ইসলামের স্বর্ণযুগে মুসলিম সমাজের নৈতিক চরিত্র গঠন, আত্মশুদ্ধি (তাসাউফ ও যুহদ), এবং আখিরাত-মুখী জীবন গড়ার লক্ষ্যে যিনি হরেক রকম বাস্তব ও হৃদয়স্পর্শী ঘটনার সংকলন করে এক অনন্য বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন, তিনি হলেন ইমাম ইবনু আবিদ দুনিয়া (রহ.)। তিনি ছিলেন তৃতীয় হিজরী শতকের অন্যতম প্রধান মুহাদ্দিস, ফকীহ, ঐতিহাসিক এবং মুসলিম মনীষীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বইয়ের লেখক ও সংকলকদের একজন। এই মহান প্রাচীন ইমামের জীবন ও কর্মের বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরা হলো।
১. জন্ম ও জন্মস্থান
ইমাম ইবনু আবিদ দুনিয়ার জন্ম হিজরী ২০৮ সনে (মোতাবেক ৮২৩ খ্রিষ্টাব্দ) আব্বাসীয় খিলাফতের কেন্দ্রস্থল এবং তৎকালীন বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইলমি নগরী বাগদাদে। তার পুরো নাম আবু বকর আব্দুল্লাহ বিন মুহাম্মদ বিন উবাইদ বিন সুফিয়ান বিন কায়েস আল-কুরাশী আল-বাগদাদী। তবে তিনি তার লকব বা উপাধি “ইবনু আবিদ দুনিয়া” (ابن أبي الدنيا) নামেই বিশ্বজুড়ে পরিচিত।
২. পড়াশোনা ও শিক্ষাজীবন
বাগদাদে জন্ম নেওয়ার কারণে তিনি শৈশব থেকেই ইলম অর্জনের এক অভূতপূর্ব পরিবেশ পান। তৎকালীন সময়ের বড় বড় মুহাদ্দিস ও ওলামাদের সান্নিধ্যে তিনি বড় হন। তার প্রখর স্মৃতিশক্তি এবং ইলমের প্রতি গভীর অনুরাগের কারণে তিনি হাদীস, ইতিহাস এবং আরবী সাহিত্যে অগাধ পাণ্ডিত্য অর্জন করেন।
তার প্রখ্যাত শিক্ষকবৃন্দ
তিনি ইসলামের ইতিহাসের স্বর্ণযুগের শ্রেষ্ঠ ইমামদের সরাসরি ছাত্র ছিলেন:
- ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রহ.): হাম্বলী মাযহাবের ইমাম ও মুহাদ্দিস।
- ইমাম আবু দাউদ সেজিস্তানী (রহ.): বিখ্যাত হাদীস গ্রন্থ ‘সুনানে আবু দাউদ’-এর সংকলক।
- শাইখ আলী বিন আল-জাদ (রহ.): প্রখ্যাত মুহাদ্দিস।
- ইমাম ইয়াহইয়া বিন মাইন (রহ.): হাদীস শাস্ত্রের অন্যতম প্রধান জারহ-তাদীল (অনুধাবন ও সমালোচনা) বিশারদ।
৩. কর্মজীবন ও রাজকীয় রাজপুত্রদের শিক্ষকতা
ইমাম ইবনু আবিদ দুনিয়ার সততা, খোদাভীতি এবং অগাধ পাণ্ডিত্যের কারণে আব্বাসীয় খলীফাগণ তাকে অত্যন্ত সম্মান করতেন। তিনি রাজপরিবারের রাজপুত্রদের নৈতিক ও দ্বীনি শিক্ষক (টিউটর) হিসেবে নিযুক্ত হয়েছিলেন।
- খলীফাদের শিক্ষকতা: তিনি আব্বাসীয় খলীফা আল-মুতাদিদ (Al-Mu’tadid) এবং তার পুত্র খলীফা আল-মুক্তাফী (Al-Muktafi) সহ বেশ কয়েকজন রাজপুত্রের ব্যক্তিগত শিক্ষক ও মেন্টর ছিলেন। রাজপ্রাসাদের বিলাসী পরিবেশের মধ্যেও তিনি রাজপুত্রদের আখিরাত-মুখী হওয়া এবং সৎ চরিত্র গঠনের শিক্ষা দিতেন।
৪. ইসলামে কৃতিত্ব ও লেখার অনন্য বৈচিত্র্য
ইমাম ইবনু আবিদ দুনিয়ার মূল কৃতিত্ব হলো— তিনি সমাজ সংস্কার এবং মানুষের আত্মশুদ্ধির জন্য হাদীস ও সালাফদের বাণীগুলোকে বিষয়ভিত্তিক ছোট ছোট কিতাব আকারে সাজিয়েছেন।
- যুহদ ও রাকায়েক শাস্ত্রের জনক: ইসলামের পরিভাষায় ‘যুহদ’ মানে হলো দুনিয়াবিমুখতা এবং ‘রাকায়েক’ মানে হলো মন গলানো উপদেশ। ইমাম ইবনু আবিদ দুনিয়া এই শাস্ত্রের অন্যতম প্রধান রূপকার। তার বইগুলো পড়লে মানুষের অন্তরে দুনিয়ার প্রতি মোহ কমে যায় এবং মৃত্যুর ও আখিরাতের কথা স্মরণ হয়।
- মনস্তাত্ত্বিক ও নৈতিক বিষয়ের বিন্যাস: তিনি মানুষের রাগ, হিংসা, লোভ, নীরবতা, কৃতজ্ঞতা, এমনকি মানুষের শেষ মুহূর্তের অনুশোচনা—এই ধরনের সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম মানবিক অনুভূতি ও নৈতিক বিষয়ের ওপর পৃথক পৃথক চমৎকার বই লিখেছেন।
