সাইয়েদ কুতুব শহীদ

বিংশ শতাব্দীর মুসলিম জাহানের চিন্তাধারায় যে কজন ব্যক্তিত্ব সবচেয়ে গভীর ও সুদূরপ্রসারী প্রভাব বিস্তার করতে পেরেছেন, তাদের মধ্যে মিশরের সাইয়েদ কুতুব (সৈয়দ কুতুব) অন্যতম। তিনি একাধারে ছিলেন বিশিষ্ট সাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ, কবি, সাংবাদিক এবং পরবর্তীতে আধুনিক ইসলামী পুনর্জাগরণ আন্দোলনের অন্যতম প্রধান তাত্ত্বিক রূপকার। মিশরের ঐতিহ্যবাহী ইসলামী আন্দোলন ‘ইখওয়ানুল মুসলিমিন’ (Muslim Brotherhood)-এর সাথে যুক্ত হয়ে তিনি তার ক্ষুরধার লেখনীর মাধ্যমে যে আদর্শিক বুনিয়াদ তৈরি করেছিলেন, তা আজো বিশ্বব্যাপী চর্চিত হয়। স্বৈরাচারী নাসের সরকারের জুলুমের মুখে মাথা নত না করে ফাঁসির মঞ্চে জীবনের আত্মাহুতি দিয়ে তিনি লাভ করেছেন ‘শহীদ’ উপাধি।


১. জন্ম, বংশমর্যাদা ও পারিবারিক পরিচিতি

সাইয়েদ কুতুব ১৯০৬ সালের ৯ অক্টোবর মিশরের উসইউত (আসইউত) জেলার ‘মুশা’ নামক একটি ঐতিহ্যবাহী ও শান্ত গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

বংশীয় উপাধি ও পূর্বপুরুষ

তার মূল নাম মূলত ‘সাইয়েদ’। আর ‘কুতুব’ হলো তার বংশীয় উপাধি বা লকব। ইতিহাস থেকে জানা যায়, তার পূর্বপুরুষগণ মূলত আরব উপদ্বীপ (বর্তমান সৌদি আরব) থেকে হিজরত করে মিশরের উত্তরাঞ্চলে এসে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেছিলেন। তারা ছিলেন অত্যন্ত শরিফ ও মর্যাদাসম্পন্ন বংশের লোক।

পিতা-মাতা ও ভাইবোন

  • পিতা: তার পিতা হাজী ইবরাহীম কুতুব ছিলেন একজন ধর্মপ্রাণ, আত্মমর্যাদাশীল এবং রাজনৈতিকভাবে সচেতন কৃষক। তিনি এলাকায় একজন সম্মানিত ব্যক্তিত্ব ছিলেন।
  • মাতা: তার মাতা ফাতিমা হোসাইন উসমান ছিলেন অত্যন্ত পরহেযগার, সংস্কৃতিমনা এবং পবিত্র কুরআনের প্রতি গভীর অনুরাগী একজন নারী।

পারিবারিক পরিমণ্ডলে সাইয়েদ কুতুব ছিলেন ভাইবোনদের মধ্যে সবার বড়। তার অপর ভাই হলেন মুহাম্মাদ কুতুব, যিনি পরবর্তী জীবনে একজন প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ ও লেখক হিসেবে বিশ্বজুড়ে খ্যাতি অর্জন করেন। তার তিন বোন ছিলেন—নাফীসা কুতুব, হামিদা কুতুব এবং আমিনা কুতুব। পুরো পরিবারটিই ইসলামের আদর্শ ও ত্যাগের ইতিহাসে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল।


২. শৈশব ও শিক্ষাজীবন

সাইয়েদ কুতুবের শিক্ষার সূচনা হয়েছিল গ্রামীণ আবহে, অত্যন্ত চমৎকার এক ধর্মীয় অনুশাসনের মধ্য দিয়ে।

শৈশবেই কুরআন হিফজ

তার মাতার তীব্র ইচ্ছা ছিল তার সন্তানরা যেন কুরআনের জ্ঞানে আলোকিত হয়। মাতার এই আকুল আকাঙ্ক্ষা এবং নিজের প্রখর মেধার কারণে সাইয়েদ কুতুব শৈশবেই, গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ার সময়, সম্পূর্ণ পবিত্র কুরআন হিফজ (স্মরণ) সম্পন্ন করেন। এই কুরআনিক বুনিয়াদই পরবর্তী জীবনে তাকে কুরআনের এক অনন্য ব্যাখ্যাকারক হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করেছিল।

