মওলানা জালালুদ্দিন মুহাম্মদ রুমি

ঐশ্বরিক প্রেমের অমর মহাকাব্য: মওলানা জালালুদ্দিন মুহাম্মদ রুমি (রহ.)-এর সুবিস্তৃত ও তাত্ত্বিক জীবনী

গবেষণা ও সংকলনে: মোহাম্মাদ ইস্রাফিল হোসাইন

ভূমিকা

বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাস, সুফি দর্শন এবং ঐশ্বরিক প্রেমের অতল সাগরে মওলানা জালালুদ্দিন মুহাম্মদ রুমি (রহ.) এক চিরভাস্বর, প্রদীপ্ত নক্ষত্র। ত্রয়োদশ শতকের এই মহান ফারসি কবি, প্রখ্যাত ধর্মতাত্ত্বিক, ইসলামী আইনজ্ঞ এবং সুফি দর্শনের শিক্ষক কেবল তাঁর সমকালীন যুগকেই আলোড়িত করেননি, বরং শতাব্দীর সীমানা পেরিয়ে আজ একবিংশ শতাব্দীতেও বিশ্বজুড়ে আধ্যাত্মিক শান্তির এক অনন্য বাতিঘর হিসেবে সমাদৃত। তিনি বিশ্বজুড়ে সংক্ষেপে ‘রুমি’ নামে পরিচিত হলেও, তাঁর জ্ঞানতাত্ত্বিক শিকড় ও জন্মস্থানের সূত্রে তিনি ‘জালালুদ্দিন মুহাম্মদ বাল্‌খি’ নামেও সমধিক পরিচিত।

১. জন্মকাল ও সমকালীন ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

মাওলানা জালালুদ্দিন রুমি ১২০৭ সালের ৩০শে সেপ্টেম্বর (হিজরি ৬০৪ সনের ৬ই রবিউল আউয়াল) খোরাসানের (বর্তমান আফগানিস্তানের অন্তর্গত) ঐতিহাসিক বলখ শহরে এক সম্ভ্রান্ত সুফি ও আইনজ্ঞ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।

রুমির পৃথিবীতে আগমনের সময়কালটি মানব ইতিহাসের এবং বিশেষ করে মুসলিম জাহানের জন্য অত্যন্ত সংকটময় ও রক্তক্ষয়ী একটি অধ্যায় ছিল। তৎকালীন বিশ্ব মূলত দুই দিক থেকে আসা মারাত্মক ও ধ্বংসাত্মক ঝড়ের মুখোমুখি হয়েছিল:

  • পশ্চিমের ক্রুসেড: ইউরোপের পশ্চিম অংশ থেকে ধেয়ে আসা খ্রিস্টানদের ক্রুসেডার বাহিনী আনাতোলিয়া উপদ্বীপ (বর্তমান তুরস্ক) পেরিয়ে সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য ও মুসলিম সালতানাতগুলোতে একের পর এক রক্তক্ষয়ী অভিযান চালাচ্ছিল।
  • পূর্বের মোঙ্গল তাণ্ডব: পূর্ব দিক থেকে ধেয়ে আসছিল ইতিহাসের অন্যতম দুর্ধর্ষ ও নিষ্ঠুর মোঙ্গল বাহিনী, যাদের তলোয়ারের আঘাতে তৎকালীন মুসলিম সভ্যতা, গ্রন্থাগার এবং নগরীসমূহ একের পর এক ধ্বংসস্তূপে পরিণত হচ্ছিল।

এমন একটি চরম অস্থির, রাজনৈতিক ও সামাজিক অবক্ষয়ের যুগেই আল্লাহ তাআলা রুমিকে পৃথিবীতে পাঠান, যাতে তিনি তাঁর আধ্যাত্মিক ও প্রেমের বাণী দ্বারা মানুষের ক্ষতবিক্ষত হৃদয়ে শান্তির মলম লাগাতে পারেন।

