সৈয়দ আশরাফ আলীর স্থলাভিষিক্ত হয়ে)।

  • তাঁর এই মেয়াদে তিনি ইসলামিক ফাউন্ডেশনের প্রকাশনা, গবেষণা এবং মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমে গতিশীলতা আনেন।
  • মুসলিম উম্মাহর অন্যতম প্রধান কেন্দ্রবিন্দু বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের আধুনিকায়ন ও সংস্কারের জন্য তিনি বিশেষভাবে সচেষ্ট ছিলেন এবং এ লক্ষ্যে সৌদি আরব দূতাবাসের মাধ্যমে বিশেষ তহবিল সংগ্রহে দূরদর্শিতার পরিচয় দেন।
  • তিনি প্রখ্যাত সাংস্কৃতিক ও সাহিত্যিক সংগঠন ‘তামাদ্দুন মজলিশ’-এর সাথে গভীরভাবে যুক্ত থেকে সমাজ সংস্কারে কাজ করেছেন।

রচয়িতা ও সাহিত্যকর্ম (ইসলামিক বই সমাহার-এর আলোকে)

এজেডএম শামসুল আলম কেবল একজন প্রশাসক বা ব্যাংকারই ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন একজন উঁচুমাপের মননশীল লেখক ও গবেষক। তাঁর লেখনীর মূল লক্ষ্য ছিল আধুনিক শিক্ষিত সমাজের কাছে ইসলামের সৌন্দর্য ও প্রায়োগিক দিকগুলো সহজ ভাষায় তুলে ধরা।

তাঁর বইগুলোতে সমসাময়িক সামাজিক সমস্যা, অর্থনীতি, আধ্যাত্মিকতা এবং সমাজ সংস্কারের ছোঁয়া পাওয়া যায়। তাঁর উল্লেখযোগ্য ও বহুল পঠিত গ্রন্থসমূহের মধ্যে রয়েছে:

১. ইসলামের অর্থনৈতিক দর্শন (ইসলামী অর্থনীতি ও সুদমুক্ত ব্যাংকিংয়ের ওপর একটি আকর গ্রন্থ) ২. প্রশাসনিক নীতি ও ইসলাম (ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে সুশাসনের রূপরেখা) ৩. উদার ও আধুনিক ইসলাম ৪. মুসলিম সমাজে অবক্ষয় ও উত্তরণের উপায় ৫. পারিবারিক শান্তি ও ইসলাম ৬. ইসলামের দৃষ্টিতে মানবধিকার ও সামাজিক ন্যায়বিচার এছাড়াও ইসলামী আদর্শ, ইতিহাস এবং সমাজচিন্তামূলক তাঁর আরও বেশ কিছু প্রবন্ধ ও গ্রন্থ রয়েছে যা রকমারিসহ বিভিন্ন দ্বীনি লাইব্রেরিতে সমাদৃত।

জীবনদর্শন ও উত্তরাধিকার (Legacy)

এজেডএম শামসুল আলমের জীবন আমাদের শেখায় যে, পেশাগত ব্যস্ততা বা উচ্চ পদের দায়িত্ব দ্বীনের সেবা ও সমাজ সংস্কারের পথে কোনো বাধা নয়। তিনি প্রশাসনিক ক্ষমতার সাথে দ্বীনি আমল ও প্রজ্ঞার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান এবং তাঁর লেখা বইগুলো আজীবন এদেশের মানুষের কল্যাণে এবং চিন্তাজগৎকে আলোকিত করতে ভূমিকা রেখে যাবে।

তার লিখিত বইয়ের লিংক হলো :

০১. আফগানিস্তান ও তালিবান

লেখক : এ জেড এম শামসুল আলম



০২. ক্রীতদাস থেকে সাহবী

লেখক : এ জেড এম শামসুল আলম



০৩. ছোটদের ইসলাম

লেখক : এ জেড এম শামসুল আলম



০৪. ছোটদের মহানবী

লেখক : এ জেড এম শামসুল আলম



০৫. তাবলীগ ও ফযিলত

লেখক : এ জেড এম শামসুল আলম



০৬. মহানবী ও শীশু

লেখক : এ জেড এম শামসুল আলম



০৭. মুসলিম সঙ্গীত চর্চার সোনালী ইতিহাস

লেখক : এ জেড এম শামসুল আলম



০৮. হযরত আলির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক চিঠি

লেখক : এ জেড এম শামসুল আলম



"বাংলা ইসলামিক বইয়ের বিশাল পিডিএফ (PDF) আর্কাইভ"