কায়রোতে উচ্চশিক্ষা ও বি.এ ডিগ্রি

প্রাথমিক শিক্ষা শেষে তার পিতা সপরিবারে কায়রো শহরের উপকণ্ঠে ‘হালওয়ান’ নামক স্থানে স্থানান্তরিত হন। সেখানে সাইয়েদ কুতুব ‘তাজহিযিয়াতু দারুল উলুম’ মাদ্রাসায় মাধ্যমিক ও উচ্চ-মাধ্যমিক শিক্ষা সমাপ্ত করেন।

এরপর তিনি কায়রোর বিখ্যাত ও ঐতিহ্যবাহী উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান ‘দারুল উলুম’ কলেজে ভর্তি হন। ১৯৩৩ সালে তিনি এই স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান থেকে আরবী ভাষা ও সাহিত্যে কৃতিত্বের সাথে বি.এ. (BA) ডিগ্রি লাভ করেন। তার মেধা ও যোগ্যতার কারণে স্নাতক শেষ করার পরপরই তাকে একই প্রতিষ্ঠানে অধ্যাপক বা লেকচারার হিসেবে নিযুক্ত করা হয়।


৩. কর্মজীবন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সফর: চিন্তাদর্শের এক মহাবিপ্লব

সাইয়েদ কুতুবের কর্মজীবন ছিল অত্যন্ত গতিশীল ও পরিবর্তনশীল। অধ্যাপনা দিয়ে জীবন শুরু করলেও পরবর্তীতে তিনি মিশরের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে ‘স্কুল ইন্সপেক্টর’ (বিদ্যালয় পরিদর্শক) হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ পদে যোগ দেন।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সফর (১৯৪৮-১৯৫০)

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তার প্রশাসনিক ও তাত্ত্বিক দক্ষতা দেখে সরকার তাকে আধুনিক শিক্ষা পদ্ধতি, কারিকুলাম ও মনস্তত্ত্ব পড়ার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পাঠায়। তিনি প্রায় দুই বছর আমেরিকার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক পরিমণ্ডল গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন।

চিন্তার মোড় পরিবর্তন (পশ্চিমা সভ্যতার স্বরূপ উন্মোচন)

আমেরিকায় অবস্থানকালে সাইয়েদ কুতুব পশ্চিমা পুঁজিবাদী সমাজ ও সভ্যতার চাকচিক্য খুব কাছ থেকে দেখেন। কিন্তু সেই বাহ্যিক অগ্রগতির অন্তরালে তিনি লক্ষ্য করেন এক চরম নৈতিক অবক্ষয়, আধ্যাত্মিক শূন্যতা, বস্তুবাদ, তীব্র বর্ণবাদ এবং অবাধ যৌনতা। তিনি বুঝতে পারেন যে, কেবল বস্তুগত উন্নতি মানুষকে প্রকৃত মুক্তি দিতে পারে না।

এই সফরটি তার জীবনের মোড় সম্পূর্ণ ঘুরিয়ে দেয়। আমেরিকার বস্তুবাদী সমাজের দুরবস্থা লক্ষ্য করে তার মনে এই দৃঢ় বিশ্বাস জন্মায় যে—“একমাত্র ইসলামই সত্যিকার অর্থে মানব সমাজকে আত্মিক ও বস্তুগত কল্যাণের পথে নিয়ে যেতে পারে এবং আধুনিক জাহেলিয়াত থেকে মানবতাকে মুক্ত করতে পারে।” এই উপলব্ধি নিয়ে ১৯৫০ সালের শেষের দিকে তিনি দেশে ফিরে আসেন।


৪. ইখওয়ানুল মুসলিমিনে যোগদান ও দাওয়াতি তৎপরতা

আমেরিকা থেকে ফিরে আসার পর সাইয়েদ কুতুব সরকারি চাকরির মোহ ত্যাগ করেন এবং মিশরের তৎকালীন প্রধান ইসলামী আন্দোলন ‘ইখওয়ানুল মুসলিমিন’ (Muslim Brotherhood)-এর আদর্শ, উদ্দেশ্য ও কর্মসূচী গভীর মনোযোগের সাথে যাচাই করতে শুরু করেন।

