বাংলাদেশের সমকালীন ইসলামি জগতে যে ক’জন নিভৃতচারী আলেম মৌলিক গবেষণা, তাত্ত্বিক দূরদর্শিতা এবং কালজয়ী লিখনীর মাধ্যমে উম্মাহর বুদ্ধিবৃত্তিক শূন্যতা পূরণ করে যাচ্ছেন, তাদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয় হলেন শাইখুল হাদিস মাওলানা মুহাম্মাদ হেমায়েত উদ্দীন (দা.বা.)। তিনি প্রচলিত ধারার কোলাহলপূর্ণ রাজনীতি বা বাহ্যিক প্রচার-প্রসার থেকে দূরে থেকে নিভৃত কোণে বসে যে জ্ঞানসাধনা ও সাহিত্য তৈরি করেছেন, তা আজ দেশের কওমি মাদরাসা ও জেনারেল শিক্ষায় শিক্ষিত উভয় শ্রেণির মানুষের কাছে এক অমূল্য সম্পদ।
বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে এবং একবিংশ শতাব্দীর এই আধুনিক যুগে ইসলামি জ্ঞানচর্চাকে কেবল প্রথাগত রীতিনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে, সমকালীন বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখা যেমন—মনোবিজ্ঞান, ভূগোল, মানচিত্র ও আধুনিক ভ্রান্ত মতবাদের তুলনামূলক পর্যালোচনার আলোকে যিনি উপস্থাপন করেছেন, তিনি হলেন মাওলানা মুহাম্মাদ হেমায়েত উদ্দীন। তিনি একাধারে একজন যুগশ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস, প্রখ্যাত মুফাসসির, দূরদর্শী লেখক এবং অনন্য গবেষক। তাঁর প্রতিটি লিখনীর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো—গভীর তাত্ত্বিকতা, কাঠখোট্টা যুক্তির বদলে সহজ উপস্থাপন এবং বাস্তব জীবনের সাথে শরিয়তের নিখুঁত প্রয়োগ।
১. জন্ম, বংশ পরিচয় ও পারিবারিক পটভূমি
জন্ম ও জন্মস্থান:
মাওলানা মুহাম্মাদ হেমায়েত উদ্দীন ১৯৬০ খ্রিষ্টাব্দের অক্টোবর মাসে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী খুলনা জেলার রূপসা থানার অন্তর্গত ‘মৈশাধুনি’ গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত ও প্রসিদ্ধ দ্বীনদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।
পারিবারিক ঐতিহ্য ও দ্বীনি আবহাওয়া:
তাঁর পরিবারটি ছিল খাঁটি ইলমি ও আধ্যাত্মিক চেতনার এক অনন্য উর্বর ভূমি। তাঁর পিতা মৌলভী বেলায়েত হোসাইন ছিলেন তদানীন্তন উপমহাদেশের অবিসংবাদিত নেতা, সমাজ-সংস্কারক এবং ‘মুজাহিদে আজম’ হযরত মাওলানা শামসুল হক ফরীদপুরী (রহ.)-এর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ছাত্র ও খাস খাদেম। পিতার এই মহান উস্তাদ-ভক্তি এবং আধ্যাত্মিক সুবাস শৈশব থেকেই বালক হেমায়েত উদ্দীনের অন্তরে প্রবেশ করেছিল। পিতার প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে এবং পরিবারের কঠোর দ্বীনি ও নৈতিক শৃঙ্খলার মধ্য দিয়েই তাঁর শৈশবের বুনিয়াদ গড়ে ওঠে।
