মরিয়ম জামিলা

মরিয়ম জামিলা (পূর্বনাম: মার্গারেট মার্কাস) ছিলেন বিংশ শতাব্দীর উত্তরভাগের ইসলামিক চিন্তাধারা, প্রাচ্যবাদ এবং আধুনিকতাবাদের অন্যতম প্রধান সমালোচক ও লেখিকা। পশ্চিমা ভোগবাদী ও ধর্মনিরপেক্ষ সমাজের গর্ভে জন্ম নিয়ে এবং বড় হয়েও তিনি যেভাবে সত্যের সন্ধানে ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় নিয়েছিলেন, তা এক অভূতপূর্ব এবং অনুপ্রেরণাদায়ী ইতিহাস। ইহুদি বংশোদ্ভূত এই মার্কিন নারী ইসলাম গ্রহণের পর তাঁর পুরো জীবন উৎসর্গ করেছিলেন ইসলামের প্রতিরক্ষা ও পশ্চিমা সভ্যতার অসারতা প্রমাণের কাজে।

১. জন্ম, বংশপরিচয় ও পারিবারিক পটভূমি

মার্গারেট মার্কাস ১৯৩৪ সালের ২২শে মে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক শহরের এক সম্ভ্রান্ত ইহুদি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পূর্বপুরুষেরা মূলত জার্মানির অধিবাসী ছিলেন। তৎকালীন ইউরোপের সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে তাঁর পরিবার ১৮৪৮ সালে জার্মানি থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন গ্রহণ করে এবং নিউ ইয়র্ক শহরে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে।

মার্গারেটের পরিবার ছিল ধর্মনিরপেক্ষ ইহুদি সংস্কৃতির অনুসারী। তাঁর বাবা-মা ইহুদি ধর্মের আচার-অনুষ্ঠান কঠোরভাবে পালন না করলেও ইহুদি জাতীয়তাবাদ ও সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। ফলে একটি আধুনিক ও চারুকলার প্রতি অনুরাগী পরিবেশের মধ্যে মার্গারেটের শৈশব অতিবাহিত হয়।

২. শৈশব ও প্রাথমিক শিক্ষাজীবন

শৈশব থেকেই মার্গারেট ছিলেন অত্যন্ত সংবেদনশীল, অন্তর্মুখী এবং প্রচণ্ড মেধাবী। তিনি স্থানীয় স্কুলে ভর্তি হন এবং তাঁর গভীর বুদ্ধিমত্তা, একাগ্রতা ও পড়ার প্রতি প্রবল আগ্রহের কারণে শিক্ষকদের কাছে অত্যন্ত প্রিয় পাত্রী হয়ে ওঠেন। স্কুলের দিনগুলোতে তিনি কেবল পাঠ্যবইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিলেন না, বরং ইতিহাস, সংস্কৃতি ও দর্শনের প্রতি তাঁর ঝোঁক ছিল লক্ষণীয়।

হাই স্কুল শেষ করার পর তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। তবে ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে, প্রথম সেমিস্টারের শুরুতেই তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। এই শারীরিক অসুস্থতা তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাজীবনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় এবং তিনি সাময়িকভাবে পড়াশোনা ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। কিন্তু এই অবসাদগ্রস্ত ও নিভৃত সময়ই তাঁর ভেতরের আধ্যাত্মিক সত্তাকে জাগিয়ে তোলে এবং তিনি বিভিন্ন ধর্ম নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা শুরু করেন।

৩. উচ্চশিক্ষা, ধর্মের প্রতি আকর্ষণ ও সত্যের অনুসন্ধান

১৯৫৩ সালে মার্গারেট নিউ ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ে (NYU) ভর্তি হন। বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর অধ্যয়নের মূল বিষয়গুলোর মধ্যে ছিল চারুকলা, সাহিত্য ও দর্শন। এখানেই তিনি প্রথমবারের মতো প্রাচ্য এবং বিশেষ করে আরব সংস্কৃতির সংস্পর্শে আসেন। ইহুদি ও ইসলাম ধর্মের প্রতি তাঁর আগ্রহ দিন দিন বৃদ্ধি পেতে থাকে। তিনি ইসলামের মৌলিক শিক্ষাগুলো বোঝার জন্য পবিত্র কুরআনের ইংরেজি অনুবাদ পড়তে শুরু করেন।