আনুষ্ঠানিক যোগদান

১৯৪৫ সালের দিকে ইখওয়ানের সাথে তার প্রাথমিক যোগাযোগ তৈরি হলেও, ১৯৫১ সালে তিনি পূর্ণাঙ্গভাবে এই আন্দোলনের সাথে জড়িয়ে পড়েন এবং এর আনুষ্ঠানিক সদস্য হন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের হাত থেকে মিশরের পূর্ণ স্বাধীনতার দাবিতে ইখওয়ান যে আপসহীন আন্দোলন গড়ে তুলেছিল, তা সাইয়েদ কুতুবকে দারুণভাবে আকৃষ্ট করে।

মুখপত্রের সম্পাদক ও নেতৃত্ব

তার অসাধারণ লিখনী শক্তি ও সাংগঠনিক দক্ষতার কারণে ১৯৫৪ সালে তিনি ইখওয়ানের কেন্দ্রীয় পরিচালনা পর্ষদের সদস্য হন এবং আন্দোলনের প্রধান মুখপত্র সাময়িকী “ইখওয়ানুল মুসলিমিন”-এর প্রধান সম্পাদক নির্বাচিত হন। তার তুখোড় সম্পাদকীয় ও প্রবন্ধগুলো মিশরের তরুণ ও বুদ্ধিজীবী সমাজকে ব্যাপকভাবে আলোড়িত করতে শুরু করে।


৫. স্বৈরশাসক নাসেরের রক্তচক্ষু ও প্রথম কারাবরণ

মিশরের তৎকালীন সামরিক শাসক কর্নেল জামাল আবদেল নাসেরের সরকার প্রথম দিকে ইখওয়ানের সহযোগিতা নিয়ে ক্ষমতা লাভ করলেও, পরবর্তীতে তারা সম্পূর্ণ সেক্যুলার ও সমাজতান্ত্রিক একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চায়।

পত্রিকা বন্ধ ও গ্রেফতার

১৯৫৪ সালে নাসের সরকার ব্রিটেনের সাথে একটি নতুন চুক্তি সম্পাদন করে, যা মিশরের সার্বভৌমত্বকে ক্ষুণ্ণ করত। সাইয়েদ কুতুবের সম্পাদনায় “ইখওয়ানুল মুসলিমিন” পত্রিকা এই দাসত্বমূলক চুক্তির তীব্র সমালোচনা করে নিবন্ধ প্রকাশ করে। এর মাত্র ছয় মাসের মাথায় নাসের সরকার ক্ষিপ্ত হয়ে পত্রিকাটি চিরতরে বন্ধ করে দেয়।

একই বছর (১৯৫৪ খ্রিষ্টাব্দে) নাসের সরকারের বিরুদ্ধে একটি কথিত ও সাজানো ‘হত্যা ষড়যন্ত্রের’ অভিযোগ এনে ইখওয়ানুল মুসলিমিন দলকে বেআইনি ঘোষণা করা হয়। এই বাহানায় আন্দোলনের শীর্ষ নেতাদের সাথে সাইয়েদ কুতুবকেও গ্রেফতার করা হয়।

অসুস্থ অবস্থায় নির্যাতন

গ্রেফতারের সময় সাইয়েদ কুতুব ভীষণভাবে তীব্র জ্বরে আক্রান্ত ছিলেন। সেই মুমূর্ষু অবস্থাতেই সামরিক অফিসাররা তাকে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যায়। মিশরের বিভিন্ন অন্ধকার ও স্যাঁতসেঁতে জেলে তাকে বন্দী রাখা হয় এবং তার ওপর চালানো হয় অমানুষিক মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন।

সাময়িক মুক্তি ও গৃহবন্দীত্ব

দীর্ঘ ১০ বছর কারাগারে থাকার পর, ১৯৬৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে ইরাকের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আবদুস সালাম আরিফ রাষ্ট্রীয় সফরে মিশরে আসেন। তিনি ব্যক্তিগতভাবে কর্নেল নাসেরের কাছে সাইয়েদ কুতুবের মুক্তির জন্য বিশেষ সুপারিশ করেন। তার সুপারিশের প্রেক্ষিতে নাসের তাকে কারাগার থেকে মুক্তি দিলেও সম্পূর্ণ মুক্ত করেননি; বরং তাকে তারই বাসভবনে কঠোর পুলিশি পাহারায় অন্তরীণ বা গৃহবন্দী করে রাখা হয়।


