আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশ্মীরী (রহ.)

উপমহাদেশের অবক্ষয়াক্রান্ত মুসলিম সমাজে যে কয়জন মনীষী ইলমে হাদিস, ফিকহ এবং আকাইদের ক্ষেত্রে এক নবজাগরণের সূচনা করেছিলেন, তাদের মধ্যে আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশ্মীরী (রহ.) অন্যতম প্রধান। বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে তিনি ছিলেন ইলমি দুনিয়ার এক বিস্ময়কর আলোকবর্তিকা। তাঁর অসাধারণ মেধা, প্রখর স্মৃতিশক্তি এবং গভীর জ্ঞানতাত্ত্বিক অবদানের কারণে সমকালীন উলামায়ে কেরাম তাঁকে ‘ইমামুল আসর’ (যুগের ইমাম) এবং ‘চলমান লাইব্রেরি’ উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন। এমনকি আরবের বড় বড় পণ্ডিতরাও তাঁর ইলমি গভীরতা দেখে স্তব্ধ হয়ে যেতেন। নিচে এই মহান কালজয়ী মুহাদ্দিস ও ফকিহের জীবন, কর্ম ও অবদান বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো:

১. জন্ম ও বংশপরিচয়

আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশ্মীরী (রহ.) ১৮৭৫ খ্রিস্টাব্দের ২৬শে নভেম্বর (১২৯২ হিজরির ২৭শে শওয়াল) শনিবার কাশ্মীরের মুজাফফরাবাদ জেলার ‘দুদওয়ান’ নামক একটি প্রত্যন্ত পাহাড়ি গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত সৈয়দ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।

তাঁর পিতার নাম মাওলানা সৈয়দ মুহাম্মদ মুয়াজ্জম শাহ, যিনি নিজেই একজন বড় আলেম এবং আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তাঁদের বংশলতিকা সরাসরি ইসলামের চতুর্থ খলিফা হযরত আলী (রা.) এবং রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর দৌহিত্র হযরত ইমাম হুসাইন (রা.)-এর সাথে গিয়ে মিলিত হয়েছে।

২. অলৌকিক মেধা ও শৈশবের শিক্ষা

শাহ কাশ্মীরী (রহ.)-এর প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় তাঁর পিতার হাত ধরেই। মাত্র সাড়ে চার বছর বয়সে তিনি পবিত্র কুরআন মাজীদ পড়া শুরু করেন এবং অত্যন্ত অল্প সময়ে তা শেষ করেন। এরপর মাত্র ছয় বছর বয়সে তিনি ফারসি ভাষার প্রাথমিক কিতাবসমূহ এবং আরবি ব্যাকরণের প্রাথমিক পাঠ সম্পন্ন করেন।

শৈশব থেকেই তাঁর মেধা ছিল সাধারণ মানুষের কল্পনার অতীত। তিনি কোনো কিতাব একবার মাত্র পাঠ করলেই তা হুবহু স্মৃতিস্থ করে ফেলতে পারতেন। কিতাবের কোন পৃষ্ঠার কোন লাইনে কী লেখা আছে, তা তিনি অবলীলায় বলে দিতে পারতেন। তাঁর এই অবিশ্বাস্য স্মৃতিশক্তিকে সমকালীন উলামারা আল্লাহর এক বিশেষ অলৌকিক নিদর্শন বা কারামত হিসেবে গণ্য করতেন।

৩. উচ্চশিক্ষা ও দারুল উলুম দেওবন্দে আগমন

কাশ্মীরের স্থানীয় উলামাদের কাছ থেকে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষা সমাপ্ত করার পর উচ্চশিক্ষার তীব্র আকাঙ্ক্ষায় তিনি তৎকালীন ভারতের উত্তর প্রদেশের বিখ্যাত দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দারুল উলুম দেওবন্দ-এর অভিমুখে রওনা হন। ১৮৯৩ খ্রিস্টাব্দে (১Mx১ হিজরি) তিনি দেওবন্দে ভর্তি হন।দারুল উলুম দেওবন্দ, যেখানে আল্লামা কাশ্মীরী তাঁর উচ্চশিক্ষা ও অধ্যাপনা জীবন অতিবাহিত করেন, AI generated

