ড. আদহাম আশ-শারকাবি: আধুনিক ইসলামিক ও মননশীল সাহিত্যের এক অনন্য নক্ষত্র
আধুনিক আরবি সাহিত্যে এবং বর্তমান মুসলিম তরুণ সমাজের মাঝে যে কজন লেখক তাদের জাদুকরী লিখনশৈলী ও মননশীল ভাবনার মাধ্যমে এক বিশাল আলোড়ন তৈরি করেছেন, তাদের মধ্যে অন্যতম শীর্ষস্থানীয় নাম ড. আদহাম আশ-শারকাবি (Adham Sharqawi)। তিনি এমন একজন সমকালীন লেখক, যিনি প্রাচীন ইসলামী ঐতিহ্যের সাথে আধুনিক সমাজ, মনস্তত্ত্ব ও জীবনবোধের এক অপূর্ব মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন। তাঁর সহজ, সাবলীল এবং একই সাথে অত্যন্ত গভীর জীবনমুখী ও আধ্যাত্মিক লেখনী পাঠকদের হৃদয়ে গভীর রেখাপাত করে। ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত এই অনন্য সাহিত্যিক মূলত তাঁর ছদ্মনাম ‘কস বিন সায়েদা’ (Qass Bin Sa’idah) নামেও বিশ্বজুড়ে বিপুল পরিচিত। নিচে এই গুণী লেখকের জীবন, শিক্ষাজীবন, কর্মজীবন এবং তাঁর অমর সাহিত্যকীর্তি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

১. জন্ম ও পরিচয়
ড. আদহাম আশ-শারকাবি ১৯৮০ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি মূলত ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত, তবে তাঁর জন্ম ও বেড়ে ওঠা লেবাননে। লেবাননের ঐতিহাসিক ও প্রাচীন শহর ‘সুর’ (Tyre)-এ তিনি শৈশব ও কৈশোর অতিবাহিত করেন। ফিলিস্তিনি শেকড় থাকার কারণে তাঁর চিন্তা ও চেতনায় অবরুদ্ধ মাতৃভূমির কষ্ট, সংগ্রাম এবং আরব বিশ্বের সামগ্রিক সংকটগুলোও গভীরভাবে প্রভাব ফেলেছে, যা পরবর্তীতে তাঁর সাহিত্যিক সত্তাকে সমৃদ্ধ করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
২. পারিবারিক জীবন ও ছদ্মনাম
আদহাম আশ-শারকাবি ব্যক্তিগত জীবনে বিবাহিত এবং তিনি তিন কন্যা ও এক পুত্রের জনক। বর্তমানে তিনি সপরিবারে লেবাননে বসবাস করছেন।
অনলাইন দুনিয়ায় এবং সাহিত্য অঙ্গনের প্রাথমিক দিনগুলোতে তিনি সরাসরি নিজের নাম ব্যবহার না করে ‘কস বিন সায়েদা’ (قس بن ساعدة) ছদ্মনামে লেখালেখি শুরু করেন। ‘কস বিন সায়েদা’ ছিলেন প্রাক-ইসলামী যুগের (আইয়ামে জাহিলিয়্যা) আরবের একজন অত্যন্ত প্রাজ্ঞ বাগ্মী, কবি ও একত্ববাদী ব্যক্তিত্ব, যার জ্ঞানগর্ভ বক্তব্য স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পছন্দ ছিল। আদহাম আশ-শারকাবি এই ছদ্মনামটি বেছে নেওয়ার পেছনে মূল কারণ ছিল—পাঠকদের কাছে নিজের ব্যক্তিপরিচয়ের চেয়ে তাঁর লেখার বার্তা ও প্রজ্ঞাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া। আজও তাঁর অগণিত অনুরাগী তাঁকে এই নামেই স্মরণ করে।
৩. শিক্ষাজীবন ও পাণ্ডিত্য
আদহাম আশ-শারকাবির শিক্ষাজীবন বেশ বৈচিত্র্যময় এবং সমৃদ্ধ। তিনি কেবল সাহিত্যের ছাত্র ছিলেন না, বরং বহুমুখী শিক্ষায় নিজেকে শিক্ষিত করেছেন।
