মুজাহিদে মিল্লাত মাওলানা হিফজুর রহমান সিওহারবি (রহ.) ছিলেন বিংশ শতাব্দীর ভারতীয় উপমহাদেশের এক অনন্যসাধারণ ইসলামি পণ্ডিত, দূরদর্শী রাজনীতিবিদ, স্বাধীনতাসংগ্রামের বীর সেনানী এবং প্রখ্যাত লেখক। তিনি একাধারে যেমন ছিলেন ইলমে হাদিসের একজন নিষ্ঠাবান শিক্ষক, অন্যদিকে তেমনি ছিলেন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের প্রথম সারির নেতা। দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে তিনি প্রায় ৮ বছর কারাবরণ করেন। ভারত বিভাজনের ঘোর বিরোধী এই মনীষী পরবর্তী সময়ে স্বাধীন ভারতের লোকসভার সদস্য (এমপি) নির্বাচিত হন এবং মুসলিম উম্মাহর অধিকার রক্ষায় আমৃত্যু লড়াই করে যান। নিচে তাঁর জীবন, কর্ম, রাজনৈতিক অবদান ও সাহিত্যসাধনার বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরা হলো:
১. জন্ম ও পারিবারিক পরিচিতি
মাওলানা হিফজুর রহমান ১৯০০ সালে (১৩১৮ হিজরি) ভারতের উত্তর প্রদেশ রাজ্যের বিজনোর জেলার অন্তর্গত ‘সেওহারা’ (সিওহার) নামক একটি সম্ভ্রান্ত ও ঐতিহ্যবাহী মুসলিম জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা হাজী শামসুদ্দিন ছিলেন একজন উচ্চশিক্ষিত ও প্রকৌশলী ব্যক্তিত্ব। তিনি প্রথমে ভোপাল রাজ্যে এবং পরবর্তী সময়ে বিকানের রাজ্যে সরকারি সহকারী প্রকৌশলী (অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার) হিসেবে অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। একটি ধার্মিক, সচ্ছল ও জ্ঞানচর্চাপূর্ণ পারিবারিক পরিবেশে মাওলানা হিফজুর রহমানের শৈশবকাল অতিবাহিত হয়, যা তাঁর ভবিষ্যৎ জীবনের মজবুত ভিত্তি গড়ে দিয়েছিল।
২. শিক্ষাজীবন ও ইলম অর্জন
পারিবারিক ধারা অনুযায়ী মাওলানা হিফজুর রহমানের প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় নিজ বাড়িতে এবং স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। এরপর তিনি উচ্চতর ইসলামি শিক্ষার উদ্দেশ্যে মুরাদাবাদের বিখ্যাত ‘মাদরাসা শাহী’-তে ভর্তি হন। সেখান থেকে প্রাথমিক স্তর শেষ করে তিনি নিজ শহরের ‘মাদ্রাসায়ে ফয়েজ-এ-আম’-এ ভর্তি হন এবং ঐতিহ্যবাহী ‘দারস-ই-নিজামী’ পাঠ্যক্রম সফলভাবে সম্পন্ন করেন। এই মাদ্রাসায় তিনি মাওলানা আবদুল গাফুর সিওহারবি, মাওলানা আহমদ চিশতী এবং সাইয়্যেদ আফতাব আলীর মতো প্রখ্যাত আলেমদের সান্নিধ্যে থেকে বিভিন্ন শাস্ত্রের জ্ঞান অর্জন করেন।
উচ্চতর ইসলামি জ্ঞান এবং বিশেষ করে ইলমে হাদিসে পারদর্শিতা অর্জনের জন্য তিনি ১৯২২ সালে তৎকালীন উপমহাদেশের সর্ববৃহৎ ইসলামি বিদ্যাপীঠ দারুল উলুম দেওবন্দে গমন করেন। দেওবন্দে তিনি তৎকালীন যুগের শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস ও যুগশ্রেষ্ঠ পণ্ডিত আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশ্মীরি (রহ.)-এর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ছাত্রে পরিণত হন। আল্লামা কাশ্মীরির তত্ত্বাবধানে তিনি বুখারি শরিফসহ সিহাহ সিত্তাহর (প্রধান ছয়টি হাদিস গ্রন্থ) গভীর পাঠ গ্রহণ করেন। ১৯২৩ সালে (১৩৪২ হিজরি) তিনি অত্যন্ত কৃতিত্বের সঙ্গে দারুল উলুম देওবন্দ থেকে স্নাতক (ফারাগাত) ডিগ্রি লাভ করেন।
৩. ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন ও রাজনৈতিক জীবন
শিক্ষা সমাপনীর পরপরই মাওলানা হিফজুর রহমান নিজেকে দেশের স্বাধীনতা এবং সমাজ সংস্কারের কাজে নিয়োজিত করেন। তিনি তৎকালীন ভারতের শীর্ষ আলেমদের রাজনৈতিক সংগঠন জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন। পরবর্তীতে তিনি এই সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক (নাজেমে আলা) হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেন।
