মাওলানা মুহাম্মদ ইদরীস কান্ধলভী (রহ.)-এর জীবন ও কর্ম। তার বায়োগ্রাফির লিংক
১. ভূমিকা
বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে ভারতীয় উপমহাদেশে যে কয়েকজন মহান মনীষী ইসলামী শিক্ষা, সংস্কৃতি, তাফসীর ও হাদীস শাস্ত্রে যুগান্তকারী অবদান রেখে গেছেন, তাদের মধ্যে অন্যতম উজ্জ্বল নক্ষত্র হলেন আল্লামা মুহাম্মদ ইদরীস কান্ধলভী (রহ.)। তিনি একাধারে ছিলেন শায়খুল হাদীস, শায়খুত তাফসীর, যুগশ্রেষ্ঠ ফকীহ, প্রখ্যাত সীরাত গবেষক এবং অনন্য লেখক। মুসলিম উম্মাহর বুদ্ধিবৃত্তিক ও আধ্যাত্মিক পুনর্জাগরণে তাঁর অবদান অবিস্মরণীয়। হাদীস ও তাফসীর শাস্ত্রে তাঁর অগাধ পাণ্ডিত্য ও গবেষণামূলক কর্মসমূহ আরব ও অনারব উভয় জাহানে বিপুলভাবে প্রশংসিত হয়েছে। ঐতিহ্যবাহী দেওবন্দী ঘরানার একজন প্রধান স্তম্ভ হওয়া সত্ত্বেও তাঁর গবেষণার গভীরতা ও রচনার অনন্য আরবী শৈলী তাঁকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছিল। তিনি তাঁর জীবনের সিংহভাগ সময় অতিবাহিত করেছেন ইলমে দীনের শিক্ষাদান, কুরআন-হাদীসের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ এবং সমকালীন বিভিন্ন বিভ্রান্তি নিরসনে।
২. জন্ম ও পারিবারিক বংশমর্যাদা
হযরত মাওলানা মুহাম্মদ ইদরীস কান্ধলভী (রহ.) ১৮৯৯ খ্রিষ্টাব্দের ২০ আগস্ট (মোতাবেক ১২ রবিউস সানি ১৩১৭ হিজরী) তৎকালীন ভারতের ভোপাল দেশীয় রাজ্যের রাজধানী ভোপালে এক অতি সম্ভ্রান্ত ও ইলমী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মাওলানা হাফেজ মুহাম্মদ ইসমাইল কান্ধলভী (মৃত ১৯৪২ খ্রি.) ছিলেন স্বীয় সময়ের একজন বিশিষ্ট আলেম এবং হযরত হাজী ইমদাদুল্লাহ মুহাজির মাক্কী (রহ.)-এর অন্যতম বিশিষ্ট খলীফা ও মুরীদ।
মাওলানা ইদরীস কান্ধলভী (রহ.)-এর পারিবারিক পরিবেশ ছিল সম্পূর্ণ দীনদার এবং জ্ঞানচর্চায় মুখরিত। তাঁর পরিবারে পবিত্র কুরআন হিফয করার রেওয়াজ এতটাই গভীর ছিল যে, পরিবারের নারী সদস্যরাও কুরআন মজীদের হাফেজা ছিলেন। পারিবারিক এই সোনালী ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় মাওলানা ইদরীস কান্ধলভী মাত্র নয় বছর বয়সেই তাঁর পিতা মাওলানা মুহাম্মদ ইসমাইল কান্ধলভীর নিকট সম্পূর্ণ কুরআন হিফয করার গৌরব অর্জন করেন।
