ইমাম বুখারী (রহ.)

আমিরুল মুমিনীন ফিল হাদিস: ইমাম বুখারী (রহ.)-এর বিস্তৃত ও পূর্ণাঙ্গ জীবনী

ইসলামের ইতিহাসে পবিত্র কুরআনের পরেই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও মর্যাদাপূর্ণ স্থানটি হলো হাদিসের। আর হাদিস শাস্ত্রের নাম মুখে নিলেই যে মহান মনীষীর নাম সবার আগে শ্রদ্ধা ও শ্রদ্ধাবনত চিত্তে স্মরিত হয়, তিনি হলেন ইমাম বুখারী (রহ.)। তিনি তাঁর প্রখর মেধা, কঠোর পরিশ্রশ ও ঐশ্বরিক স্মরণশক্তির মাধ্যমে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বাণীসমূহকে এমন এক কাঠামোর ওপর বিন্যস্ত করেছেন, যা কিয়ামত পর্যন্ত বিশ্ব মুসলিমের জন্য হিদায়াতের আলোকবর্তিকা হিসেবে কাজ করবে। তিনি হাদিস ইতিহাসের অবিসংবাদিত নেতা এবং মানবজাতির ইতিহাসে অন্যতম সেরা স্মৃতিধর ব্যক্তি।

১. জন্ম ও বংশ পরিচয়

ইমাম বুখারী (রহ.) ১৯৪ হিজরি সালের ১৩ শাওয়াল, রোজ শুক্রবার (মোতাবেক ২১ জুলাই, ৮১০ খ্রিস্টাব্দ) খোরাসানের প্রসিদ্ধ ‘বুখারা’ (যা বর্তমানে মধ্য এশিয়ার উজবেকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত) নামক ঐতিহাসিক জ্ঞানকেন্দ্রে একটি অত্যন্ত সম্ভ্রান্ত ও ধর্মীয় মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।

আরবীয় রীতি অনুযায়ী তাঁর পুরো নাম হলো: আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মাদ ইবনু ইসমাঈল ইবনু ইবরাহীম ইবনু মুগীরাহ ইবনু বারদিযবাহ আল-জু’ফী আল-বুখারী। তাঁর নামের শেষ অংশ ‘বারদিযবাহ’ ছিল একটি ফার্সি শব্দ, যার অর্থ কৃষক। তাঁর প্রপিতামহ মুগীরাহ তৎকালীন বুখারার গভর্নর আল-ইয়ামান আল-জু’ফীর হাত ধরে ইসলাম গ্রহণ করেন। সেই থেকে তাঁদের বংশের সাথে ‘আল-জু’ফী’ উপাধিটি যুক্ত হয়। বুখারা শহরে জন্ম ও বেড়ে ওঠার কারণে তিনি বিশ্বজুড়ে ‘ইমাম বুখারী’ নামে সমধিক পরিচিতি লাভ করেন।

২. শৈশব ও অলৌকিক নিরাময়

ইমাম বুখারীর শৈশব সাধারণ শিশুদের মতো ছিল না। তিনি খুব ছোট থাকতেই তাঁর পিতা বিখ্যাত মুহাদ্দিস ইসমাঈল ইবনে ইবরাহীম ইন্তেকাল করেন। উল্লেখ্য, তাঁর পিতা ইমাম মালিক (রহ.) ও আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক (রহ.)-এর মতো যুগশ্রেষ্ঠ আলেমদের ছাত্র ছিলেন। পিতার আকস্মিক ইন্তেকালের পর ইমাম বুখারীর লালন-পালনের সম্পূর্ণ দায়িত্ব এসে পড়ে তাঁর মহীয়সী মাতার ওপর।