৬. দ্বিতীয়বার গ্রেফতার ও প্রহসনের বিচার

কারাগার থেকে বের হওয়ার পর মাত্র এক বছর পার হতে না হতেই নাসের সরকার ইখওয়ানকে সম্পূর্ণ নির্মূল করার নতুন ষড়যন্ত্র শুরু করে।

ব্যাপক ধরপাকড় ও নারী নির্যাতন

১৯৬৫ সালে কর্নেল নাসের যখন মস্কো সফরে ছিলেন, তখন সেখান থেকে এক রাষ্ট্রীয় বিবৃতিতে হঠাৎ ঘোষণা করা হয় যে—ইখওয়ানুল মুসলিমিন তাকে এবং তার সরকারকে উৎখাত করার জন্য পুনরায় সশস্ত্র বলপ্রয়োগের চেষ্টা ও হত্যার ষড়যন্ত্র করছে। এই কাল্পনিক অভিযোগের পর পুরো মিশরজুড়ে ইখওয়ানের নেতাকর্মীদের ওপর ইতিহাসের নৃশংসতম দমনপীড়ন শুরু হয়।

এই দফায় সাইয়েদ কুতুব, তার ভাই মুহাম্মাদ কুতুব, এবং দুই বোন—হামিদা কুতুব ও আমিনা কুতুবসহ ২০ হাজারেরও বেশি সাধারণ মানুষকে গ্রেফতার করা হয়। এই গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে প্রায় ৭০০ জন নিরীহ নারী ছিলেন, যা সমকালীন আরবী সমাজেও এক নজিরবিহীন বর্বরতা ছিল। ১৯৬৪ সালের একটি বিশেষ কালো আইনের অজুহাতে আদালতকে এড়িয়ে প্রেসিডেন্টকে যেকোনো নাগরিকের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত ও আটকের অসীম ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল।

আদালতের প্রহসন ও মিডিয়া ব্ল্যাকআউট

বিশেষ সামরিক ট্রাইবুনালে সাইয়েদ কুতুব ও অন্যান্যদের বিচার শুরু হয়। সরকার প্রথমে বিশ্ববাসীকে দেখানোর জন্য ঘোষণা করেছিল যে, এই বিচার অনুষ্ঠান টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচার করা হবে। কিন্তু বিচার শুরু হতেই ঘটে বিপত্তি। সাইয়েদ কুতুবসহ অভিযুক্ত ব্যক্তিরা সামরিক আদালতের সাজানো অপরাধ স্বীকার করতে পরিষ্কার অস্বীকার করেন। উল্টো তারা ক্যামেরার সামনে ও ট্রাইবুনালের বিচারকদের কাছে জেলের ভেতরে তাদের ওপর চালানো অমানুষিক বৈদ্যুতিক ও শারীরিক নির্যাতনের লোমহর্ষক বিবরণ এবং দাগ দেখাতে শুরু করেন।

এতে নাসের সরকার চরম বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ে এবং সাথে সাথে আদালতের টেলিভিশন সম্প্রচার সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়। এরপর বাকি বিচার প্রক্রিয়া চালানো হয় সম্পূর্ণ রুদ্ধদ্বার কক্ষে।

আইনজীবীদের প্রবেশে বাধা

আসামিপক্ষের আত্মপক্ষ সমর্থনের সমস্ত অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। তাদের পক্ষে কোনো আইনজীবী নিয়োগ করতে দেওয়া হয়নি। আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকে যখন ফরাসী বার অ্যাসোসিয়েশনের ভূতপূর্ব সভাপতি উইলিয়াম থরপ (Thorp) এবং মরক্কোর দু’জন প্রখ্যাত আইনজীবী আসামিপক্ষ সমর্থনের জন্য কায়রোতে আবেদন করেন, সরকার তা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে। এমনকি সুদান থেকে দু’জন আইনজীবী কায়রোতে এসে নিয়ম অনুযায়ী বার অ্যাসোসিয়েশনে নাম নিবন্ধন করে আদালতে হাজির হলে, পুলিশ তাদের আদালত কক্ষ থেকে জোরপূর্বক বের করে দেয় এবং ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মিশর ত্যাগ করতে বাধ্য করে।


৭. ঐতিহাসিক ফাঁসি ও শাহাদাত

১৯৬৬ সালের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসজুড়ে প্রহসনের বিচার শেষে, আগস্ট মাসে সামরিক ট্রাইবুনাল সাইয়েদ কুতুব এবং তার দুই ঘনিষ্ঠ সহযোদ্ধাকে সুনির্দিষ্টভাবে ফাঁসির মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ শোনায়।

