আল্লামা খলিল আহমদ সাহারানপুরী (রহ.)

হাদিস শাস্ত্রের অনন্য ভাস্কর: ইমামে রব্বানী আল্লামা খলিল আহমদ সাহারানপুরী (রহ.)-এর সুবিস্তৃত জীবনী

উপমহাদেশের ইসলামী রেনেসাঁ, বিশেষ করে ইলমে হাদিসের চর্চা, প্রচার এবং লেখনীর ইতিহাসে যে কয়জন মহান মনীষী নিজেদের জীবনকে উৎসর্গ করেছেন, তাদের মধ্যে আল্লামা খলিল আহমদ সাহারানপুরী (রহ.) অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব। তিনি ছিলেন একাধারে যুগশ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস, ফকিহ, আধ্যাত্মিক সাধক এবং ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম অগ্রপথিক। বিশ্বখ্যাত হাদিস গ্রন্থ ‘আবু দাউদ শরীফ’-এর অনন্য ব্যাখ্যাগ্রন্থ ‘বজলুল মাজহুদ’ রচনা করে তিনি বিশ্ব দরবারে ভারতীয় উপমহাদেশের উলামাদের জ্ঞানতাত্ত্বিক শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেছিলেন।

নিচে এই কালজয়ী কালান্তরের ইমামের জীবন, কর্ম এবং অবদান নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

১. জন্ম ও বংশপরিচয়

আল্লামা খলিল আহমদ সাহারানপুরী (রহ.) ১৮৫২ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে (হিজরি ১২৬৮ সনের সফর মাসে) ভারতের উত্তর প্রদেশের সাহারানপুর জেলার ‘নানৌতা’ নামক ঐতিহাসিক গ্রামে এক অত্যন্ত সম্ভ্রান্ত দ্বীনি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।

তাঁর পিতার নাম হাফেজ শাহ মুহাম্মদ মজিদ আলী। মাতুলালয়ের দিক থেকে তাঁর বংশধারা ইসলামের প্রথম খলিফা হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-এর সাথে মিলিত হয়েছে। তাঁর নানার পরিবারে হযরত মাওলানা মামলুক আলী নানৌতভী (রহ.)-এর মতো বড় বড় পণ্ডিত ব্যক্তিত্ব ছিলেন, যার ফলে শৈশব থেকেই তিনি একটি চমৎকার ইলমি ও আধ্যাত্মিক পরিবেশ লাভ করেন।

২. শৈশব ও অলৌকিক মেধার বিকাশ

শৈশব থেকেই খলিল আহমদ (রহ.) অত্যন্ত শান্ত, ভদ্র এবং অসাধারণ মেধার অধিকারী ছিলেন। মাতুলালয় নানৌতা গ্রামেই তাঁর প্রাথমিক শিক্ষার হাতেখড়ি হয়। তিনি অত্যন্ত অল্প সময়ে পবিত্র কুরআনুল কারীমের হেফজ সম্পন্ন করেন। এরপর তিনি আরবি ব্যাকরণ (সরফ ও নাহু) এবং ফারসি ভাষার প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের কিতাবসমূহ অত্যন্ত দক্ষতার সাথে আয়ত্ত করেন। তাঁর মেধা ও প্রাতিষ্ঠানিক একাগ্রতা দেখে তৎকালীন উস্তাদরা ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে, এই বালক ভবিষ্যতে দ্বীনের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হবে।

৩. উচ্চশিক্ষা ও দারুল উলুম দেওবন্দে সমাবর্তন

প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্তির পর উচ্চতর দ্বীনি জ্ঞান অর্জনের লক্ষ্যে তিনি তৎকালীন নবপ্রতিষ্ঠিত শিক্ষাকেন্দ্র দারুল উলুম দেওবন্দে ভর্তি হন। তিনি ছিলেন দেওবন্দের প্রাথমিক যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ছাত্র। দেওবন্দে তিনি ফিকহ, উসুল, তাফসির এবং মানতিক শাস্ত্রে গভীর বুৎপত্তি লাভ করেন।