২. মেধা ও কৃতিত্বে উজ্জ্বল শিক্ষা জীবন
মাওলানা মুহাম্মাদ হেমায়েত উদ্দীনের শিক্ষাজীবন ছিল অত্যন্ত বৈচিত্র্যময় এবং কৃতিত্বে ভরপুর। স্কুল থেকে প্রাথমিক শিক্ষা সফলতার সাথে সমাপ্ত করার পর তিনি সম্পূর্ণ দ্বীনি ধারার উচ্চতর শিক্ষায় আত্মনিয়োগ করেন।
ক. পবিত্র কুরআন হিফজ ও প্রাথমিক পাঠ:
পারিবারিক ইচ্ছায় তিনি আল কুরআনের জ্ঞান অর্জনের উদ্দেশ্যে মাদরাসায় ভর্তি হন। ১৯৭৬ সনে তিনি খুলনা জেলার বিখ্যাত ‘নূরুল উলূম হাফেজিয়া মাদরাসা গল্লামারি’ থেকে অত্যন্ত সুনামের সাথে পবিত্র কুরআন হিফজ (মুখস্থ) সম্পন্ন করেন।
খ. কিতাব বিভাগের পড়াশোনা ও মেধার স্বাক্ষর:
হিফজ শেষ করার পর তিনি ইসলামি জ্ঞানবিজ্ঞানের মূল ধারায় পদার্পণ করেন এবং দেশের কয়েকটি শীর্ষস্থানীয় ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানে কিতাব বিভাগে অধ্যয়ন করেন:
- খুলনা দারুল উলূম: হিফজ শেষ করে তিনি প্রথমে খুলনা জেলার কেন্দ্রীয় মাদরাসা ‘দারুল উলূম’-এ এক বছর পড়াশোনা করেন।
- জামেয়া গওহরডাঙ্গা ফরিদপুর: এরপর তিনি তাঁর পিতার আত্মিক ও ইলমি কেন্দ্র ফরিদপুরের ঐতিহ্যবাহী কেন্দ্রীয় মাদরাসা ‘গওহরডাঙ্গা খাদেমুল ইসলাম’-এ সুদীর্ঘ ৫ বছর অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে কিতাব বিভাগের মাধ্যমিক ও উচ্চ-মাধ্যমিক স্তরের পাঠ গ্রহণ করেন। এখানে অধ্যয়নকালেই তাঁর অনন্য মেধার বহিঃপ্রকাশ ঘটে। গওহরডাঙ্গা বেফাকের কেন্দ্রীয় পরীক্ষায় তিনি ‘নাহবেমীর’ এবং ‘কাফিয়া’ জামাতে (শ্রেণিতে) সমগ্র বোর্ডের মধ্যে ১ম স্থান অধিকার করার গৌরব লাভ করেন।
- জামেয়া শরইয়্যাহ মালিবাগ ঢাকা: উচ্চতর শিক্ষার উদ্দেশ্যে তিনি রাজধানী ঢাকার প্রাচীন বিদ্যাপীঠ ‘মালিবাগ জামেয়া’-তে ভর্তি হন এবং সেখানে ৪ বছর গভীর মনোযোগের সাথে হাদীস, ফিকহ ও তাফসির শাস্ত্র অধ্যায়ন করেন। ১৯৮৬ সনে তিনি এই প্রতিষ্ঠান থেকে সর্বোচ্চ ডিগ্রি ‘দাওরায়ে হাদীস’ (তাকমীল) ফারেগ হন। মালিবাগে থাকাকালীন বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশ (কওমি মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড)-এর কেন্দ্রীয় পরীক্ষায় তিনি ‘মেশকাত’ ও ‘দাওরায়ে হাদীস’ জামাতে সমগ্র দেশের মধ্যে ২য় স্থান অধিকার করে তাঁর মেধার শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেন।
গ. দারুল উলূম দেওবন্দে উচ্চতর হাদিস পাঠ:
দেশীয় শিক্ষার সর্বোচ্চ চূড়া স্পর্শ করার পরও তাঁর ইলমি তৃষ্ণা মেটেনি। তাই তিনি ১৯৮৭ সনে পুনরায় ভারতের উত্তর প্রদেশে অবস্থিত মুসলিম বিশ্বের ঐতিহাসিক ও ঐতিহ্যবাহী ইলমি মারকাজ ‘দারুল উলূম দেওবন্দ’-এ গমন করেন। সেখানে তিনি পুনরায় সমকালীন উপমহাদেশের শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস ও শায়খদের সান্নিধ্যে ‘দাওরায়ে হাদীস’ (তাকমীল) সম্পন্ন করে দ্বিতীয়বার ফারেগ হন এবং ইলমে হাদীসের উচ্চতর ইজাজত ও সনদ লাভ করেন।
ঘ. ভাষা, সাহিত্য ও বিবিধ শাস্ত্রে বিশেষায়িত দক্ষতা:
মাওলানা হেমায়েত উদ্দীন কেবল মাদরাসার গণ্ডির মধ্যে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। তিনি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে সাবলীলভাবে ফুটিয়ে তোলার জন্য তৎকালীন বিশিষ্ট ভাষাবিজ্ঞানী ও প্রখ্যাত পণ্ডিত ডক্টর কাজী দ্বীন মুহাম্মাদ-এর নিকট সরাসরি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের উচ্চতর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। এর ফলে তাঁর লিখনীতে এক অনন্য সাহিত্যিক মাধুর্য ও প্রাঞ্জলতা তৈরি হয়।
তাছাড়া, তিনি নিজস্ব গবেষণা ও সাধনার মাধ্যমে কয়েকটি বিরল ও বিশেষায়িত শাস্ত্রে পাণ্ডিত্য অর্জন করেন, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
- ইসলামী মনোবিজ্ঞান (Islamic Psychology): মানব মন ও আত্মার ব্যাধি এবং তার সুস্থতা নিয়ে সমকালীন বিজ্ঞানের সাথে ইসলামের সমন্বিত জ্ঞান।
- ইসলামী ভূগোল ও মানচিত্র (Islamic Geography and Mapping): শরিয়তের বিভিন্ন আহকাম পালনে ভূগোলের ব্যবহারিক প্রয়োগ।
- তরজমা ও তাফসীর শাস্ত্র: আল কুরআনের সূক্ষ্ম রহস্য ও মর্মার্থ উদ্ধার।
- স্বপ্নের ব্যাখ্যা (تعبير الرؤيا): এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রদত্ত একটি বিশেষ জ্ঞান, যাতে মাওলানা হেমায়েত উদ্দীনের গভীর পারদর্শিতা ও বিশেষ দক্ষতা রয়েছে।
৩. শিক্ষকতা, খুতবা ও কর্মজীবন
শিক্ষাজীবন সমাপ্ত করার পর ১৯৮৭ খ্রিষ্টাব্দ থেকেই তিনি নিজেকে পূর্ণাঙ্গভাবে দ্বীনের বহুমুখী খিদমতে সঁপে দেন। তাঁর কর্মজীবন মূলত শিক্ষকতা, ইমামতি ও গবেষণার এক অনন্য ত্রিবেণী সংগম।
ক. শায়খুল হাদিস ও সিনিয়র মুহাদ্দিস হিসেবে খিদমত:
শিক্ষা সমাপনীর পর থেকে তিনি ঢাকার একাধিক শীর্ষস্থানীয় ও নামকরা উচ্চতর ইসলামি বিদ্যাপীঠে অত্যন্ত সুনামের সাথে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিতাবসমূহের দরস (পাঠদান) দিয়েছেন। তাঁর শিক্ষকতার প্রধান কয়েকটি স্টেশন হলো:
১. জামেয়া শরইয়্যাহ মালিবাগ, ঢাকা।
২. জামেয়া মাদানিয়া বারিধারা, ঢাকা।
৩. জামেয়া মাদানিয়া রাজফুলবাড়িয়া, সাভার।
৪. জামেয়া সুবহানিয়া, উত্তরা ধউর, ঢাকা।
৫. ইসলামিয়া মাদরাসা, ইসলামপুর, ঢাকা।
এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে তিনি দীর্ঘ বছর সিনিয়র মুহাদ্দিস ও শায়খুল হাদীস হিসেবে সহীহ বুখারী, তিরমিযীসহ হাদীসের প্রধান প্রধান কিতাবসমূহ পড়িয়েছেন। ২০১০-২০১১ শিক্ষাবর্ষ থেকে তিনি বর্তমান (২০২৬ সাল) পর্যন্ত দেশের অন্যতম শীর্ষ ও প্রাচীন ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় ‘জামেয়া ইসলামিয়া দারুল উলূম মাদানিয়া’ (যাত্রাবাড়ী বড় মাদরাসায়) অত্যন্ত সুনামের সাথে সিনিয়র মুহাদ্দিস এবং তাফসীর বিভাগের প্রধান তত্ত্বাবধায়ক বা ‘মুশরিফ’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন।
খ. দীর্ঘকালীন ইমামতি ও খতিবের দায়িত্ব:
শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি ঢাকার সাধারণ মুসলমানদের হেদায়েতের আলো ছড়াতে ইমামতি ও খুতবার মঞ্চকে বেছে নিয়েছিলেন। দেওবন্দ থেকে ফিরে ১৯৮৭ খ্রিষ্টাব্দ থেকেই তিনি ঢাকার পশ্চিম নাখালপাড়ার ঐতিহাসিক ‘বায়তুল আতীক জামে মসজিদ’ (ছাপড়া মসজিদ)-এর ইমাম ও খতীবের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। অত্যন্ত নিষ্ঠা, একাগ্রতা ও ইলমি দূরদর্শিতার সাথে তিনি সুদীর্ঘ ২৩ বছর (১৯৮৭-২০০৮) এই দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর জ্ঞানগর্ভ খুতবা ও বয়ানের মাধ্যমে হাজার হাজার সাধারণ মানুষ ও তরুণ সমাজ সুন্নাহর পথে ফিরে আসে।
গ. নিভৃতচারী ও রাজনীতিমুক্ত জীবনদর্শন:
মাওলানা মুহাম্মাদ হেমায়েত উদ্দীনের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর দিক হলো তাঁর প্রচারবিমুখতা ও নিভৃতচারী মানসিকতা। সমকালীন সময়ে উলামায়ে কেরামের বড় একটা অংশ বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, দলাদলি বা আন্দোলনমুখী তৎপরতায় যুক্ত থাকলেও, তিনি সম্পূর্ণ সচেতনভাবে সব রকম রাজনৈতিক কোলাহল ও প্রচারের আলো থেকে নিজেকে দূরে রেখেছেন। তিনি বিশ্বাস করেন, উম্মাহর বুদ্ধিবৃত্তিক ও চিন্তাগত দেউলিয়াত্ব দূর করতে হলে নিভৃত কোণে বসে গভীর অধ্যয়ন, গবেষণা, শিক্ষকতা ও নিরবচ্ছিন্ন লেখালেখিই সবচেয়ে বড় জিহাদ।
৪. রচনা, সংকলন ও কালজয়ী সাহিত্যকর্ম
মাওলানা মুহাম্মাদ হেমায়েত উদ্দীন ছাত্রজীবন থেকেই একজন প্রথাবদ্ধ ও সাবলীল লেখক। বাংলা, আরবি ও উর্দু—এই তিন ভাষাতেই তাঁর সমান সাবলীল লেখালেখির যোগ্যতা রয়েছে। তাঁর ছাত্রজীবনের গভীর জ্ঞান ও লেখনী যোগ্যতার প্রমাণ মেলে তখন, যখন তাঁর ছাত্রাবস্থাতেই লেখা শতাধিক গবেষণামূলক প্রবন্ধ ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ কর্তৃক প্রকাশিত ‘ইসলামী বিশ্বকোষ’-এ অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
