বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে মুসলিম বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী ইসলামী চিন্তাবিদ, তাত্ত্বিক, বাগ্মী এবং প্রতিরোধ আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তিত্ব ছিলেন ড. শহীদ আবদুল্লাহ ইউসুফ আযযাম (আরবি: عبد الله يوسف عزام; ইংরেজিতে সাধারণত Abdullah Azzam হিসেবে পরিচিত)। তাকে আধুনিক জিহাদী আন্দোলনের বুদ্ধিবৃত্তিক ও তাত্ত্বিক জনক হিসেবে গণ্য করা হয়।আফগানিস্তানে সোভিয়েত ইউনিয়নের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী মুসলিম তরুণদের উদ্বুদ্ধ করতে এবং তাদের সংগঠিত করতে তিনি সবচেয়ে প্রধান ভূমিকা পালন করেছিলেন। এই যুগান্তকারী ব্যক্তিত্বের জীবন ও কর্ম বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো:
১. জন্ম ও জন্মস্থান
আবদুল্লাহ আযযাম ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দে ফিলিস্তিনের জেনিন (Jenin) শহরের নিকটবর্তী সিলাত আল-হারিথিয়া (Silat al-Harithiya) গ্রামে একটি ঐতিহ্যবাহী ও সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার শৈশব কেটেছিল ফিলিস্তিনের মাটিতে, যা তার পরবর্তী জীবনের চিন্তাধারা ও সংগ্রামকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল।
২. শিক্ষা জীবন ও উচ্চতর ডিগ্রি
ড. আবদুল্লাহ আযযাম শিক্ষা জীবনে অত্যন্ত মেধাবী ও অধ্যবসায়ী ছিলেন। তিনি সমকালীন সময়ের সর্বোচ্চ প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মীয় শিক্ষা অর্জন করেছিলেন:
- প্রাথমিক ও ডিপ্লোমা শিক্ষা: নিজ গ্রামে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্তির পর তিনি খদুরী কৃষি কলেজে ভর্তি হন এবং ১৯৫৯ খ্রিস্টাব্দে সেখান থেকে ডিপ্লোমা ডিগ্রি লাভ করেন।
- স্নাতক (Graduation): এরপর তিনি সিরিয়ার দামেস্ক বিশ্ববিদ্যালয়ে শরীয়াহ অনুষদে ভর্তি হন এবং ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দে কৃতিত্বের সাথে শরীয়াহ বা ইসলামী আইনে স্নাতক (BA) ডিগ্রি লাভ করেন।
- স্নাতকোত্তর (Master’s): ১৯৬৭ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের (ছয় দিনের যুদ্ধ) পর যখন পশ্চিম তীর ইসরায়েল দখল করে নেয়, তখন তিনি সপরিবারে জর্ডানে হিজরত করেন। পরে তিনি মিশরের বিখ্যাত আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং ১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দে উসুলুদ-দ্বীন (Principles of Religion) বিষয়ে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন।
- পিএইচডি (Ph.D): ১৯৭৩ খ্রিস্টাব্দে তিনি আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই উসুলুল ফিকহ (Islamic Jurisprudence) বিষয়ে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ডক্টরেট (Ph.D) ডিগ্রি লাভ করেন। তার গবেষণার বিষয়বস্তু ছিল ইসলামী আইনের নীতিমালার ওপর।
৩. কর্মজীবন ও বুদ্ধিবৃত্তিক কার্যক্রম