বংশানুক্রমিক ধারায় মাওলানা ইদরীস কান্ধলভী পিতার দিক থেকে ইসলামের প্রথম খলীফা হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.)-এর বংশধর এবং মাতার দিক থেকে দ্বিতীয় খলীফা হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর বংশধর ছিলেন। একারণে তিনি নিজেকে ‘সিদ্দীকী আল-ফারুকী’ বলে অভিহিত করতেন। তাঁর পূর্বপুরুষদের মধ্যে অন্যতম বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব ছিলেন মুফতি ইলাহী বখশ কান্ধলভী, যিনি শাহ আবদুল আজীজ মুহাদ্দিসে দেহলভীর ছাত্র ছিলেন। তাঁর পূর্ণ বংশলতিকা হলো: মুহাম্মদ ইদরীস ইবনে মুহাম্মদ ইসমাইল ইবনে মুহাম্মদ ইসহাক ইবনে মুহাম্মদ আবুল কাসিম ইবনে মুফতি ইলাহী বখশ কান্ধলভী।
স্বীয় আত্মপরিচয় দিতে গিয়ে তিনি তাঁর একটি আরবী গ্রন্থে লিখেছেন: “আমি বংশের দিক থেকে সিদ্দীকী ও ফারুকী, জন্ম ও উৎপত্তির দিক থেকে ভোপালী, আবাসের দিক থেকে কান্ধলভী, মাযহাবের দিক থেকে হানাফী এবং তরীকতের দিক থেকে চিশতী ও নকশবন্দী মুজাদ্বিদী।”
৩. শিক্ষাজীবন ও ইলম অর্জন
পবিত্র কুরআন হিফয সম্পন্ন করার পর মাওলানা ইদরীস কান্ধলভী (রহ.)-এর পিতা তাঁকে উচ্চতর ধর্মীয় শিক্ষার জন্য তৎকালীন যুগের শ্রেষ্ঠ আধ্যাত্মিক সাধক ও সমাজ সংস্কারক হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.)-এর নিকট থানা ভবনের ‘খানকাহ ইমদাদিয়া আশরাফিয়া’-তে সোপর্দ করেন। সেখানে তিনি প্রাথমিক দরসে নিযামী পাঠ্যক্রমের শিক্ষা লাভ করেন হযরত থানভী এবং মাওলানা আবদুল্লাহ গাঙ্গোহী (রহ.)-এর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে।
থানা ভবনের মাদরাসায় প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্তির পর, উচ্চতর শিক্ষার উদ্দেশ্যে হযরত আশরাফ আলী থানভী (রহ.) নিজেই তরুণ ইদরীস কান্ধলভীকে সাহারানপুরের বিখ্যাত দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ‘মাজাহির উলুম’-এ নিয়ে যান এবং যুগশ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস হযরত মাওলানা খলীল আহমদ সাহারানপুরী (রহ.)-এর খিদমতে পেশ করেন। মাজাহির উলুমে তিনি মাওলানা খলীল আহমদ সাহারানপুরী, মাওলানা সাবিত আলী, মাওলানা আবদুল লতিফ এবং মাওলানা জাফর আহমদ উসমানী (রহ.)-এর মতো বিশ্বখ্যাত উলামাদের নিকট হাদীস, ফিকহ, আকীদা ও আরবী সাহিত্যের গভীর জ্ঞান অর্জন করেন। মাত্র ১৯ বছর বয়সে তিনি মাজাহির উলুম থেকে দাওরায়ে হাদীস সম্পন্ন করে প্রথম ‘সানাদে ফারাগাত’ (সনদ) লাভ করেন।
ইলমের গভীরতা আরও বৃদ্ধির লক্ষ্যে তিনি পরবর্তীতে ঐতিহ্যবাহী দারুল উলুম দেওবন্দে ভর্তি হন এবং সেখানে দ্বিতীয়বারের মতো অত্যন্ত সুনামের সাথে দাওরায়ে হাদীস সম্পন্ন করেন। দেওবন্দে তিনি যাদের সান্নিধ্য লাভ করেন তারা হলেন:
- আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশ্মীরী (রহ.): যাঁর অনন্য স্মৃতিশক্তি ও হাদীসের গভীরতা ইদরীস কান্ধলভীর চিন্তাধারাকে গভীরভাবে प्रभावित করেছিল।