তিনি মূলত মৌলিক ও বাস্তবমুখী গ্রন্থ রচনায় বিশেষ প্রসিদ্ধ। তাঁর তৈরি বহু কিতাব বাংলাদেশের কওমি মাদরাসা এবং বিভিন্ন ইসলামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উচ্চতর সিলেবাসের অন্তর্ভুক্ত।
১. ‘ইসলামী আকীদা ও ভ্রান্ত মতবাদ’:
এটি তাঁর জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও যুগান্তকারী গবেষণামূলক কাজ। সমকালীন যুগে মুসলিম উম্মাহর আকিদা বিশ্বাসের ওপর যে সমস্ত বাতেল বা ভ্রান্ত ফেরকার (যেমন: কাদিয়ানি, মওদুদিবাদ, শিয়া মতবাদ, নাস্তিকতা ইত্যাদি) আঘাত আসছে, তার চুলচেরা বিশ্লেষণ ও খাঁটি সুন্নাহভিত্তিক আকীদার বিবরণ এতে রয়েছে। কওমি মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড (বেফাক) কর্তৃক এটি অনুমোদিত এবং মেশকাত জামাতের ‘ফেরকায়ে বাতেলা’ বা বাতেল ফিরকা বিষয়ক সহযোগী সিলেবাস হিসেবে দেশের প্রতিটি মাদরাসায় নিয়মিত পড়ানো হয়।
২. ‘আহকামে যিন্দেগী’ ও ‘ফাযায়েলে যিন্দেগী’:
একজন সাধারণ মুসলমানের সকাল থেকে সন্ধ্যা এবং জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত দৈনন্দিন জীবনের যাবতীয় ব্যবহারিক মাসআলা-মাসায়েল নিয়ে রচিত এক কালজয়ী এনসাইক্লোপিডিয়া হলো ‘আহকামে যিন্দেগী’। এই কিতাব দুটি এবং নারীদের জন্য লিখিত ‘আহকামুন নিসা’ ও ‘ফিকহুন নিছা’ বইগুলো বাংলাদেশের হাজার হাজার মসজিদে এবং মা-বোনদের ঘরোয়া তালীমের মজলিসে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে নিয়মিত পাঠ করা হয়।

৩. নতুন ও বিশেষায়িত বিষয়ের ওপর গ্রন্থসমূহ:
তিনি এমন কিছু বিষয়ে বই লিখেছেন যা বাংলা ইসলামি সাহিত্যে একদম নতুন ও বিরল:
- ইসলামী মনোবিজ্ঞান: আধুনিক সাইকোলজির সাথে ইসলামি আধ্যাত্মিকতার অপূর্ব সমন্বয়।
- ইসলামী ভূগোল ও কুরআন ও ইসলামী ইতিহাসের মানচিত্র: মানচিত্র ও ভূগোলের নিরিখে কুরআনে বর্ণিত বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থান, নবী-রাসুলদের হিজরতের পথ এবং যুদ্ধক্ষেত্রের বিবরণ।
- হজ্জ ও উমরার মানচিত্র: হাজীদের সুবিধার্থে হজের স্থানগুলোর মানচিত্রসহ সহজ বিবরণ।
- নামায ও রোযার চিরস্থায়ী ক্যালেন্ডার: তাঁর জ্যোতির্বিজ্ঞান ও ভৌগোলিক হিসাবের এক অনন্য প্রামাণ্য দলিল।
৪. তাঁর অন্যান্য উল্লেখযোগ্য গ্রন্থাবলি:
- যদি জীবন গড়তে চান
- নফস ও শয়তানের সাথে মোকাবেলা
- আহকামে হজ্জ
- কথা সত্য মতলব খারাপ
- চশমার আয়না যেমন
- ভাষা ও সাহিত্য প্রশিক্ষণ
- তরীকে তালীম
- চিন্তা-চেতনার ভুল
- মিসরে কয়েক দিন
- দ্বীনি দাওয়াতের মূলনীতি (অনুবাদ)
- তলোয়ারে নয় উদারতায় (অনুবাদ)
৫. বর্তমান অবস্থা (২০২৬)