শৈশবেই এক কঠিন রোগে আক্রান্ত হয়ে ইমাম বুখারী তাঁর দুটি চোখের দৃষ্টিশক্তি পুরোপুরি হারিয়ে ফেলেন। তৎকালীন চিকিৎসকেরা তাঁর চোখের আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর মা ছিলেন এক বিদূষী, তাহাজ্জুদগুজার এবং আল্লাহর দরবারে সদা ক্রন্দনরতা নারী। তিনি সন্তানের দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাওয়ার জন্য দিন-রাত আল্লাহর দরবারে রোনাজারি করতে থাকেন। একদিন রাতে তাঁর মা স্বপ্নে ইসলামের মহান নবী হযরত ইবরাহীম (আ.)-কে দেখতে পান। হযরত ইবরাহীম (আ.) তাঁকে উদ্দেশ্য করে বলেন, “হে নারী! তোমার প্রগাঢ় ও অনবরত দোয়ার বরকতে আল্লাহ তাআলা তোমার সন্তানের চোখের দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিয়েছেন।” সকালে ঘুম থেকে উঠে তাঁর মা দেখতে পান যে বালক মুহাম্মাদের দুই চোখ আল্লাহর কুদরতে সম্পূর্ণ সুস্থ ও প্রখর জ্যোতিতে উদ্ভাসিত হয়ে গেছে।

৩. শিক্ষাজীবন ও প্রখর স্মৃতিশক্তি

চোখের দৃষ্টি ফিরে পাওয়ার পর বালক বুখারীর শিক্ষার পথ উন্মুক্ত হয়। মাত্র ১০ বছর বয়সে তিনি স্থানীয় মক্তবে হাদিস শিক্ষা শুরু করেন। তাঁর মেধা ও স্মরণশক্তি ছিল অলৌকিক পর্যায়ের। তিনি কোনো বই বা খাতা একবার দেখলেই বা কোনো হাদিস একবার শুনলেই তা স্মৃতিপটে হুবহু গেঁথে নিতে পারতেন। মাত্র ১১ বছর বয়সে তিনি তাঁর শিক্ষক দাখেলী (রহ.)-এর হাদিস বর্ণনার একটি সূক্ষ্ম ভুল সংশোধন করে দিয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন। ১৬ বছর বয়সের মধ্যেই তিনি তৎকালীন বিখ্যাত মুহাদ্দিস ইবনুল মুবারক এবং ওয়াকী ইবনুল জাররাহ (রহ.)-এর সংকলিত সমস্ত হাদিসের কিতাব হুবহু মুখস্থ করে ফেলেন।

৪. হাদিস অন্বেষণে বিশ্বভ্রমণ (রিহলাহ)

১৬ বছর বয়সে (২১০ হিজরিতে) ইমাম বুখারী তাঁর মাতা এবং বড় ভাই আহমদের সাথে পবিত্র হজ পালনের উদ্দেশ্যে মক্কাতুল মুকাররমায় গমন করেন। হজ সম্পন্নের পর তাঁর মা ও ভাই বুখারায় ফিরে গেলেও ইমাম বুখারী হাদিসের উচ্চতর জ্ঞান অর্জনের জন্য মক্কাতেই থেকে যান। মক্কা ও মদিনার বড় বড় শায়খদের কাছ থেকে হাদিস সংগ্রহের পর তিনি শুরু করেন ইতিহাসের এক দীর্ঘতম জ্ঞান সফর বা ‘রিহলাহ’।

তিনি জ্ঞানের পিপাসা মেটাতে তৎকালীন আব্বাসীয় খিলাফতের প্রধান প্রধান জ্ঞানকেন্দ্রসমূহ চষে বেড়ান। তিনি একে একে মক্কা, মদিনা, বাগদাদ, কুফা, বসরা, মিশর, সিরিয়া (দামেস্ক), ফিলিস্তিন, জাজিরা এবং মার্ভ সফর করেন। তিনি নিজেই বলেছেন, “হাদিস সংগ্রহের জন্য আমি সিরিয়া, মিশর এবং জাজিরায় দুইবার সফর করেছি। বসরার মুহাদ্দিসদের কাছে গিয়েছি চারবার। আর কুফা ও বাগদাদে কতবার যে গিয়েছি, তার কোনো ইয়ত্তা নেই।” এই দীর্ঘ সফরে তিনি অভাব-অনটন এবং শত কষ্টের সম্মুখীন হলেও সুন্নাহর আলো খোঁজার পথ থেকে কখনো বিচ্যুত হননি।