- আল্লামা শাব্বির আহমদ উসমানী (রহ.): যাঁর সুনিপুণ ব্যাখ্যা ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞা কান্ধলভীকে উজ্জীবিত করেছিল।
- মুফতি আজীজুর রহমান উসমানী (রহ.): দেওবন্দের প্রথম প্রধান মুফতি।
- মাওলানা মুহাম্মদ আহমদ নানৌতভী (রহ.) ও মাওলানা হাবীবুর রহমান উসমানী (রহ.)।
দারুল উলুম দেওবন্দে তাঁর সহপাঠীদের মধ্যে ছিলেন মুফতি মুহাম্মদ শফী (পাকিস্তানের সাবেক গ্র্যান্ড মুফতি) এবং ক্বারী মুহাম্মদ তৈয়ব (দারুল উলুম দেওবন্দের দীর্ঘকালীন মুহতামিম)। এই মহান মনীষীদের সাথে তাঁর ছাত্রজীবনের সখ্যতা ও ইলমী আদান-প্রদান তাঁর পরবর্তী কর্মজীবন গঠনে ব্যাপক ভূমিকা রাখে।
৪. কর্মজীবন ও দ্বীনি খিদমত
৪.১ শিক্ষকতার সূচনা (১৯২১–১৯২২)
শিক্ষা সমাপনীর পর ১৯২১ খ্রিষ্টাব্দে (১৩৩৮ হিজরী) মাওলানা ইদরীস কান্ধলভী (রহ.) দিল্লির বিখ্যাত মাদরাসা আমীনিয়ায় শিক্ষক হিসেবে যোগদানের মাধ্যমে তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন। তৎকালীন সময়ে মাদরাসা আমীনিয়ার প্রধান ছিলেন মুফতি কেফায়াতুল্লাহ দেহলভী (রহ.)। সেখানে মাত্র এক বছর শিক্ষকতার পর তাঁর মেধা ও যোগ্যতায় মুগ্ধ হয়ে দারুল উলুম দেওবন্দের তৎকালীন মুহতামিম মাওলানা মুহাম্মদ আহমদ নানৌতভী এবং নায়েবে মুহতামিম মাওলানা হাবীবুর রহমান উসমানী তাঁকে দেওবন্দে শিক্ষকতার জন্য আমন্ত্রণ জানান।
৪.২ দারুল উলুম দেওবন্দে প্রথম পর্যায় (১৯২২–১৯২৯)
১৯২২ খ্রিষ্টাব্দে মাওলানা ইদরীস কান্ধলভী দারুল উলুম দেওবন্দে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। তাঁর অসাধারণ যোগ্যতার কারণে তাঁকে কখনোই প্রাথমিক স্তরের বই পড়াতে দেওয়া হয়নি; বরং শুরুতেই তাঁকে হানাফী ফিকহের অন্যতম কঠিন গ্রন্থ ‘হিদায়া আউয়ালীঈন’ এবং আরবী সাহিত্যের অমর সৃষ্টি ‘মাকামাতে হারিরী’ পড়ানোর দায়িত্ব দেওয়া হয়। পরবর্তীতে তিনি ‘মিশকাতুল মাসাবীহ’ এবং ‘তাফসীরে জালালাইন’-এর দরস প্রদান করেন। দেওবন্দে অবস্থানকালীন দীর্ঘ নয় বছর তিনি প্রতিদিন ফজরের নামাযের পর মাদরাসার ‘নওদারা’ ভবনে পবিত্র কুরআনের তাফসীরের ওপর বিশেষ লেকচার দিতেন। এই দরসে উচ্চতর ও ফযীলত জামাতের ছাত্ররা অংশগ্রহণ করত, যেখানে তাফসীর, হাদীস, ইলমুল কালাম এবং ফিকহের অতি সূক্ষ্ম ও জটিল বিষয়সমূহ অত্যন্ত প্রাঞ্জল ভাষায় আলোচনা করা হতো।
৪.৩ হায়দরাবাদ রাজ্যে অবস্থান ও গ্রন্থ রচনা (১৯২৯–১৯৩৯)
