শাইখ সফিউর রহমান মুবারকপুরী (১৯৪২-২০০৬) হলেন ভারত উপমহাদেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় মুহাদ্দিস (হাদীসবিদ), বিশিষ্ট ইসলামী গবেষক এবং আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন লেখক। রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর সীরাত বা জীবনীর ওপর রচিত তার বিশ্ববিখ্যাত গ্রন্থ ‘আর্-রাহীকুল মাখতূম’ (The Sealed Nectar)-এর জন্য তিনি সমগ্র মুসলিম বিশ্বে এক চিরস্মরণীয় নাম। বিশ্বব্যাপী সীরাত সাহিত্যে তার এই অনবদ্য অবদান তাকে অনন্য উচ্চতায় আসীন করেছে। এই মহান ইলমী নক্ষত্রের জীবন, শিক্ষাজীবন, কর্মজীবন এবং সাহিত্যিক কীর্তিগুলোর একটি সুবিন্যস্ত ও পূর্ণাঙ্গ জীবনী নিচে প্রস্তুত করা হলো:
১. জন্ম, বংশ ও উপাধি
শাইখ সফিউর রহমানের অফিশিয়াল সার্টিফিকেটে জন্মতারিখ ৬ জুন ১৯৪২ উল্লেখ থাকলেও, প্রকৃতপক্ষে তিনি ১৯৪২ সালের মাঝামাঝি সময়ে ভারতের উত্তর প্রদেশের আযমগড় জেলার ঐতিহ্যবাহী ‘মুবারকপুর’ শহরের হুসাইনাবাদ গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পুরো নাম সাফিউর রহমান ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে মুহাম্মাদ আকবর ইবনে মুহাম্মাদ আলী ইবনে আব্দুল মুমিন মুবারকপুরী আযমী।
তাদের পৈতৃক নিবাস মুবারকপুর শহরটি যেমন তাঁত শিল্পের জন্য বিখ্যাত, ঠিক তেমনি এটি ইলমে হাদীসের বহু প্রখ্যাত নক্ষত্রের সূতিকাগার। বিখ্যাত মুহাদ্দিস আব্দুর রহমান মুবারকপুরী (তুহফাতুল আহওয়াযী-এর লেখক) এবং ওবায়দুল্লাহ মুবারকপুরী (মিরআতুল মাফাতীহ-এর রচক)-এর মতো পণ্ডিতদের জন্ম এই শহরেই। ভৌগোলিক সম্পৃক্ততার কারণে শাইখ সফিউর রহমানকে ‘মুবারকপুরী’, আযমগড়ের কারণে ‘আযমী’ এবং গ্রামের কারণে কখনো কখনো ‘হুসাইনাবাদী’ বলা হয়ে থাকে।
২. শিক্ষাজীবন ও ইলমী বুনিয়াদ
শাইখ মুবারকপুরীর প্রাথমিক শিক্ষাজীবন শুরু হয়েছিল সম্পূর্ণ পারিবারিক ও ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় পরিবেশের মধ্য দিয়ে।
- হাতেখড়ি ও প্রাথমিক শিক্ষা: বাল্যকালে নিজের দাদা মুহাম্মদ আকবর এবং চাচা মাওলানা আব্দুছ ছামাদের কাছে পবিত্র কুরআন মাজীদ পাঠের মাধ্যমে তার শিক্ষার হাতেখড়ি হয়। ১৯৪৮ সালে তিনি মুবারকপুরের ‘দারুত তা’লিম’ মাদরাসায় ভর্তি হন এবং সেখানে ৬ বছর প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের পড়াশোনা শেষ করেন। একই সাথে তিনি ফার্সি ভাষাতেও দক্ষতা অর্জন করেন।
