বিশিষ্ট ইসলামি চিন্তাবিদ, লেখক ও গবেষক প্রফেসর আবুল হোসেন ভট্টাচার্য (পূর্বনাম: দুর্গাচরণ ভট্টাচার্য)– বাংলাদেশের শরীয়তপুর জেলায় জন্মগ্রহণকারী অত্যন্ত প্রখ্যাত একজন নওমুসলিম পণ্ডিত, যিনি নিজের জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও লিখনীর মাধ্যমে বাংলাভাষী মুসলিম সমাজে এক অনন্য বিপ্লব ঘটিয়েছেন। নিচে তাঁর বিস্তারিত জীবনী তুলে ধরা হলো:
১. জন্ম ও বংশ পরিচয়
প্রফেসর আবুল হোসেন ভট্টাচার্য ১৯১৬ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের (বর্তমান বাংলাদেশের) শরীয়তপুর জেলার ডামুড্যা উপজেলার কায়স্থপাড়া গ্রামে এক অত্যন্ত সম্ভ্রান্ত, উচ্চশিক্ষিত ও কট্টরপন্থী হিন্দু ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পূর্বনাম ছিল দুর্গাচরণ ভট্টাচার্য। তাঁর পিতা ছিলেন একজন সংস্কৃত পণ্ডিত ও পুরোহিত, যার ফলে শৈশব থেকেই দুর্গাচরণ ধর্মীয় ও শাস্ত্রীয় পরিবেশের মধ্যে বড় হন।
২. শিক্ষাজীবন ও মেধার স্বাক্ষর
তিনি অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিলেন। নিজের মেধার বলে তিনি তৎকালীন সময়ে উচ্চশিক্ষা লাভ করেন:
- গ্রামের প্রাথমিক পাঠ শেষ করে তিনি কলকাতায় উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন।
- তিনি তৎকালীন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সংস্কৃত এবং দর্শন (Philosophy) বিষয়ে ডাবল এম.এ (মাস্টার্স) ডিগ্রী লাভ করেন।
- এর পাশাপাশি তিনি সনাতন ধর্মের মূল ভিত্তি—বেদ, উপনিষদ, রামায়ণ, মহাভারত, গীতা এবং বিভিন্ন পুরাণ শাস্ত্র গভীরভাবে অধ্যয়ন করে ‘শাস্ত্রী’ উপাধি লাভ করেন।
৩. সত্যের সন্ধান ও ইসলাম গ্রহণ
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনাকালীন এবং পরবর্তী সময়ে শিক্ষকতা জীবনে তাঁর মনে সৃষ্টিজগতের প্রকৃত মালিক এবং মানবজীবনের উদ্দেশ্য নিয়ে তীব্র দার্শনিক ভাবনার উদয় হয়।
- তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব অধ্যয়ন: তিনি কেবল হিন্দু শাস্ত্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থেকে খ্রিষ্টধর্ম, ইহুদিধর্ম এবং ইসলাম ধর্মগ্রন্থসমূহ মূল উৎস থেকে পড়ার সিদ্ধান্ত নেন। বিশেষ করে পবিত্র কুরআনের ইংরেজি ও বাংলা অনুবাদ এবং মহানবী হযরত মুহাম্মদ (ﷺ)-এর জীবনী তাঁর চিন্তার জগৎকে সম্পূর্ণ বদলে দেয়।
- কুরআনের অকাট্য যুক্তি: কুরআনের পরম একত্ববাদ (তাওহীদ), জাতি-ভেদাভেদহীন সামাজিক সাম্য এবং বৈজ্ঞানিক যৌক্তিকতা তাঁর বিবেককে স্পর্শ করে। তিনি বুঝতে পারেন, সনাতন শাস্ত্রের ঋষিদের পরম ব্রহ্মের যে আদি ধারণা, তা মূলত ইসলামের ‘আল্লাহ’ রাব্বুল আলামীনের একত্ববাদেরই বহিঃপ্রকাশ।
- শুভ ইসলাম গ্রহণ: দীর্ঘ প্রায় এক দশকের আত্মিক অনুসন্ধান ও সত্যের লড়াই শেষে তিনি সনাতন ধর্ম ত্যাগ করে আল্লাহর দরবারে আত্মসমর্পণ করেন এবং ইসলাম গ্রহণ করেন। ইসলাম গ্রহণের পর তিনি নিজের নাম রাখেন ‘আবুল হোসেন ভট্টাচার্য’। (ব্রাহ্মণ বংশের ঐতিহ্য হিসেবে তিনি নিজের নামের শেষে ভট্টাচার্য উপাধিটি রেখে দেন, যাতে মানুষ বুঝতে পারে তিনি একজন শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিত হয়েও ইসলামকে সত্য হিসেবে বেছে নিয়েছেন)।
