বিংশ শতাব্দী এবং একবিংশ শতাব্দীর বর্তমান সময়ে ইসলামী শরীয়াহ, আকীদা, এবং ফিকহ শাস্ত্রে সৌদি আরবের যে কয়েকজন আলেমকে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য এবং পর্বতসম মর্যাদার অধিকারী মনে করা হয়, তাদের মধ্যে অন্যতম শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিত্ব হলেন শাইখ ড. সালেহ বিন ফাওযান আল-ফাওযান। সমকালীন বিশ্বে বিশুদ্ধ সালাফী আকীদা ও সুন্নাহর সংরক্ষণ এবং প্রসারে তার অবদান অনন্য। তাকে এই যুগের অন্যতম প্রধান নীতি-নির্ধারক আলেম বা ‘সিনিয়র ওলামা’ হিসেবে গণ্য করা হয়।
নিচে এই মহান প্রবীণ আলেম ও ফকীহর বিস্তারিত জীবনী উপস্থাপন করা হলো।
১. জন্ম ও জন্মস্থান
শাইখ সালেহ আল-ফাওযান হিজরী ১৩৫৪ সনের ১লা রজব (মোতাবেক ১৯৩৫ সালের ২২শে সেপ্টেম্বর) সৌদি আরবের কাসিম (Al-Qassim) প্রদেশের শামাসিয়াহ (Ash-Shamasuyah) নামক একটি ঐতিহ্যবাহী গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।
২. শৈশব ও শিক্ষাজীবন
শাইখের শৈশব কালেই তার পিতা ইন্তেকাল করেন। ফলে অত্যন্ত প্রতিকূল পরিবেশ ও এতিম অবস্থায় তিনি তার পরিবারের অন্য সদস্যদের তত্ত্বাবধানে বড় হন।
প্রাথমিক ও উচ্চশিক্ষা
- কুরআন হিফজ: শৈশবেই তিনি নিজ গ্রামের প্রধান ক্বারী শাইখ হামুদ বিন সুলাইমান আত-তালাল-এর কাছে পবিত্র কুরআনুল কারীম সম্পূর্ণ হিফজ করেন এবং প্রাথমিক লিখন ও পঠন শৈলী আয়ত্ত করেন।
- প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা: ১৯৪৮ সালে (হিজরী ১৩৬৭) তিনি শামাসিয়াহ শহরের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। এরপর উনাইজাহ শহরের ‘বুরাইদাহ সায়েন্টিফিক ইনস্টিটিউট’-এ ভর্তি হয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তর শেষ করেন।
- উচ্চতর ডিগ্রী: এরপর তিনি রিয়াদের ইমাম মুহাম্মদ ইবনে সৌদ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শরীয়াহ ফ্যাকাল্টিতে ভর্তি হন এবং ১৯৬০ সালে (হিজরী ১৩৮১) ব্যাচেলর ডিগ্রী লাভ করেন। পরবর্তীতে তিনি একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফিকহ শাস্ত্রে মাস্টার্স এবং অত্যন্ত সুনামের সাথে পিএইচডি (PhD) ডিগ্রী অর্জন করেন।
তার প্রখ্যাত শিক্ষকবৃন্দ
শাইখ ফাওযান তার দীর্ঘ শিক্ষাজীবনে বিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠতম আলেমদের সরাসরি সান্নিধ্য লাভ করেন:
- শাইখ আব্দুল আজিজ বিন আব্দুল্লাহ বিন বায (রহ.): সাবেক গ্র্যান্ড মুফতি।
- শাইখ মুহাম্মদ আল-আমিন আশ-শানকীতি (রহ.): বিখ্যাত মুফাসসির ও আদওয়াউল বায়ান-এর লেখক।
- শাইখ আব্দুর রহমান বিন নাসের আস-সাদী (রহ.): প্রখ্যাত ফকীহ ও মুফাসসির (উনাইজাহ-তে থাকাকালীন তার দরসে অংশ নেন)।