পরবর্তীতে তিনি সাহারানপুরের বিখ্যাত মাদ্রাসা মাজাহির উলুম-এ ভর্তি হন এবং সেখান থেকে ১২৮৮ হিজরিতে দাওরায়ে হাদিস (হাদিস শাস্ত্রের সর্বোচ্চ ডিগ্রি) সম্পন্ন করেন। তৎকালীন সময়ে হাদিসের মূল কিতাবসমূহ তিনি অত্যন্ত সূক্ষ্ম ব্যাখ্যাসহ অধ্যায়ন করেন।

৪. যুগশ্রেষ্ঠ শিক্ষক ও শায়খবৃন্দ

আল্লামা সাহারানপুরী (রহ.) তাঁর শিক্ষাজীবনে তৎকালীন উপমহাদেশের শ্রেষ্ঠ আলেমদের সান্নিধ্য পেয়েছিলেন। তাঁর বিখ্যাত উস্তাদগণের মধ্যে রয়েছেন:

  • মাওলানা মুহাম্মদ কাসেম নানৌতভী (রহ.): দারুল উলুম দেওবন্দের মূল প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রখ্যাত ধর্মতত্ত্ববিদ।
  • মাওলানা রশীদ আহমদ গাঙ্গুহী (রহ.): ফিকহ ও হাদিস শাস্ত্রের অনন্য ইমাম। খলিল আহমদ (রহ.) তাঁর কাছ থেকে ফিকহ ও তাসাউফের গভীর জ্ঞান লাভ করেন।
  • মাওলানা ইয়াকুব নানৌতভী (রহ.): দারুল উলুম দেওবন্দের প্রথম প্রধান শিক্ষক (সদরুল মুদাররিস)।
  • মাওলানা মাজহার নানৌতভী (রহ.): মাদ্রাসা মাজাহির উলুম সাহারানপুরের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা।

৫. কর্মজীবন ও শিক্ষকতায় অনন্য ভূমিকা

শিক্ষাজীবন সম্পন্ন করার পর আল্লামা খলিল আহমদ সাহারানপুরী (রহ.) দিল্লির ‘মাদ্রাসায়ে আলিয়া’য় শিক্ষক হিসেবে তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন। এরপর তিনি ভারতের বিভিন্ন বিখ্যাত মাদ্রাসায়—যেমন ভুপালের মাদ্রাসা, বাহাওয়ালপুরের মাদ্রাসা এবং রায়বেরেলির মাদ্রাসায় অত্যন্ত সুনামের সাথে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন।

১৮৯৬ খ্রিস্টাব্দে (১৩১৪ হিজরিতে) তিনি তাঁর প্রিয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মাদ্রাসা মাজাহির উলুম সাহারানপুর-এ প্রধান শিক্ষক (সদরুল মুদাররিস) হিসেবে যোগদান করেন। পরবর্তীতে তিনি এই মাদ্রাসার সাধারণ সম্পাদকের (নাজেম) দায়িত্বও অত্যন্ত দক্ষতার সাথে পালন করেন। তাঁর দীর্ঘ শিক্ষকতা ও প্রশাসনিক মেধার কারণে মাজাহির উলুম মাদ্রাসাটি ভারত ছাড়িয়ে গোটা বিশ্বে ইলমে হাদিসের অন্যতম প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়।

