বাংলাদেশের সমকালীন রাজনীতি এবং বিশেষ করে ইসলামী আন্দোলনের ইতিহাসে আব্বাস আলী খান (১৯১৪–১৯৯৯) এক অতি পরিচিত ও আলোচিত নাম। তিনি ছিলেন একাধারে একজন সরকারি কর্মকর্তা, অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী এ কে ফজলুল হকের সাবেক সচিব, সংসদ সদস্য এবং লেখক। সুদীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য এবং ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক সরকারের শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। স্বাধীন বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামী পুনর্গঠিত হলে তিনি দীর্ঘ সময় দলটির ভারপ্রাপ্ত আমীর হিসেবে নেতৃত্ব দেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে তার রাজনৈতিক অবস্থান এবং পরবর্তী সময়ের কর্মতৎপরতা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত।
নিচে তার প্রারম্ভিক জীবন, শিক্ষাজীবন, সরকারি চাকরি, রাজনৈতিক উত্থান, ১৯৭১ সালের ভূমিকা এবং পরবর্তী স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক জীবনের বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরা হলো:
১. জন্ম ও জন্মস্থান
আব্বাস আলী খান ১৯১৪ সালে ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির অন্তর্গত বৃহত্তর বগুড়া জেলার জয়পুরহাট থানায় (বর্তমান জয়পুরহাট জেলা) এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তৎকালীন ঔপনিবেশিক শাসন আমল এবং গ্রামীণ বাংলায় মুসলিম সমাজের শিক্ষা ও রাজনৈতিক জাগরণের সন্ধিক্ষণে তার শৈশবকাল অতিবাহিত হয়।
২. শিক্ষাজীবন
তৎকালীন যুগের সামাজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে আব্বাস আলী খানের শিক্ষাজীবন ছিল বেশ কৃতিত্বপূর্ণ ও উচ্চশিক্ষার স্বাক্ষরবাহী।
- মাধ্যমিক শিক্ষা: তিনি ঐতিহ্যবাহী হুগলী মাদ্রাসা থেকে ১৯৩১ সালে কৃতিত্বের সাথে ম্যাট্রিকulation (মাধ্যমিক) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।
- উচ্চশিক্ষা (স্নাতক): ম্যাট্রিক পাসের পর বিভিন্ন পারিবারিক ও পারিপার্শ্বিক কারণে তার উচ্চশিক্ষায় কিছুটা বিরতি ঘটে। ম্যাট্রিক পরীক্ষার দীর্ঘ দশ বছর পর, তিনি রংপুরের বিখ্যাত কারমাইকেল কলেজ থেকে সফলভাবে ব্যাচেলর অব আর্টস বা বিএ (BA) ডিগ্রি অর্জন করেন।
৩. কর্মজীবন ও সরকারি চাকরি
রাজনীতিতে পুরোপুরি যুক্ত হওয়ার পূর্বে আব্বাস আলী খান একজন দক্ষ সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে নিজের কর্মজীবন শুরু করেছিলেন। ব্রিটিশ ভারতের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু পদে তিনি কাজ করার সুযোগ পান।
- ভারত সরকারের অধীনে চাকরি: ১৯৩৬ সাল থেকে ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পূর্ব পর্যন্ত তিনি ব্রিটিশ ভারত সরকারের বিভিন্ন প্রশাসনিক পদে অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করেন।
- শেরেবাংলার সচিব হিসেবে দায়িত্ব: তার কর্মজীবনের অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক হলো, তিনি অবিভক্ত বাংলার প্রথম প্রধানমন্ত্রী (মুখ্যমন্ত্রী) এবং উপমহাদেশের প্রখ্যাত জননেতা শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের ব্যক্তিগত সচিব (Secretary) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। এই দায়িত্ব পালনের ফলে খুব কাছ থেকে উপমহাদেশের শীর্ষ নেতাদের রাজনীতি ও শাসনপ্রক্রিয়া দেখার অভিজ্ঞতা তার হয়েছিল।
৪. রাজনৈতিক জীবন ও পাকিস্তান আমল