- আরবি সাহিত্য: তিনি লেবাননের রাজধানী বৈরুতে অবস্থিত বিখ্যাত ‘লেবানন বিশ্ববিদ্যালয়’ (The Lebanese University) থেকে আরবি সাহিত্যে স্নাতক (BA) ও স্নাতকোত্তর (MA) ডিগ্রি অর্জন করেন। আরবি ভাষার ব্যাকরণ, অলঙ্কারশাস্ত্র এবং ক্লাসিক্যাল সাহিত্যের ওপর তাঁর এই প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা তাঁর লেখার ভাষা শৈলীকে অসাধারণ উচ্চতা প্রদান করেছে।
- অন্যান্য শিক্ষা: তিনি ইউনেস্কো (UNESCO) থেকে ‘দারুল মুয়াল্লিমীন’ (শিক্ষক প্রশিক্ষণ) ডিপ্লোমা অর্জন করেন। এর পাশাপাশি তিনি শারীরিক শিক্ষা (Physical Education)-এর ওপরও একটি ডিপ্লোমা ডিগ্রি লাভ করেন।
শিক্ষাজীবনের এই বৈচিত্র্য তাঁর চিন্তাভাবনার পরিধিকে আরও বিস্তৃত করেছে, যার স্পষ্ট ছাপ তাঁর প্রতিটি বইয়ের পাতায় লক্ষ্য করা যায়।
৪. কর্মজীবন ও সাহিত্যিক যাত্রা
শিক্ষাজীবন শেষ করে আদহাম আশ-শারকাবি সাংবাদিকতা ও লেখালেখিকে পেশা হিসেবে বেছে নেন। তিনি কাতারের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় ও প্রভাবশালী দৈনিক পত্রিকা ‘আল-ওয়াতান’ (Al-Watan)-এ নিয়মিত কলামিস্ট হিসেবে কাজ করেছেন।
তাঁর মূল সাহিত্যিক যাত্রা শুরু হয় ইন্টারনেটের মাধ্যমে। তিনি ‘আল-সাখির’ (Al-Sakher) নামক একটি জনপ্রিয় ফোরাম বা অনলাইন প্ল্যাটফর্মে নিয়মিত লেখালেখি করতেন। সেখানে তাঁর রসাত্মক অথচ গভীর চিন্তাশীল লেখাগুলো পাঠকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। পরবর্তীতে ২০১২ সালে তাঁর প্রথম বই ‘হাদিসুস সাবাহ’ (حديث الصباح – সকালের কথা) প্রকাশের মাধ্যমে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রন্থজগতে পদার্পণ করেন। প্রথম বইটির ব্যাপক সাফল্যের পর তাঁকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। একের পর এক বই লিখে তিনি দ্রুতই সমগ্র আরব বিশ্ব, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় লেখক বা ‘বেস্ট সেলিং’ রাইটারে পরিণত হন।
৫. লিখনশৈলী ও সাহিত্যিক বৈশিষ্ট্য
ড. আদহাম আশ-শারকাবির লেখার কিছু অনন্য বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা তাঁকে সমসাময়িক অন্য সব লেখক থেকে আলাদা করেছে:
- গল্পের মাধ্যমে শিক্ষা: তিনি সরাসরি কোনো উপদেশ না দিয়ে চমৎকার সব ঐতিহাসিক বা কাল্পনিক গল্পের মাধ্যমে জীবনের গভীর সত্যগুলোকে ফুটিয়ে তোলেন। তাঁর বইগুলোতে সীরাত, সাহাবিদের জীবন এবং ইসলামের ইতিহাসের বিভিন্ন ঘটনাকে আধুনিক মনস্তত্ত্বের আলোকে ব্যাখ্যা করা হয়।
- সহজ কিন্তু সমৃদ্ধ ভাষা: তিনি অত্যন্ত চমৎকার ও সাবলীল আরবি ভাষা ব্যবহার করেন, যা সাধারণ পাঠক থেকে শুরু করে বিদগ্ধ সাহিত্যপ্রেমী—সবার মন জয় করে।