আপসহীন বীরত্ব

ফাঁসির রায় কার্যকরের ঠিক আগের রাতে নাসেরের পক্ষ থেকে সাইয়েদ কুতুবের কাছে বার্তা পাঠানো হয়েছিল যে, তিনি যদি কেবল একটি সাধারণ কাগজে লিখে নাসেরের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন বা নিজের ভুল স্বীকার করেন, তবে তার মৃত্যুদণ্ড মওকুফ করে তাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় মুক্তি দেওয়া হবে।

তখন মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে এই মহান মুজাহিদ যে কালজয়ী জবাব দিয়েছিলেন, তা ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। তিনি বলেছিলেন:

“যে তর্জনী (শাহাদাত আঙুল) দিয়ে আমি প্রতিদিন নামাযের মধ্যে আল্লাহর একাত্মবাদের সাক্ষ্য দেই, সেই আঙুল দিয়ে কোনো স্বৈরশাসকের কাছে ক্ষমা চেয়ে আবেদনপত্রে আমি স্বাক্ষর করতে পারি না। যদি আমি অপরাধী হিসেবে মারা যাই, তবে আল্লাহর দরবারে ক্ষমার আবেদন করার কোনো প্রশ্নই আসে না। আর যদি আমি সত্যের পথে শহীদ হই, তবে আমি কোনো বাতিলের কাছ থেকে জীবন ভিক্ষা নেব না।”

অবশেষে ১৯৬৬ সালের ২৯ আগস্ট ভোরের আলো ফোটার পূর্বমুহূর্তে কায়রোর কেন্দ্রীয় কারাগারে এই মহান চিন্তাবিদকে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলিয়ে শাহাদাতের পেয়ালা পান করানো হয়।


৮. জ্ঞান ও সাহিত্য চর্চা এবং রচিত গ্রন্থাবলী

সাইয়েদ কুতুব একাধারে একজন খাঁটি ধার্মিক আলেম এবং আধুনিক আরবী সাহিত্যের একজন দিকপাল ছিলেন। তার আরবী ভাষা ব্যবহারের চমৎকার শৈলী ও গদ্যের মাধুর্য আধুনিক আরবী সাহিত্যে এক নতুন যুগের সূচনা করেছিল।

সাহিত্যিক জীবনের সূচনা

তিনি অত্যন্ত সহজ, সরল ও আকর্ষণীয় ভাষায় ছোটদের জন্য নবীদের জীবনালেখ্য ও কাহিনী লিখে তার সাহিত্যিক জীবন শুরু করেন। এরপর তিনি ইসলামের মৌলিক আকিদা ও সমাজব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে একের পর এক অমর গ্রন্থ রচনা করেন। তার রচিত উপন্যাস ‘আশওয়াক’ (কাঁটা) তৎকালীন সাহিত্য মহলে দারুণ সাড়া ফেলেছিল।

