মাওলানা মুহাম্মদ ইউসুফ ইসলাহী

বিংশ শতাব্দীর উত্তরভাগে ও একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে ইসলামি দাওয়াহ, সমাজ সংস্কার এবং তরুণ ও নারী সমাজকে দ্বীনি শিক্ষায় শিক্ষিত করার ক্ষেত্রে যে কজন মনীষী কালজয়ী অবদান রেখেছেন, মাওলানা মুহাম্মদ ইউসুফ ইসলাহী (رحمه الله) তাদের মধ্যে অন্যতম। তিনি একাধারে একজন প্রখ্যাত আলেম, সুবক্তা, সমাজসংস্কারক এবং কালজয়ী লেখক ছিলেন। বিশেষ করে তার রচিত গ্রন্থাবলি এবং পারিবারিক ও সামাজিক জীবন গঠনের দিকনির্দেশনা ভারতীয় উপমহাদেশ ছাড়িয়ে সারাবিশ্বের মুসলিমদের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছে।

১. জন্ম ও জন্মস্থান

মাওলানা মুহাম্মদ ইউসুফ ইসলাহী ১৯৩২ সালের ৯ জুলাই তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের (বর্তমান পাকিস্তান) পাঞ্জাব প্রদেশের ফয়সালাবাদ (তৎকালীন নাম লায়ালপুর) জেলায় এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তবে তার পৈতৃক নিবাস ছিল ভারতের উত্তর প্রদেশের রামপুরে। দেশভাগের পর এবং জীবনের সিংহভাগ সময় তিনি ভারতের উত্তর প্রদেশেই অতিবাহিত করেন এবং সেখান থেকেই তার মূল দ্বীনি কার্যক্রম পরিচালিত হয়।

২. পিতা-মাতা

তার পিতা মওলানা আবদুল কাদীম সাহেব ছিলেন একজন অত্যন্ত পরহেজগার এবং দ্বীনি ইলমে সমৃদ্ধ ব্যক্তি। তিনি তৎকালীন সময়ে ব্রিটিশ ভারতের সামরিক বাহিনীতে সরকারি চাকরিতে নিয়োজিত ছিলেন। সরকারি চাকরি করলেও তিনি সন্তানদের ইসলামি তরবিয়ত বা লালন-পালনের ব্যাপারে অত্যন্ত কঠোর ও সচেতন ছিলেন। তার মা-ও ছিলেন অত্যন্ত ধার্মিক ও বিদুষী নারী, যা ছোটবেলা থেকেই ইউসুফ ইসলাহীর চরিত্রের ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছিল।

৩. পড়াশুনা ও শিক্ষা জীবন

মুহাম্মদ ইউসুফ ইসলাহীর প্রাথমিক শিক্ষার হাতেখড়ি হয় তার মায়ের কাছেই। এরপর তার পিতা তাকে দ্বীনি শিক্ষায় শিক্ষিত করার জন্য তৎকালীন ভারতের বিখ্যাত সব মাদরাসায় পাঠান।

  • প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা: তিনি উত্তর প্রদেশের বেরেলির ‘মাদরাসা মাজাহিরুল উলুম’ থেকে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপন করেন। পরবর্তীতে তিনি সাহারানপুরের বিখ্যাত মাদরাসায় পড়াশোনা করেন।
  • উচ্চশিক্ষা: উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি রামপুরের বিখ্যাত দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ‘মাদরাসাতুল ইসলাহ’-এ ভর্তি হন। এই মাদরাসাটি কুরআন কেন্দ্রিক গভীর গবেষণা ও চিন্তাধারার জন্য সুপরিচিত ছিল। এখানে তিনি দীর্ঘ সময় অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে পড়াশোনা করেন এবং ১৯৫৩ সালে কৃতিত্বের সাথে ‘ফজিলত’ (স্নাতকোত্তর সমমান) ডিগ্রি লাভ করেন।
  • ‘ইসলাহী’ উপাধির রহস্য: ‘মাদরাসাতুল ইসলাহ’ থেকে পড়াশোনা শেষ করার কারণেই তার নামের শেষে ‘ইসলাহী’ উপাধি যুক্ত হয়, যা পরবর্তীতে তার স্থায়ী পরিচিতিতে রূপ নেয়। তিনি কুরআন, হাদিস, ফিকহ এবং আরবি সাহিত্যে অগাধ পাণ্ডিত্য অর্জন করেছিলেন।