১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের স্বাধীনতার পর তিনি সরকারি চাকরি ছেড়ে ধীরে ধীরে প্রত্যক্ষ রাজনীতি ও সমাজ সংস্কারের দিকে ধাবিত হন।
- জামায়াতে ইসলামীতে যোগদান: ১৯৫৫ সালে তিনি তৎকালীন ‘জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তান’-এ আনুষ্ঠানিকভাবে যোগদান করেন। দলে যোগ দেওয়ার পর তার শিক্ষাগত যোগ্যতা ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার কারণে দ্রুতই তাকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি দীর্ঘ সময় তৎকালীন রাজশাহী বিভাগের আমীর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং উত্তরবঙ্গে দলটিকে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী করেন।
- সংসদ সদস্য নির্বাচিত (১৯৬২): ১৯৬২ সালে পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি আইয়ুব খানের আমলে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তিনি ৩য় জাতীয় পরিষদের সদস্য (MNA) নির্বাচিত হন। তিনি ‘এনই-৮ দিনাজপুর-কাম-বগুড়া’ আসন থেকে পাকিস্তান সংসদের সদস্য হিসেবে ওই অঞ্চলের প্রতিনিধিত্ব করেন।
- ডেপুটি আমীর (১৯৭১): ১৯৭১ সালের শুরুর দিকে রাজনৈতিক অস্থিরতার সময়ে তিনি জামায়াতে ইসলামীর পূর্ব পাকিস্তান শাখার ডেপুটি আমীর (সহ-সভাপতি) হিসেবে মনোনীত হন।
৫. ১৯৭১ সালের ভূমিকা ও মালেক মন্ত্রিসভা
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে আব্বাস আলী খান এবং তার দল জামায়াতে ইসলামী অখণ্ড পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নেন এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেন।
- শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব: মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে আন্তর্জাতিক চাপ ও অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি সামাল দিতে পাকিস্তানি সামরিক শাসকেরা পূর্ব পাকিস্তানে একটি বেসামরিক সরকার গঠনের উদ্যোগ নেয়। এর অংশ হিসেবে ১৯৭১ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর ডা. আব্দুল মোতালেব মালিকের নেতৃত্বে ‘মালেক মন্ত্রিসভা’ গঠিত হয়। আব্বাস আলী খান এই মন্ত্রিসভায় শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে যোগদান করেন। এটিই ছিল পূর্ব পাকিস্তানের সর্বশেষ মন্ত্রিসভা। ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত (পাকবাহিনীর আত্মসমর্পণের দুই দিন পূর্ব পর্যন্ত) তিনি এই পদে বহাল ছিলেন।

৬. স্বাধীন বাংলাদেশ: গ্রেফতার, সাধারণ ক্ষমা ও জামায়াতের পুনর্গঠন
বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের পর পাকিস্তানের পক্ষ নেওয়া এবং যুদ্ধকালীন সময়ে মালেক মন্ত্রিসভার সদস্য থাকার অভিযোগে ১৯৭১ সালের ২৪ ডিসেম্বর তাকে গ্রেফতার করা হয়।
- কারাবরণ ও মুক্তি: স্বাধীনতার পর দালাল আইনসহ বিভিন্ন অভিযোগে তাকে কারাগারে রাখা হয়। পরবর্তীতে ১৯৭৩ সালের ৩০ নভেম্বর তৎকালীন বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক ‘সাধারণ ক্ষমা’ (General Amnesty) ঘোষিত হলে তিনি কারাগার থেকে মুক্তি লাভ করেন।
- জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ-এর নেতৃত্ব: ১৯৭৯ সালে বাংলাদেশে পুনরায় রাজনৈতিক দল হিসেবে ‘জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ’ গঠিত হলে তিনি দলটির সিনিয়র নায়েবে আমীর নিযুক্ত হন।