- উচ্চতর শিক্ষা: ১৯৫৪ সালে তিনি মুবারকপুরের ‘এহইয়াউল উলুম’ মাদরাসায় ভর্তি হয়ে আরবী ভাষা, সাহিত্য এবং ব্যাকরণ (নাহু-ছরফ) গভীর মনোযোগের সাথে অধ্যয়ন করেন। দুই বছর পর ১৯৫৬ সালে তিনি মৌনাথভঞ্জন এলাকার বিখ্যাত আহলে হাদীস মাদরাসা ‘ফয়েযে আম’-এ ভর্তি হন। সেখানে দীর্ঘ ৫ বছর অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে তাফসীর, হাদীস, উসূলে হাদীস, ফিকহ এবং উসূলে ফিকহসহ শরীয়তের বিভিন্ন উচ্চতর শাখায় জ্ঞানার্জন করেন। ১৯৬১ সালে তিনি সেখান থেকে কৃতিত্বের সাথে শিক্ষা সমাপনী টাইটেল বা সার্টিফিকেট লাভ করেন এবং একই সাথে পাঠদান ও ফতোয়া প্রদানের অনুমতি (ইজাজত) প্রাপ্ত হন।
- অন্যান্য ডিগ্রী: সনাতন দরসে নিযামীর পাশাপাশি তিনি এলাহাবাদ বোর্ডের অধীনে ১৯NT সালের ফেব্রুয়ারিতে ‘মৌলভী’ এবং ১৯৬০ সালে ‘আলেম’ পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। পরবর্তীতে তিনি ১৯৭৬ সালে ‘ফাযেলে আদব’ এবং ১৯৭৮ সালে ‘ফেযেলে দ্বীনিয়াত’ পরীক্ষায়ও প্রথম স্থান অধিকার করেন।
৩. কর্মজীবন ও সাংগঠনিক নেতৃত্ব
১৯৬১ সালে পড়াশোনা শেষ করার পরপরই শাইখ মুবারকপুরী শিক্ষকতা ও ইলমী খিদমতে নিজেকে নিয়োজিত করেন। তার দীর্ঘ ৪ দশকেরও বেশি সময়ের কর্মজীবন ছিল অত্যন্ত গতিশীল:
- মাদরাসায় শিক্ষকতা: তিনি প্রথমে এলাহাবাদ এবং পরবর্তীতে নাগপুরে শিক্ষকতা শুরু করেন। ১৯৬৩ সালে নিজ মাদরাসা ‘ফয়যে আম’-এর আমন্ত্রণে সেখানে দুই বছর কাটান। এরপর আযমগড়ের ‘জামেআতুর রাশাদ’ (১৯৬৫) এবং মৌনাথভঞ্জনের ‘জামিআ আছারিয়া দারুল হাদিসে’ (১৯৬৬) তিন বছর উপাধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে মধ্যপ্রদেশের সিউনী জেলার ফয়যুল উলুম মাদরাসায় চার বছর এবং ১৯৭২ সালের শেষে মুবারকপুরের ‘دارুত তা’লীম’ মাদরাসায় অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
- বেনারস ও জামিআ সালাফিয়া: দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনের পর তিনি ভারতের আহলে হাদীসদের প্রধান ইলমী কেন্দ্র বেনারসের ‘জামিআ সালাফিয়া’-তে যোগ দেন। সেখানে তিনি জামিআর প্রধান মুখপত্র বিখ্যাত উর্দু মাসিক পত্রিকা ‘মুহাদ্দিস’-এর সম্পাদকের দায়িত্ব অত্যন্ত সুনামের সাথে পালন করেন।