১৯২৯ খ্রিষ্টাব্দে দারুল উলুম দেоবন্দের অভ্যন্তরীণ কিছু প্রশাসনিক মতভেদের কারণে আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশ্মীরী ও আল্লামা শাব্বির আহমদ উসমানী মাদরাসা ত্যাগ করলে, মাওলানা ইদরীস কান্ধলভীও দেওবন্দ থেকে ইস্তফা দেন। এরপর তিনি দক্ষিণ ভারতের হায়দরাবাদ রাজ্যে গমন করেন এবং সেখানে প্রায় নয় বছর অবস্থান করেন। হায়দরাবাদে অবস্থানকালীন সময়টি তাঁর জীবনের অন্যতম ফলপ্রসূ সময় ছিল। সেখানে শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি মূলত গ্রন্থ রচনা ও গবেষণায় আত্মনিয়োগ করেন।
হায়দরাবাদের বিখ্যাত ‘আসাফিয়া লাইব্রেরি’-তে সংরক্ষিত প্রাচীন ও দুর্লভ পাণ্ডুলিপিসমূহ অধ্যয়নের সুযোগ পান তিনি। বিশেষ করে, ‘মাকাতিলুল মুসাব্বিহ’ এবং তুরবাশতীর ‘শরাহ মাসাবীহুস সুন্নাহ’-এর একমাত্র বিরল ভারতীয় পাণ্ডুলিপি ব্যবহার করে তিনি মিশকাতুল মাসাবীহের অমর আরবী ব্যাখ্যাগ্রন্থ ‘আত-তালীকুস সবিহ’ (Al-Taleeq al-Sabeeh) রচনা শুরু করেন। এই গ্রন্থটি পরবর্তীতে সিরিয়ার দামেস্ক থেকে প্রকাশিত হলে সমগ্র আরব বিশ্বে তাঁর পাণ্ডিত্য ও হাদীস গবেষণার সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। হায়দরাবাদে থাকাকালীন সময়ে তাঁর সাথে বিশ্বখ্যাত ইংরেজ মুসলিম মনীষী মুহাম্মদ মারমাডিউক পিকথল, আল্লামা মানাজির আহসান গিলানী এবং আবুল আলা মওদুদীর সাথে গভীর বৈজ্ঞানিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
৪.৪ দেওবন্দে দ্বিতীয় পর্যায় ও শায়খুত তাফসীর পদ (১৯৩৯–১৯৪৯)
১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দে আল্লামা শাব্বির আহমদ উসমানী এবং ক্বারী মুহাম্মদ তৈয়বের বিশেষ অনুরোধে মাওলানা ইদরীস কান্ধলভী পুনরায় দারুল উলুম দেওবন্দে প্রত্যাবর্তন করেন। এবার তিনি ‘শায়খুত তাফসীর’ (প্রধান তাফসীর অধ্যাপক) পদে সমাসীন হন। হায়দরাবাদের উচ্চ বেতনের চাকরি ছেড়ে দিয়ে অর্ধেকেরও কম বেতনে দ্বীনি মহব্বতে তিনি দেওবন্দে ফিরে আসেন এবং ১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত টানা দশ বছর অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে তাফসীরে ইবনে কাছীর, তাফসীরে বায়যাবী, তাফসীরে জালালাইন, সুনানে আবু دাউদ এবং ইমাম তহাবীর ‘শরহু মাআনিল আসার’ গ্রন্থের দরস দেন।
৪.৫ পাকিস্তানে হিজরত ও জামিয়া আব্বাসিয়া বাহাওয়ালপুর (১৯৪৯–১৯৫১)
