সীরাত শাস্ত্রের মুকুটহীন সম্রাট: ইমাম ইবনে হিশাম (রহ.)-এর জীবনী
ভূমিকা
ইসলামের ইতিহাসে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর পবিত্র জীবন ও কর্ম (সীরাত) সংরক্ষণ ও সংকলনের ক্ষেত্রে যে কজন মনীষী অমর হয়ে আছেন, তাদের মধ্যে ইমাম ইবনে হিশাম (রহ.) অন্যতম। তিনি ছিলেন একাধারে সুপ্রসিদ্ধ ঐতিহাসিক, প্রথম সারির আরবী ব্যাকরণবিদ, বংশতত্ত্ববিদ এবং ভাষাতাত্ত্বিক। সীরাত চর্চায় তাঁর অবদান এতোটাই গভীর যে, তাঁর সংকলিত ‘সীরাতে ইবনে হিশাম’ গ্রন্থটি বিশ্বজুড়ে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনীর সবচেয়ে প্রাচীন এবং নির্ভরযোগ্য প্রামাণ্য উৎস হিসেবে বিবেচিত হয়। মুসলিম উম্মাহর নিকট তিনি অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় এবং সীরাত শাস্ত্রের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র।
১. নাম ও বংশ পরিচয়
ইমাম ইবনে হিশামের পূর্ণ নাম হলো আবু মুহাম্মদ আব্দুল মালিক বিন হিশাম ইবনে আইয়ুব আল-হিময়ারী আল-মাআফিরী আল-বাসরী।
- আবু মুহাম্মদ: এটি তাঁর কুনিয়াত বা উপনাম।
- আল-হিময়ারী ও আল-মাআফিরী: তাঁর পূর্বপুরুষগণ ছিলেন দক্ষিণ আরবের (বর্তমান ইয়েমেন) বিখ্যাত হিময়ার অঞ্চলের ‘বানু মাআফির’ গোত্রের বংশোদ্ভূত। ফলে বংশানুক্রমে তাঁকে হিময়ারী বা মাআফিরী বলা হতো।
- আল-বাসরী ও আল-মিশরী: তাঁর পরিবার ইরাকের বসরা নগরীতে বসবাস শুরু করায় তাঁকে বাসরী বলা হয়। তবে জীবনের শেষভাগে মিশরে স্থায়ী হওয়ার কারণে তাঁকে ‘মিশরী’ নামেও অভিহিত করা হয়।
২. জন্ম ও প্রাথমিক জীবন
ইমাম ইবনে হিশাম (রহ.)-এর সঠিক জন্মসাল নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে কিছুটা মতভেদ রয়েছে। তবে অধিকাংশ ঐতিহাসিকের মতে, তিনি দ্বিতীয় হিজরী শতকের মাঝামাঝি সময়ে (আব্বাসীয় খিলাফতের স্বর্ণযুগে) ইরাকের প্রাচীন জ্ঞানকেন্দ্র বসরা নগরীতে জন্মগ্রহণ করেন।
তাঁর শৈশব ও কৈশোর কাটে বসরাতেই। তৎকালীন সময়ে বসরা এবং কুফা ছিল আরবী ভাষা, ব্যাকরণ, হাদীস ও ইতিহাসের প্রধান দুটি জ্ঞানপীঠ। এই উপযুক্ত পরিবেশের কারণে শৈশব থেকেই তিনি ইলম অর্জনের প্রতি গভীরভাবে অনুরাগী হয়ে ওঠেন। তিনি আরবী কবিতা, প্রাচীন আরবদের ইতিহাস এবং গোত্রীয় বংশতত্ত্বের ওপর অসাধারণ দক্ষতা অর্জন করেন।
৩. জ্ঞান অন্বেষণ ও শিক্ষা জীবন
ইমাম ইবনে হিশাম (রহ.) ছিলেন অত্যন্ত প্রখর মেধার অধিকারী। বসরা নগরীতে অবস্থানকালে তিনি তৎকালীন শ্রেষ্ঠ আলেমদের সান্নিধ্য লাভ করেন। পরবর্তীতে উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে এবং জ্ঞান পিপাসা মেটানোর জন্য তিনি তৎকালীন ইসলামী সাম্রাজ্যের অন্যতম প্রধান সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক কেন্দ্র মিশরে হিজরত করেন।
মিশরে গিয়ে তিনি বিখ্যাত আলেম এবং সীরাত গবেষক যিয়াদ বিন আব্দুল্লাহ আল-বুকায়ী (রহ.)-এর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। এই যিয়াদ বিন আব্দুল্লাহ ছিলেন সীরাত শাস্ত্রের আদি জনক বা প্রথম সংকলক ইবনে ইসহাক (রহ.)-এর অন্যতম প্রধান এবং বিশ্বস্ত ছাত্র। ইমাম ইবনে হিশাম তাঁর উস্তাদ যিয়াদ আল-বুকায়ীর কাছ থেকে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ইবনে ইসহাকের সীরাত গ্রন্থের বর্ণনা ও পাণ্ডুলিপিটি লাভ করেন, যা পরবর্তীতে তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় কীর্তির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে।