উল্লেখযোগ্য গ্রন্থাবলী ও অনন্য অবদান

ক্রমিকগ্রন্থের নাম (বাংলা ও আরবী)মূল প্রতিপাদ্য বিষয় ও গুরুত্ব
ফী যিলালিল কুরআন
(في ظلال القرآن)
এটি তার জীবনের সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ কীর্তি। ৩০ খণ্ডের এই সুবিশাল ও কালজয়ী তাফসীর গ্রন্থটি তিনি মূলত নাসেরের অন্ধকার কারাগারে বন্দী থাকা অবস্থায় রচনা করেছিলেন। এর অনন্য সাহিত্যিক ভাষা এবং সমকালীন যুগের প্রেক্ষাপটে কুরআনের প্রায়োগিক ব্যাখ্যা একে বিশ্বের অন্যতম ‘বেস্ট সেলার’ তাফসীর গ্রন্থে পরিণত করেছে।
মাআলিম ফিত ত্বরীক
(معالم في الطريق / পথের দিশারী)
এটি আধুনিক ইসলামী আন্দোলনের একটি অন্যতম বৈপ্লবিক মেনিফেস্টো বা দিকনির্দেশনামূলক বই। এই বইয়ে তিনি আল্লাহর নিরঙ্কুশ সার্বভৌমত্ব (হাকিমিয়াহ) এবং আধুনিক জাহেলিয়াতের স্বরূপ উন্মোচন করেছেন। এই বইটির অপরাধেই তাকে ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল।
ইসলামী সমাজ বিপ্লবের ধারা
(خصائص التصور الإسلامي)
মুসলিম সমাজে কীভাবে ইসলামী আদর্শের ভিত্তিতে একটি সামগ্রিক ও সুস্থ সামাজিক পরিবর্তন আনা যায়, তার তাত্ত্বিক রূপরেখা।
ইসলামে সামাজিক সুবিচার
(العدالة الاجتماعية في الإسلام)
পুঁজিবাদ ও সমাজবাদের অসারতা প্রমাণ করে ইসলামের অর্থনৈতিক ও সামাজিক ন্যায়বিচারের এক নিখুঁত চিত্র এতে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
ইসলাম ও পুঁজিবাদের দ্বন্দ্ব
(الإسلام والرأسمالية)
পশ্চিমা অর্থনৈতিক শোষণের বিপরীতে ইসলামের সুষম অর্থব্যবস্থার যৌক্তিক তুলনা।
আল-মুস্তাকবাল লি হাজাদ দ্বীন
(المستقبل لهذا الدين / এই দ্বীনই বিজয়ী হবে)
ইসলামের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও এর শাশ্বত বিজয়ের অকাট্য দলিল।

৯. উল্লেখযোগ্য তাত্ত্বিক ধারণা ও চিন্তাধারা

সাইয়েদ কুতুবের চিন্তাধারা সমকালীন ইসলামী চিন্তার জগতকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। তার প্রধান দুটি চিন্তাগত ধারণা হলো:

  • আইয়ামে জাহেলিয়া (আধুনিক জাহেলিয়াত): সাইয়েদ কুতুবের মতে, জাহেলিয়াত কেবল রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর আগমনের পূর্বের কোনো ঐতিহাসিক যুগ নয়; বরং যখনই কোনো সমাজ আল্লাহর আইন ও সার্বভৌমত্ব ত্যাগ করে মানুষের তৈরি আইন, মতবাদ (যেমন: সমাজতন্ত্র, পুঁজিবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ) দ্বারা রাষ্ট্র ও সমাজ পরিচালনা করে, সেটাই হলো ‘আধুনিক জাহেলিয়াত’।
  • উবুদিয়া ও হাকিমিয়াহ: তিনি বিশ্বাস করতেন, ইবাদত বা ‘উবুদিয়া’ কেবল নামায-রোযার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। জীবনের সকল ক্ষেত্রে—আইন, আদালত, রাজনীতি ও অর্থনীতিতে একমাত্র আল্লাহর হুকুম বা ‘হাকিমিয়াহ’ (সার্বভৌমত্ব) মেনে নেওয়ার মাধ্যমেই মানুষের প্রকৃত দাসত্ব বা উবুদিয়া পূর্ণতা পায়।

১০. ঐতিহাসিক প্রভাব ও মূল্যায়ন (বর্তমান অবস্থা)

সাইয়েদ কুতুব আজ আর আমাদের মাঝে সশরীরে বেঁচে নেই, কিন্তু তার শাহাদাতের ৬০ বছর পেরিয়ে যাওয়ার পরও বিশ্বব্যাপী ইসলামী পুনর্জাগরণ ও বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে তিনি আজো অমর হয়ে আছেন।

যাদের দ্বারা প্রভাবিত

তিনি মূলত পবিত্র কুরআন, সুন্নাহ এবং ইখওয়ানের প্রতিষ্ঠাতা ইমাম হাসানুল বান্নার বৈপ্লবিক চিন্তার দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত ছিলেন। এছাড়াও সমকালীন যুগের উপমহাদেশের প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ সাইয়েদ আবুল আলা মওদুদীর ‘আল-কুরআনের চারটি মৌলিক পরিভাষা’ ও ‘হাকিমিয়াহ’ তত্ত্বের সাথে তার চিন্তার গভীর মিল ছিল।

যাদের প্রভাবিত করেছেন

তার বৈপ্লবিক লেখনী পরবর্তী প্রজন্মের হাজারো ইসলামী চিন্তাবিদ, গবেষক, ছাত্র ও আন্দোলনকারীকে অনুপ্রাণিত করেছে। তার ছোট ভাই মুহাম্মাদ কুতুব সৌদি আরবের উম্মুল কুরা বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘকাল অধ্যাপনা করে সাইয়েদ কুতুবের চিন্তাধারাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেন।