তিনি কেবল বই পড়েই ক্ষান্ত হননি; সত্যের সন্ধানে তিনি ইহুদি ও মুসলিম উভয় ধর্মের পণ্ডিত বা আলেমদের সাথে যোগাযোগ শুরু করেন। তিনি এই দুই ধর্মের শিক্ষা ও বিশ্বাসের একটি তুলনামূলক অধ্যয়ন (Comparative Study) শুরু করেন।

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সমাপ্তি

১৯৫৬ সালে, বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনার শেষ দিকে এসে মার্গারেট আবার মারাত্মকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। এবার অসুস্থতা এতটাই দীর্ঘস্থায়ী ছিল যে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়। দীর্ঘ চিকিৎসাধীন থাকার কারণে তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা স্থায়ীভাবে থমকে যায়। তিনি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক ডিগ্রি অর্জন করতে পারেননি। তবে এই অসুস্থতা তাঁর জ্ঞানার্জনের তৃষ্ণাকে দমাতে পারেনি, বরং হাসপাতালের বিছানায় শুয়েই তাঁর আসল ধর্মতাত্ত্বিক অধ্যয়নের গতি আরও বেগবান হয়।

৪. মানসিক সংকট ও আল্লামা মুহাম্মদ আসাদের প্রভাব

হাসপাতালে অবস্থানকালে মার্গারেট যখন ইহুদি ও ইসলামের মাঝে এক তীব্র মানসিক দ্বন্দ্বে ভুগছিলেন, তখন তাঁর হাতে আসে বিখ্যাত নব্য মুসলিম, চিন্তাবিদ ও প্রাচ্যবিদ আল্লামা মুহাম্মদ আসাদের (যিনি পূর্বে লিওপোল্ড ওয়াইজ নামে এক অস্ট্রিয়ান ইহুদি ছিলেন) লেখা বিখ্যাত আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘রোড টু মক্কা’ (The Road to Mecca)

“‘রোড টু মক্কা’ বইটি মার্গারেটের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। একজন ইহুদি কীভাবে ইসলামের শাশ্বত সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে মুসলমান হতে পারেন এবং পশ্চিমা সভ্যতার কৃত্রিমতা ও শূন্যতা উপলব্ধি করতে পারেন, তা তিনি এই বই থেকে জানতে পারেন। এটি তাঁর মনের ভেতরের দ্বিধাদ্বন্দ্ব দূর করে দেয় এবং ইসলামের প্রতি তাঁর অনুরাগ বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।”

কুরআনের বাণী এবং মুহাম্মদ আসাদের চিন্তাধারা তাঁকে এই সিদ্ধান্তে উপনীত করে যে, ইহুদি ধর্ম বর্তমানে তার আদি ও বিশুদ্ধ রূপ হারিয়ে ফেলেছে, আর ইসলামই হলো মানবজাতির জন্য একমাত্র পূর্ণাঙ্গ ও অবিকৃত জীবনব্যবস্থা। তিনি মনে মনে সিদ্ধান্ত নেন, হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার পরপরই তিনি তাঁর পৈতৃক ধর্ম ত্যাগ করবেন।

৫. পারিবারিক সংঘাত ও একাকীত্ব

হাসপাতাল থেকে মুক্ত হয়ে মার্গারেট তাঁর সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করেন। তিনি নিউ ইয়র্কের ইসলামিক সেন্টারে যাতায়াত শুরু করেন এবং মুসলিম সম্প্রদায়ের সাথে মেলামেশা বাড়ান। মার্গারেটের এই রূপান্তর তাঁর ধর্মনিরপেক্ষ ইহুদি পরিবার সহজে মেনে নিতে পারেনি।

ইহুদি সমাজব্যবস্থা এবং তাঁদের ধর্মীয় রীতিনীতি নিয়ে মার্গারেটের মনে যে সমস্ত যৌক্তিক প্রশ্ন তৈরি হয়েছিল, তাঁর বাবা-মা তার কোনো সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারতেন না। উল্টো ইসলামের প্রতি মেয়ের এই অন্ধ ভালোবাসা তাঁদের ক্ষুব্ধ করে তোলে। এই মতাদর্শিক বিরোধের জেরে ১৯৫৯ সালে তাঁর বাবা-মা তাঁকে পরিবার থেকে আলাদা করে দেন।