- শাইখ আব্দুল্লাহ বিন হুমাইদ (রহ.): সৌদি আরবের বিচার বিভাগের সাবেক প্রধান।
৩. কর্মজীবন ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্বসমূহ
শাইখ সালেহ আল-ফাওযান তার মেধা ও যোগ্যতার কারণে সৌদি আরবের ধর্মীয় ও বিচারিক ক্ষেত্রে বহু সর্বোচ্চ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং করছেন:
- বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক: পিএইচডি সম্পন্ন করার পর তিনি ইমাম মুহাম্মদ ইবনে সৌদ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শরীয়াহ ফ্যাকাল্টি এবং উচ্চতর বিচারিক ইনস্টিটিউট (Higher Institute for Judiciary)-এ সুদীর্ঘকাল অধ্যাপনা করেন।
- সিনিয়র উলামা পরিষদের সদস্য: তিনি সৌদি আরবের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নীতি-নির্ধারক ফোরাম “সিনিয়র উলামা পরিষদ” (Council of Senior Scholars)-এর অন্যতম জ্যেষ্ঠ সদস্য।
- স্থায়ী ফাতওয়া কমিটির সদস্য: সৌদি আরবের প্রাতিষ্ঠানিক ফাতওয়া প্রদানের সর্বোচ্চ বোর্ড “স্থায়ী ফাতওয়া কমিটি” (Lajna ad-Da’imah)-র তিনি একজন প্রধান সদস্য, যেখানে বিশ্বজুড়ে আসা হাজার হাজার জটিল মাসআলার সমাধান দেওয়া হয়।
- মসজিদ আল-হারাম ও প্রিন্স মুতআব মসজিদের ইমাম ও খতিব: রিয়াদের প্রিন্স মুতআব মসজিদের ইমাম ও খতিব হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি মক্কার মসজিদুল হারামেও হজ্জের মৌসুমে নিয়মিত শিক্ষামূলক দরস প্রদান করেন।

৪. ইসলামে কৃতিত্ব ও অবদান
শাইখ সালেহ আল-ফাওযানের প্রধান অবদান হলো ইসলামের মৌলিক আকীদা বা বিশ্বাসকে সব ধরনের বিকৃতি, বিদআত ও চরমপন্থা থেকে মুক্ত রাখা।
- আকীদার সহজ সরল ব্যাখ্যা: সমসাময়িক বিশ্বে বিভ্রান্তিকর বিভিন্ন মতবাদের বিপরীতে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের খাঁটি সালাফী আকীদা সাধারণ মানুষের উপযোগী করে তুলে ধরার ক্ষেত্রে তিনি সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছেন।
- চরমপন্থা ও সন্ত্রাসবাদের খণ্ডন: খারেজী বা চরমপন্থী চিন্তাধারার বিরুদ্ধে তিনি সবসময় কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। যুবসমাজ যেন বিভ্রান্ত না হয়, সেজন্য তিনি কুরআন ও সুন্নাহর সঠিক বোঝাপড়া তুলে ধরেছেন।
- ছাত্র তৈরি: তার দীর্ঘ প্রায় ৬০ বছরের শিক্ষকতা জীবনে সৌদি আরব ও বিশ্বের বিভিন্ন দেশের হাজার হাজার শিক্ষার্থী তার থেকে সরাসরি ইলম অর্জন করেছেন, যারা আজ প্রত্যেকে নিজ নিজ দেশে বড় আলেম ও দাঈ।
৫. তার বিখ্যাত রচনাবলী