- ভারপ্রাপ্ত আমীর হিসেবে দীর্ঘ দায়িত্ব (১৯৭৯-১৯৯৪): গোলাম আযমের নাগরিকত্ব বাতিল ও অন্যান্য রাজনৈতিক জটিলতার কারণে ১৯৭৯ থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত আব্বাস আলী খান জামায়াতে ইসলামীর ‘ভারপ্রাপ্ত আমীর’ হিসেবে মূল নেতৃত্ব দেন। ১৯৯১ সালে গোলাম আযম আমীর নির্বাচিত হলে তার এই দীর্ঘ দায়িত্বের সমাপ্তি ঘটে। তবে ১৯৯২ সালে সরকার পুনরায় গোলাম আযমকে গ্রেফতার করলে, পরবর্তী ১৬ মাস তিনি আবারো অত্যন্ত সংকটাপন্ন মুহূর্তে দলটির ভারপ্রাপ্ত আমীর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন মেয়াদে তিনি দলটির শীর্ষ অভিভাবকের ভূমিকা পালন করেছেন।

৭. লেখক হিসেবে অবদান
রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি আব্বাস আলী খান একজন সুপরিচিত লেখক ও অনুবাদক ছিলেন। তিনি বিশেষ করে ইসলামী আদর্শ, সমাজব্যবস্থা এবং নিজের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা নিয়ে বেশ কিছু বই রচনা করেছেন। তার লিখিত বইগুলোর মধ্যে অন্যতম:
১. স্মৃতির সাগরে ঢেউ: তার জীবন ও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার এক অনন্য স্মৃতিকথামূলক গ্রন্থ।
২. মৌলবাদ ও জামায়াতে ইসলামী
৩. সমাজতন্ত্র ও ইসলাম
৪. বিপ্লবের পথ (অনুবাদ ও সম্পাদনা)
তার লেখনীগুলো মূলত দলের নেতা-কর্মীদের তাত্ত্বিক জ্ঞানার্জন এবং রাজনৈতিক দর্শন প্রচারের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।
৮. মৃত্যু ও বর্তমান মূল্যায়ন
জীবন সায়াহ্নে এসে আব্বাস আলী খান মারাত্মক লিভার সিরোসিস (Liver Cirrhosis) রোগে আক্রান্ত হন। দীর্ঘদিন এই জটিল ব্যাধির সাথে লড়াই করার পর ১৯৯৯ সালের ৩ অক্টোবর ঢাকার একটি হাসপাতালে ৮৫ বছর বয়সে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
তার জীবন মূল্যায়ন:
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আব্বাস আলী খানের জীবনটি অত্যন্ত দ্বিমুখী মূল্যায়নে ঘেরা। একদিকে, বাংলাদেশের মূলধারার ইতিহাস ও সাধারণ মানুষের কাছে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীকে সমর্থন এবং মালেক মন্ত্রিসভার শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার কারণে তিনি একজন বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব এবং স্বাধীনতার বিরোধিতাকারী হিসেবে চিহ্নিত। অন্যদিকে, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের কাছে তিনি স্বাধীনোত্তর বাংলাদেশে প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে দলকে টিকিয়ে রাখা, পুনর্গঠন করা এবং দীর্ঘ সময় ভারপ্রাপ্ত আমীর হিসেবে দক্ষতার সাথে নেতৃত্ব দেওয়ার কারণে একজন প্রাজ্ঞ ও শ্রদ্ধেয় অভিভাবক হিসেবে সমাদৃত। তার ৮৫ বছরের দীর্ঘ জীবনটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিবর্তন ও ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় জুড়ে রয়েছে।
তার লিখিত কিছু বইয়ের লিংক :
০১. আলেমে দ্বীন সাইয়্যেদ আবুল আলা মওদুদী
লেখক : আব্বাস আলী খান
০২. ইসলাম ও জাহেলিয়াতের চিরন্তন দন্দ
লেখক : আব্বাস আলী খান
০৩. ইসলামী বিপ্লব একটি পরিপূর্ণ নৈতিক বিপ্লব
লেখক : আব্বাস আলী খান
০৪. ঈমানের দাবী
লেখক : আব্বাস আলী খান
০৫. একটি আদর্শবাদী দলের পতনের কারণ : তার থেকে বাঁচার উপায়
লেখক : আব্বাস আলী খান
০৬. জামায়াতে ইসলামীর ইতিহাস
লেখক : আব্বাস আলী খান
০৭. বাংলার মুসলমানের ইতিহাস
লেখক : আব্বাস আলী খান
০৮. বিকালের আসর
লেখক : আব্বাস আলী খান
০৯. বিশ্বের মনিষীদের দৃষ্টিতে মাওলানা মওদূদী
লেখক : আব্বাস আলী খান
১০. মাওলানা মওদুদী একটি জীবন একটি ইতিহাস
লেখক : আব্বাস আলী খান
১১. মাওলানা মওদুদীর বহুমুখী অবদান
লেখক : আব্বাস আলী খান
১২. মৃত্যু যবানীকার ওপারে
লেখক : আব্বাস আলী খান