- হৃদয়স্পর্শী আবেদন: তাঁর লেখায় এক ধরণের মায়াবী ও আধ্যাত্মিক টান থাকে, যা পাঠককে আত্মশুদ্ধি এবং আল্লাহর প্রতি ভালোবাসার দিকে ধাবিত করে। বিশেষ করে হতাশায় নিমজ্জিত তরুণদের জন্য তাঁর লেখা আশার আলো দেখায়।
৬. উল্লেখযোগ্য বইসমূহ
ড. আদহাম আশ-শারকাবি এ পর্যন্ত প্রচুর বই ও উপন্যাস রচনা করেছেন। মিশর, কাতার, লেবাননসহ পুরো আরব বিশ্বে তাঁর বইগুলো বেস্টসেলার তালিকায় থাকে। তাঁর বইগুলোর একটি বড় অংশ বর্তমানে বাংলা ভাষায় অনূদিত হয়ে বাংলাদেশের পাঠকদের মাঝেও তুমুল জনপ্রিয়তা পেয়েছে। নিচে তাঁর কিছু বিখ্যাত বইয়ের সংক্ষিপ্ত পরিচয় দেওয়া হলো:
- রিসাইল মিনাল কুরআন (رسائل من القرآن – কুরআন থেকে কিছু বার্তা): এটি তাঁর অন্যতম জনপ্রিয় ও সাড়া জাগানো বই। কুরআনের বিভিন্ন আয়াতের গভীর ও মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা এবং আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে সেই আয়াতগুলোর প্রয়োগ কীভাবে হতে পারে, তা অত্যন্ত চমৎকারভাবে এই বইয়ে তুলে ধরা হয়েছে।
- হাদিসুস সাবাহ (حديث الصباح – সকালের কথা) ও হাদিসুল মাসা (حديث المساء – সন্ধ্যার কথা): এই বই দুটিতে সমাজ, সংস্কৃতি, পরিবার এবং ব্যক্তিজীবনের নানা অসঙ্গতি ও সুন্দর দিকগুলো ছোট ছোট প্রবন্ধ ও গল্পের আকারে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
- খুরবিশাত ফি আল-জাকিরাহ (خُربشات في الذّاكرة – স্মৃতির পাতায় হিজিবিজি): মানুষের স্মৃতি, অতীত এবং জীবনের নানা অনুভূতির এক চমৎকার সাহিত্যিক উপস্থাপন।
- আন-নাবিয়্যুল ইনসান (النبيّ الإنسان – মানবীয় নবী): বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর কোমলতা, দয়া, মানবিক গুণাবলি এবং মানুষের সাথে তাঁর আচরণের দিকগুলো নিয়ে রচিত একটি অসাধারণ বই।
- লিইয়াতমাইন্না কালবি (ليطمئن قلبي – যেন আমার হৃদয় প্রশান্ত হয়): এটি একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় উপন্যাস। এতে ঈমান, নাস্তিকতা, সন্দেহ এবং বিশ্বাসের নানা দিক যুক্তি ও সাহিত্যের আলোকেই উপস্থাপন করা হয়েছে।
- আস-সালামু আলাইকা ইয়া সাহিবি (السلام عليك يا صاحبي – বন্ধু, তোমার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক): বন্ধুত্বের গভীরতা, দুঃখ-কষ্ট শেয়ার করা এবং জীবনের চড়াই-উতরাইয়ে পাশে থাকার এক আবেগঘন এবং হৃদয়স্পর্শী সংকলন।
এছাড়াও তাঁর লেখা অন্যান্য জনপ্রিয় বইগুলোর মধ্যে রয়েছে: ‘মাআন নবী’ (مع النبي), ‘ইলা আল-মুনকাছিরাতি কুলুবুহুম’ (إلى المنكسرة قلوبهم), ‘নাবয’ (نبض), ‘নুত্বফাহ’ (نطفة) ইত্যাদি।
৭. একটি বিশেষ ঐতিহাসিক ঘটনা ও বিশ্বজুড়ে আলোচনা