৪. কর্মজীবন
ইসলাম গ্রহণের পর পারিবারিক ও সামাজিক তীব্র বাধা-বিপত্তির মুখে পড়েও তিনি নিজের জ্ঞানচর্চা থামিয়ে রাখেননি। তিনি পেশাগত জীবনে একজন সফল অধ্যাপক (Professor) ছিলেন। তিনি বাংলাদেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি কলেজে দর্শন ও ভাষা তত্ত্বের অধ্যাপক হিসেবে সুনামের সাথে দায়িত্ব পালন করেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি তাঁর জীবনের বাকি সময়টা ইসলামি গবেষণা ও লেখালেখিতে উৎসর্গ করেন।
৫. লিখনী ও গ্রন্থাবলী (ইসলামি সাহিত্যে অবদান)
একজন সংস্কৃত ও দর্শনের পণ্ডিত হওয়ার কারণে আবুল হোসেন ভট্টাচার্যের লিখনী ছিল অত্যন্ত গভীর, তথ্যবহুল ও যুক্তিপূর্ণ। তিনি তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বের ওপর বেশ কিছু কালজয়ী গ্রন্থ রচনা করেছেন, যা আজো পাঠকপ্রিয়। তাঁর উল্লেখযোগ্য বইসমূহ:
১. আমি কেন ইসলাম গ্রহণ করলাম: এটি তাঁর জীবনের সবচেয়ে বিখ্যাত ও পাঠকপ্রিয় বই। এতে তিনি তাঁর সত্যের মুখোমুখি হওয়ার গল্প, সনাতন ধর্মের শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা এবং ইসলাম গ্রহণের যৌক্তিক কারণগুলো তাত্ত্বিকভাবে তুলে ধরেছেন।
2. বেদে আল্লাহ ও মুহাম্মদ (ﷺ): এই অত্যন্ত গবেষণামূলক গ্রন্থে তিনি সনাতন ধর্মের আদি উৎস ‘বেদ’ থেকে বিভিন্ন মন্ত্র ও শ্লোক উদ্ধৃত করে প্রমাণ করেছেন যে, বেদেও এক ঈশ্বর (আল্লাহ) এবং শেষ ঋষি বা দূত (মুহাম্মদ ﷺ)-এর আগমনের স্পষ্ট ইঙ্গিত রয়েছে।
৩. কল্কি অবতার ও মুহাম্মদ (ﷺ): হিন্দু পুরাণে বর্ণিত শেষ যুগের ত্রাতা ‘কল্কি অবতার’-এর গুণাবলী ও বৈশিষ্ট্যের সাথে মহানবী (ﷺ)-এর জীবনের হুবহু মিল তিনি এই বইয়ে দলীলসহ ফুটিয়ে তুলেছেন।
৪. ইসলামের আলো ও অমুসলিমের সমাজ: মুসলিম সমাজের নৈতিক সৌন্দর্য এবং অমুসলিম সমাজের সাথে এর তুলনামূলক সামাজিক ও দার্শনিক বিশ্লেষণ।
৬. মৃত্যু ও ইন্তিকাল
প্রফেসর আবুল হোসেন ভট্টাচার্য বার্ধক্যজনিত কারণে ১৯৯৪ সালের ১২ই জুলাই ইন্তিকাল করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল প্রায় ৭৮ বছর।
বাংলাদেশের শরীয়তপুর জেলার মাটি থেকে উঠে আসা এই মহান মনীষী আজীবন তাঁর কলমের মাধ্যমে মানুষের মাঝে তাওহীদের আলো ছড়িয়ে গেছেন। তাঁর রেখে যাওয়া সাহিত্য ও গবেষণাকর্ম বাংলাভাষী মুসলিম উম্মাহর জন্য এক অমূল্য সম্পদ। আল্লাহ তাআলা তাঁর সমস্ত দ্বীনি খিদমত কবুল করুন এবং তাঁকে জান্নাতুল ফিরদাউস নসিব করুন। আমীন।
তার কিছু লেখা বই হলো
০১. আমি কেন ইসলাম গ্রহণ করলাম
লেখক : আবুল হোসেন ভট্টাচার্য
০২. আমি কেন খ্রীষ্টধর্ম গ্রহণ করলাম না
লেখক : আবুল হোসেন ভট্টাচার্য
০৩. আর্তনাদের অন্তরালে
লেখক : আবুল হোসেন ভট্টাচার্য
০৪. ইতিহাস কথা কয়
লেখক : আবুল হোসেন ভট্টাচার্য
০৫. দীন ধর্ম রিলিজিয়ন
লেখক : আবুল হোসেন ভট্টাচার্য
০৬. বিড়াল বিভ্রাট
লেখক : আবুল হোসেন ভট্টাচার্য
০৭. মূর্তিপূজার গোড়ার কথা
লেখক : আবুল হোসেন ভট্টাচার্য