ভাষা ও ব্যাকরণের ক্ষেত্রে তিনি তৎকালীন মিশরের প্রধান ইমামদের অন্যতম হিসেবে স্বীকৃতি পান। সুপ্রসিদ্ধ ইমাম, ফকীহ ও মাযহাবের ইমাম হযরত ইমাম শাফেয়ী (রহ.) যখন মিশরে অবস্থান করছিলেন, তখন ইমাম ইবনে হিশামের সাথে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। ইমাম শাফেয়ী (রহ.) আরবী কবিতা ও সাহিত্যের গভীর অনুরাগী ছিলেন। তিনি ইবনে হিশামের আরবী কবিতার অগাধ জ্ঞান এবং ভাষাগত পাণ্ডিত্য দেখে এতোটাই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে, তিনি ইবনে হিশামের ভূয়সী প্রশংসা করেন। স্বয়ং ইবনে হিশামও ইমাম শাফেয়ীর জ্ঞান দেখে অভিভূত হয়ে বলেছিলেন, “আমি ভাবিনি যে আল্লাহ তাআলা শাফেয়ীর মতো কোনো মানুষ পৃথিবীতে সৃষ্টি করেছেন।”
৪. সীরাত শাস্ত্রে অবদান: ‘সীরাতে ইবনে হিশাম’
ইমাম ইবনে হিশাম (রহ.)-কে পৃথিবীর মানুষ মূলত স্মরণ করে তাঁর অমর গ্রন্থ ‘আস-সীরাহ আন-নাবাবিয়্যাহ’ বা ‘সীরাতে ইবনে হিশাম’-এর জন্য।
প্রেক্ষাপট ও পরিমার্জন:
মূলত সীরাত বা নবীজীর জীবনী প্রথম বিস্তারিতভাবে লিপিবদ্ধ করেছিলেন মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক (মৃত ১৫০ হিজরী)। কিন্তু ইবনে ইসহাকের মূল গ্রন্থটি (কিতাবুল মাগাযী) আকারে ছিল বিশাল এবং তাতে সৃষ্টির শুরু থেকে আদি পিতা আদম (আ.)-এর ইতিহাস এবং অনেক ইসরাঈলী রেওয়ায়েত (ইহুদী-খ্রিস্টানদের থেকে আগত কিসসা-কাহিনী) অন্তর্ভুক্ত ছিল। এছাড়া তাতে কিছু দুর্বল বর্ণনা ও অপ্রাসঙ্গিক আরবী কবিতাও স্থান পেয়েছিল।
ইমাম ইবনে হিশাম তাঁর প্রখর মেধা, গভীর যাচাই-বাছাই ও ঐতিহাসিক দূরদর্শিতার মাধ্যমে ইবনে ইসহাকের সেই বিশাল পাণ্ডুলিপিকে পরিমার্জিত, সংশোধিত ও সংক্ষেপিত রূপ দেন। তিনি মূলত নিচের নীতিগুলো অবলম্বন করে গ্রন্থটি সম্পাদনা করেন:
- অপ্রাসঙ্গিক অংশ বর্জন: তিনি আদম (আ.) থেকে শুরু করে ইসমাইল (আ.) পর্যন্ত দীর্ঘ ইতিহাসের অপ্রাসঙ্গিক অংশগুলো বাদ দিয়ে সরাসরি মহানবী (সা.)-এর বংশধারা এবং আরবের কুরাইশ বংশের ইতিহাস থেকে আলোচনা শুরু করেন।
- বিশুদ্ধতা যাচাই: কুরআনের আয়াতের সাথে সাংঘর্ষিক বা অত্যন্ত দুর্বল ও সন্দেহজনক বর্ণনাগুলো তিনি কঠোরভাবে বাদ দেন।
- কবিতার সত্যতা পরীক্ষা: ইবনে ইসহাকের বইয়ে এমন অনেক কবিতা ছিল যা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর যুগের আরবদের দ্বারা রচিত ছিল না। ভাষাবিদ ও আরবী কবিতার বিশেষজ্ঞ হওয়ায় ইবনে হিশাম সেসব জাল ও দুর্বল কবিতা বাদ দিয়ে কেবল খাঁটি কবিতাগুলো বহাল রাখেন।
- কঠিন শব্দের ব্যাখ্যা: সীরাতের বর্ণনায় যেসব প্রাচীন ও কঠিন আরবী শব্দ ছিল, ইবনে হিশাম নিজের ভাষাতাত্ত্বিক জ্ঞান দিয়ে বইয়ের ভেতরেই সেগুলোর চমৎকার ব্যাখ্যা জুড়ে দেন।
- নিজস্ব সংযোজন: উস্তাদের সূত্রের বাইরেও কোনো নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক তথ্য পেলে তিনি তা “ইবনে হিশাম বলেন…” (قال ابن هشাম) বলে সংযোজন করেন।