৫. বাগদাদের ঐতিহাসিক পরীক্ষা ও প্রমাণের গল্প

ইমাম বুখারীর প্রখর স্মৃতিশক্তি ও পাণ্ডিত্যের কথা যখন ইরাকের রাজধানী বাগদাদে পৌঁছায়, তখন ওখানকার আলেম সমাজ তাঁর মেধার একটি কঠিন পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ইমাম বুখারী বাগদাদে পৌঁছালে একটি বড় মজলিসে দশজন প্রখ্যাত মুহাদ্দিসকে নির্বাচন করা হয়। প্রত্যেক মুহাদ্দিসকে ১০টি করে মোট ১০০টি হাদিস দেওয়া হয়। তবে পরীক্ষার কৌশল হিসেবে প্রতিটি হাদিসের মূল অংশ (মতন) এবং বর্ণনাকারীদের ধারাবাহিকতা (সনদ)-কে ওলটপালট বা মিশ্রিত করে দেওয়া হয়েছিল (অর্থাৎ এক হাদিসের সনদ অন্য হাদিসের মতনের সাথে জুড়ে দেওয়া হয়েছিল)।

মজলিস শুরু হলে প্রথম মুহাদ্দিস তাঁর ওলটপালট করা প্রথম হাদিসটি পাঠ করে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি কি এই হাদিসটি চেনেন?” ইমাম বুখারী শান্তভাবে উত্তর দিলেন, “লা আ’রিফুহু” (আমি এটি জানি না)। এভাবে একে একে দশজন মুহাদ্দিস তাঁদের ওলটপালট করা ১০০টি হাদিসই পাঠ করলেন এবং প্রতিবারই ইমাম বুখারী বললেন, “আমি এটি জানি না।” মজলিসের সাধারণ মানুষ ভাবল বুখারী হয়তো কিছুই জানেন না, কিন্তু সূক্ষ্মদর্শী আলেমরা বুঝতে পারলেন যে ভিন্ন কিছু ঘটতে যাচ্ছে।

১০০টি হাদিস পড়া শেষ হলে ইমাম বুখারী প্রথম মুহাদ্দিসের দিকে তাকিয়ে বললেন, “আপনার পড়া প্রথম হাদিসটির সনদ আপনি এভাবে পড়েছেন, কিন্তু এর সঠিক রূপ হবে এই…। আপনার দ্বিতীয় হাদিসটি ছিল এমন, কিন্তু তার সঠিক সনদ হলো এই…।” এভাবে ইমাম বুখারী ক্রমানুসারে দশজন পরীক্ষকের পড়া ১০০টি ভুল হাদিস প্রথমে হুবহু স্মৃতি থেকে আওড়ালেন এবং সাথে সাথে প্রতিটির সঠিক সনদ ও মতন উপস্থাপন করে দিলেন। এই অলৌকিক মেধার প্রদর্শন দেখে বাগদাদের সমস্ত আলেম ও সাধারণ মানুষ একযোগে দাঁড়িয়ে তাঁর পাণ্ডিত্যের স্বীকৃতি দেন এবং তাঁকে ‘আমিরুল মুমিনীন ফিল হাদিস’ উপাধিতে ভূষিত করেন।

৬. ইমাম বুখারী (রহ.)-এর শিক্ষক ও ছাত্র সমাজ

ইমাম বুখারী তাঁর জীবনে ১,০৮০ জন নির্ভরযোগ্য মুহাদ্দিসের কাছ থেকে হাদিস গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর শিক্ষকদের মধ্যে তৎকালীন যুগের শ্রেষ্ঠ সমস্ত ইমামগণ শামিল ছিলেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকজন হলেন:

  • ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল (রহ.) (হাম্বলী মাযহাবের প্রতিষ্ঠাতা)
  • ইসহাক ইবনে রাহওয়াইহ (যাঁর একটি কথায় সহীহ বুখারী রচনার অনুপ্রেরণা জাগে)
  • আলী ইবনুল মাদীনী (যিনি ইমাম বুখারী সম্পর্কে বলেছিলেন, “তিনি নিজেকে আমাদের চেয়ে বড় মনে করেন না, কিন্তু সত্য হলো আমরা তাঁর সামনে নিজেদের ছোট মনে করি”)
  • ইয়াহইয়া ইবনে মা’ঈন (যুগশ্রেষ্ঠ হাদিস সমালোচক)
  • কুতাইবা ইবনে সাঈদ

অপরদিকে ইমাম বুখারীর দরসগাহ থেকে শিক্ষা নিয়ে বিশ্বখ্যাত সব মুহাদ্দিস তৈরি হয়েছিলেন। ইতিহাসবিদ ইমাম ফারবরী বলেন, ইমাম বুখারীর মুখ থেকে সরাসরি প্রায় ৯০,০০০ (নব্বই হাজার) মানুষ ‘সহীহ বুখারী’ শ্রবণ করেছেন। তাঁর বিখ্যাত ছাত্রদের মধ্যে অন্যতম হলেন:

  • ইমাম মুসলিম ইবনুল হাজ্জাজ (রহ.) (সহীহ মুসলিমের সংকলক)
  • ইমাম আবু ঈসা আত-তিরমিযী (রহ.) (সুনানে তিরমিযির সংকলক)
  • ইমাম আবু আব্দুর রহমান আন্-নাসায়ী (রহ.) (সুনানে নাসাইর সংকলক)
  • ইবনে খুযায়মাহ ও ইবনে আবিদ দুনিয়া

৭. ‘সহীহ বুখারী’ সংকলন: ইসলামের ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ কীর্তি

ইমাম বুখারীর জীবনের শ্রেষ্ঠতম এবং অমর কর্ম হলো ‘আল-জামি আল-সাহীহ আল-মুসনাদ মিন উমুরি রাসূলিল্লাহ ওয়া সুনানিহি ওয়া আইয়ামিহি’, যা সংক্ষেপে ‘সহীহ বুখারী’ নামে সমধিক পরিচিত।

সংকলনের পটভূমি ও কারণ:

তদানীন্তন সময়ে হাদিসের যেসব গ্রন্থ রচিত হয়েছিল, সেগুলোতে সহীহ (বিশুদ্ধ), হাসান (উত্তম) এবং জইফ (দুর্বল) সব ধরণের হাদিস একসাথে মিশ্রিত অবস্থায় ছিল। একদিন ইমাম বুখারী তাঁর উস্তাদ ইসহাক ইবনে রাহওয়াইহ-এর মজলিসে বসা ছিলেন। উস্তাদ আক্ষেপ করে ছাত্রদের উদ্দেশ্যে বললেন, “তোমাদের মধ্যে কেউ যদি এমন একটি সংক্ষিপ্ত গ্রন্থ সংকলন করতে, যাতে কেবল রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বিশুদ্ধ (সহীহ) হাদিসগুলোই স্থান পেত, তবে কতই না ভালো হতো!” উস্তাদের এই কথাটি তরুণ বুখারীর হৃদয়ে গভীরভাবে রেখাপাত করে। এছাড়া তিনি নিজেই একটি স্বপ্ন দেখেছিলেন যে, তিনি স্বয়ং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সামনে দাঁড়িয়ে আছেন এবং একটি পাখা দিয়ে আল্লাহর রাসুলের শরীর থেকে মাছি তাড়াচ্ছেন। স্বপ্নের ব্যাখ্যাকারীরা বলেন, এর অর্থ হলো তিনি রাসুল (সা.)-এর নামে প্রচলিত মিথ্যা ও জাল হাদিসগুলোকে দূর করে সুন্নাহকে রক্ষা করবেন। এই দুই ঘটনার পর তিনি এই কঠিন কাজে হাত দেন।

কঠোর সতর্কতা ও শর্তাবলী:

ইমাম বুখারীর প্রায় ৬ লক্ষ হাদিস মুখস্থ ছিল। এই বিশাল সমুদ্র থেকে যাচাই-বাছাই করে দীর্ঘ ১৬ বছরের নিরলস সাধনায় তিনি সহীহ বুখারী গ্রন্থটি সংকলন করেন। এই গ্রন্থে দ্বিরুক্তিসহ মোট হাদিস সংখ্যা ৭,৫৬৩টি এবং পুনরাবৃত্তি ছাড়া একক হাদিসের সংখ্যা প্রায় ২,২৩০টি। হাদিসটি বুখারীতে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য তিনি এমন কঠোর শর্ত (শুরুতে রাবিদের সমসাময়িক হওয়া এবং একে অপরের সাথে সরাসরি সাক্ষাৎ বা মোলাকাত প্রমাণিত হওয়া বাধ্যতামূলক) আরোপ করেছিলেন যা ইসলামের ইতিহাসে নজিরবিহীন।

ইমাম বুখারী নিজেই তাঁর সতর্কতার কথা উল্লেখ করে বলেছেন:

“আমি এই কিতাবে একটি হাদিসও অন্তর্ভুক্ত করিনি, যতক্ষণ না আমি পবিত্রতার উদ্দেশ্যে গোসল করেছি এবং দুই রাকাত নফল নামাজ পড়ে আল্লাহর দরবারে ইস্তিখারা (সঠিক সিদ্ধান্তের জন্য প্রার্থনা) করে পূর্ণ নিশ্চিত হয়েছি।”

তিনি মক্কার কাবার চত্বরে বসে এই গ্রন্থের খসড়া তৈরি করেন এবং মদিনার মসজিদে নববীতে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর রওজা মোবারকের পাশে বসে এর চূড়ান্ত বিন্যাস সম্পন্ন করেন। কিতাবটি সম্পন্ন করার পর তিনি তাঁর উস্তাদ ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল, ইয়াহইয়া ইবনে মঈন এবং আলী ইবনুল মাদীনীর সামনে পেশ করলে তাঁরা সকলেই এটিকে ইসলামের সবচেয়ে বিশুদ্ধতম গ্রন্থ হিসেবে সর্বসম্মত স্বীকৃতি দেন।

৮. উন্নত চরিত্র, তাকওয়া ও দানশীলতা

ইমাম বুখারী (রহ.) কেবল তত্ত্বীয় বা কাগজের আলেম ছিলেন না; তাঁর বাস্তব জীবন ছিল ইবাদত, খোদাভীতি ও সুন্নাহর মূর্ত প্রতীক। তিনি অত্যন্ত অল্পেতুষ্ট ছিলেন এবং বিলাসিতা থেকে দূরে থাকতেন। দিনে তিনি প্রায়শই রোজা রাখতেন এবং রমজান মাসে প্রতি রাতে সালাতুত তারাবিহ ও তাহাজ্জুদে সম্পূর্ণ কুরআন খতম করতেন।

পিতার রেখে যাওয়া কাপড়ের ব্যবসা থেকে তাঁর যে আয় হতো, তার সিংহভাগই তিনি তাঁর গরিব ছাত্র এবং অভাবী মানুষদের মাঝে দান করে দিতেন। একবার তাঁর এক ব্যবসায়িক পার্টনার বা দেনাদার তাঁর একটি বড় অঙ্কের টাকা আত্মসাৎ করার চেষ্টা করে। অন্য আলেমরা ইমাম বুখারীকে বললেন এর বিরুদ্ধে সরকারি বিচারকের কাছে নালিশ করতে। ইমাম বুখারী উত্তর দিলেন, “আমি দুনিয়ার সামান্য কিছু টাকার জন্য আদালতের বারান্দায় গিয়ে নিজের সম্মান খোয়াতে এবং মানুষের গিবতের কারণ হতে চাই না।” তিনি নিজের পাওনা টাকা নিঃশর্তভাবে মাফ করে দেন। তীরন্দাজিতেও তাঁর দারুণ শখ ও দক্ষতা ছিল এবং জীবনে খুব কম সময়ই তাঁর লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছিল।