হঠাৎ করেই তরুণী মার্গারেট সম্পূর্ণ একা হয়ে পড়েন। নিজের মৌলিক চাহিদা মেটানো এবং বেঁচে থাকার তাগিদে তাঁকে কঠোর পরিশ্রম ও কাজ করতে হয়েছিল। চরম আর্থিক ও মানসিক সংকটের এই দিনগুলোতেও তিনি তাঁর সত্যের পথ থেকে বিচ্যুত হননি।

৬. মাওলানা মওদুদীর প্রভাব ও ইসলাম গ্রহণ

কঠিন জীবনযুদ্ধের মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় মার্গারেট জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা, প্রখ্যাত ইসলামিক চিন্তাবিদ ও মুফাসসির মাওলানা সাইয়্যিদ আবুল আ’লা মওদুদীর লেখা ‘মৃত্যুর পরের জীবন’ (Life After Death) শীর্ষক একটি প্রবন্ধ পড়ার সুযোগ পান। এই প্রবন্ধটি তাঁর হৃদয়ে গভীর রেখাপাত করে। পরকাল, মানুষের জবাবদিহিতা এবং জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্পর্কে মাওলানার অকাট্য যুক্তি তাঁকে মুগ্ধ করে।

১৯৬০ সালের শেষের দিকে তিনি মাওলানা মওদুদীর সাথে নিয়মিত পত্রালাপ শুরু করেন। চিঠির মাধ্যমে তিনি ইসলামের বিভিন্ন জটিল বিষয়ে মাওলানার কাছ থেকে দিকনির্দেশনা ও পরামর্শ পান। মাওলানার জ্ঞান এবং দূরদর্শিতা তাঁকে ইসলাম গ্রহণে চূড়ান্তভাবে উদ্বুদ্ধ করে।

ঐতিহাসিক সেই দিন: ২৪শে মে, ১৯৬১

অবশেষে ১৯৬১ সালের ২৪শে মে মার্গারেট মার্কাস ব্রুকলিনে অবস্থিত নিউ ইয়র্কের ইসলামিক মিশনের পরিচালক শেখ দাউদ আহমেদ ফয়সলের কাছে যান। সেখানে তিনি সমবেত মুসলিমদের সামনে পরম শ্রদ্ধার সাথে ‘কালিমা শাহাদাত’ পাঠ করে আনুষ্ঠানিকভাবে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। ইসলাম গ্রহণের পর তাঁর নতুন নামকরণ করা হয় মরিয়ম জামিলা

৭. পাকিস্তানে হিজরত ও নতুন জীবন

ইসলাম গ্রহণ করার পর মরিয়ম জামিলা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে একজন লেখক ও ইসলামের পক্ষে সোচ্চার কণ্ঠস্বর হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিমা ও সেক্যুলার পরিবেশে একজন একাকী মুসলিম নারী হিসেবে পূর্ণাঙ্গ ইসলামিক জীবনযাপন করা তাঁর জন্য কঠিন হয়ে উঠছিল। উপরন্তু, তাঁর এই রূপান্তরের কারণে আমেরিকার সমাজ ও নিজের পরিবার থেকেও তিনি বিচ্ছিন্ন ছিলেন।

এই পরিস্থিতিতে মাওলানা মওদুদীর আমন্ত্রণে ও পরামর্শে ১৯৬২ সালে মরিয়ম জামিলা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ছেড়ে চিরতরে পাকিস্তানে চলে যাওয়ার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেন। পাকিস্তানে আসার পর মাওলানা মওদুদী এবং তাঁর পরিবার মরিয়মকে নিজেদের মেয়ের মতো পরম স্নেহে আগলে রাখেন।

বিবাহ ও পারিবারিক জীবন

পাকিস্তানি সমাজ ও সংস্কৃতির সাথে মরিয়ম খুব দ্রুত নিজেকে মানিয়ে নেন। তিনি নিষ্ঠার সাথে উর্দু ভাষা শেখেন এবং ইসলামিক জীবনযাত্রাকে আপন করে নেন। ১৯৬৩ সালে লাহোরের বাসিন্দা মুহাম্মদ ইউসুফ খান সাহেবের সাথে তাঁর বিয়ে সম্পন্ন হয়। মুহাম্মদ ইউসুফ খান ছিলেন একজন ধর্মপ্রাণ মানুষ। বিয়ের পর মরিয়ম একজন আদর্শ মুসলিম গৃহিণী এবং মা হিসেবে তাঁর দায়িত্ব পালন করার পাশাপাশি তাঁর লেখালেখির কাজ পূর্ণ উদ্যমে চালিয়ে যান।