শাইখ সালেহ আল-ফাওযান অত্যন্ত সহজ, সংক্ষিপ্ত অথচ দালিলিক ভাষায় বই লেখার জন্য সুপরিচিত। তার লেখা বইগুলো বিভিন্ন দেশের মাদ্রাসা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত। তার উল্লেখযোগ্য কিছু মাস্টারপিস বই হলো:
১. আল-ইরশাদ ইলা সহীহিল ই’তিকাদ (A Guide to Correct Belief): আকীদা বিষয়ক একটি কালজয়ী কিতাব, যা সারাবিশ্বে অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং বাংলায় অনূদিত।
২. কিতাবুত তাওহীদ (The Book of Tawheed): তাওহীদের মূলনীতি নিয়ে লেখা অত্যন্ত চমৎকার ও সহজপাঠ্য একটি বই, যা প্রায় প্রতিটি দেশের দ্বীনি মাদ্রাসায় পড়ানো হয়।
৩. আল-মুলাকখাস আল-ফিকহী (A Summary of Islamic Jurisprudence): দুই খণ্ডে সমাপ্ত এটি ইবাদত ও মুয়ামালাতের (লেনদেন) একটি অত্যন্ত সহজ ফিকহী সারসংক্ষেপ।
৪. শারহু আকীদাতিত তাহাবিয়্যাহ: ইমাম তাহাবীর বিখ্যাত আকীদা গ্রন্থের ধারাবাহিক ব্যাখ্যা।
৫. আল-বিদআতু ওয়াত তাহযীরু মিনহা: বিদআতের সংজ্ঞা এবং সমাজ থেকে বিদআত দূর করার উপায়।
৬. মাজমু’ ফাতাওয়া শাইখ সালেহ আল-ফাওযান: তার প্রদানকৃত হাজার হাজার ফাতওয়ার বিশাল সংকলন।
৬. বর্তমান অবস্থা
শাইখ সালেহ আল-ফাওযান বর্তমানে অত্যন্ত প্রবীণ এবং আলহামদুলিল্লাহ জীবিত আছেন। বার্ধক্যজনিত কারণে শারীরিক দুর্বলতা থাকা সত্ত্বেও তিনি নিয়মিত ফাতওয়া প্রদান, রেডিও প্রোগ্রাম (যেমন বিখ্যাত ‘নূরুন আলাদ দারব’) এবং ওলামাদের মজলিসে অংশ নিয়ে যাচ্ছেন। আধুনিক সময়ে মুসলিম উম্মাহর জন্য তাকে একটি বড় ইলমি আশ্রয়স্থল মনে করা হয়।
আল্লাহ তাআলা এই প্রবীণ আলেম ও মহান ফকীহকে সুস্থতার সাথে দীর্ঘজীবী করুন, তার হায়াতে বারাকাহ দান করুন এবং উম্মাহর প্রতি তার এই মহান খেদমতকে কবুল করুন। আমীন।
তার লিখিত কিছু কিতাব হলো :
১. ইসলামের দৃষ্টিতে মিত্রতা ও বৈরতা
লেখক : ড. সালেহ বিন ফাওযান
২. কালেমা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ এর অর্থ শর্তসমূহ এবং ব্যাক্তি ও সমাজ জীবনে তার প্রভাব
লেখক : ড. সালেহ বিন ফাওযান
০৩. তাওহীদ পরিচিতি
লেখক : ড. সালেহ বিন ফাওযান
০৪. দ্বীনের ফিকহ তথা জ্ঞানই ফেতনা থেকে বাঁচার সঠিক উপায়
লেখক : ড. সালেহ বিন ফাওযান
০৫. মাজার ও কবরের উদ্দেশ্য কুরবানি
লেখক : ড. সালেহ বিন ফাওযান
০৬. মুমিন নারীদের বিশেষ বিধান
লেখক : ড. সালেহ বিন ফাওযান
০৭. মুমিনদের জন্য মাহে রমজানের হাদিয়া
লেখক : ড. সালেহ বিন ফাওযান
০৮. যুব সমাজের অবক্ষয় ও তার প্রতিকার
লেখক : ড. সালেহ বিন ফাওযান
০৯. লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ এর অর্থ
লেখক : ড. সালেহ বিন ফাওযান
১০. ইসলামে সুন্নাহর অবস্থান
লেখক : ড. সালেহ বিন ফাওযান
১১. ইসলামে বন্ধুত্ব ও শত্রুতা
লেখক : ড. সালেহ বিন ফাওযান