২. শৈশব, পারিবারিক পটভূমি ও শিক্ষা জীবন

রুমির পারিবারিক ঐতিহ্য ছিল অত্যন্ত গৌরবময়। তাঁদের পরিবার ছিল তৎকালীন খোরাসানের একটি বিশিষ্ট আইনজ্ঞ, ফকিহ এবং উচ্চমানের ধর্মতাত্ত্বিক পরিবার। তাঁর পিতা বাহাউদ্দিন ওয়ালাদ ছিলেন সমকালীন জ্ঞানজগতের এক প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তিত্ব, যাঁকে তৎকালীন উলামা ও সমাজ “পণ্ডিতদের সুলতান” (সুলতানুল উলামা) উপাধিতে ভূষিত করেছিল।

পিতা বাহাউদ্দিন ওয়ালাদ ছিলেন একাধারে সুফি, বিখ্যাত ধর্মতাত্ত্বিক এবং অতীন্দ্রিয়বাদী সাধক। তাঁর অসীম সাহস, সাধুতা, অন্তরের মহত্ত্ব এবং প্রথাগত শুষ্ক দার্শনিক বা মৌল অভিগমনের পরিবর্তে সরাসরি আধ্যাত্মিক অনুভূতির মাধ্যমে ঈশ্বরের সমীপবর্তী বা নিকটবর্তী হওয়ার তীব্র বাসনা শিশু রুমিকে গভীরভাবে প্রভাবিত ও অনুপ্রাণিত করেছিল। বাহাউদ্দিন ওয়ালাদের আধ্যাত্মিক ডায়েরি বা সংকলন, যার নাম ছিল ‘মা’রিফ’ (আত্মাকে ভালোবাসার গভীর কথা), তা রুমিকে শৈশব থেকেই কাব্যচর্চা, আধ্যাত্মিক রহস্য এবং ঐশ্বরিক প্রেমের পথে অগ্রসর হতে প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছিল।

৩. মোঙ্গল আক্রমণ, হিজরত ও ফরিদউদ্দিন আত্তারের সঙ্গে সাক্ষাৎ

রুমির বয়স যখন তরুণ কোঠায়, তখন চেঙ্গিস খানের নেতৃত্বাধীন মোঙ্গল বাহিনীর বলখ আক্রমণের খবর চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে রুমির পিতা সপরিবারে বলখ ত্যাগ করার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেন। এই দীর্ঘ হিজরত বা শরণার্থী জীবনে তাঁরা প্রথমে নিশাপুর এবং পরবর্তীতে দামেস্কে আশ্রয় নেন।

নিশাপুরে অবস্থানকালে কিশোর রুমির জীবনে একটি ঐতিহাসিক ও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা ঘটে। সেখানে তাঁর সাক্ষাৎ হয় তৎকালীন পারস্য সুফি সাহিত্যের অন্যতম প্রধান পুরুষ, বিখ্যাত ‘মানতিকে তাইয়ার’ (পাখিদের সম্মেলন) গ্রন্থের রচয়িতা, সাধক কবি ও শিক্ষক হযরত ফরিদউদ্দিন আত্তার (রহ.)-এর সঙ্গে।

হযরত ফরিদউদ্দিন আত্তার কিশোর রুমির চোখের দিকে তাকিয়েই তাঁর ভেতরের সুপ্ত অলৌকিক আধ্যাত্মিক সম্ভাবনা এবং ঐশ্বরিক প্রেমের স্ফুলিঙ্গ দেখতে পান। তিনি অত্যন্ত আনন্দিত হয়ে কিশোর রুমিকে নিজের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আধ্যাত্মিক গ্রন্থ ‘ইলাহিনামা’ (আল্লাহর গ্রন্থ) উপহার দেন এবং রুমির পিতাকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন, “আপনার এই পুত্রটি একদিন বিশ্বজুড়ে মানুষের অন্তরে খোদার প্রেমের আগুন জ্বালিয়ে দেবে।”