- স্বাধীনতা সংগ্রাম ও কারাবরণ: ১৯২২ থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ২৫ বছর তিনি ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে রাজপথে লড়াই করেন। মহাত্মা গান্ধী, মাওলানা আবুল কালাম আজাদ এবং মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানির ডাক দেওয়া প্রতিটি আন্দোলনে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। লবণ সত্যাগ্রহ, ভারত ছাড়ো আন্দোলনসহ বিভিন্ন গণআন্দোলনে অংশ নেওয়ার কারণে ব্রিটিশ সরকার তাঁকে বারবার গ্রেপ্তার করে। তিনি তাঁর জীবনের প্রায় ৮টি বছর বিভিন্ন অন্ধকার কারাগারে বন্দি হিসেবে কাটান।
- দেশভাগের বিরোধিতা: মাওলানা হিফজুর রহমান সিওহারবি এবং জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের নেতৃবৃন্দ দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত বিভাজনের ঘোর বিরোধী ছিলেন। ১৯৪৭ সালে যখন ভারত ভাগের প্রস্তাব পাস হয়, তখন যে কয়েকজন জাতীয়তাবাদী মুসলিম নেতা এর তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে মাওলানা হিফজুর রহমান, ড. সাইফুদ্দিন কিচলু এবং আনসার হারওয়ানি অন্যতম ছিলেন। তাঁরা মনে করতেন, দেশভাগ মুসলিমদের সমস্যার সমাধান না করে বরং তাঁদের আরও বেশি বিভক্ত ও দুর্বল করে তুলবে।
- স্বাধীন ভারতের সংসদ সদস্য: দেশভাগের পর যখন অনেক মুসলিম নেতা পাকিস্তানে চলে যান, তখন মাওলানা হিফজুর রহমান ভারতেই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। দাঙ্গাপীড়িত ভারতীয় মুসলিমদের পুনর্বাসন এবং তাঁদের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তিনি দিনরাত কাজ করেন। তিনি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের রাজনীতিতে যুক্ত হন। ১৯৫২ সালে স্বাধীন ভারতের প্রথম সাধারণ নির্বাচনে তিনি উত্তর প্রদেশের আমরোহা লোকসভা কেন্দ্র থেকে সংসদ সদস্য (এমপি) নির্বাচিত হন। এরপর ১৯৫৭ এবং ১৯৬২ সালের নির্বাচনেও তিনি একই আসন থেকে বিপুল ভোটে বিজয়ী হন। ১৯৬২ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি লোকসভার একজন প্রভাবশালী সদস্য ছিলেন। ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরুর সঙ্গে তাঁর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও চমৎকার সম্পর্ক ছিল, যার সুবাদে তিনি সংসদে ভারতীয় মুসলিমদের অধিকার ও ধর্মীয় স্বাধীনতা সুরক্ষায় বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর হিসেবে ভূমিকা রাখতে পেরেছিলেন।

৪. সাহিত্যিক অবদান ও গ্রন্থাবলি
ব্যস্ততম রাজনৈতিক জীবন এবং সমাজসেবার পাশাপাশি মাওলানা হিফজুর রহমান সিওহারবি উর্দূ সাহিত্যে ও ইসলামি গবেষণায় এক চিরস্মরণীয় অবদান রেখে গেছেন। তাঁর লেখা বইগুলো আজও ইসলামি চিন্তাধারার আকর গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত হয়। তাঁর রচিত প্রধান প্রধান গ্রন্থগুলোর সংক্ষিপ্ত বিবরণ নিচে দেওয়া হলো:
কাসাসুল কুরআন (Kasasul Qur’an)
এটি মাওলানা সিওহারবির জীবনের সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ এবং যুগান্তকারী রচনা। পবিত্র কুরআনে বর্ণিত বিভিন্ন নবী-রাসূল, ঐতিহাসিক জাতি এবং গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলিকে তিনি অত্যন্ত চমৎকার, নির্ভুল এবং তাত্ত্বিক বিশ্লেষণসহ এই গ্রন্থে তুলে ধরেছেন। এটি কেবল সাধারণ কাহিনীর বই নয়, বরং এতে প্রতিটি কাহিনীর ঐতিহাসিক সত্যতা, ভৌগোলিক অবস্থান এবং সমকালীন সমাজব্যবস্থার ওপর কুরআনের শিক্ষার প্রভাব বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে। চার খণ্ডে সমাপ্ত এই বিশাল গ্রন্থটি উর্দূ সাহিত্যের একটি অমূল্য সম্পদ, যা পরবর্তীতে বাংলাসহ বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে।