১৯external৪৭ খ্রিষ্টাব্দে ভারত বিভাগের পর আল্লামা শাব্বির আহমদ উসমানী পাকিস্তানে চলে যান এবং মাওলানা ইদরীস কান্ধলভীকেও পাকিস্তানে আসার জন্য বারবার আহ্বান জানান। অবশেষে ১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দে ভারতের মাটিতে মুসলমানদের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় পরিস্থিতির পরিবর্তন লক্ষ্য করে তিনি স্থায়ীভাবে পাকিস্তানে হিজরতের সিদ্ধান্ত নেন। ১৯৪৯ সালের মে মাসে তিনি দেওবন্দ থেকে পদত্যাগ করেন। পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী দারুল উলুম হাটহাজারী মাদরাসা থেকে শায়খুল হাদীস পদের অফার থাকলেও তিনি পশ্চিম পাকিস্তানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
১৯৪৯ সালের অক্টোবরে বাহাওয়ালপুর দেশীয় রাজ্যের আমন্ত্রণে তিনি ‘জামিয়া আব্বাসিয়া’-র (বর্তমান ইসলামিয়া ইউনিভার্সিটি অব বাহাওয়ালপুর) উপাচার্য বা ‘শায়খুল জামিয়া’ হিসেবে যোগদান করেন। সেখানে তিনি প্রশাসনিক সংস্কারের পাশাপাশি সহীহ আল-বুখারী ও তাফসীরে বায়যাবীর দরস প্রদান করেন।
৪.৬ জামিয়া আশরাফিয়া লাহোর (১৯৫১–১৯৭৪)
১৯৫১ খ্রিষ্টাব্দের আগস্ট মাসে মাওলানা ইদরীস কান্ধলভী জামিয়া আব্বাসিয়া থেকে ইস্তফা দিয়ে লাহোরের নবপ্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ‘জামিয়া আশরাফিয়া’-তে ‘শায়খুল হাদীস ওয়াাত তাফসীর’ হিসেবে যোগদান করেন। মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা মুফতি মুহাম্মদ হাসান (রহ.)-এর আন্তরিক আমন্ত্রণে তিনি এই পদ গ্রহণ করেন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত দীর্ঘ ২৩ বছর তিনি লাহোরের জামিয়া আশরাফিয়াতেই বুখারী শরীফ, তিরমিযী শরীফ এবং তাফসীরের সর্বোচ্চ কিতাবসমূহের পাঠদান করেন। তাঁর দরসের আকর্ষণে সমগ্র পাকিস্তান ও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শিক্ষার্থীরা লাহোরে ছুটে আসত।
৫. রাজনৈতিক অবদান ও পাকিস্তান আন্দোলন
মাওলানা মুহাম্মদ ইদরীস কান্ধলভী (রহ.) কেবল শ্রেণীকক্ষের শিক্ষক ছিলেন না, বরং তিনি মুসলিম উম্মাহর রাজনৈতিক অধিকার আদায়েও সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। তিনি ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন এবং পরবর্তীতে পাকিস্তান আন্দোলনে আল্লামা শাব্বির আহমদ উসমানী (রহ.)-এর নেতৃত্বে গঠিত ‘জমিয়ত উলামায়ে ইসলাম’-এর অন্যতম শীর্ষস্থানীয় নেতা হিসেবে কাজ করেন। মুসলমানদের জন্য একটি স্বতন্ত্র ও স্বাধীন আবাসভূমি প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে তিনি তাঁর লেখনী ও বক্তব্যের মাধ্যমে জনমত গঠনে অভূতপূর্ব অবদান রাখেন। হিজরতের পর পাকিস্তানের ইসলামী সংবিধান প্রণয়ন এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় ইসলামী মূল্যবোধের অন্তর্ভুক্তির দাবিতে তিনি উলামাদের সাথে নিরলসভাবে কাজ করেন।
৬. কালজয়ী সাহিত্যকর্ম ও প্রকাশনা সম্ভার