ড. আযযামের কর্মজীবন ছিল শিক্ষকতা, গবেষণা এবং সাংগঠনিক কাজের এক অপূর্ব সমন্বয়:
- অধ্যাপনা: পিএইচডি শেষ করার পর তিনি জর্ডান বিশ্ববিদ্যালয়ে শরীয়াহ অনুষদে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন এবং সেখানে ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত অধ্যাপনা করেন। পরবর্তীতে তিনি সৌদি আরবের জেদ্দায় অবস্থিত কিং আব্দুল আজিজ বিশ্ববিদ্যালয়েও অধ্যাপনা করেন।
- আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামাবাদ: ১৯৮১ খ্রিস্টাব্দে তিনি পাকিস্তানের ইসলামাবাদে নবপ্রতিষ্ঠিত ‘আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়’-এ শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। মূলত এই পদায়নের ফলেই তিনি আফগান-সোভিয়েত সীমান্তের কাছাকাছি আসার সুযোগ পান, যা তার জীবনের মোড় সম্পূর্ণ ঘুরিয়ে দেয়।
৪. আফগান যুদ্ধ ও প্রতিরোধ আন্দোলনে অবদান
১৯৭৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন (রাশিয়া) আফগানিস্তানে সামরিক আগ্রাসন চালালে ড. আবদুল্লাহ আযযাম তার আরামদায়ক প্রাতিষ্ঠানিক ও একাডেমিক জীবন পরিত্যাগ করে মজলুম আফগান জনগণের পাশে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন।
- মাকতাব আল-খিদমাত (Maktab al-Khidmat): ১৯৮৪ খ্রিস্টাব্দে তিনি পাকিস্তানের পেশোয়ারে ‘মাকতাব আল-খিদমাত’ (Services Office) নামে একটি আন্তর্জাতিক সহায়তা কেন্দ্র গড়ে তোলেন। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল বিশ্বজুড়ে আফগান শরণার্থীদের জন্য মানবিক সাহায্য সংগ্রহ করা এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তানের ভেতর ত্রাণ পৌঁছানো। (উল্লেখ্য, ওসামা বিন লাদেন এই অফিসের প্রাথমিক অর্থায়নে যুক্ত ছিলেন)।
- বিশ্বব্যাপী মুসলিম তরুণদের সংগঠিতকরণ: তিনি তার অসামান্য বাগ্মিতা এবং লেখনীর মাধ্যমে আরবে ও পাশ্চাত্যে সফর করে মুসলিম তরুণদের আফগান প্রতিরোধে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান। তার একটি বিখ্যাত স্লোগান ছিল: “জিহাদ এবং একটি রাইফেল; আর কোনো আলোচনা বা কোনো সংলাপ নয়।”
- রণাঙ্গনে ভূমিকা: তিনি কেবল একজন তাত্ত্বিক গুরু ছিলেন না, বরং নিজেই নিয়মিত আফগানিস্তানের দুর্গম পাহাড়-পর্বতে রণাঙ্গনে ঘুরে বেড়াতেন এবং মুজাহিদদের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক তারবিয়াত (প্রশিক্ষণ) দিতেন।
৫. চিন্তাধারা ও ফিকহী দৃষ্টিভঙ্গি
ড. আবদুল্লাহ আযযামের মূল ফিকহী অবদান ছিল “জিহাদের আধুনিক তত্ত্বায়ন”।
- তিনি তার বিভিন্ন ফতোয়া ও বইয়ে প্রমাণ করার চেষ্টা করেন যে, যখন কোনো মুসলিম ভূখণ্ড (যেমন: ফিলিস্তিন বা আফগানিস্তান) কোনো অমুসলিম শক্তি দ্বারা আক্রান্ত হয়, তখন সেই ভূখণ্ড রক্ষা করার জন্য প্রতিরোধে অংশ নেওয়া প্রতিটি সক্ষম মুসলমানের জন্য ‘ফরজে আইন’ (ব্যক্তিগতভাবে বাধ্যতামূলক কর্তব্য) হয়ে দাঁড়ায়।