গ্রন্থের জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা:
ইবনে হিশামের এই অনন্য সম্পাদনার ফলে বইটি মুসলিম উম্মাহর কাছে এতটাই জনপ্রিয় ও সমাদৃত হয় যে, মানুষ মূল ‘সীরাতে ইবনে ইসহাক’কে এক প্রকার ভুলেই যায় এবং ‘সীরাতে ইবনে হিশাম’ই সীরাত শাস্ত্রের প্রধান উৎস হিসেবে আসন লাভ করে। আজ পর্যন্ত পৃথিবীতে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনীর ওপর যত বই লেখা হয়েছে, তার সবগুলোর প্রধানতম ভিত্তি হলো এই গ্রন্থটি। বাংলা ভাষাসহ পৃথিবীর প্রায় সব প্রধান ভাষায় এই গ্রন্থটি অনূদিত হয়েছে (বাংলাদেশে ইসলামিক ফাউন্ডেশন এটি অনুবাদ করেছে)।
৫. অন্যান্য সাহিত্যকর্ম ও অবদান
যদিও ইমাম ইবনে হিশাম সীরাত গ্রন্থের জন্য বিশ্ববিখ্যাত, তবে ইতিহাস ও ভাষাতত্ত্বে তাঁর আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ রয়েছে। তাঁর অন্যতম আরেকটি বিখ্যাত গ্রন্থ হলো:
- কিতাব আল-তিজান লি মা’রিফাতি মুলুক আল-জামান (রাজমুকুটের বই: যুগের সম্রাটদের ইতিহাস): এটি প্রাচীন দক্ষিণ আরবের (ইয়েমেনের) ইতিহাস এবং হিময়ার রাজবংশের রাজা ও তাদের শাসনকাল সম্পর্কিত একটি ঐতিহাসিক দলিল। এই গ্রন্থে তিনি প্রাচীন আরবদের সংস্কৃতি ও ইতিহাস অত্যন্ত নিপুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।
৬. সমসাময়িক আলেমদের মূল্যায়ন
ইসলামী ইতিহাসের মহান মনিষী ও মুহাদ্দিসগণ ইমাম ইবনে হিশাম (রহ.)-এর সততা, বিশ্বস্ততা এবং ইলমী গভীরতার প্রশংসা করেছেন।
- ইমাম আদ-দাহাবী (রহ.) তাঁর বিখ্যাত ‘তারীখুল ইসলাম’ (ইসলামের ইতিহাস) গ্রন্থে ইবনে হিশামকে একজন অত্যন্ত বিশ্বস্ত বর্ণনাকারী, আরবী ভাষার পণ্ডিত এবং অনন্য লেখক হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
- ইমাম ইবনে খাল্লিকান (রহ.) বলেন, ইবনে হিশাম হলেন আরবী ভাষা, ব্যাকরণ এবং ইতিহাসের জ্ঞানভাণ্ডার।
তিনি হাদীসের পরিভাষায় একজন ‘সিকাহ’ বা অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য রাবী (বর্ণনাকারী) ছিলেন। তাঁর থেকে তাঁর ভাই আব্দুর রাহীম, আহমদ বিন আব্দুল্লাহ বিন আল-বারকী এবং মুহাম্মদ বিন হাসান আল-কাত্তানের মতো প্রখ্যাত আলেমগণ হাদীস ও সীরাতের বর্ণনা রেওয়ায়েত করেছেন।
৭. মৃত্যু
জ্ঞানের আলো ছড়ানো এই মহান ইমাম ও ঐতিহাসিক আব্বাসীয় খিলাফতের যুগে, ২১৮ হিজরীর ১৩ই রবিউস সানী (মতান্তরে ২১২ হিজরী) মোতাবেক ৮৩৩ খ্রিস্টাব্দের ৭ই মে মিশরের ফাসতাত (পুরাতন কায়রো) নগরীতে ইন্তেকাল করেন। মিশরের মাটিতেই এই মহান মনীষীকে সমাহিত করা হয়।
উপসংহার
ইমাম ইবনে হিশাম (রহ.) মুসলিম উম্মাহর জন্য এমন এক সম্পদ রেখে গেছেন, যার ঋণ কখনোই শোধ করা সম্ভব নয়। তিনি যদি ইবনে ইসহাকের সীরাতকে পরিমার্জিত ও সংরক্ষণ না করতেন, তবে হয়তো আজ আমরা ইসলামের প্রাথমিক যুগের এবং মহানবী (সা.)-এর পবিত্র জীবনের অনেক খাঁটি ইতিহাস থেকে বঞ্চিত হতাম। তাঁর নিষ্ঠা, সততা এবং কঠোর পরিশ্রমের ফলস্বরূপ ‘সীরাতে ইবনে হিশাম’ আজ চৌদ্দশত বছর পরও সগৌরবে টিকে আছে এবং কিয়ামত পর্যন্ত বিশ্বমানবতার জন্য হেদায়াতের আলো ছড়াতে থাকবে। আল্লাহ তাআলা এই মহান ইমামকে জান্নাতুল ফিরদাউসের উচ্চ মাকাম দান করুন। আমীন।
০১.
লেখক : আল্লামা ইবনে হিশাম
০২.
লেখক : আল্লামা ইবনে হিশাম