মাওলানা ইদরীস কান্ধলভী (রহ.)-এর জ্ঞানগর্ভ লেখনী ছিল তাঁর জীবনের অন্যতম প্রধান খিদমত। ২১ বছর বয়সে আরবী সাহিত্যের বিখ্যাত গ্রন্থ ‘মাকামাতে হারিরী’-র আরবী ব্যাখ্যাগ্রন্থ রচনার মাধ্যমে যে সাহিত্যিক জীবনের সূচনা হয়েছিল, তা মৃত্যুর মাত্র ১৫ দিন পূর্ব পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। দীর্ঘ অর্ধশতাব্দীর সাহিত্য জীবনে তিনি আরবী ও উর্দু ভাষায় প্রায় শতাধিক গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁর প্রধান প্রধান রচনার সংক্ষিপ্ত বিবরণ নিচে দেওয়া হলো:
- মাআরিফুল কুরআন (Maarif al-Quran): ৮ খণ্ডে সমাপ্ত উর্দু ভাষার এই তাফসীর গ্রন্থটি আল-কুরআনের এক অনন্য সংযোজন। আধুনিক যুগের পাশ্চাত্য চিন্তাধারা ও বস্তুবাদের অসারতা প্রমাণ করে আল-কুরআনের শাশ্বত রূপ এই তাফসীরে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। (উল্লেখ্য, এটি মুফতি শফী রহ.-এর ‘মাআরিফুল কুরআন’ থেকে ভিন্ন এবং স্বতন্ত্র)।
- আত-তালীকুস সবিহ (Al-Taleeq al-Sabeeh): ৫ খণ্ডের এই বিশাল গ্রন্থটি ‘মিশকাতুল মাসাবীহ’-এর অন্যতম সেরা আরবী ব্যাখ্যাগ্রন্থ। দামেস্ক থেকে প্রকাশের পর আরব বিশ্বে এটি আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং তাঁর পাণ্ডিত্যকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দেয়।
- সীরাতুল মুস্তফা (Seerat-e Mustafa): ৪ খণ্ডের এই সীরাত গ্রন্থটি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র জীবনের ওপর রচিত অন্যতম বিশুদ্ধ, প্রামাণ্য ও তথ্যবহুল গ্রন্থ। ১৯৪১ থেকে ১৯৬৬ সালের মধ্যে তিনি এটি রচনা সম্পন্ন করেন।
- আকাইদুল ইসলাম (Aqaid al-Islam): ইসলামী আকীদা ও বিশ্বাসের ওপর একটি অত্যন্ত বিশদ, যুক্তিপূর্ণ ও মৌলিক গ্রন্থ, যা সর্বমহলে সমাদৃত।
- ইলমুল হাদীস ও মুকাদ্দিমাতুল হাদীস: হাদীস শাস্ত্রের পরিভাষা, ইতিহাস ও উসূলের ওপর রচিত অত্যন্ত উচ্চাঙ্গের গবেষণামূলক আরবী বই।
এছাড়াও তিনি কাদিয়ানী ফিতনা এবং সমকালীন বিভিন্ন বিভ্রান্তি খণ্ডনে অসংখ্য বই লিখেছেন। যার মধ্যে ‘ইসলাম আওর মিরযায়িয়াত কা উসুলী ইখতিলাফ’, ‘কালিমাতুল্লাহ ফী হায়াতি রূহিল্লাহ’ এবং ‘আল-কাওলুল মুহকাম’ অন্যতম। তাঁর লেখনীর প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল—তিনি আহলুস সুנת ওয়াল জামাআতের বিশুদ্ধ আকীদা অত্যন্ত চমৎকার ও অকাট্য দলীল-প্রমাণের মাধ্যমে উপস্থাপন করতেন।
७. আধ্যাত্মিক জীবন ও ছাত্র সমাজ