২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে ড. আদহাম আশ-শারকাবি এবং তাঁর বই বিশ্বব্যাপী এক নতুন আলোচনার জন্ম দেয়। ফিলিস্তিনের গাজায় চলমান সংঘাতের সময় হামাসের সামরিক শাখা ‘কতায়েব আশ-শহীদ ইজ্জুদ্দীন আল-কাসসাম’-এর যোদ্ধাদের একটি ভিডিও প্রকাশিত হয়। সেই ভিডিওতে দেখা যায়, অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও জটিল ‘কামিন আল-জান্না’ (আল-জান্না অ্যামবুশ)-এর পরিকল্পনা করার সময় এক বীর যোদ্ধার পাশে ড. আদহাম আশ-শারকাবির বিখ্যাত বই ‘রিসাইল মিনাল কুরআন’ (কুরআন থেকে কিছু বার্তা) বইটি রাখা রয়েছে।
এই দৃশ্যটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঝড়ের বেগে ছড়িয়ে পড়ে। অবরুদ্ধ গাজার যোদ্ধারা যুদ্ধের ময়দানেও যেখানে আধ্যাত্মিক শক্তি সঞ্চয়ের জন্য তাঁর বই পড়ছেন, তা দেখে লেখক নিজেও অত্যন্ত আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন এবং সামাজিক মাধ্যমে তাঁর প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, তাঁর লেখা কেবল সাধারণ পাঠকদের মনের খোরাকই জোগায় না, বরং তা মজলুমের মনে সাহস ও বিশ্বাসের এক অপরাজেয় শক্তি তৈরি করে।
৮. বাংলাদেশে ড. আদহাম আশ-শারকাবির জনপ্রিয়তা
বর্তমানে বাংলাদেশে ইসলামিক ও মননশীল ধারার পাঠকদের কাছে ড. আদহাম আশ-শারকাবি অত্যন্ত পরিচিত এবং সমাদৃত একটি নাম। তাঁর ‘রিসাইল মিনাল কুরআন’, ‘আস-সালামু আলাইকা ইয়া সাহিবি’, ‘লিইয়াতমাইন্না কালবি’ বইগুলোর বাংলা অনুবাদ দেশের তরুণদের মাঝে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। যারা জীবনকে নতুন করে সাজাতে চান, আত্মিক প্রশান্তি খুঁজছেন, তারা ড. আদহামের বইগুলো সংগ্রহ করার জন্য ‘রকমারি ডট কম’ (Rokomari) কিংবা ‘ওয়াফিলাইফ’ (Wafilife)-এর মতো দেশের জনপ্রিয় অনলাইন বুকশপগুলোর সাহায্য নিয়ে থাকেন। সেখানে তাঁর মূল আরবি বইয়ের পাশাপাশি চমৎকার সব বাংলা অনুবাদের সংগ্রহ পাওয়া যায়।
উপসংহার
ড. আদহাম আশ-শারকাবি কেবল একজন জনপ্রিয় লেখকই নন, বরং তিনি এই সময়ের তরুণ প্রজন্মের একজন আত্মিক অভিভাবক ও পথপ্রদর্শক। যখন আধুনিক সভ্যতার চাকচিক্য মানুষকে একাকীত্ব ও হতাশার দিকে ঠেলে দিচ্ছে, তখন আদহাম আশ-শারকাবি তাঁর জাদুকরী কলম দিয়ে মানুষকে ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন আল-কুরআন, সুন্নাহ এবং ইসলামের গৌরবময় ইতিহাসের চিরন্তন শান্তির নীড়ে। তাঁর সাহিত্যিক অবদান মুসলিম উম্মাহর মাঝে দীর্ঘকাল বেঁচে থাকবে।
তার লিখিত কিছু কিতাব :
০১. উমরের সাথে যখন দেখা হলো
লেখক : ড. আদহাম আশ-শারকাবি
০২. নবীজির ﷺ পাঠশালা
লেখক : ড. আদহাম আশ-শারকাবি
০৩. ফিমেল মাইন্ড
লেখক : ড. আদহাম আশ-শারকাবি