৪. কর্মজীবন, শিক্ষকতা ও বাগ্মী হিসেবে আত্মপ্রকাশ

দীর্ঘ সফর শেষে সেলজুক সুলতানের আমন্ত্রণে রুমির পরিবার বর্তমান তুরস্কের আনাতোলিয়ার কুনিয়া (কোণয়া) শহরে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে। রুমির বয়স যখন মাত্র চব্বিশ বছর (১২৩১ খ্রিস্টাব্দ), তখন তাঁর পিতা বাহাউদ্দিন ওয়ালাদ ইন্তেকাল করেন। পিতার ইন্তেকালের পর কনিয়ার জনগণ ও মুরিদদের অনুরোধে রুমি তাঁর পিতার শূন্য স্থলাভিষিক্ত হন।

তিনি অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে তাঁর পিতার মুরিদদের ও সাধারণ মানুষের আত্মার বিকাশের সাথে জড়িত বিভিন্ন সূক্ষ্ম বিষয়, উচ্চতর ধর্মতত্ত্ব (ফিকহ ও আকাইদ), হাদিস ও তাফসিরের শিক্ষা দিতে শুরু করেন। একই সাথে কবিতা, সঙ্গীত এবং বিভিন্ন ইসলামী জ্ঞানশাস্ত্রে তাঁর অগাধ পাণ্ডিত্যের কারণে চারদিকে তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে।

রুমির পরিচালিত এই সুফি ধারার মূল লক্ষ্যই ছিল মানুষের আত্মার পর্দাগুলো উন্মোচন করা এবং স্রষ্টার সাথে মিলনের গূঢ় রহস্য আবিষ্কার করা। তিনি তাঁর ছাত্রদের এই আধ্যাত্মিক অনুশীলনগুলো করাতেন গভীর উপমা, কবিতা, ধ্যান, নীরবতা, শিক্ষণীয় কাহিনী এবং গভীর তত্ত্বসমৃদ্ধ সংলাপের মাধ্যমে। বলা হয়ে থাকে, তৎকালীন সময়ে তাঁর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বা দরসগাহে দূর-দূরান্ত থেকে আসা প্রায় দশ হাজার ছাত্রের বিশাল সমাবেশ ঘটত এবং তিনি অত্যন্ত সম্মান ও মর্যাদাপূর্ণ রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক জীবন অতিবাহিত করতেন।

৫. সুফি সাধনা: শামস-ই-তাবরিজীর আগমন ও জীবনের আমূল পরিবর্তন

১২৪৪ সালের ১৫ই নভেম্বর রুমির জীবনে এমন এক নাটকীয় ও অলৌকিক মোড় আসে, যা তাঁর ভেতরের জগতকে সম্পূর্ণরূপে ওলটপালট করে দেয়। কনিয়ার বুকে তাঁর সাথে সাক্ষাৎ হয় তাঁর প্রকৃত আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক, মরমী সুফি সাধক ও কবি হযরত শামস-ই-তাবরিজী (রহ.)-এর সাথে।

প্রাথমিক জীবনে রুমি সারাদিন হাদিস, তাফসির, ফিকহ ইত্যাদি ধর্মগ্রন্থের চুলচেরা বিশ্লেষণে এবং কিতাব পাঠে মগ্ন থাকতেন। তাঁর চারপাশে সবসময় লক্ষ লক্ষ মুরিদান, আলেম ও মুহাদ্দিসের ভিড় থাকত, যাঁরা শুধু তাঁর মুখের একটি মূল্যবান বাণী শোনার জন্য চাতকের মতো বসে থাকতেন। কিন্তু যখন তাঁর বয়স প্রায় চল্লিশের কোঠায়, তখন কোথা থেকে এক রহস্যময়, পরিব্রাজক সাধক শামস-ই-তাবরিজীর আগমন ঘটে, যিনি মাওলানার দিনের খাওয়া আর রাতের ঘুম হারাম করে দেন। শামস ছিলেন এমন এক মস্ত বড় আউলিয়া, যাঁকে বাহ্যিক অবয়বের কারণে অনেকেই ‘ড্যান্সিং দরবেশ’ (ঘূর্ণায়মান দরবেশ) বলে মনে করত; কারণ তিনি তীব্র ঐশ্বরিক প্রেমে বিভোর হয়ে রাস্তায় রাস্তায় নেচে নেচে আল্লাহর জিকির ও তাসবিহ পাঠ করতেন। সাধারণ লোক তাঁকে নেহায়েত এক উন্মাদ বা পাগল বলে মনে করত, এমনকি প্রথমদিকে স্বয়ং রুমি নিজেও তাঁকে তাই ভেবেছিলেন।