৬. আধ্যাত্মিক সাধনা ও খিলাফত লাভ

আল্লামা খলিল আহমদ সাহারানপুরী (রহ.) কেবল কিতাবি বিদ্যায় পারদর্শী ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন তাসাউফ বা আধ্যাত্মিক জগতের এক দিকপাল। তিনি তৎকালীন ভারতের প্রখ্যাত আধ্যাত্মিক সম্ৰাট মাওলানা রশীদ আহমদ গাঙ্গুহী (রহ.)-এর নিকট বায়াত গ্রহণ করেন। দীর্ঘদিনের কঠোর রিয়াজত, মোজাহাদা এবং উস্তাদের খিদমতের মাধ্যমে তিনি আধ্যাত্মিকতার চরম শিখরে আরোহণ করেন এবং গাঙ্গুহী (রহ.) কর্তৃক ‘চিশতিয়া ইমদাদিয়া’ তরিকার খেলাফত বা স্থলাভিষিক্ত লাভ করেন। তাঁর হাত ধরে হাজার হাজার মানুষ অন্ধকার পথ ছেড়ে হেদায়েতের আলো লাভ করেছিল।

৭. বিশ্বখ্যাত ছাত্র সমাজ

হাদিস ও ফিকহের দরসে তাঁর একটি সুনির্দিষ্ট ও আকর্ষক বৈশিষ্ট্য ছিল। তাঁর দরস থেকে এমন সব ছাত্র তৈরি হয়েছিলেন, যাঁরা পরবর্তী সময়ে গোটা বিশ্বের বুকে ইসলামের পতাকা বহন করেছিলেন। তাঁর সুযোগ্য ছাত্রদের মধ্যে অন্যতম হলেন:

  • শায়খুল হাদিস মাওলানা মুহাম্মদ জাকারিয়া কান্ধলভী (রহ.): বিশ্বখ্যাত ‘ফাজায়েলে আমাল’ এবং আবু দাউদের অন্য এক বিখ্যাত ব্যাখ্যাগ্রন্থ ‘আওজাজুল মাসালিক’-এর রচয়িতা। তিনি ছিলেন আল্লামা সাহারানপুরীর সবচেয়ে প্রিয় ছাত্র এবং ইলমি উত্তরাধিকারী।
  • মাওলানা মুহাম্মদ ইউসুফ কান্ধলভী (রহ.): তাবলিগ জামাতের দ্বিতীয় আমির এবং ‘হায়াতুস সাহাবা’ গ্রন্থের লেখক।
  • মাওলানা মনযুর নোমানী (রহ.): প্রখ্যাত লেখক এবং ‘মাআরিফুল হাদিস’-এর রচয়িতা।

৮. অমর কালজয়ী রচনা: বজলুল মাজহুদ

আল্লামা খলিল আহমদ সাহারানপুরী (রহ.)-এর জ্ঞানতাত্ত্বিক জীবনের সবচেয়ে বড় এবং অমর কীর্তি হলো ‘বজলুল মাজহুদ ফী হাল্লি আবী দাউদ’ (بذل المجهود في حل أبي داود)। সিহাহ সিত্তার অন্যতম প্রধান হাদিস গ্রন্থ ‘সুনানে আবু দাউদ’-এর এটি একটি বিশাল এবং অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য ব্যাখ্যাগ্রন্থ।

  • রচনার প্রেক্ষাপট: মদিনা মুনাওয়ারায় অবস্থানকালে তিনি এই কিতাবটি লেখা শুরু করেন। তাঁর প্রিয় ছাত্র মাওলানা জাকারিয়া কান্ধলভী (রহ.) এই কিতাবটি লেখায় তাঁর প্রধান সহযোগী ও লিপিকার ছিলেন।
  • বৈশিষ্ট্য: এটি মূলত ২০টি বিশাল খণ্ডে সমাপ্ত। এতে অত্যন্ত সাবলীল ভাষায় হাদিসের ব্যাখ্যা, রাবীদের (বর্ণনাকারী) অবস্থা এবং ফিকহি মাসআলাসমূহের চমৎকার সমন্বয় করা হয়েছে। হানাফি মাযহাবের পক্ষে দলীল উপস্থাপনের ক্ষেত্রে এই কিতাবটিকে বিশ্বব্যাপী অন্যতম শ্রেষ্ঠ রেফারেন্স হিসেবে গণ্য করা হয়। মিশরের জামে আজহার থেকে শুরু করে আরবের বড় বড় পণ্ডিতরা এই গ্রন্থের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।

