আব্দুর রহমান বিন আলী ইবনুল জাওযী

ইসলামের ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চিন্তাবিদ, বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী ইমাম, মুহাদ্দিস, ফকীহ এবং অনন্য বাগ্মী ছিলেন ইমাম ইবনুল জাওযী (রহ.)। ষষ্ঠ হিজরি শতকের বাগদাদে তাঁর জ্ঞান ও প্রচারণার মাধ্যমে এক অভূতপূর্ব জাগরণ সৃষ্টি হয়েছিল। নিচে তাঁর বিস্তারিত জীবনী এবং অবদান তুলে ধরা হলো:

১. জন্ম ও জন্মস্থান (Birth and Birthplace)

ইমাম ইবনুল জাওযীর পূর্ণ নাম হলো আবুল ফরাজ জামালুদ্দীন আব্দুর রহমান বিন আলী বিন মুহাম্মদ বিন আলী বিন উবাইদুল্লাহ বিন আবদুল্লাহ বিন জাফর বিন আবদুল্লাহ বিন আল-কাসিম বিন মুহাম্মদ বিন আবী বকর আস-সিদ্দীক। বংশলতিকার শেষ অংশ থেকে স্পষ্ট যে, তিনি ইসলামের প্রথম খলিফা হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-এর সরাসরি বংশধর ছিলেন।

  • জন্মসাল: তিনি আনুমানিক ৫১০ হিজরি (মোতাবেক ১১১৬ খ্রিস্টাব্দ) মতান্তরে ৫১২ হিজরিতে জন্মগহণ করেন।
  • জন্মস্থান: তিনি তৎকালীন আব্বাসীয় খেলাফতের রাজধানী এবং জ্ঞান-বিজ্ঞানের কেন্দ্রস্থল বাগদাদ নগরীতে জন্মগ্রহণ করেন। বাগদাদের ‘দারুল কুতুব’ বা কিতাবের মহল্লা হিসেবে পরিচিত একটি বনেদি পরিবারে তাঁর জন্ম হয়।

২. পিতামাতা ও পারিবারিক পটভূমি (Parents and Family Background)

ইবনুল জাওযী (রহ.)-এর পরিবার ছিল অত্যন্ত সচ্ছল এবং ধর্মপ্রাণ।

  • পিতা: তাঁর পিতা আলী বিন মুহাম্মদ ছিলেন একজন ব্যবসায়ী এবং অত্যন্ত পরহেযগার মানুষ। তবে ইবনুল জাওযীর বয়স যখন মাত্র তিন বছর, তখন তাঁর পিতা ইন্তেকাল করেন।
  • মাতা ও লালন-পালন: পিতার মৃত্যুর পর তাঁর লালন-পালনের দায়িত্ব পড়ে তাঁর মা এবং ফুফুর ওপর। তাঁর ফুফু ছিলেন অত্যন্ত পুণ্যবতী নারী। তিনি শিশু আব্দুর রহমানকে খুব ছোটবেলাতেই বাগদাদের বিখ্যাত আলেমদের মজলিশে নিয়ে যেতেন।
  • ‘ইবনুল জাওযী’ নামের রহস্য: তাঁর পরিবারের বাগদাদের বাসভবনের আঙিনায় একটি বিখ্যাত ‘আখরোট গাছ’ (عنب الجوز – জাওয) ছিল। তৎকালীন সময়ে পুরো বসতিতে ওই একটিই আখরোট গাছ ছিল। সেই গাছের সূত্র ধরেই তাঁদের পরিবারকে ‘ইবনুল জাওযী’ (আখরোট ওয়ালার বংশধর) বলে ডাকা হতো।

৩. পড়াশোনা ও শিক্ষাজীবন (Education and Seeking Knowledge)

পিতার রেখে যাওয়া বিপুল সম্পত্তি থাকা সত্ত্বেও ইবনুল জাওযী আমোদ-প্রমোদে লিপ্ত হননি। শৈশব থেকেই তাঁর মধ্যে জ্ঞানের প্রতি এক তীব্র ব্যাকুলতা দেখা যায়। তিনি নিজেই তাঁর স্মৃতিচারণায় লিখেছেন:

“আমার মনে পড়ে, আমি যখন মক্তবে যেতাম, তখন আমার সমবয়সী ছেলেরা দজলা নদীর তীরে খেলাধুলা করত। কিন্তু আমি বই হাতে কোনো আলেম বা মুহাদ্দিসের দরবারে ছুটে যেতাম।”

A depiction of Baghdad from 1808, taken from the print collection in Travels in Asia and Africa, etc. (ed. J. P. Berjew, British Library); Ibn al-Jawzī spent his entire life in this city in the twelfth-century.

প্রধান শিক্ষক ও শায়খগণ:

বাগদাদের তৎকালীন বিখ্যাত প্রায় সব আলেমদের কাছ থেকেই তিনি শিক্ষা লাভ করেছেন। তাঁর উস্তাদদের সংখ্যা নব্বইয়েরও বেশি। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকজন হলেন:

১. আবু বকর আল-আনসারী (রহ.): যাঁর কাছ থেকে তিনি পবিত্র কুরআনের ক্বিরাত এবং হিফজ সম্পন্ন করেন।

২. ইমাম ইবনে হুবাইরা (রহ.): যিনি আব্বাসীয় খলিফার উজির এবং একজন বড় ফকীহ ছিলেন।

৩. ইমাম আবুল ফযল ইবনে নাসের (রহ.): যিনি ইবনুল জাওযীকে হাদীস শাস্ত্রের জটিল বিষয়গুলো শিখিয়েছিলেন।

অর্জিত জ্ঞান ও যোগ্যতা:

তিনি কুরআন, হাদীস, ফিকহ (বিশেষ করে হাম্বলি মাযহাব), ইতিহাস, চিকিৎসাবিজ্ঞান, সাহিত্য ও ব্যাকরণে পাণ্ডিত্য অর্জন করেন। তরুণ বয়সেই তিনি তৎকালীন মুসলিম বিশ্বের অন্যতম সেরা ‘হাফিযে হাদীস’ (যাঁদের লাখের ওপর হাদীস মুখস্থ থাকে) হিসেবে স্বীকৃতি পান।

৪. কর্মজীবন ও প্রচার কাজ (Career and Public Life)

শিক্ষা জীবন শেষ করে ইমাম ইবনুল জাওযী শিক্ষকতা ও ওয়াজ-নসীহতের (Religious Sermons) মাধ্যমে কর্মজীবন শুরু করেন।

শিক্ষকতা:

তিনি বাগদাদের তৎকালীন বিখ্যাত মাদ্রাসা ‘আল-মারজানিয়া’ এবং ‘মাদ্রাসা ইবনে হুবাইরা’-তে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর দরসে অংশ নেওয়ার জন্য দূর-দূরান্ত থেকে ছাত্ররা আসত।

বাগ্মীতা ও খুতবা:

ইবনুল জাওযী ইসলামের ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বক্তা বা খতীব ছিলেন। বাগদাদের জামে মসজিদে যখন তিনি খুতবা বা বয়ান দিতেন, তখন মানুষের ঢল নামত। ইতিহাসবিদদের মতে, তাঁর একেকটি মজলিশে কখনো কখনো ১০,০০০ থেকে ১,০০,০০০ পর্যন্ত মানুষ সমবেত হতো। এমনকি খলিফা এবং মন্ত্রীরাও ছদ্মবেশে বা সরাসরি তাঁর আলোচনা শুনতে আসতেন।

তার ওয়াজের প্রভাব এত তীব্র ছিল যে, কঠোর হৃদয়ের মানুষও কেঁদে আকুল হতো। তিনি নিজেই উল্লেখ করেছেন যে, তাঁর হাতে হাত রেখে হাজার হাজার অমুসলিম ইসলাম গ্রহণ করেছিল এবং লক্ষাধিক পাপী মানুষ তওবা করে সঠিক পথে ফিরে এসেছিল।