কিন্তু প্রথম সাক্ষাতের পরই রুমি শামস-ই-তাবরিজীর মাঝে এমন এক ঐশ্বরিক নূরের সন্ধান পেয়ে যান, যা তিনি এতদিন ধরে কিতাবের পাতায় পাতায় খুঁজে বেড়াচ্ছিলেন।

কিতাব পানিতে ফেলে দেওয়ার অলৌকিক ঘটনা:

গ্রন্থসমূহে শামস ও রুমির প্রথম পরিচয়ের এক চমৎকার ও অলৌকিক বিবরণ পাওয়া যায়। একদিন রুমি তাঁর মুরিদদের বেষ্টনীতে বসে তাঁর পিতা বাহাউদ্দিন ওয়ালাদের লেখা আধ্যাত্মিক গ্রন্থ ‘মারিফ’ পড়ে শুনাচ্ছিলেন। এমন সময় শামস-ই-তাবরিজী হুট করে সেই মজলিসে এসে রুমির হাত থেকে মূল্যবান কিতাবটি কেড়ে নিয়ে পাশে থাকা একটি পানির কুণ্ড বা হাউজে ফেলে দেন!

রুমি অত্যন্ত মর্মাহত ও ক্ষুব্ধ হয়ে বলে উঠলেন, “আপনি কে? একি করলেন আপনি? এই অমূল্য কিতাব তো আর পাওয়া যাবে না!” তখন শামস মুচকি হেসে বললেন, “তোমার এসব কিতাব আর পড়ার প্রয়োজন নেই।” এরপর শামস হাউজের পানি থেকে কাগজগুলো তুলে রুমির হাতে দিলেন। রুমি বিস্ময়ের সাথে দেখলেন, পানির ভেতর থেকে তোলার পরেও কিতাবের পাতাগুলো সম্পূর্ণ শুকনা, ঝরঝরে এবং অক্ষত!

এই অলৌকিক ঘটনা রুমির ভেতরের অহংকার ও কিতাবি শুষ্কতাকে এক নিমেষে গুঁড়িয়ে দেয়। রুমি তখন বুঝতে পারেন যে, কাগজের অক্ষরের বাইরেও এক জিন্দা জ্ঞান বা ‘ইলমে লাদুন্নী’ রয়েছে। রুমি তাৎক্ষণিকভাবে তাঁর ধর্মীয় গুরুর পদবী, সম্মান ও বাহ্যিক পেশা ত্যাগ করে শামস-ই-তাবরিজীর কাছে বায়াত হওয়ার আকুল ইচ্ছা প্রকাশ করেন।

শামস তখন রুমিকে পরীক্ষা করার জন্য বললেন, “আমার মুরিদ হওয়া এত সহজ নয়। আমার কাছে বায়াত হতে হলে তোমার আমার প্রতিটি কঠিন কথা ও নির্দেশ মেনে চলতে হবে, যা সাধারণ হুজুরদের পক্ষে করা সম্ভব নয়। আমার কথা না মানলে আমি তোমাকে মুরিদ হিসেবে গ্রহণ করতে পারব না।” রুমি কোনো শর্ত ছাড়াই খোদার প্রেমের তাগিদে সবকিছু মেনে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। শামস তাঁকে আরও ভেবে দেখতে বললেন এবং বহু পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে তাঁদের মাঝে এক অভূতপূর্ব ও গভীরতম আধ্যাত্মিক বন্ধুত্বের সূচনা হয়।

শামস সম্পর্কে রুমির একটি বিখ্যাত ফারসি কবিতার বাংলা ভাবার্থ হলো:

“সমস্ত কিতাব ও গ্রন্থ যা কিছু আছে সব নদীতে ফেলে দাও, কারণ কাগজের পাতায় আল্লাহকে পাওয়া যায় না; যদি আল্লাহকে পেতে চাও, তবে শামস-ই-তাবরিজীর হৃদয়ের কাছে যাও।”

৬. চল্লিশ দিনের চিল্লা ও বিরহের অগ্নিপরীক্ষা

ধীরে ধীরে রুমি ও শামস-ই-তাবরিজীর ঘনিষ্ঠতা এতটা বৃদ্ধি পায় যে, রুমির ভেতরের সমস্ত আধ্যাত্মিক রহস্যের জট একে একে খুলতে শুরু করে। তিনি নিজেকে এবং নিজের স্রষ্টাকে এক নতুন আলোয় চিনতে শুরু করেন। রুমি তখন তাঁর বিশাল মাদ্রাসার শিক্ষকতা, মান-সম্মান এবং মুরিদদের সঙ্গ ত্যাগ করে কেবল শামস-ই-তাবরিজীর পিছনে পিছনে ঘুরতে থাকেন।

পরবর্তীতে শামস-ই-তাবরিজী রুমিকে মুরিদ করে টানা চল্লিশ দিনের এক কঠোর নির্জন চিল্লায় (আধ্যাত্মিক নির্জনতা) বসিয়ে দেন। এই চল্লিশ দিনে শামস তাঁর সিনার সমস্ত মারিফতের নূরী জ্ঞান ও ঐশ্বরিক রহস্য মাওলানা রুমির সিনায় ঢেলে দেন।

চিল্লা থেকে বের হওয়ার পর মাওলানা রুমি সম্পূর্ণ নীরব, নিশ্চুপ ও ধ্যানমগ্ন হয়ে যান। দুনিয়ার খাওয়া-দাওয়া, রাজকীয় পোশাক ও ঘুম সবকিছু ভুলে গিয়ে তিনি দিন-রাত কেবল শামস তাবরিজীর শেখানো ঐশ্বরিক প্রেমের স্মরণে মগ্ন থাকেন। তিনি মাওলানার রাজকীয় ও জাঁকজমকপূর্ণ পোশাক চিরতরে ছেড়ে দিয়ে এক সাধারণ ফকির বা দরবেশের পোশাক পরিধান করেন। শামস-ই-তাবরিজীর মতো বাহ্যিক অবয়বে উন্মাদের ভেতর আল্লাহর নূরী জ্ঞানের এই সুবিশাল মহাসমুদ্র দেখে মাওলানা রুমি তাঁর অনুভূতি প্রকাশ করে ফারসি শ্লোকে বলে উঠেছিলেন (যার বাংলা লোক-ভাবার্থ):

“ওরে খোদার ভাব মিলে নাই মাওলানায়, কি দেখিয়া এত ফালফালানি শরীয়তের হুজুরদের!”

৭. শামস-ই-তাবরিজীর নিখোঁজ হওয়া ও ট্র্যাজিক অন্তিম পরিণতি

মাওলানা রুমির মতো একজন যুগশ্রেষ্ঠ শায়খ ও আল্লামার এমন পাগলপ্রায় বেহাল দশা এবং একজন ভবঘুরে দরবেশের পিছনে ছুটে চলা কনিয়ার রক্ষণশীল সমাজ ও রুমির ভক্ত-মুরিদরা মেনে নিতে পারল না। তারা বলতে লাগল, রুমি নিজেই হয়ত পাগল হয়ে গেছেন। এই ঈর্ষা ও ক্ষোভের বশবর্তী হয়ে মাওলানা রুমির আপন ছোট পুত্র আলাউদ্দিন এবং তাঁর কিছু মুরিদ মিলে শামস-ই-তাবরিজীকে দুনিয়া থেকে চিরতরে সরিয়ে দেওয়ার এক গোপন ও নিকৃষ্ট ষড়যৌত্র শুরু করে।