৮. সাহিত্য সাধনা ও গ্রন্থাবলি

মরিয়ম জামিলা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করতে না পারলেও, তাঁর ব্যক্তিগত অধ্যাবসায় ও পাণ্ডিত্য ছিল সমকালীন অনেক বড় বড় গবেষকের চেয়েও গভীর। তিনি ইংরেজি ভাষায় ইসলামের বিভিন্ন দিক, পশ্চিমা সভ্যতার অসারতা, আধুনিকতাবাদের করাল গ্রাস এবং প্রাচ্যবাদের বিভ্রান্তি নিয়ে ছোট-বড় মিলিয়ে মোট ৩৪টি গ্রন্থ রচনা করেন।

তাঁর বইগুলো বিশ্বজুড়ে ইসলামিক স্কলার এবং সাধারণ পাঠকদের মাঝে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। নিচে তাঁর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও বিখ্যাত কিছু বইয়ের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি দেওয়া হলো:

১. ইজ ওয়েস্টার্ন সিভিলাইজেশন ইউনিভার্সাল? (Is Western Civilization Universal?)

এই গ্রন্থে তিনি অত্যন্ত জোরালো যুক্তি দিয়ে প্রমাণ করেছেন যে, পশ্চিমা সভ্যতা কোনো সার্বজনীন বা শাশ্বত সভ্যতা নয়। এটি বস্তুবাদের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে যা মানুষের আত্মিক শান্তি দিতে ব্যর্থ।

২. ইসলাম ইন থিওরি অ্যান্ড প্র্যাকটিস (Islam in Theory and Practice)

ইসলামের তাত্ত্বিক সৌন্দর্য এবং মানবজীবনে এর বাস্তব প্রয়োগের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে এটি একটি অনন্য গ্রন্থ।

৩. ইসলাম অ্যান্ড ওরিয়েন্টালিজম (Islam and Orientalism)

পশ্চিমা প্রাচ্যবিদরা (Orientalists) যেভাবে ইসলাম, কুরআন এবং মহানবী (সা.)-কে ভুলভাবে উপস্থাপন করে বিশ্ব দরবারে বিভ্রান্তি ছড়াত, এই বইয়ে মরিয়ম জামিলা তাদের সেই কুযুক্তিগুলোর দাঁতভাঙা জবাব দিয়েছেন।

৪. ইসলাম অ্যান্ড মডার্নিজম (Islam and Modernism)

আধুনিকতার নামে মুসলিম সমাজে যে সমস্ত অপসংস্কৃতি ও বিকৃতি প্রবেশ করছে, তার বিরুদ্ধে তিনি এই বইয়ে তীব্র সমালোচনা করেছেন।

৫. ইসলাম ভার্সেস দ্য ওয়েস্ট (Islam Versus the West)

ইসলামি মূল্যবোধের সাথে পশ্চিমা ভোগবাদী সংস্কৃতির যে মৌলিক সংঘাত, তা এই বইয়ের মূল উপজীব্য বিষয়।

তাঁর অন্যান্য উল্লেখযোগ্য বইগুলোর মধ্যে রয়েছে:

  • Western Imperialism Menaces Muslims
  • A Selected Bibliography of Islamic Books in English
  • Ahmad Khalil: The Story of a Palestinian Refugee (উপন্যাস)

৯. মরিয়ম জামিলার চিন্তাধারা ও অবদান

মরিয়ম জামিলার চিন্তাধারার মূল ভিত্তি ছিল—“ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান এবং এর আধুনিকায়নের কোনো প্রয়োজন নেই, বরং আধুনিক সমাজকেই ইসলামের আলোয় আলোকিত করা প্রয়োজন।” * পশ্চিমা সভ্যতার কঠোর সমালোচক: জন্মসূত্রে পশ্চিমা হয়েও তিনি পশ্চিমা নারী স্বাধীনতা, ধর্মনিরপেক্ষতা ও বস্তুবাদের তীব্র বিরোধী ছিলেন। তিনি মনে করতেন, পশ্চিমা নারী স্বাধীনতা আসলে নারীকে পণ্যে রূপান্তর করার একটি চক্রান্ত মাত্র।