- তার এই তত্ত্ব তৎকালীন ও পরবর্তী সময়ের বৈশ্বিক মুসলিম রাজনীতি ও প্রতিরোধ আন্দোলনে এক গভীর এবং সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলে।

৬. উল্লেখযোগ্য গ্রন্থাবলী
ড. আবদুল্লাহ আযযাম তার ব্যস্ততম সংগ্রামী জীবনের মধ্যেও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বই ও পুস্তিকা রচনা করে গেছেন, যা মূলত প্রতিরোধ, আকীদা ও আত্মশুদ্ধি বিষয়ক। তার কয়েকটি বিখ্যাত বই হলো:
১. মুসলিম ভূখণ্ড রক্ষায় প্রধান কর্তব্য (Defending the Muslim Lands) – তার সবচেয়ে আলোচিত ফতোয়া ও বই, যেখানে তিনি আক্রান্ত মুসলিম দেশের প্রতিরক্ষাকে ফরজে আইন হিসেবে সাব্যস্ত করেছেন।
২. আল্লাহর দ্বীনের সাইনপোস্টসমূহ (Signposts of the Movement)
৩. আফগানিস্তানে পরম করুণাময়ের নিদর্শনাবলী (Signs of the Ar-Rahman in the Afghan Jihad) – আফগান যুদ্ধে মুজাহিদদের বিভিন্ন অলৌকিক ঘটনা ও অভিজ্ঞতার সংকলন।
৪. জিহাদের ফিকহ বা নিয়মাবলী (Fiqh al-Jihad)
৫. পাহাড়ের চূড়ায় ক্রন্দন (The Lofty Mountain)
৭. শাহাদাত (মৃত্যু)
১৯৮৯ খ্রিস্টাব্দের ২৪ নভেম্বর, জুমার নামাজের উদ্দেশ্যে যাওয়ার সময় পাকিস্তানের পেশোয়ারে এক ভয়াবহ ও রহস্যময় বোমা হামলায় ড. আবদুল্লাহ আযযাম শাহাদাত বরণ করেন। সন্ত্রাসীরা তার গাড়ি লক্ষ্য করে রাস্তার পাশে ল্যান্ডমাইন বা শক্তিশালী বিস্ফোরক পেতে রেখেছিল। এই হামলায় তার দুই ছেলে (মুহাম্মদ ও ইব্রাহিম) এবং গাড়ির চালকও একই সাথে নিহত হন।

মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৪৮ বছর। তার এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে কারা ছিল, তা আজো একটি বড় রহস্য; বিভিন্ন সময় সিআইএ (CIA), কেজিবি (KGB), ইসরায়েলি মোসাদ কিংবা অভ্যন্তরীণ কোনো রাজনৈতিক উপদলের ওপর এর দায় চাপানো হয়েছে। তাকে পেশোয়ারের ‘পাব্বি’ নামক মুজাহিদ কবরস্থানে দাফন করা হয়।
আধুনিক ইসলামী ইতিহাসে ড. আবদুল্লাহ আযযামকে একজন খাঁটি বুদ্ধিজীবী-যোদ্ধা (Scholar-Warrior) হিসেবে স্মরণ করা হয়, যিনি যা বিশ্বাস করতেন, নিজের জীবন দিয়ে তা বাস্তবায়ন করে গেছেন।
তার লিখিত কিছু কিতাব হলো :
০১. তাওহীদ আল আমালী
লেখক : ড. শহীদ আব্দুল্লাহ আযযাম
০২.আল্লাহর সাথে সততা
লেখক : ড. শহীদ আব্দুল্লাহ আযযাম
০৩. আফগানিস্তানে আমার দেখা আল্লাহর নিদর্শন
লেখক : ড. শহীদ আব্দুল্লাহ আযযাম
০৪. কারা জান্নাতী কুমারীদের ভালবাসে
লেখক : ড. শহীদ আব্দুল্লাহ আযযাম
০৫. তাফসীরে সুরা তওবা
লেখক : ড. শহীদ আব্দুল্লাহ আযযাম
০৬.পাশ্চাত্য ইসলাম বিরোধী ষড়যন্ত্র
লেখক : ড. শহীদ আব্দুল্লাহ আযযাম
০৭. ফিলিস্তিনের স্মৃতি
লেখক : ড. শহীদ আব্দুল্লাহ আযযাম
০৮. মুসলিম ভূমির প্রতিরক্ষা
লেখক : ড. শহীদ আব্দুল্লাহ আযযাম
০৯.যুবক ভাইদের প্রতি বিশেষ বার্তা
লেখক : ড. আব্দুল্লাহ আযযাম
১০. লাল কর্কট
লেখক : ড. শহীদ আব্দুল্লাহ আযযাম
১১. সিরাত থেকে শিক্ষা
লেখক : ড. শহীদ আব্দুল্লাহ আযযাম