বহুদিন অতিবাহিত হওয়ার পর, একদিন শামস তাবরিজী ও মাওলানা রুমি একান্তে গভীর আধ্যাত্মিক ও মারিফতের আলোচনায় বসেছিলেন। হঠাৎ শামস রুমিকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলেন, “হে রুমি! এখন আমাকে চিরবিদায় দাও। মৃত্যুর দূত (আজরাইল) আমাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য দরজায় ইশারা দিয়ে ডাকছেন।” এই কথা বলে শামস যেমনই কক্ষ থেকে একটু বাইরে পা বাড়ালেন, অমনি অন্ধকারে ওত পেতে থাকা মাওলানার আপন ছেলে আলাউদ্দিন ও তার সঙ্গীরা এক বিশাল খঞ্জর (ছুরি) দিয়ে শামস-ই-তাবরিজীকে পিছন থেকে নির্মমভাবে আঘাত করে। আঘাত পাওয়ার সাথে সাথে শামস-ই-তাবরিজী আল্লাহর নামে এত জোরে এক বিকট চিৎকার দেন যে, সেই অলৌকিক ও ভয়ানক চিৎকার শুনে হত্যাকারীরা সঙ্গে সঙ্গে জ্ঞান হারিয়ে (বেহুশ হয়ে) মাটিতে লুটিয়ে পড়ে মারা যায়!

কিছুক্ষণ পর মাওলানা রুমি বাইরে এসে দেখেন, সেই জায়গায় শামস-ই-তাবরিজীর মৃতদেহ কোথাও নেই; অলৌকিকভাবে শরীরটি গায়েব হয়ে গেছে এবং মাটিতে কেবল ছোপ ছোপ লাল রক্ত পড়ে আছে। মাওলানা রুমি নিজের প্রিয়তম আধ্যাত্মিক গুরুর প্রতি নিজের ছেলের এই জঘন্য দুষ্কৃতি ও হত্যাকাণ্ড দেখে এতটাই মর্মাহত, স্তব্ধ ও ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন যে, তিনি তাঁর নিজের ছেলে আলাউদ্দিনের জানাজার নামাজ পর্যন্ত পড়েননি।

৮. বিরহ থেকে কাব্যের জন্ম: ‘দেওয়ানে শামস’ ও ‘মসনবী শরিফ’

গুরুর এই আকস্মিক ও চিরন্তন বিচ্ছেদের পর রুমি তীব্র বিরহ, বিচ্ছেদ ও ঐশ্বরিক এশকে (প্রেম) মাতোয়ারা হয়ে যান। শামসের বিরহ-বেদনা থেকেই তাঁর ভেতরের সুপ্ত কবিসত্তা এক আগ্নেয়গিরির মতো বিস্ফোরিত হয়। তিনি শামসের স্মৃতিকে অমর করে রাখতে রচনা করেন তাঁর অন্যতম শ্রেষ্ঠ কিতাব ‘দেওয়ান-ই-শামস-ই-তাবরিজী’

arif-২

পরবর্তীতে রুমি তাঁর জীবনের শেষ ১২ বছর ধরে সম্পূর্ণ মগ্ন অবস্থায় তাঁর বিশ্বখ্যাত এবং ইসলামের ইতিহাসের সবচেয়ে প্রভাবশালী আধ্যাত্মিক কবিতার বই ‘মসনবী শরিফ’ রচনা করেন। প্রায় ২৭,০০০ লাইনের (শ্লোকের) এই সুবিশাল মহাকাব্যটি মোট ছয়টি খণ্ডে বিভক্ত।

এই অনন্য গ্রন্থের বৈশিষ্ট্য হলো:

  • আত্মা ও পরমাত্মার কথা: এর ছত্রে ছত্রে রয়েছে মানুষের আত্মা কীভাবে তার মূল উৎস স্রষ্টার সাথে মিলিত হতে পারে, তার নিখুঁত বর্ণনা।
  • কুরআন-হাদিসের বাতেনী ব্যাখ্যা: রুমি অত্যন্ত চমৎকারভাবে বিভিন্ন লোককাহিনী, উপমা এবং রসিকতার ছলে পবিত্র কুরআনের গভীর আয়াত ও হাদিসের বাতেনী (আধ্যাত্মিক ও অন্তরের) ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন। তিনি ইসলামের মূল ভিত্তি ‘তাওহীদ’ বা আল্লাহর একত্ববাদকে তাত্ত্বিক শুষ্কতা থেকে বের করে প্রেমের আলোয় ব্যাখ্যা করেছেন।

