ইমাম হাফিজ জালালুদ্দীন সুয়ূতী (রহ.)

ইমাম হাফিজ জালালুদ্দীন সুয়ূতী (রহ.) ছিলেন ইসলামি ইতিহাসের নবম হিজরি শতকের সবচেয়ে প্রবাদপ্রতিম, বহুশাস্ত্রবিদ এবং ক্ষুরধার পণ্ডিত। তিনি একাধারে মুহাদ্দিস, মুফাসসির, ফকিহ, ঐতিহাসিক, ভাষাবিদ এবং গবেষক ছিলেন। ইসলামের ইতিহাসে খুব কম আলেমই তাঁর মতো এত বেশি বিষয়ে এবং এত বিপুলসংখ্যক কালজয়ী গ্রন্থ রচনা করতে পেরেছেন। তাঁকে তাঁর যুগের ‘ইলমের সাগর’ বলা হতো।



১. জন্ম ও বংশ পরিচয়

ইমাম সুয়ূতীর আসল নাম আব্দুর রহমান, কুনিয়্যাত বা উপনাম ‘আবুল ফজল’ এবং লকব (উপাধি) হলো ‘জালালুদ্দীন’ (দ্বীনের গৌরব)। হাদিস শাস্ত্রে তাঁর অনন্য অবদানের জন্য তাঁকে ‘হাফিজ’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়।

  • পুরো নাম: আব্দুর রহমান ইবনে আবি বকর ইবনে মুহাম্মাদ সাবিকুদ্দীন আল-খুদায়রী আল-আসয়ূতী।
  • জন্ম: তিনি ১লা রজব, ৮৪৯ হিজরি (মোতাবেক অক্টোবর, ১৪৪৫ খ্রিস্টাব্দ) মিশরের কায়রোতে জন্মগ্রহণ করেন।
  • বংশের পটভূমি: তাঁর পূর্বপুরুষরা মূলত বাগদাদের ‘খুদায়র’ অঞ্চলের বাসিন্দা ছিলেন, পরবর্তীতে তাঁরা মিশরের ‘আসয়ূৎ’ (Asyut) শহরে স্থায়ী হন। এই আসয়ূৎ শহরের দিকে সম্বন্ধ করেই তাঁকে ‘আল-আসয়ূতী’ বা বাংলায় ‘সুয়ূতী’ বলা হয়।

২. অলৌকিক ঘটনা ও শৈশব

ইমাম সুয়ূতীর জন্ম ও শৈশবের সাথে কিছু চমৎকার ঘটনা জড়িয়ে আছে:

  • কিতাবের গর্ভজাত সন্তান (ইবনুল কুতুব): শৈশবে তাঁর পিতা তাঁকে একবার লাইব্রেরি থেকে একটি কিতাব এনে দিতে বলেন। তাঁর গর্ভবতী মা কিতাবটি আনতে গেলে লাইব্রেরির ভেতরেই ইমাম সুয়ূতীর জন্ম হয়। এই কারণে তাঁকে রসিকতা করে ‘ইবনুল কুতুব’ বা ‘কিতাবের সন্তান’ বলা হতো।
  • পিতৃহীনতা ও হিফয: তাঁর বয়স যখন মাত্র ৫ বছর, তখন তাঁর পিতা ইন্তেকাল করেন। পিতৃহীন অবস্থায় বড় হলেও তিনি মাত্র ৮ বছর বয়সের আগেই পবিত্র কুরআন সম্পূর্ণ মুখস্থ (হিফয) করে ফেলেন। এরপর একে একে উসূলে ফিকহ এবং আরবি ব্যাকরণের কঠিন কঠিন কিতাব যেমন—‘উমদাতুল আহকাম’, ‘মিনহাজুল ফিকহ’ এবং ‘আলফিয়্যাহ ইবনে মালিক’ মুখস্থ করে ফেলেন।

৩. শিক্ষা জীবন ও শিক্ষকবৃন্দ

ইমাম সুয়ূতী ছিলেন ইলমের এক অতৃপ্ত তৃষ্ণার্ত চাতক পাখি। মিশরের কায়রো, দামেস্ক, হেজাজ (মক্কা-মদিনা), ইয়েমেন, ভারত ও মরক্কোর দেড় শতাধিক প্রখ্যাত আলেমের কাছ থেকে তিনি ইলম অর্জন করেন।

  • শিক্ষাগুরু: তাঁর বিখ্যাত উস্তাদদের মধ্যে অন্যতম হলেন—ইমাম কাফিয়াজী (যাঁর সান্নিধ্যে তিনি ১৪ বছর ছিলেন), শায়খ জালালুদ্দীন আল-মহল্লী, ইমাম শামসুদ্দীন আল-সাখাভী এবং আল্লামা ইবনুল হুমাম।
  • জমজম কূপের পানি ও দুআ: তিনি যখন হজ্জ করতে মক্কায় যান, তখন জমজম কূপের পানি পান করে আল্লাহর কাছে দুআ করেছিলেন: “হে আল্লাহ! আমাকে যেন ফিকহ শাস্ত্রে ইমাম সিরাজুদ্দীন আল-বুলকিনী এবং হাদিস শাস্ত্রে হাফিজ ইবনে হাজার আল-আসকালানীর মতো যোগ্যতা দান করা হয়।” আল্লাহ তাঁর সেই দুআ কবুল করেছিলেন।