তার কর্মের মূল্যায়ন

আজকের দিনেও সাইয়েদ কুতুবের রচিত তাফসীর ‘ফী যিলালিল কুরআন’ এবং অন্যান্য গ্রন্থাবলী ইংরেজি, বাংলা, উর্দু, তুর্কি, ফার্সি, ফরাসি ও মালয়সহ পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি প্রধান ভাষায় অনূদিত হয়েছে। বাংলাভাষী সাধারণ পাঠক এবং ইসলামী গবেষকদের কাছেও তার বইগুলো অত্যন্ত সমাদৃত ও জনপ্রিয়। বাতিলের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তার সেই আপসহীন শাহাদাত আজো বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর কাছে এক চরম অনুপ্রেরণার উৎস এবং ঈমানী দৃঢ়তার এক জীবন্ত প্রতীক।

তাল লিখিত কিছু কিতাব :

তাফসির কারক : সাইয়েদ কুতুব শহীদ

তাফসীর ফী যিলালিল কোরআন আধুনিক যুগের এক অনন্য ও কালজয়ী তাফসির গ্রন্থ। এটি গতানুগতিক ব্যাখ্যাগ্রন্থের ঊর্ধ্বে উঠে কুরআনের শৈল্পিক সৌন্দর্য এবং এর বিপ্লবী চেতনাকে পাঠক হৃদয়ে জীবন্ত করে তোলে।


সাইয়েদ কুতুব (১৯০৬–১৯৬৬) ছিলেন আধুনিক ইসলামি চিন্তাধারার অন্যতম প্রধান রূপকার, সাহিত্যিক এবং চিন্তাবিদ। তিনি মিশরের আসিউত প্রদেশের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।

  • কর্মজীবন: কর্মজীবনের শুরুতে তিনি একজন সাহিত্য সমালোচক ও কবি হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন। তবে পরবর্তীকালে তিনি ইসলামি দাওয়াহ ও পুনর্জাগরণ আন্দোলনের সাথে জড়িয়ে পড়েন।
  • শাহাদাত: তৎকালীন মিশরীয় সরকারের রোষানলে পড়ে তিনি দীর্ঘ সময় কারাবরণ করেন এবং ১৯৬৬ সালে তাঁকে ফাঁসি দিয়ে শহীদ করা হয়। কারাগারের নির্জন প্রকোষ্ঠেই তিনি এই অমর তাফসির গ্রন্থের বড় একটি অংশ রচনা করেন।

‘ফী যিলালিল কোরআন’ শব্দটির অর্থ হলো— ‘কুরআনের ছায়াতলে’। লেখক নিজেই বলেছেন, জীবনের এক দীর্ঘ সময় তিনি কুরআনের ছায়াতলে অতিবাহিত করেছেন এবং সেই অভিজ্ঞতাই এই বইটিতে ফুটিয়ে তুলেছেন।

প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ:

  • সাহিত্যিক সৌন্দর্য: সাইয়েদ কুতুব মূলত একজন উঁচুদরের সাহিত্যিক ছিলেন। তাই এই তাফসিরের ভাষা অত্যন্ত আবেগপূর্ণ, গতিশীল এবং মোহনীয়। এটি পাঠককে কেবল জ্ঞান দেয় না, বরং কুরআনের আবহে আলোড়িত করে।
  • শৈল্পিক ও মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা: কুরআনের বর্ণনাভঙ্গি এবং এর শব্দশৈলী কীভাবে মানুষের মনস্তত্ত্বকে প্রভাবিত করে, তিনি তা অত্যন্ত নিপুণভাবে বিশ্লেষণ করেছেন।
  • আকিদাহ ও তাওহিদ: এতে আল্লাহর একত্ববাদ বা ‘তাওহিদ’কে জীবনের সকল ক্ষেত্রে (বিশেষ করে শাসন ও বিচার ব্যবস্থায়) একচ্ছত্র আধিপত্য হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
  • সমকালীন বাস্তবতায় প্রয়োগ: ইসলামকে কেবল কিছু আচার-অনুষ্ঠানের সমষ্টি হিসেবে নয়, বরং একটি পূর্ণাঙ্গ বিপ্লব ও জীবনব্যবস্থা হিসেবে তিনি উপস্থাপন করেছেন। জাহেলিয়াতের বিপরীতে ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করা এই তাফসিরের অন্যতম লক্ষ্য।
  • কুরআনি পরিবেশ সৃষ্টি: তিনি আয়াতের ব্যাখ্যায় এমন এক পরিবেশ তৈরি করেন, যাতে পাঠক অনুভব করেন তিনি নিজেই সেই ওহী নাযিলের সাক্ষী এবং সম্বোধিত ব্যক্তি।