৫. ইসলামে কৃতিত্ব ও অবদান (Achievements and Contributions to Islam)

ইসলামী সংস্কৃতির পুনর্জাগরণে এবং সমকালীন সমাজ সংস্কারে ইমাম ইবনুল জাওযীর অবদান অতুলনীয়।

  • হাদীসের বিশুদ্ধতা রক্ষা: তাঁর অন্যতম বড় কৃতিত্ব ছিল হাদীসের নামে প্রচলিত নানাবিধ জাল ও বানোয়াট হাদীস বা কিচ্ছা-কাহিনী চিহ্নিত করা। তিনি অত্যন্ত কঠোরভাবে রাবীদের (বর্ণনাকারী) যাচাই করতেন।
  • দাওয়াতি ও আধ্যাত্মিক সংস্কার: তৎকালীন সময়ে বাগদাদে একদিকে যেমন শুষ্ক দার্শনিক বিতর্ক বাড়ছিল, অন্যদিকে সুফীবাদের নামে কিছু ভণ্ডামি তৈরি হচ্ছিল। ইবনুল জাওযী তাঁর ক্ষুরধার লেখনী ও বক্তব্যের মাধ্যমে ইসলামের মধ্যপন্থী রূপটি তুলে ধরেন। তিনি সমাজকে কুরআন ও সুন্নাহর দিকে ফিরিয়ে আনার ডাক দেন।
  • বিদআতের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান: সমাজে প্রচলিত নানা কুসংস্কার এবং বিদআতের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন আপসহীন। এই কারণে তাকে জীবনের শেষভাগে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে কয়েক বছর কারাবাস ও নির্বাসনও ভোগ করতে হয়েছিল, তবুও তিনি সত্য থেকে বিচ্যুত হননি।

৬. তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থাবলী বা লিখনী (Famous Literary Works)

ইমাম ইবনুল জাওযী ছিলেন ইসলামের ইতিহাসের সবচেয়ে ফলপ্রসূ ও বহু লেখক (Prolific Authors) আলেমদের একজন। আল্লামা ইবনে কাসির (রহ.) বলেন, “তিনি এত বিপুল সংখ্যক কিতাব লিখেছেন যে, তা গণনা করাও কঠিন।” ধারণা করা হয়, ছোট-বড় মিলিয়ে তাঁর রচিত গ্রন্থের সংখ্যা ৫০০ থেকে ৭০০-এর কাছাকাছি

নিচে তাঁর কয়েকটি যুগান্তকারী কিতাবের বিবরণ দেওয়া হলো (আরবি ও ইংরেজি নামসহ):

কিতাবের নাম (বাংলা)আরবি নাম (Original Arabic)ইংরেজি অনুবাদ/নাম (English context)বিষয়বস্তু (Genre)
তালবীসু ইবলীরتلبيس إبليسThe Devil’s Deceptionশয়তানের ধোঁকা এবং বিভিন্ন উপদলের বিভ্রান্তি উন্মোচন।
যাদুল মাসীর ফী ইলমিত তাফসীরزاد المسير في علم التفسيرProvision for the Journey in Tafsirআল-কুরআনের অন্যতম সেরা এবং সুবিন্যস্ত তাফসীর গ্রন্থ।
সাইদুল খাতিরصيد الخاطرCaptured Thoughtsতাঁর নিজস্ব জীবনের অভিজ্ঞতা, আত্মশুদ্ধি ও ভাবনার সংকলন।
আল-মুন্তাযাম ফী তারিখিল মুলূক ওয়াল উমামالمنتظم في تاريخ الملوك والأممThe Regular History of Kings and Nationsসৃষ্টির শুরু থেকে তাঁর সময় পর্যন্ত ইসলামের একটি বিশাল ইতিহাস গ্রন্থ।
আল-মাওযূ’আতالموضوعات من الأحاديث المرفوعاتThe Book of Fabricated Hadithsসমাজে প্রচলিত জাল ও বানোয়াট হাদীসসমূহের সংকলন ও খণ্ডন।
সিফাতুস সাফওয়াহصفة الصفوةThe Characteristics of the Electসাহাবী ও তাবেয়ীদের জীবনী এবং তাঁদের আধ্যাত্মিকতা।