৫. তার বিখ্যাত রচনাবলী
ইমাম ইবনু আবিদ দুনিয়া প্রায় দুই শতাধিক (২০০+) ছোট-বড় কিতাব সংকলন করেছেন। তার অধিকাংশ বই-ই মূলত হাদীস, সাহাবী ও তাবেয়ীদের বাণী এবং শিক্ষণীয় বাস্তব ঘটনার সংকলন। বর্তমানে তার বইগুলো আধুনিক প্রকাশনার মাধ্যমে বহুখণ্ডে প্রকাশিত হয়েছে। তার উল্লেখযোগ্য কিছু কিতাব হলো:
১. কিতাবুজ যুহদ (The Book of Asceticism): দুনিয়াবিমুখতা ও খোদাভীতির ওপর সালাফদের চমৎকার সব বাণী ও ঘটনার সংকলন।
২. আস-সামত ও আদাবুল লিসান (নীরবতা ও জিহ্বার হেফাজত): অতিরিক্ত কথা বলার অপকারিতা এবং মুখের ভাষা সংযত রাখার গুরুত্ব নিয়ে লেখা একটি কালজয়ী বই।
৩. আল-উমরু ওয়াশ শাইব (বয়স ও বার্ধক্য): মানুষের বয়স বেড়ে যাওয়ার সাথে সাথে কীভাবে আল্লাহর দিকে ধাবিত হওয়া উচিত, তা নিয়ে আলোচনা।
৪. কিতাবুল মাউত (The Book of Death): মৃত্যু, মৃত্যুর কষ্ট এবং কবরের জীবনের প্রস্তুতি সংক্রান্ত আলোচনা।
৫. মুহাসাবাতুন নাফস (আত্মসমালোচনা): একজন মুমিন কীভাবে প্রতিদিন নিজের আমলের হিসাব নেবে, সে সংক্রান্ত দিকনির্দেশনা।
৬. জাম্মুদ দুনিয়া (দুনিয়ার নিন্দা): জাগতিক মোহ ও পঙ্কিলতা থেকে অন্তরকে মুক্ত রাখার উপায়।
৭. কিতাবুল ফারাজি বাদাস শিদ্দাহ (কঠিন বিপদের পর স্বস্তি): বিপদের সময় ধৈর্য ধারণ এবং আল্লাহর রহমতের আশাবাদী হওয়ার গল্পসমূহ।
৬. মুহাদ্দিসগণের দৃষ্টিতে তার মর্যাদা
হাদীস শাস্ত্রে তার নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে তৎকালীন ও পরবর্তী যুগের ইমামগণ অত্যন্ত উচ্চ ধারণা পোষণ করতেন।
- ইমাম যাহাবী (রহ.) তার সম্পর্কে বলেন: “তিনি ছিলেন একজন সত্যবাদী (সাদূক) হাফেযে হাদীস এবং অসংখ্য দরকারী ও বিরল কিতাবের লেখক।”
- ইমাম ইবনে কাছীর (রহ.) তার প্রশংসা করে বলেছেন: “তিনি তার সুন্দর বিন্যাস এবং চমৎকার উপদেশের মাধ্যমে মানুষকে আখিরাতের প্রতি আগ্রহী করে তুলতে অনন্য ছিলেন।”
৭. ইন্তিকাল
সুদীর্ঘকাল ধরে মুসলিম উম্মাহর অন্তরের ব্যাধি নিরাময় এবং আত্মশুদ্ধির এক বিশাল ইলমি ভাণ্ডার রেখে, এই মহান ইমাম হিজরী ২৮১ সনের ১৪ই জিলহজ্জ (মোতাবেক ৮৯৪ খ্রিষ্টাব্দ) বাগদাদ নগরীতে ৭৩ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন।
বাগদাদের “শূনীজিয়াহ” (Shuniziyyah) কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। তার মৃত্যুর পরও এক হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে তার সংকলিত কিতাবগুলো মুসলিম উম্মাহর আত্মশুদ্ধি ও চরিত্র গঠনের অন্যতম প্রধান উৎস হিসেবে সমাদৃত হয়ে আসছে।
আল্লাহ তাআলা ইমাম ইবনু আবিদ দুনিয়াকে জান্নাতুল ফিরদাউসের সুউচ্চ মাকাম দান করুন। আমীন।
তার লিখিত কিতাবগুলোর মাঝে অন্যতম হলো :
১. আত্মবিচার বিশুদ্ধ জীবনের ভিত্তি
লেখক : ইমাম ইবনু আবিদ দুনিয়া
২.আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল
লেখক : ইমাম ইবনু আবিদ দুনিয়া
০৩. আল্লাহর প্রতি সুধারণা
লেখক : ইমাম ইবনু আবিদ দুনিয়া
০৪. ওপারের সুখগুলো
লেখক : ইমাম ইবনু আবিদ দুনিয়া
০৫. দরজা এখনও খোলা
লেখক : ইমাম ইবনু আবিদ দুনিয়া
০৬. দুনিয়া কি এবং কেন?
লেখক : ইমাম ইবনু আবিদ দুনিয়া
০৭. ফিতনার দিনে নির্জনবাস
লেখক : ইমাম ইবনু আবিদ দুনিয়া
০৮. বড়দের তাহাজ্জুদ ও রাত জাগরণ
লেখক : ইমাম ইবনু আবিদ দুনিয়া
০৯. সিসাঢালা প্রাচীর
লেখক : ইমাম ইবনু আবিদ দুনিয়া