৪. কর্মজীবন ও নির্জনবাস (ইকতিফাফ)

শিক্ষা জীবন শেষে মাত্র ১৭ বছর বয়স থেকেই তিনি ফতোয়া প্রদান ও গ্রন্থ রচনার কাজ শুরু করেন।

  • শিক্ষকতা: তিনি কায়রোর বিখ্যাত ‘জামে শাইখুন’ এবং ‘মাদরাসাতুল বাইবারসিয়্যাহ’-তে প্রধান মুহাদ্দিস ও শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর দরসে সমসাময়িক যুগের বড় বড় আলেমরা এসে ছাত্রের মতো বসতেন।
  • রাজকীয় পদের মোহ ত্যাগ: তৎকালীন মিশরের মামলুক সুলতান ও মন্ত্রীরা তাঁকে প্রচুর অর্থ-সম্পদ এবং বড় বড় বিচারকের (কাজী) পদ দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি দুনিয়াবি পদের লোভ ত্যাগ করে অত্যন্ত সাদামাটা জীবনযাপন করতেন।
  • নির্জনবাস ও কিতাব সাধনা: জীবনের শেষভাগে, ৯৬১ হিজরিতে (মাত্র ৪০ বছর বয়সে) তিনি রাজকীয় ও সামাজিক ব্যস্ততা থেকে সম্পূর্ণ নিজেকে গুটিয়ে নেন। তিনি কায়রোর নীল নদের তীরে ‘রওদাতুল মিকয়াস’ নামক একটি দ্বীপে নির্জনবাস (ইকতিফাফ) শুরু করেন। জীবনের শেষ ২০ বছর তিনি মানুষের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ বন্ধ করে কেবল আল্লাহর ইবাদত এবং কিতাব লেখার কাজে নিমগ্ন ছিলেন।

৫. ইসলামে অবদান ও কারামত

ইমাম সুয়ূতীকে হিজরি নবম শতকের মুজাদ্দিদ বা সংস্কারক মনে করা হয়। তিনি ইসলামি জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রায় প্রতিটি শাখাকে সুবিন্যস্ত করে গেছেন।

  • হাদিস শাস্ত্রে অবদান: তিনি তাঁর যুগের সবচেয়ে বড় ‘মুহাদ্দিস’ ছিলেন। বলা হয়ে থাকে, তাঁর প্রায় ২ লাখের বেশি হাদিস সনদের বিবরণসহ মুখস্থ ছিল।
  • জাগ্রত অবস্থায় রাসুল (সা.)-এর দর্শন: ইমাম সুয়ূতী নিজেই উল্লেখ করেছেন যে, তিনি জীবনে ৭৫ বারেরও বেশি সময় জাগ্রত অবস্থায় (স্বপ্নে নয়) রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জিয়ারত বা দর্শন লাভ করেছিলেন এবং সরাসরি রাসুল (সা.)-এর কাছ থেকে হাদিসের বিশুদ্ধতা যাচাই করে নিয়েছিলেন।

৬. কালজয়ী গ্রন্থাবলী

ইমাম সুয়ূতী ইসলামের ইতিহাসের অন্যতম সর্বাধিক গ্রন্থ প্রণেতা। তাঁর রচিত ছোট-বড় কিতাবের সংখ্যা প্রায় ৬০০ থেকে ৮০০-এর কাছাকাছি। তাঁর লিখনীর অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল—তিনি সমুদ্রসম জ্ঞানকে খুব ছোট আকারে সাজিয়ে লিখতে পারতেন। তাঁর বিখ্যাত কয়েকটি গ্রন্থ হলো:

তাফসির শাস্ত্রে:

১. তাফসীরুল জালালাইন (تفسير الجلالين): এটি সারা বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং মাদরাসাগুলোতে বহুল পঠিত তাফসির গ্রন্থ। এই কিতাবটির প্রথমার্ধ লিখেছিলেন তাঁর উস্তাদ জালালুদ্দীন মহল্লী, তিনি ইন্তেকাল করলে ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ূতী মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে বাকি অর্ধাংশ লিখে কিতাবটি সম্পন্ন করেন। দুই ‘জালাল’-এর লেখা বলেই এর নাম ‘জালালাইন’।

২. আদ-দুররুল মানসূর (الدر المنثور في التفسير بالمأثور): এটি সম্পূর্ণ হাদিস ও সাহাবিদের বাণীর আলোকে রচিত এক বিশাল তাফসির গ্রন্থ।

৩. আল-ইতকান ফী উলূমিল কুরআন (الإتقان في علوم القرآن): কুরআন অবতীর্ণের ইতিহাস, শানে নুযূল এবং কুরআনের ব্যাকরণের ওপর লেখা এটি একটি অপ্রতিদ্বন্দ্বী মূলনীতি গ্রন্থ।