দারুল উলুম দেওবন্দ, যেখানে আল্লামা কাশ্মীরী তাঁর উচ্চশিক্ষা ও অধ্যাপনা জীবন অতিবাহিত করেন. Source: Wikipedia

দেওবন্দে তিনি তিন বছর অবস্থান করেন এবং তৎকালীন শ্রেষ্ঠ পণ্ডিতদের সান্নিধ্যে থেকে ইলমে হাদিস, তাফসির, ফিকহ, উসুল, দর্শন ও মানতিক (যুক্তিবিদ্যা) শাস্ত্রে সর্বোচ্চ ডিগ্রি লাভ করেন। ১৮৯৬ খ্রিস্টাব্দে তিনি দেওবন্দের দাওরায়ে হাদিস (মাস্টার্স) সমাপন করেন।

৪. প্রধান শিক্ষক ও শায়খবৃন্দ

দারুল উলুম দেওবন্দে তিনি তৎকালীন ভারতবর্ষের শ্রেষ্ঠ উলামাদের ছাত্র হিসেবে পাওয়ার সৌভাগ্য লাভ করেন। তাঁর প্রধান শিক্ষকদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন:

  • শায়খুল হিন্দ মাওলানা মাহমুদ হাসান দেওবন্দী (রহ.): যিনি ছিলেন দারুল উলুম দেওবন্দের প্রথম ছাত্র এবং স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম প্রধান নেতা। তাঁর কাছ থেকেই শাহ সাহেব মূলত হাদিসের গভীর জ্ঞান লাভ করেন।
  • মাওলানা খলিল আহমদ সাহারানপুরী (রহ.): বিখ্যাত হাদিস গ্রন্থ ‘আবু দাউদ’-এর ব্যাখ্যাগ্রন্থ ‘বজলুল মাজহুদ’-এর রচয়িতা।
  • মাওলানা গোলাম রসুল হাজারভী (রহ.)

৫. কর্মজীবন ও অধ্যাপনা

শিক্ষাজীবন সমাপ্ত করার পর আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশ্মীরী (রহ.) দিল্লির ‘মাদ্রাসায়ে আমিনিয়া’য় প্রধান শিক্ষক হিসেবে তাঁর শিক্ষকতা জীবন শুরু করেন। সেখানে সাড়ে চার বছর সুনামের সাথে দায়িত্ব পালনের পর তিনি নিজ জন্মভূমি কাশ্মীরে ফিরে যান এবং সেখানে ‘মাদ্রাসায়ে ফয়যে আম’ প্রতিষ্ঠা করে ইলমে দ্বীনের আলো ছড়াতে থাকেন।

১৯০৮ খ্রিস্টাব্দে তাঁর উস্তাদ শায়খুল হিন্দ মাওলানা মাহমুদ হাসান (রহ.) যখন স্বাধীনতা আন্দোলনের কারণে হেজাজে (মক্কা-মদিনা) চলে যান, তখন তাঁর শূন্যতা পূরণের জন্য আল্লামা কাশ্মীরীকে দারুল উলুম দেওবন্দে ডেকে আনা হয়। প্রথমে তিনি শিক্ষক হিসেবে যোগ দিলেও ১৯১৫ খ্রিস্টাব্দে তাঁকে দারুল উলুম দেওবন্দের ‘শায়খুল হাদিস’ (প্রধান মুহাদ্দিস) পদে আসীন করা হয়। দীর্ঘ বারো বছর তিনি এই পদে অধিষ্ঠিত থেকে বুখারী শরীফ ও তিরমিযী শরীফের দরস দেন। তাঁর দরসের মজলিসগুলো কেবল ছাত্রদের জন্য নয়, বরং অন্যান্য বড় বড় আলেমদের জন্যও একটি গবেষণাকেন্দ্র ছিল।