জ্ঞানচর্চার পাশাপাশি মাওলানা ইদরীস কান্ধলভী তাসাউফ বা আধ্যাত্মিক সাধনায় উচ্চ মাকামে অধিষ্ঠিত ছিলেন। তিনি হযরত হাকিমুল উম্মাত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.)-এর নিকট বায়াত গ্রহণ করেন এবং চিশতিয়া সাবিরিয়া তরীকায় খেলাফত লাভ করেন। তাঁর হাত ধরে হাজারো মানুষ আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহর নৈকট্য লাভের পথ খুঁজে পায়।
তাঁর দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে বহু বিশ্বখ্যাত আলেম তৈরি হয়েছেন, যারা পরবর্তীতে এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে দ্বীনের আলো ছড়িয়েছেন। তন্মধ্যে বাংলাদেশের প্রখ্যাত বুযুর্গ ও আলেম হযরত মাওলানা হারুন ইসলামাবাদী (রহ.) (আল-জামিয়াতুল ইসলামিয়া পটিয়ার সাবেক মহাপরিচালক) অন্যতম, যিনি জামিয়া আশরাফিয়া লাহোরে তাঁর নিকট থেকে হাদীসের উচ্চতর শিক্ষা লাভ করেছিলেন।
৮. ইন্তেকাল ও চিরবিদায়
ইলমে দীন, হাদীস, তাফসীর ও উম্মাহর খিদমতে সুদীর্ঘ জীবন অতিবাহিত করার পর, বিংশ শতাব্দীর এই মহান জ্ঞানসাধক ১৯৭৪ খ্রিষ্টাব্দের ২৮ জুলাই (মোতাবেক ৭ রজব ۱۳৯৪ হিজরী) রবিবার সকালে পাকিস্তানের লাহোরে ৭৪ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। তাঁর ইন্তেকালের সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে সমগ্র মুসলিম বিশ্বে শোকের ছায়া নেমে আসে। লাহোরের ঐতিহাসিক জামিয়া আশরাফিয়া প্রাঙ্গণে তাঁর জানাযার নামায অনুষ্ঠিত হয়, যাতে লাখো ওলামা, ছাত্র ও সাধারণ মানুষের ঢল নামে। জামিয়া আশরাফিয়ার কবরস্থানেই এই মহান মনীষীকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়।
৯. মূল্যায়ন ও উপসংহার
হযরত মাওলানা মুহাম্মদ ইদরীস কান্ধলভী (রহ.) ছিলেন একাধারে একজন সফল শিক্ষক, গবেষক, রাজনৈতিক দূরদর্শী নেতা এবং নিখাদ আল্লাহর অলী। দারুল উলুম দেওবন্দের ঐতিহ্যবাহী ধারার সার্থক রূপকার হিসেবে তিনি কুরআন ও সুন্নাহর বিশুদ্ধ চর্চাকে আজীবন আঁকড়ে ধরেছিলেন। তাঁর রচিত ‘মাআরিফুল কুরআন’ ও ‘সীরাতুল মুস্তফা’ আজো কোটি মানুষের হেদায়েতের আলো ছড়াচ্ছে। আরব বিশ্বের বড় বড় আলেম ও গবেষকগণ তাঁর আরবী রচনার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। তাঁর রেখে যাওয়া ইলমী ও আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকার যুগ যুগ ধরে মুসলিম উম্মাহর জন্য পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করবে।
তার লিখিত কিছু বইয়ের লিংক :
০১.ইসলামের মূলনীতি
লেখক : আল্লামা মুহাম্মদ ইদরীস কান্ধলভী (রহ.)
০২. সীরাতুল মুস্তফা ﷺ ১-৩ খন্ড একত্রে
লেখক : আল্লামা মুহাম্মদ ইদরীস কান্ধলভী (রহ.)