- মদীনা বিশ্ববিদ্যালয় ও আন্তর্জাতিক গবেষণা: শাইখ মুবারকপুরীর মেধা ও যোগ্যতার কারণে ১৯৮৮ সালে তিনি সৌদি আরবের মদীনাস্থ ‘ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়’-এর অধীনে “রাসূল ﷺ বিষয়ক উচ্চতর গবেষণা ইনস্টিটিউটে” গবেষক হিসেবে নিযুক্ত হন। দীর্ঘ সময় তিনি মদীনায় সীরাত ও হাদীস গবেষণায় কাটান এবং পরবর্তীতে বিখ্যাত আন্তর্জাতিক প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ‘দারুসসালাম’-এর রিয়াদ শাখায় প্রধান পাণ্ডুলিপি গবেষক ও সম্পাদক হিসেবে কাজ করেন।
- সাংগঠনিক নেতৃত্ব: ১৯৯৮ সালের জুলাই মাসে শাইখ সফিউর রহমান মুবারকপুরী ভারতের আহলে হাদীসদের কেন্দ্রীয় সংগঠন “মারকাযী জমঈয়ত আহলে হাদিস হিন্দ”-এর আমীর (সভাপতি) নির্বাচিত হন। এর পূর্বে তিনি উত্তর প্রদেশ শাখার আমীর ছিলেন। তার কেন্দ্রীয় আমীরত্বের মেয়াদে সংগঠনের কর্মপরিধি এবং দাওয়াতী কার্যক্রম দেশজুড়ে ব্যাপক গতিশীলতা লাভ করে।
৪. ‘আর্-রাহীকুল মাখতূম’ ও বিশ্বজোড়া স্বীকৃতি
১৯৭৬ সালে সৌদি আরবের মক্কায় অনুষ্ঠিত প্রথম আন্তর্জাতিক সীরাত সম্মেলনে ‘রাবেতাতুল আলামিল ইসলামী’ (মুসলিম ওয়ার্ল্ড লীগ)-এর পক্ষ থেকে বিশ্বব্যাপী একটি সীরাত গ্রন্থ রচনা প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। শাইখ সফিউর রহমান মুবারকপুরী সেই প্রতিযোগিতায় আরবী ভাষায় ‘আর্-রাহীকুল মাখতূম’ (অনুবাদ: মোহরঙ্কিত জান্নাতী সুধা) নামে রাসূল ﷺ-এর এক অনন্য জীবনী গ্রন্থ জমা দেন।

বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে জমা পড়া মোট ১,১৮২টি সীরাত গ্রন্থের মধ্যে শাইখ মুবারকপুরীর বইটি শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করে প্রথম স্থান (First Prize) লাভ করে। এই ঐতিহাসিক গৌরব অর্জনের পর বইটি আরবী ও উর্দু থেকে বাংলা, ইংরেজিসহ বিশ্বের প্রায় প্রতিটি প্রধান ভাষায় অনূদিত হয়। এটিই তাকে বিশ্বমঞ্চে একজন শ্রেষ্ঠ সীরাত গবেষক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
৫. উল্লেখযোগ্য গ্রন্থাবলী
শাইখ মুবারকপুরী আরবী ও উর্দু উভয় ভাষায় বহু মূল্যবান এবং গবেষণামূলক গ্রন্থ রচনা করেছেন। তার বিখ্যাত বইগুলোর তালিকা নিচে দেওয়া হলো:
আরবী গ্রন্থসমূহ:
১. আর্-রাহীকুল মাখতূম: বিশ্বখ্যাত ও প্রথম পুরস্কারপ্রাপ্ত সীরাত গ্রন্থ।
২. রাওযাতুল আনওয়ার ফী সিরাতিন নাবিয়্যিল মুখতার: সাধারণ পাঠকদের সুবিধার্থে ‘আর্-রাহীকুল মাখতূম’-এর একটি চমৎকার সংক্ষিপ্ত রূপ।
৩. ইতহাফুল কিরাম: হাফেয ইবনে হাজার আসকালানী রচিত বিখ্যাত হাদীস গ্রন্থ ‘বুলুগুল মারাম’-এর অনন্য আরবী ব্যাখ্যাগ্রন্থ।