  • ঐতিহ্যের সংরক্ষণ: তিনি মুসলিম নারীদের পর্দা প্রথা, পারিবারিক মূল্যবোধ এবং ঐতিহ্যবাহী ইসলামি জীবনধারা বজায় রাখার জন্য আজীবন তাগিদ দিয়ে গেছেন।
  • ইংরেজি জানা পাঠকদের জন্য আলোকবর্তিকা: পাশ্চাত্যের যে সমস্ত মানুষ বা ইংরেজি জানা তরুণ প্রজন্ম ইসলাম সম্পর্কে জানতে আগ্রহী ছিলেন, তাঁদের জন্য মরিয়ম জামিলার বইগুলো ছিল প্রধান গাইডবুক।

১০. জীবনের শেষ দিনগুলো ও ইন্তেকাল

পাকিস্তানে আসার পর মরিয়ম জামিলা বাকি জীবন লাহোরেই অতিবাহিত করেন। তিনি অত্যন্ত সাদাসিধে ও অনাড়ম্বর জীবনযাপনে অভ্যস্ত ছিলেন। ইসলামের খেদমতে জীবনের সোনালী দিনগুলো বিলিয়ে দিয়ে, এই মহান বিদুষী নারী ২০১২ সালের ৩১শে অক্টোবর পাকিস্তানের লাহোরে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুর সময় তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৮ বছর। লাহোরের সানাতনগরের একটি কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।

মরিয়ম জামিলার জীবনপঞ্জি (এক নজরে)

বিষয়বিবরণ
পূর্বনামমার্গারেট মার্কাস
ইসলামিক নামমরিয়ম জামিলা
জন্ম তারিখ ও স্থান২২শে মে, ১৯৩৪; নিউ ইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র
বংশ পরিচয়জার্মান-ইহুদি পরিবার
ইসলাম গ্রহণ২৪শে মে, ১৯৬১ (ব্রুকলিন, নিউ ইয়র্ক)
পাকিস্তানে হিজরত১৯৬২ সাল
বিবাহ১৯৬৩ সাল (স্বামী: মুহাম্মদ ইউসুফ খান)
মোট গ্রন্থের সংখ্যা৩৪টি (ইংরেজিতে লিখিত)
প্রধান বিষয়বস্তুইসলাম, প্রাচ্যবাদ প্রতিরোধ, পশ্চিমা সভ্যতার সমালোচনা
মৃত্যু তারিখ ও স্থান৩১শে অক্টোবর, ২০১২; লাহোর, পাকিস্তান

উপসংহার

মরিয়ম জামিলা কেবল একজন ব্যক্তি ছিলেন না, তিনি ছিলেন একটি জীবন্ত প্রতিষ্ঠান। এমন এক সময়ে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন যখন পশ্চিমা বিশ্ব নিজেদের বৈজ্ঞানিক ও সাংস্কৃতিক দিক থেকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মনে করত। আমেরিকার আধুনিক জীবন, ভোগবিলাস এবং ইহুদি আভিজাত্য ত্যাগ করে পাকিস্তানের একটি সাধারণ ও রক্ষণশীল মুসলিম পরিবারে নিজেকে সঁপে দেওয়া সাধারণ কোনো ঘটনা ছিল না।

আজ তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে (৩১শে অক্টোবর) আমরা গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করি এই জ্ঞানসাধিকাকে। তিনি তাঁর ক্ষুরধার লেখনীর মাধ্যমে বিশ্ববাসীকে দেখিয়ে গেছেন যে, সত্যের আলো একবার অন্তরে প্রবেশ করলে পৃথিবীর কোনো মোহ বা প্রতিবন্ধকতাই মানুষকে সেই পথ থেকে বিচ্যুত করতে পারে না। কেয়ামত পর্যন্ত তাঁর রেখে যাওয়া সাহিত্যকর্ম ও চিন্তাধারা বিশ্ব মুসলিমের জন্য, বিশেষ করে পশ্চিমা মুসলিমদের জন্য সঠিক পথ চেনার আলো হিসেবে কাজ করবে।

তার লিখিত কিছু বই :

০১. ইসলাম ও আধুনিক মুসলিম নারী

লেখক :   মরিয়ম জামিলা



০২. ইসলাম ও আধুনিকতা

লেখক :   মরিয়ম জামিলা



০৩. ইসলাম ও জাতীয়তাবাদ

লেখক :   মরিয়ম জামিলা



০৪. ইসলামী আন্দোলনের মেনিফেষ্টো

লেখক :  মরিয়ম জামিলা



০৫. ফিলিস্থিনের আকাশ

লেখক :  মরিয়ম জামিলা



"বাংলা ইসলামিক বইয়ের বিশাল পিডিএফ (PDF) আর্কাইভ"