৯. রুমির সুফি দর্শনের মূল ভিত্তি: ‘ফানা’ ও ‘বাকা’ এবং ‘সামা’

মাওলানা রুমির সুফি সাধনা ও দর্শনের একটি অনন্য এবং সুনির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য রয়েছে। তিনি খোদা প্রাপ্তি বা আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের জন্য কেবল কঠোর রিয়াজতই নয়, বরং আধ্যাত্মিক ভাবধারা প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে গভীর কবিতা, ঐশ্বরিক গান এবং আধ্যাত্মিক নৃত্যের (সামা) ব্যবহার করেন। তাঁর দ্বারা প্রবর্তিত ‘সামা’ বা সুফিদের বৃত্তাকার ঘূর্ণনমান নৃত্যের ধারাটি পরবর্তী সময়ে গোটা বিশ্বে ‘Whirling Dervishes’ (ঘূর্ণায়মান দরবেশ) নামে ব্যাপক প্রসার লাভ করে।

রুমির সমগ্র দর্শনের মূল ভিত্তি দাঁড়িয়ে আছে দুটি অতিন্দ্রীয় ও আরবি শব্দের ওপর— ‘ফানা’ (Fana) এবং ‘বাকা’ (Baqa)। সৃষ্টিকর্তার সাথে মানুষের গভীরতম আধ্যাত্মিক খেলা, মিলন ও ব্যাবচ্ছেদের ক্ষেত্রে এই দুটি শব্দ ব্যবহৃত হয়:

  • ফানা (الفناء): ফানা শব্দের অর্থ হলো একের ভেতরে আরেকজনের সম্পূর্ণ লীন হয়ে যাওয়া। নিজের অহং, অস্তিত্ব এবং ইচ্ছাকে আল্লাহর ইচ্ছার ভেতরে সম্পূর্ণরূপে হারিয়ে ফেলা। যেমন— সরাইখানায় মত্ত মাতাল যেমন নিজের হুঁশ হারিয়ে বলে ওঠে, “যে আমাকে এখানে এনেছে, সেই আমাকে বাড়ি নিয়ে যাবে”; ঠিক তেমনি আশেকে এলাহী নিজের অস্তিত্ব ভুলে যান। এর আরেকটি সুন্দর উপমা হলো মোমবাতির আগুন ঘিরে পতঙ্গের উড়াউড়ি। পতঙ্গটি যখন আগুনের শিখায় ঝাঁপ দিয়ে স্বয়ং আগুনের শিখায় পরিণত হয়ে যায়, তখন সে নিজেকে হারিয়ে ফেলে।
  • বাকা (البقاء): ফানার দরজা পেরিয়ে যে নতুন পথের সৃষ্টি হয়, তাকেই বলা হয় ‘বাকা’। আরবিতে বাকার অর্থ হলো স্থায়িত্ব বা অমরত্ব লাভ করা। ফানার মাধ্যমে মানুষ যখন নিজের অহং ধ্বংস করে ফেলে, তখন বাকার মাধ্যমে তার ভেতরে এক নতুন ঐশ্বরিক অস্তিত্বের জন্ম হয়। বাকা এমন একটি চব্বিশ ঘণ্টার আত্মিক অবস্থান, যেখানে মানুষ প্রতি মুহূর্তে, প্রতি শ্বাসে তাঁর স্রষ্টাকে অনুভব করে। যার সাথে মানুষের ‘ফানা’ ঘটে, আধ্যাত্মিকভাবে তার সাথেই সে সবসময় ‘বাকা’ বা চিরস্থায়ী অবস্থায় বিরাজ করে।