হাদিস ও অন্যান্য শাস্ত্রে:

৪. আল-জামেউল কাবীর ও আল-জামেউস সাগীর (الجامع الصغير): রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাজার হাজার হাদিসের এক বিশাল বর্ণানুক্রমিক সংকলন।

৫. তারীখুল খুলাফা (تاريخ الخلفاء): রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পর থেকে তাঁর নিজের যুগ পর্যন্ত ইসলামি খিলাফতের সুবিন্যস্ত ও নির্ভরযোগ্য ইতিহাস গ্রন্থ।

৬. আল-আশবাহ ওয়ান নাযাইর (الأشباه والنظائر): শাফেয়ী ফিকহের মূলনীতির ওপর লেখা বিখ্যাত কিতাব।

৭. তাদরীবুর রাবী (تدريب الراوي): হাদিসের পরিভাষা ও উসূলে হাদিসের ওপর লেখা অন্যতম শ্রেষ্ঠ ব্যাখ্যাগ্রন্থ।

৭. ইন্তেকাল

জ্ঞান-বিজ্ঞানের এই আলোকবর্তিকা ৯১১ হিজরির ১৯শে জুমাদাল উলা (মোতাবেক ১৮ই অক্টোবর, ১৫০৫ খ্রিস্টাব্দ) শুক্রবার রাতে, ৬২ বছর বয়সে কায়রোতে নিজ বাসভবনে ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুর আগে তিনি টানা সাত দিন বাম হাতের ব্যথায় ভুগছিলেন।

ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ূতীর মাজার, কায়রো, মিশর।

পরদিন জুমার সালাতের পর কায়রোর বিখ্যাত জামে শাইখুন-এ তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে হাজার হাজার মানুষের সমাগম ঘটে। কায়রোর ‘বাবুল কারাফা’ গোরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়, যা আজও আলেম ও জ্ঞানপিপাসুদের যিয়ারতের স্থান।

আল্লাহ তাআলা ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ূতীকে দ্বীনের জন্য করা এই বিশাল খিদমতের সর্বোত্তম প্রতিদান দান করুন এবং জান্নাতুল ফিরদাউসের উচ্চ মাকাম নসিব করুন। আমীন।

তার জীবনি সম্পর্কে একটি ইংরেজি পিডিএফ ফা্‌ইল দেখতে ক্লিক করি

তার লিখিত কিছু কিতাব হলো :

০১. খাসায়েসুল কুবরা ১ম খণ্ড

লেখক : হাফিজ জালালুদ্দীন সুয়ুতি



০২. খাসায়েসুল কুবরা ২য় খণ্ড

লেখক : হাফিজ জালালুদ্দীন সুয়ুতি



০৩. আরশের ছায়ায় থাকবে যাদের কায়া

লেখক : হাফিজ জালালুদ্দীন সুয়ুতি



৪. জাগ্রত অবস্থায় জিয়ারতে মোস্তফা (সা.)

লেখক : হাফিজ জালালুদ্দীন সুয়ুতি



০৫. জ্বিন জাতির বিস্ময়কর ইতিহাস

লেখক : হাফিজ জালালুদ্দীন সুয়ুতি



০৬. তানবিরুল হালকা

লেখক : হাফিজ জালালুদ্দীন সুয়ুতি



০৭. তারীখুল খুলাফা

লেখক : হাফিজ জালালুদ্দীন সুয়ুতি



০৮. দোযখের আযাব ও বেহেশতের সুখ শান্তি

লেখক : হাফিজ জালালুদ্দীন সুয়ুতি



০৯. দোয়া কিভাবে কবুল হয়

লেখক : হাফিজ জালালুদ্দীন সুয়ুতি



১০. নবী করিম ﷺ-এর ওসীয়ত

লেখক : হাফিজ জালালুদ্দীন সুয়ুতি



১১. নবী বংশের মর্যাদা সম্পর্কিত ৬০ হাদিস

লেখক : হাফিজ জালালুদ্দীন সুয়ুতি



১২. নবীগণ (আ.) স্বশরীরে জীবিত

লেখক : হাফিজ জালালুদ্দীন সুয়ুতি



১৩. বিচারনীতিতে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর বিশেষত্ব

লেখক : হাফিজ জালালুদ্দীন সুয়ুতি



১৪. বিশ্বনবী (সা.)-এর ইলমে গায়েব

লেখক : হাফিজ জালালুদ্দীন সুয়ুতি



১৫. মরনের পরে কি হবে বা দোযখের আযাব ও বেহেশতের সুখ শান্তি

লেখক : হাফিজ জালালুদ্দীন সুয়ুতি



১৬. মুমিনের কবর জীবন

লেখক : হাফিজ জালালুদ্দীন সুয়ুতি



১৭. হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা

লেখক : হাফিজ জালালুদ্দীন সুয়ুতি



১৮. হাদিসের আলোকে রুজী বৃদ্ধির আমল

লেখক : হাফিজ জালালুদ্দীন সুয়ুতি


"বাংলা ইসলামিক বইয়ের বিশাল পিডিএফ (PDF) আর্কাইভ"