৪. মিন্নাতুল মুনঈম: ইমাম মুসলিমের ‘সহীহ মুসলিম’-এর অত্যন্ত প্রাঞ্জল ও গবেষণামূলক আরবী শরাহ বা ব্যাখ্যাগ্রন্থ।
৫. আল ফিরকাতুন নাযিয়াহ ওয়াল ফিরাক আল ইসলামিয়াহ: ইসলামী দল ও উপদলগুলোর ঐতিহাসিক বিবরণ।
৬. শারহু আযহারুল আরব: আরবী সাহিত্যের একটি অপ্রকাশিত ব্যাখ্যাগ্রন্থ।
উর্দু গ্রন্থসমূহ:
১. কাদিয়ানিয়াত আপনে আয়না মেঁ: কাদিয়ানী বা আহমদিয়া মতবাদের অসারতা নিয়ে লিখিত তাত্ত্বিক বই।
২. তারিখে আলে সউদ: সৌদি রাজবংশের উত্থান ও আরবের সমকালীন ইতিহাসের বিবরণ।
৩. ইনকারে হাদিস কন?: হাদীস অস্বীকারকারী বা আহলে কুরআনদের বিভ্রান্তির জবাবে লেখা একটি গুরুত্বপূর্ণ বই।
৪. ফিতনায়ে কাদিয়ানিয়াত আওর মাওলানা সানাউল্লাহ অমৃতসরী: কাদিয়ানীদের বিরুদ্ধে ‘ফাতিহে কাদিয়ান’ খ্যাত আল্লামা সানাউল্লাহ অমৃতসরীর ঐতিহাসিক লড়াই ও খিদমতের ওপর লেখা বই।
৬. ইন্তেকাল ও জানাযা
ইলমে হাদীস ও সীরাত সাহিত্যের এই মহান সাধক ২০০৬ সালের ১লা ডিসেম্বর, পবিত্র জুমাবার বিকেল ৩টার দিকে নিজ গ্রাম হুসাইনাবাদে ৬৩ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।
পরদিন ২রা ডিসেম্বর (শনিবার) তার সুযোগ্য পুত্র এবং তৎকালীন ‘জামিআ ইসলামিয়া মিমবারা’ মাদরাসার শিক্ষক মাওলানা মুহাম্মদ ইয়াসির মাদানীর ইমামতিতে তার জানাযার সালাত অনুষ্ঠিত হয়। এই জানাযায় মারকাযী জমঈয়তের তৎকালীন সেক্রেটারি জেনারেল শায়খ আসগার আলী সালাফীসহ দেশ-বিদেশের হাজার হাজার উলামা, ছাত্র এবং সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষ অংশ নেন। মুবারকপুরের পারিবারিক কবরস্থানেই তাকে সমাহিত করা হয়। তার রেখে যাওয়া সাহিত্যকর্ম ও সীরাতগ্রন্থ আজো বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মুসলমানের হৃদয়ে আলোর মশাল জ্বালিয়ে যাচ্ছে।
তার লিখিত কিছু কিতাবের লিংক :
০১. আর রাহীকুল মাকতুম সমকালীন প্রকাশনী
লেখক : শফিউর রহমান মোবারকপুরী
০২. আর রাহীকুল মাখতূম (রাসূল (সঃ) এর শ্রেষ্ঠ জীবনী)
লেখক : শফিউর রহমান মোবারকপুরী
০৩. আররাহীকুল মাখতূম রাসূলﷺ_এর শ্রেষ্ঠসীরাতগ্রন্থ, দারুল হুদা কুতুবখানা
লেখক : শফিউর রহমান মোবারকপুরী
০৪.আর-রাহীকুল মাখতূম (রাসূল (সঃ) এর জীবনী) তাওহীদ পাবলিকেশন
লেখক : শফিউর রহমান মোবারকপুরী
০৫. রাসূলে আরাবি (ﷺ) বিশুদ্ধ বর্ণনার ভিত্তিতে প্রিয় নবির সংক্ষিপ্ত জীবনী
লেখক : শফিউর রহমান মোবারকপুরী