সারকথা: যারা কুরআনের অন্তর্নিহিত আধ্যাত্মিক শক্তি এবং এর সামাজিক ও রাজনৈতিক বিপ্লবের দিকগুলো হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করতে চান, তাদের জন্য ‘ফী যিলালিল কোরআন’ একটি অসাধারণ দিকনির্দেশনা।

নিচে তাফসিরটি ডাউনলোড লিংক দেওয়া হলো :

প্রথম খণ্ড ডাইনলোড

দ্বিতীয় খণ্ড ডাউনলোড

তৃতীয় খণ্ড ডাউনলোড

চতুর্থ খণ্ড ডাউনলোড

পঞ্চম খণ্ড ডাউনলোড

ষষ্ঠ খণ্ড ডাউনলোড

সপ্তম খণ্ড ডাউনলোড

অষ্টম খণ্ড ডাউনলোড

নবম খণ্ড ডাউনলোড

দশম খণ্ড ডাউনলোড

একদশ খণ্ড ডাউনলোড

দ্বাদশ খণ্ড ডাউনলোড

ত্রয়োদশ খণ্ড ডাউনলোড

চতুর্দশ খণ্ড ডাউনলোড

পঞ্চদশ খণ্ড ডাউনলোড

ষোড়ষ খণ্ড ডাউনলোড

সপ্তদশ খণ্ড ডাউনলোড

অষ্টদশ খণ্ড ডাউনলোড

উনবিংশ খণ্ড ডাউনলোড

বিশতম খণ্ড ডাউনলোড

একুশতম খণ্ড ডাউনলোড

বাইশতম খণ্ড ডাউনলোড



০২. আগামী বিপ্লবের ঘোষানা পত্র

লেখক : সাইয়েদ কুতুব শহীদ



০৩.আমরা কি মুসলমান

লেখক : সাইয়েদ কুতুব শহীদ



০৪. আল কুরআনের শিল্পিক সৌন্দর্য

লেখক : সাইয়েদ কুতুব শহীদ



০৫. ইসলাম ও নারী

লেখক : সাইয়েদ কুতুব শহীদ



০৬. ইসলাম ও সামাজিক সুবিচার

লেখক : সাইয়েদ কুতুব শহীদ



০৭. ইসলাম কমিউনিজম ও পুঁজিবাদ

লেখক : সাইয়েদ কুতুব শহীদ



০৮.ইসলামী আন্দোলন সংকট ও সম্ভাবনা

লেখক : সাইয়েদ কুতুব শহীদ



০৯. ইসলামী সমাজ বিপ্লবের ধারা

লেখক : সাইয়েদ কুতুব শহীদ



১০. ইসলামে প্রশিক্ষণ পদ্ধতি

লেখক : সাইয়েদ কুতুব শহীদ



১১. ইসলামের স্বর্ণযুগে সামাজিক ন্যায়নীতি

লেখক : সাইয়েদ কুতুব শহীদ



১২. কালজয়ী আদর্শ ইসলাম

লেখক : সাইয়েদ কুতুব শহীদ



১৩. কুরআনের সংক্ষিপ্ত আলোচনা

লেখক : সাইয়েদ কুতুব শহীদ



১৪. জিহাদ

লেখক : সাইয়েদ কুতুব শহীদ



১৫. বিংশ শতাব্দীর জাহেলিয়াত

লেখক : সাইয়েদ কুতুব শহীদ



১৬. বিশ্ব শান্তি ও ইসলাম

লেখক : সাইয়েদ কুতুব শহীদ



১৭. ভ্রান্তির বেড়াজালে ইসলাম

লেখক : সাইয়েদ কুতুব শহীদ



১৮. মুজাহিদের আযান

লেখক : সাইয়েদ কুতুব শহীদ


১৯. আগামী দিনের জীবন বিধান

লেখক : সাইয়েদ কুতুব শহীদ



"বাংলা ইসলামিক বইয়ের বিশাল পিডিএফ (PDF) আর্কাইভ"