৯. শেষ জীবন ও কঠিন পরীক্ষা (মিহনা)

জ্ঞানের আলোয় বিশ্বকে আলোকিত করলেও ইমাম বুখারীর শেষ জীবন ছিল অত্যন্ত বেদনাদায়ক এবং কঠিন পরীক্ষায় পূর্ণ। নিশাপুরে অবস্থানকালে তৎকালীন কিছু ঈর্ষাপরায়ণ লোকের কারণে আলফাযের মাসআলা (পবিত্র কুরআনের শব্দাবলী মানুষের মুখ দিয়ে উচ্চারিত হওয়ার পর তা সৃষ্টি নাকি স্রষ্টার বাণী—এই তাত্ত্বিক বিতর্ক) নিয়ে তাঁর ওপর মিথ্যা অপবাদ দেওয়া হয়।

পরবর্তীতে তিনি যখন নিজ জন্মভূমি বুখারায় ফিরে আসেন, তখন বুখারার আমির বা গভর্নর খালেদ ইবনে আহমদ জুহলী ইমাম বুখারীকে রাজপ্রাসাদে এসে তাঁর সন্তানদের ‘সহীহ বুখারী’ এবং ‘তারীখে কবীর’ পড়ানোর নির্দেশ দেন। ইমাম বুখারী একজন প্রকৃত আলেমের মর্যাদা রক্ষা করে অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে গভর্নরের এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে উত্তর পাঠান:

“আমি ইলম বা জ্ঞানকে রাজপ্রাসাদের দরজায় নিয়ে গিয়ে অবমাননা করতে পারব না। যার ইলম অর্জনের পিপাসা আছে, সে যেন আমার ঘর বা মসজিদে এসে তা গ্রহণ করে।”

আমির এতে ক্ষিপ্ত হয়ে তাঁর রাজকীয় ক্ষমতার অহংকারে ইমাম বুখারীকে নিজের প্রিয় জন্মভূমি বুখারা থেকে নির্বাসিত করার আদেশ দেন। বৃদ্ধ বয়সে এই মহান ইমাম নিজের জন্মভূমি ছেড়ে সমরকন্দের (সমরকন্দও বর্তমান উজবেকিস্তানের একটি শহর) উদ্দেশ্যে রওনা হন।

১০. ইন্তেকাল ও শেষ শয্যা

বুখারা থেকে নির্বাসিত হয়ে তিনি সমরকন্দের কাছাকাছি ‘খরতঙ্গ’ নামক একটি প্রত্যন্ত গ্রামে তাঁর আত্মীয়দের বাড়িতে আশ্রয় নেন। সেখানে তিনি নিঃসঙ্গ ও অসুস্থ হয়ে পড়েন। এক রাতে তিনি তাহাজ্জুদের নামাজ শেষে আল্লাহর দরবারে হাত তুলে দোয়া করেন, “হে আল্লাহ! এই বিশাল পৃথিবী আজ সংকীর্ণতার কারণে আমার জন্য ছোট হয়ে গেছে। আপনি আমাকে আপনার নিজের সান্নিধ্যে তুলে নিন।”

আল্লাহ তাআলা তাঁর এই প্রিয় বান্দার দোয়া কবুল করলেন। এর কিছুদিন পরই ২৫৬ হিজরি সালের ১ শাওয়াল, পবিত্র ঈদুল ফিতরের রাতে (মোতাবেক ১ সেপ্টেম্বর, ৮৭০ খ্রিস্টাব্দ) ৬০ বছর বয়সে ইলমে হাদিসের এই মহান সম্রাট খরতঙ্গ গ্রামেই ইন্তেকাল করেন (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। ঈদের দিন যোহরের নামাজের পর খরতঙ্গের মাটিতেই তাঁকে দাফন করা হয়। ঐতিহাসিক বর্ণনায় এসেছে, তাঁর দাফনের পর তাঁর কবর থেকে এক অলৌকিক সুগন্ধি চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল, যা বেশ কিছুদিন স্থায়ী ছিল এবং মানুষ দূর-দূরান্ত থেকে তা দেখতে এসেছিল। বর্তমানে সমরকন্দের সেই খরতঙ্গ গ্রামে তাঁর একটি বিশাল ও চমৎকার মাজার কমপ্লেক্স রয়েছে।