তাঁর অন্যান্য উল্লেখযোগ্য গ্রন্থসমূহ:

  • আল-মুহান্নাদ আলাল মুফান্নাদ (المهند على المفند): আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত তথা দেওবন্দী উলামাদের সঠিক আকিদা-বিশ্বাস আন্তর্জাতিক মহলে তুলে ধরার জন্য আরবি ভাষায় লিখিত একটি ঐতিহাসিক ও কালজয়ী কিতাব।
  • বারাহিনে কাতিআহ: বিভিন্ন বিদআত ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে লিখিত একটি তাত্ত্বিক গ্রন্থ।

৯. স্বাধীনতা আন্দোলনে ভূমিকা ও হিজরত

আল্লামা সাহারানপুরী (রহ.) ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের ঘোর বিরোধী ছিলেন। তাঁর উস্তাদ শায়খুল হিন্দ মাওলানা মাহমুদ হাসান দেওবন্দী (রহ.)-এর নেতৃত্বে পরিচালিত ‘রেশমি রুমাল আন্দোলন’-এর সাথে তিনি পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত ছিলেন। ব্রিটিশদের জুলুম-নির্যাতন এবং ভারতের রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে তিনি জীবনের শেষভাগে স্থায়ীভাবে পবিত্র মদিনা মুনাওয়ারায় হিজরত করার সিদ্ধান্ত নেন। ১৯২৬ খ্রিস্টাব্দে তিনি মদিনায় চলে যান এবং সেখানেই স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন।

১০. ইন্তেকাল ও জান্নাতুল বাকিতে দাফন

মদিনা মুনাওয়ারায় হিজরতের পর তিনি সেখানেও হাদিসের দরস দেওয়া বন্ধ করেননি। অবশেষে ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দের ১৩ই অক্টোবর (১৩৪৬ হিজরির ১৫ই রবিউস সানি) বুধবার মদিনা শরীফে এই মহান ইমাম ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুর সময় তাঁর বয়স হয়েছিল প্রায় ৭৫ বছর।

তাঁর ইন্তেকালের সংবাদ মদিনাবাসীর মধ্যে ছড়িয়ে পড়লে গভীর শোকের ছায়া নেমে আসে। মসজিদে নববীতে তাঁর জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। এরপর অত্যন্ত মর্যাদার সাথে ইসলামের ইতিহাসে অত্যন্ত পবিত্র স্থান ‘জান্নাতুল বাকি’ কবরস্থানে হযরত আহলুল বাইত (রাসূলুল্লাহ সা.-এর পরিবার) এবং তৃতীয় খলিফা হযরত উসমান (রা.)-এর কবরের কাছাকাছি স্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।

উপসংহার

আল্লামা খলিল আহমদ সাহারানপুরী (রহ.) ছিলেন ইলম ও আমলের এক জীবন্ত সমুদ্র। তাঁর রেখে যাওয়া ‘বজলুল মাজহুদ’ আজ এক শতাব্দী পরেও বিশ্বের প্রতিটি হাদিস গবেষকের জন্য একটি অপরিহার্য বাতিঘর হিসেবে আলো ছড়াচ্ছে। আল্লাহ তায়ালা দ্বীনের এই মহান সিপাহসালারকে জান্নাতুল ফিরদাউসের সর্বোচ্চ মাকাম দান করুন। আমীন।

তার লিখিত কিতাব :

০১. আল মুহান্নাদ আলাল মুফান্নাদ

লেখক :  খলিল আহমদ সাহারানপুরী (রহ.)




"বাংলা ইসলামিক বইয়ের বিশাল পিডিএফ (PDF) আর্কাইভ"