একটি ঐতিহাসিক কিংবদন্তি: বলা হয়ে থাকে, ইমাম ইবনুল জাওযী (রহ.) তাঁর সারাজীবনে হাদীস লেখার জন্য যে কাঠের কলমগুলো ছুলেছিলেন, সেই কলমের অবশিষ্টাংশ বা চাঁছা কাঠগুলো তিনি জমিয়ে রেখেছিলেন। তিনি অসিয়ত করেছিলেন যে, তাঁর মৃত্যুর পর যেন সেই কাঠগুলো জ্বালিয়ে তাঁর জানাজার গোসলের পানি গরম করা হয়। আশ্চর্যজনকভাবে, সেই জমানো কাঠ দিয়ে পানি গরম করার পরও কিছু কাঠ উদ্বৃত্ত থেকে গিয়েছিল! এর থেকে বোঝা যায় তিনি কত বিশাল পরিমাণ লেখালেখি করেছিলেন।

৭. মৃত্যু বা ইন্তিকাল (Death and Demise)

জীবনভর দ্বীনের খেদমত, অনবদ্য রচনা এবং সংস্কারমূলক কাজের পর এই মহান মনীষী মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।

  • মৃত্যুর তারিখ: ৫৯৭ হিজরির ১২ই রমজান (মোতাবেক ১২০১ খ্রিস্টাব্দ), জুমার রাতে তিনি বাগদাদে ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুর সময় তাঁর বয়স হয়েছিল প্রায় ৮৫-৮৭ বছর।
  • জানাজা ও দাফন: তাঁর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে পুরো বাগদাদ নগরীতে শোকের ছায়া নেমে আসে। তৎকালীন সময়ের সব বাজার ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়। লাখো মানুষের উপস্থিতিতে বাগদাদের জামে মসজিদে তাঁর জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। ভিড়ের কারণে অনেকের পক্ষে জানাজায় অংশ নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছিল।
  • সমাধি: তাঁকে বাগদাদের বিখ্যাত ‘বাবুল হারব’ (باب حرب) কবরস্থানে, ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল (রহ.)-এর কবরের পাশে দাফন করা হয়।

ইমাম ইবনুল জাওযী (রহ.) আজ আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া শত শত কিতাব এবং আত্মশুদ্ধির বাণী আজও বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মুসলিমকে আলোর পথ দেখাচ্ছে। আল্লাহ তায়ালা দ্বীনের এই মহান খিদমতগারকে জান্নাতুল ফিরদাউসের উচ্চ মাকাম দান করুন।

তার লিখিত কিতাবের কিছু হলো :

১. মনের ওপর লাগাম

লেখক : ইমাম ইবনুল জাওযী



০২.শয়তান যেভাবে ধোঁকা দেয়

লেখক : ইমাম ইবনুল জাওযী



০৩. শয়তানের ধোঁকা

লেখক : ইমাম ইবনুল জাওযী



০৪. সুন্দর সম্পর্ক বিনিময়ে জান্নাত

লেখক : ইমাম ইবনুল জাওযী



০৫. সোনালি যুগের গল্পগুলো

লেখক : ইমাম ইবনুল জাওযী



০৬. হৃদয়ের দিনলিপি

লেখক : ইমাম ইবনুল জাওযী



০৭. নেক সুরতে শয়তানের ধোঁকা

লেখক : ইমাম ইবনুল জাওযী


৮. নববি শিষ্টাচার ও দুনিয়া-বিমুখতার মূর্তপ্রতীক হাসান বসরি (রহ)

লেখক : ইমাম ইবনুল জাওযী



"বাংলা ইসলামিক বইয়ের বিশাল পিডিএফ (PDF) আর্কাইভ"