৪. কর্মজীবন

শিক্ষা জীবন শেষ করার পরপরই মাওলানা ইউসুফ ইসলাহী নিজেকে দ্বীনি দাওয়াতের কাজে নিয়োজিত করেন। তিনি কোনো গতানুগতিক পেশার দিকে না গিয়ে ইসলামি আন্দোলন এবং লেখনীকে নিজের জীবনের মূল ব্রত হিসেবে বেছে নেন।

  • জামায়াতে ইসলামী হিন্দ-এ যোগদান: ছাত্রজীবন শেষ করেই ১৯৫৩ সালে তিনি ‘জামায়াতে ইসলামী হিন্দ’-এর সাথে যুক্ত হন। দীর্ঘ সময় তিনি এই সংগঠনের কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরার (পরামর্শ সভা) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
  • মার্কাজী দারসে কুরআন: উত্তর প্রদেশের রামপুরে তিনি দীর্ঘ দিন ‘মার্কাজী দারসে কুরআন’ (কেন্দ্রীয় কুরআন শিক্ষা আসর)-এর পরিচালক ছিলেন। তার এই সাপ্তাহিক কুরআনের দরসে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে বুদ্ধিজীবীরাও দলে দলে যোগ দিতেন।
  • আমেরিকা ও ইউরোপ সফর: নব্বইয়ের দশক এবং একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে তিনি উত্তর আমেরিকা (আমেরিকা ও কানাডা) এবং ইউরোপের মুসলিম কমিউনিটির আমন্ত্রণে বহুবার সফর করেন। সেখানে তিনি আইসিএনএ (ICNA) সহ বিভিন্ন বড় বড় ইসলামি কনফারেন্সে মূল বক্তা হিসেবে খুতবা ও বক্তব্য প্রদান করেন।

৫. ইসলামে কৃতিত্ব ও অবদান

ইসলামের প্রচার, প্রসার এবং মুসলিম সমাজের বিশেষ করে নারী ও তরুণদের নৈতিক চরিত্র গঠনে মাওলানা ইউসুফ ইসলাহীর অবদান অতুলনীয়।

  • পারিবারিক ও সামাজিক সংস্কার: তিনি লক্ষ্য করেছিলেন যে, মুসলিম সমাজে বাহ্যিক ইবাদতের ওপর জোর দেওয়া হলেও পারিবারিক শিষ্টাচার এবং সামাজিক লেনদেনের (মুয়ামালাত) ক্ষেত্রে চরম অবক্ষয় রয়েছে। তিনি তার লেখনী ও বক্তব্যের মাধ্যমে মুসলিম পরিবারগুলোকে আদর্শ ইসলামি পরিবার হিসেবে গড়ে তোলার আন্দোলন শুরু করেন।
  • নারী শিক্ষার প্রসার: মাওলানা ইউসুফ ইসলাহী নারী সমাজকে দ্বীনি শিক্ষায় শিক্ষিত করার জন্য রামপুরে ‘জামিয়াতুস সালিহাত’ (Jamiat-us-Salehat) নামে একটি বিশাল আবাসিক নারী উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। এটি ভারতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় ও আদর্শ নারী মাদরাসা হিসেবে স্বীকৃতি পায়, যেখান থেকে হাজার হাজার নারী উচ্চ দ্বীনি শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখছেন।
  • অনলাইন ও মিডিয়া দাওয়াহ: ইন্টারনেটের শুরুর যুগেও তিনি প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করেছিলেন। বিভিন্ন স্যাটেলাইট চ্যানেল এবং অনলাইনে তার বক্তব্য বিশ্বব্যাপী লাখ লাখ মানুষের কাছে ইসলামের সঠিক বার্তা পৌঁছে দিয়েছিল।

৬. তার উল্লেখযোগ্য লেখনী ও বইসমূহ

লেখক হিসেবে মাওলানা মুহাম্মদ ইউসুফ ইসলাহী ছিলেন অত্যন্ত সহজ সরল অথচ অকাট্য ভাষার অধিকারী। তার বইগুলো পড়ার সময় মনে হয় একজন দরদী অভিভাবক সামনে বসে উপদেশ দিচ্ছেন। তিনি ৬০টিরও বেশি বই লিখেছেন, যার অনেকগুলোই বাংলা, ইংরেজি, তুর্কি ও হিন্দি ভাষায় অনূদিত হয়েছে।

তার কয়েকটি বিশ্ববিখ্যাত বইয়ের নাম নিচে দেওয়া হলো:

১. আদাবে জিন্দেগী (Etiquettes of Life / জীবন যাপনের ইসলামি আদব): এটি তার জীবনের সবচেয়ে সেরা এবং কালজয়ী কাজ। এই একটি বই ভারতীয় উপমহাদেশে লাখ লাখ কপি বিক্রি হয়েছে। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত একজন মুসলিমের ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবন কেমন হওয়া উচিত—তা কুরআন ও হাদিসের আলোকে এই বইটিতে অত্যন্ত চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। বাংলাভাষী পাঠকদের কাছেও বইটি অত্যন্ত জনপ্রিয়।

২. আসান ফিকহ (সহজ ফিকহ): সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন ইবাদত ও মাসআলা-মাসায়েল সহজে বোঝার জন্য দুই খণ্ডে রচিত এই বইটি একটি অসাধারণ দলিল।

৩. কুরআনী দোয়া (পবিত্র কুরআনের দোয়া): কুরআনে বর্ণিত নবী-রাসুলদের দোয়া এবং মোনাজাতের ওপর একটি চমৎকার সংকলন।

৪. ইসলামি معاشرہ (ইসলামি সমাজ): একটি আদর্শ মুসলিম সমাজ গঠনে প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব ও কর্তব্য নিয়ে লেখা বই।

৫. তাজকিয়ায়ে নফস (আত্মশুদ্ধি): মানুষের ভেতরের অহংকার ও পঙ্কিলতা দূর করে আধ্যাত্মিক উন্নতির উপায় নিয়ে রচিত বই।

৬. জিকরে ইলাহী (আল্লাহর জিকির): আল্লাহর স্মরণের গুরুত্ব ও ফজিলত নিয়ে আলোচনা।

এছাড়া তিনি দীর্ঘ সময় ধরে অত্যন্ত জনপ্রিয় ইসলামি মাসিক পত্রিকা ‘জিকরা’ (Zikra) সম্পাদনা ও প্রকাশ করে আসছিলেন, যা মুসলিমদের চিন্তাধারার সংশোধনে বড় ভূমিকা রেখেছিল।

৭.ইন্তেকাল :

মাওলানা মুহাম্মদ ইউসুফ ইসলাহী ২০২১ সালের ২১ ডিসেম্বর (১৪ جمادى الأولى ১৪৪৩ হিজরি) মঙ্গলবার ভোরে ভারতের উত্তর প্রদেশের নয়ডার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৯ বছর।

তিনি দীর্ঘ দিন ধরে বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন রোগে ভুগছিলেন। তার ইন্তেকালের পর তাকে তার প্রিয় শহর এবং কর্মস্থল রামপুরে দাফন করা হয়। তার জানাজায় দেশ-বিদেশের হাজার হাজার আলেম, শুভাকাঙ্ক্ষী ও ভক্ত অনুরাগী অংশ নেন।

উত্তরাধিকার: ব্যক্তিগতভাবে তিনি ইহলোক ত্যাগ করলেও তার রেখে যাওয়া কর্ম, ‘জামিয়াতুস সালিহাত’ মাদরাসা এবং ‘আদাবে জিন্দেগী’-র মতো কালজয়ী বইগুলোর মাধ্যমে তিনি কিয়ামত পর্যন্ত কোটি কোটি মুসলিমের হৃদয়ে বেঁচে থাকবেন। তার সন্তান এবং ছাত্ররা বর্তমানে তার শুরু করা দাওয়াহ ও শিক্ষা কার্যক্রমের ধারাকে বিশ্বব্যাপী এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।

মাওলানা মুহাম্মদ ইউসুফ ইসলাহীর জীবন আমাদের শিক্ষা দেয় কীভাবে একটি পুরো জীবনকে আল্লাহর দ্বীনের জন্য, সমাজের মানুষের কল্যাণের জন্য এবং একটি সুন্দর পরিবার ও সমাজ গঠনে উৎসর্গ করা যায়। উম্মাহর প্রতি তার দরদ ও কর্মপ্রচেষ্টা অনাগত প্রজন্মের জন্য পথপ্রদর্শক হয়ে থাকবে।

তার লেখা বইয়ের কিছি লিংক :

০১. আল কুরআনের শিক্ষা

লেখক : মুহাম্মদ ইউসুফ ইসলাহী



০২. আদবে জিন্দেগী

লেখক : মুহাম্মদ ইউসুফ ইসলাহী



০৩. আসান ফেকাহ সংকলিত

লেখক : মুহাম্মদ ইউসুফ ইসলাহী


০৪. মাতা পিতা ও সন্তানের অধিকার

লেখক : মুহাম্মদ ইউসুফ ইসলাহী



"বাংলা ইসলামিক বইয়ের বিশাল পিডিএফ (PDF) আর্কাইভ"