১০. বিশ্বজুড়ে মসনবীর প্রভাব ও বাংলা অনুবাদ

মওলানা রুমির ‘মসনবী শরিফ’ বিশ্বের প্রায় প্রতিটি প্রধান ভাষায় অনূদিত হয়েছে এবং আজও বিভিন্ন ওয়াজ মাহফিল, আন্তর্জাতিক সেমিনার ও ধর্মীয় আলোচনা সভায় তাঁর রচিত কবিতা ও শ্লোকসমূহ আবৃত্তি করা হয়। বাংলা ভাষাতেও মসনবীর বেশ কয়েকটি চমৎকার ও নির্ভরযোগ্য অনুবাদ রয়েছে, যা বাঙালি পাঠকদের আত্মিক খোরাক জোগাচ্ছে:

  1. এমদাদিয়া লাইব্রেরি সংস্করণ: মাওলানা আবদুল মাজিদ কর্তৃক অনূদিত ও এমদাদিয়া লাইব্রেরি থেকে প্রকাশিত বিখ্যাত অনুবাদ।
  2. মীনা বুক হাউজ সংস্করণ: মাওলানা মুজিবুর রহমান ও মাওলানা নুরুদ্দিন কর্তৃক অনূদিত ও মীনা বুক হাউজ থেকে প্রকাশিত প্রাঞ্জল অনুবাদ।
  3. এছাড়াও তাঁর ‘দিওয়ান-ই-শামস-ই-তাবরিজ’-এর নির্বাচিত অংশও এখন বাংলা ভাষায় পাঠকদের জন্য সহজলভ্য।

১১. অন্তিম যাত্রা ও মৃত্যু

জীবনভর মানবাত্মার চিকিৎসা এবং ঐশ্বরিক প্রেমের আলো ছড়ানোর পর, ১২৭৩ সালের ১৭ই ডিসেম্বর তুরস্কের কুনিয়া (কোণয়া) শহরে এই মহান সুফি সম্রাট ইন্তেকাল করেন। সুফি ধারায় তাঁর মৃত্যুর এই দিনটিকে কোনো শোকের দিন বলা হয় না, বরং একে বলা হয় ‘শবে উরুস’ বা ‘মিলন রজনী’; কারণ এই দিনেই রুমি তাঁর চিরকাঙ্ক্ষিত পরমাত্মা বা স্রষ্টার সাথে চূড়ান্তভাবে মিলিত হয়েছিলেন। তুরস্কের কনিয়ায় তাঁর মাজারের ওপর নির্মিত সবুজ গম্বুজটি আজও বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ আশেক ও শান্তিপ্রিয় মানুষের প্রধান মিলনকেন্দ্র।

সারসংক্ষেপ ও গবেষকের শেষ কথা

মওলানা জালালুদ্দিন রুমি (রহ.) কেবল ত্রয়োদশ শতকের একজন কবি ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন কিয়ামত পর্যন্ত আগত মানবজাতির আত্মিক ব্যাধির এক পরম চিকিৎসক। তাঁর জীবন ও লেখনী আমাদের শেখায় কীভাবে বাহ্যিক আনুষ্ঠানিকতার খোলস ভেঙে অন্তরের গভীর ভালোবাসার মাধ্যমে স্রষ্টাকে পাওয়া যায়। বর্তমানের এই হিংসা, যুদ্ধ ও অশান্তির পৃথিবীতে রুমির প্রেমের বাণী ও সুফি দর্শনই হতে পারে মানবজাতির মুক্তির একমাত্র চাবিকাঠি। আল্লাহ তাআলা এই মহান ইমামকে জান্নাতুল ফিরদাউসের সর্বোচ্চ মাকাম দান করুন। আমীন।

তার লিখিত মহা কাব্য : মসনবী শরিফ’

০১. মসনবী শরীফ

লেখক :  মওলানা জালালুদ্দিন মুহাম্মদ রুমি



০২. মসনবীয়ে রুমী

লেখক :  মওলানা জালালুদ্দিন মুহাম্মদ রুমি



"বাংলা ইসলামিক বইয়ের বিশাল পিডিএফ (PDF) আর্কাইভ"