ইসলাম কা ইকতেসাদি নিজাম (ইসলামের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা)
এই গ্রন্থে তিনি পুঁজিবাদের শোষণ এবং সমাজবাদের অবাস্তবতার বিপরীতে ইসলামের ভারসাম্যপূর্ণ অর্থনৈতিক ব্যবস্থার রূপরেখা তুলে ধরেছেন। সম্পদ বণ্টন, জাকাত ব্যবস্থা, সুদমুক্ত অর্থনীতি এবং শ্রমিকের অধিকার নিয়ে এটি একটি অসাধারণ তাত্ত্বিক কাজ।
অন্যান্য উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ:
- আখলাক আওর ফালসাফায়ে আখলাক: মানব চরিত্রের নৈতিক দিক এবং এর দর্শন নিয়ে লেখা একটি মূল্যবান বই।
- আজাদী: বুনিয়াদী ইনসানী হক: মানুষের মৌলিক অধিকার ও স্বাধীনতার ওপর ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গির বিশ্লেষণ।
- তেহরিকে পাকিস্তান পার এক নজর: তৎকালীন পাকিস্তান আন্দোলনের প্রেক্ষাপট ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে তাঁর নিজস্ব পর্যবেক্ষণ।
- হুকুমাত কা দ্বীনী তাসাউউর: ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থা ও শাসনের ধর্মীয় ধারণা।
- সীরাতে রাসুলে করিম ও সিরাতে নববী কা জরুরত আওর আহামিয়ত: রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র জীবনচরিত এবং মানবজীবনে সীরাতের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা।
- বালাগ-ই-mুবীন ও কুরআনী উসূল কে মাআশিয়াত: কুরআন নির্দেশিত জীবন ও জীবিকার নীতিমালা।
৫. মৃত্যু ও সমাধি
ক্যান্সারের মতো মরণব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে এই মহান মনীষী ১৯৬২ সালের ২রা আগস্ট (১৩৮২ হিজরি) দিল্লীতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুর সময় তাঁর বয়স হয়েছিল মাত্র ৬১-৬২ বছর। তাঁর মৃত্যুতে গোটা ভারত জুড়ে বিশেষ করে মুসলিম উম্মাহর মধ্যে গভীর শোকের ছায়া নেমে আসে।
দারুল উলুম দেওবন্দের তৎকালীন মুহতামিম (অধ্যক্ষ) ক্বারী মুহাম্মদ তাইয়েব (রহ.) তাঁর জানাজার নামাজ পড়ান। তৎকালীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরুসহ দেশের শীর্ষস্থানীয় রাজনীতিক, আলেম-উলামা এবং প্রায় ২ লক্ষ সাধারণ মানুষ তাঁর জানাজায় শরিক হন। নতুন দিল্লির ঐতিহাসিক মুনহাদিয়ান কবরস্থানে (যেখানে ইসলামের মহান সংস্কারক শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভীকে সমাহিত করা হয়েছে) এই মহান মুজাহিদকে দাফন করা হয়।
তাঁর স্মৃতি ও অবদানকে চিরস্মরণীয় করে রাখতে এবং ইসলামি গবেষণার ধারা বজায় রাখতে সৌদি আরবের জেদ্দায় ‘হিফজুর রহমান একাডেমি’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যা আজও বিভিন্ন সামাজিক ও শিক্ষামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। ত্যাগ, তিতিক্ষা ও দেশপ্রেমের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হিসেবে মাওলানা হিফজুর রহমান সিওহারবি ইতিহাসের পাতায় সর্বদা অমর হয়ে থাকবেন।
তার লিখিত কিতাব : কাসাসুল কুরআন’

মাওলানা হিফজুর রহমান সিওহারবি (রহ.) রচিত ‘কাসাসুল কুরআন’ ইসলামি সাহিত্য ও ইতিহাসের এক কালজয়ী এবং অনন্য সাধারণ আকর গ্রন্থ। পবিত্র কুরআনে বর্ণিত আম্বিয়া আলাইহিমুস সালাম, প্রাচীন জাতিসমূহ ও ঐতিহাসিক ঘটনাবলিকে তাত্ত্বিক, ভৌগোলিক ও আধুনিক প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণার আলোকে এখানে বিন্যস্ত করা হয়েছে। ১১ খণ্ডের এই বিশাল জ্ঞানকোষটি কেবল সাধারণ গল্পের সমাহার নয়, বরং এতে প্রতিটি কাহিনীর ঐতিহাসিক সত্যতা ও সমকালীন সমাজব্যবস্থার ওপর পবিত্র কুরআনের শিক্ষার গভীর প্রভাব সুনিপুণভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। সরল অনুবাদ, সহজবোধ্য ভাষা এবং বিশুদ্ধ সূত্রনির্ভর উপস্থাপনার কারণে গ্রন্থটি বিশ্বজুড়ে বাংলাভাষী পাঠকদের কাছে সত্যের সন্ধান ও হেদায়েতের এক অনন্য বাতিঘর হিসেবে সমাদৃত।