বর্তমান ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দে শাইখুল হাদিস মাওলানা মুহাম্মাদ হেমায়েত উদ্দীন (দা.বা.) তাঁর জীবনের ৬৬তম বর্ষে পদার্পণ করেছেন। তিনি বার্ধক্যজনিত স্বাভাবিক শারীরিক ক্লান্তি সত্ত্বেও মহান আল্লাহ তায়ালার অশেষ মেহেরবানীতে সুস্থ আছেন এবং অবিরাম গতিতে ইলমি খিদমত আঞ্জাম দিয়ে যাচ্ছেন।
বর্তমানে তিনি ঢাকার ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ জামেয়া ইসলামিয়া দারুল উলূম মাদানিয়া যাত্রাবাড়ীতে শায়খুল হাদিস ও সিনিয়র মুহাদ্দিস হিসেবে বুখারি শরীফসহ উচ্চতর কিতাবসমূহের দরস দিচ্ছেন এবং তাফসীর বিভাগের তরুণ গবেষকদের প্রধান মুরুব্বী ও ‘মুশরিফ’ হিসেবে সার্বিক দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন। বড় কোনো কোলাহল, সস্তা জনপ্রিয়তা বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের (Social Media) কৃত্রিম আলো থেকে নিজেকে দূরে রেখে তিনি আজও নিভৃত কোণে নতুন নতুন কিতাব রচনা ও গবেষণার রাজত্বে মগ্ন আছেন। দেশীয় উলামা সমাজ ও জেনারেল লাইনে শিক্ষিত সুধী সমাজের কাছে তিনি এক পরম শ্রদ্ধেয় এবং নির্ভরযোগ্য অভিভাবক।
উপসংহার
মাওলানা মুহাম্মাদ হেমায়েত উদ্দীন (দা.বা.) হলেন সমকালীন বাংলাদেশের ইসলামি আকাশের এক শান্ত, স্নিগ্ধ ও জ্যোতির্ময় নক্ষত্র। বাগাড়ম্বরহীন নিখাদ জ্ঞানসাধনা কাকে বলে, তিনি নিজের জীবন দিয়ে তার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। ইসলামের শাশ্বত জ্ঞানকে আধুনিক মনস্তত্ত্ব, ভূগোল ও প্রামাণ্য মানচিত্রের ফ্রেমে বেঁধে তিনি বাংলাভাষী মুসলিমদের যে অপরিসীম উপকার করেছেন, তা চিরকাল সদকায়ে জারিয়া হিসেবে জারি থাকবে, ইনশাআল্লাহ। মহান আল্লাহ তায়ালা এই মুখলিস ও নিভৃতচারী আলেমকে দীর্ঘায়ু ও পূর্ণ সুস্থতা দান করুন। আমীন।
তার কিছু বইয়ের লিংক :
০১. আহকামুন নিসা
লেখক : মাওলানা হেমায়েত উদ্দিন
০২.আহকামে যিন্দেগী
লেখক : মাওলানা হেমায়েত উদ্দিন
০৩. ইসলামী ভূগোল
লেখক : মাওলানা হেমায়েত উদ্দিন
০৪. ইসলামী মনোবিজ্ঞান
লেখক : মাওলানা হেমায়েত উদ্দিন
০৫. কথা সত্য মতলব খারাপ
লেখক : মাওলানা হেমায়েত উদ্দিন
০৬. কাসাসুল আম্বিয়া
লেখক : মাওলানা হেমায়েত উদ্দিন
০৭.চশমার আয়না যেমন
লেখক : মাওলানা হেমায়েত উদ্দিন
০৮. নফছ ও শয়তানের সাথে মোকাবেলা
লেখক : মাওলানা হেমায়েত উদ্দিন
০৯. ফিকহুন নিছা
লেখক : মাওলানা হেমায়েত উদ্দিন
১০. যদি জীবন গড়তে চান
লেখক : মাওলানা হেমায়েত উদ্দিন
১১. সলাতুন নবীﷺনবীজির নামায যেমন ছিলো
লেখক : মাওলানা হেমায়েত উদ্দিন
১২. ইসলামি আকিদা ও ভ্রান্তমবাদ
লেখক : মাওলানা হেমায়েত উদ্দিন