উপসংহার

ইমাম বুখারী (রহ.) দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন আজ থেকে শত শত বছর আগে। কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া ‘সহীহ বুখারী’ আজো পৃথিবীর প্রতিটি কোণে মুসলিম উম্মাহর হিদায়াত ও আইনি ব্যাখ্যার মূল ভিত্তি হিসেবে দেদীপ্যমান। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ সুরক্ষায় তাঁর এই আত্মত্যাগ মানব ইতিহাসে অনন্য মাইলফলক। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমিরুল মুমিনীন ফিল হাদিস ইমাম বুখারীকে জান্নাতুল ফিরদাউসের সর্বোচ্চ মাকাম দান করুন এবং উম্মাহর পক্ষ থেকে তাঁকে সর্বোত্তম জাজা দান করুন। আমীন।

তার লিখিত কিছু কিতাব :

০১. সহিহ বুখারি

সংকলক : মুহাম্মদ বিন ইসমাইল আল-বুখারি।

ইসলামি ইলম বা জ্ঞানজগতের ইতিহাসে সহিহ বুখারি এক অনন্য ও বিস্ময়কর নাম। কোরআন মাজিদের পর মুসলিম উম্মাহর কাছে সবচেয়ে বিশুদ্ধ গ্রন্থ হিসেবে এটি স্বীকৃত।

সহিহ বুখারির সংকলক ইমাম বুখারির পূর্ণ নাম মুহাম্মদ বিন ইসমাইল আল-বুখারি। তিনি ১৯৪ হিজরিতে বর্তমান উজবেকিস্তানের বুখারা নগরীতে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশবেই তিনি পিতৃহারা হন এবং তাঁর মা অত্যন্ত যত্ন ও অভাবনীয় ধৈর্যের সাথে তাঁকে লালন-পালন করেন। বলা হয়ে থাকে, ইমাম বুখারি বাল্যকালে অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন, কিন্তু তাঁর মায়ের আকুল দোয়ায় আল্লাহ তাঁর দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দেন।

তাঁর মুখস্থ শক্তি ছিল অলৌকিক। মাত্র ১০ বছর বয়স থেকেই তিনি হাদিস মুখস্থ করতে শুরু করেন। জীবনের বড় একটি অংশ তিনি মক্কা, মদিনা, বাগদাদ এবং কুফাসহ তৎকালীন বিশ্বের প্রধান ইলমি কেন্দ্রগুলোতে ভ্রমণ করে কাটিয়েছেন। তিনি প্রায় ৬ লক্ষ হাদিসের মধ্য থেকে যাচাই-বাছাই করে তাঁর ‘সহিহ’ গ্রন্থটি সংকলন করেন। ২৫৬ হিজরিতে এই মহান ইমাম ইন্তেকাল করেন।


সহিহ বুখারি: একটি অনন্য সংকলন

এই গ্রন্থটির প্রকৃত নাম হলো ‘আল-জামি আল-মুসনাদ আস-সহিহ আল-মুখতাসার মিন উমুরি রাসুলিল্লাহি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওয়া সুনানিহি ওয়া আইয়ামিহি’। দীর্ঘ ১৬ বছরের অক্লান্ত পরিশ্রম ও কঠোর সাধনার ফসল এই কিতাব।

সহিহ বুখারির উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্যসমূহ:

  • বিস্ময়কর সতর্কতা: ইমাম বুখারি প্রতিটি হাদিস কিতাবে অন্তর্ভুক্ত করার আগে গোসল করে দুই রাকাত নফল নামাজ আদায় করতেন এবং মহান আল্লাহর কাছে ইশতিখারা (পরামর্শ) করতেন।
  • বিশুদ্ধতার মানদণ্ড: তিনি হাদিসের রাবি বা বর্ণনাকারীদের নির্ভরযোগ্যতা এবং তাদের পরস্পরের সাথে সাক্ষাতের বিষয়ে অত্যন্ত কঠিন শর্ত আরোপ করেছিলেন।
  • অধ্যায় বিন্যাস: কিতাবটি ঈমান, ইলম, সালাত ও জাকাতসহ বিভিন্ন বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে ৯৭টি অধ্যায়ে বিন্যস্ত। এতে মোট হাদিসের সংখ্যা (পুনরাবৃত্তিসহ) প্রায় ৭,৫৬৩টি।

সহিহ বুখারি কেবল একটি হাদিস গ্রন্থ নয়, বরং এটি ফিকহ বা ইসলামি আইনশাস্ত্রের এক বিশাল উৎস। এর প্রতিটি ‘বাব’ বা শিরোনাম ইমাম বুখারির গভীর পাণ্ডিত্য ও প্রজ্ঞার পরিচয় দেয়। যুগ যুগ ধরে মুসলিম মনীষী ও গবেষকগণ এই কিতাবটি অধ্যয়ন করে আসছেন এবং কিয়ামত পর্যন্ত এটি হিদায়াতের আলোকবর্তিকা হিসেবে অম্লান থাকবে

ইসলামিক ফাউন্ডেশন সহিহ বুখারির ডাউনলোড লিংক :
ক্র : নংখণ্ড নম্বরডাউনলোড
০১প্রথম খণ্ডডাউনলোড
০২দ্বিতীয় খণ্ডডাউনলোড
০৩তৃতীয় খণ্ডডাউনলোড
০৪চতু‍র্থ খণ্ডডাউনলোড
০৫পঞ্চম খণ্ডডাউনলোড
০৬ষষ্ঠ খণ্ডডাউনলোড
০৭সপ্তম খণ্ডডাউনলোড
০৮অষ্টম খণ্ডডাউনলোড
০৯নবম খণ্ডডাউনলোড
১০দশম খণ্ডডাউনলোড

সহীহুল বুখারী তাওহীদ পাবলিকেশন্স

ক্র: নংখণ্ড নম্বরডাউনলোড
০১প্রথম খণ্ড ডাউনলোড
০২দ্বিতীয় খণ্ডডাউনলোড 
০৩তৃতীয় খণ্ড ডাউনলোড
০৪চতুর্থ খণ্ড ডাউনলোড
০৫পঞ্চম খণ্ড ডাউনলোড
০৬ষষ্ঠ খণ্ড ডাউনলোড

 আধুনিক প্রকাশনি থেকে প্রকাশিত :

ক্র: নংখণ্ড নম্বরডাউনলোড
০১প্রথম খণ্ড ডাউনলোড
০২দ্বিতীয় খণ্ড ডাউনলোড
০৩তৃতীয় খণ্ড ডাউনলোড
০৪চতুর্থ খণ্ড ডাউনলোড
০৫পঞ্চম খণ্ড ডাউনলোড
০৬ষষ্ঠ খণ্ড ডাউনলোড


০২. আল লু-লু ওয়াল মারজান

লেখক :  ইমাম বুখারী (রহ.) ও ইমাম মুসলিম (রহ.)



০৩. আল-আদুবুল মুফরাদ –

লেখক : ইমাম বুখারী (রহ.)



০৪. জুযউ রফইল ইয়াদাঈন, জানেন কি কি পরিমাণ নেকী হতে আপনি বঞ্চিত হচ্ছেন

লেখক :  ইমাম বুখারী (রহ.)



০৫. জুযউ রফইল ইয়াদায়ন ফিস সালাত

লেখক : ইমাম বুখারী (রহ.)



০৬.

লেখক : ইমাম বুখারী (রহ.)



"বাংলা ইসলামিক বইয়ের বিশাল পিডিএফ (PDF) আর্কাইভ"