৬. জামিয়া ইসলামিয়া ডাবেল-এ হিজরত

১৯২৭ খ্রিস্টাব্দে দারুল উলুম দেওবন্দের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা নিয়ে কিছু মতপার্থক্যের সৃষ্টি হলে আল্লামা কাশ্মীরী (রহ.) অত্যন্ত নিঃস্পৃহতার সাথে দেওবন্দের প্রধান মুহাদ্দিসের পদ থেকে ইস্তফা দেন। এরপর তিনি গুজরাটের ‘ডাবেল’ নামক স্থানে অবস্থিত জামিয়া ইসলামিয়া ডাবেল-এ চলে যান। সেখানে তিনি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত শায়খুল হাদিস হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং ডাবেল মাদ্রাসাকে এশিয়ার অন্যতম শ্রেষ্ঠ হাদিস চর্চাকেন্দ্রে পরিণত করেন।

৭. বিশ্বখ্যাত ছাত্র সমাজ

আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশ্মীরী (রহ.)-এর দরস থেকে এমন সব ছাত্র তৈরি হয়েছিলেন, যাঁরা পরবর্তী সময়ে গোটা মুসলিম বিশ্বের চিন্তাধারাকে প্রভাবিত করেছিলেন। তাঁর হাজার হাজার বিখ্যাত ছাত্রদের মধ্যে অন্যতম হলেন:

  • মুফতি মুহাম্মদ শফী উসমানী (রহ.): পাকিস্তানের প্রাক্তন গ্র্যান্ড মুফতি এবং বিশ্বখ্যাত তাফসির গ্রন্থ ‘মাআরিফুল কুরআন’-এর রচয়িতা।
  • মাওলানা মুহাম্মদ ইদ্রিস কান্ধলভী (রহ.): বিখ্যাত ‘সীরাতুল মুস্তফা’ এবং বুখারী শরীফের ব্যাখ্যাগ্রন্থ ‘তাওযীহুল বারী’র লেখক।
  • মাওলানা সাইয়্যিদ মানাজির আহসান গিলানি (রহ.): প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ ও গবেষক।
  • মাওলানা ক্বারী মুহাম্মদ তৈয়ব (রহ.): দারুল উলুম দেওবন্দের দীর্ঘকালীন চ্যান্সেলর বা মুহতামিম।
  • মাওলানা ইউসুফ বিন্নুরী (রহ.): করাচির জামিয়া বিন্নুরিয়ার প্রতিষ্ঠাতা এবং আল্লামা কাশ্মীরীর ইলমের প্রধান উত্তরাধিকারী।

৮. কাদিয়ানী ফিতনা প্রতিরোধে ঐতিহাসিক ভূমিকা

ইসলামের মৌলিক আকিদা—বিশেষ করে ‘খতমে নবুয়ত’ (হযরত মুহাম্মদ সা. শেষ নবী এবং তাঁর পর আর কোনো নবী আসবে না) সুরক্ষায় আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশ্মীরী (রহ.) যে ভূমিকা পালন করেছেন, তা ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। মির্জা গোলাম আহমদ কাদিয়ানী যখন নিজেকে নবী দাবি করে উপমহাদেশে ফিতনা ছড়াচ্ছিল, তখন শাহ সাহেব একে ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করেন।

তিনি তাঁর জীবনের শেষভাগের একটি বড় অংশ কাদিয়ানী মতবাদের অসারতা প্রমাণে ব্যয় করেন। তিনি নিজে এ বিষয়ে অসংখ্য কিতাব লেখেন এবং তাঁর ছাত্রদের এই বিষয়ে কাজ করার জন্য তৈরি করেন। তিনি বাহাওয়ালপুর আদালতে কাদিয়ানীদের অমুসলিম ঘোষণার ঐতিহাসিক মামলায় প্রধান ধর্মীয় সাক্ষী হিসেবে এমন দালিলিক প্রমাণ উপস্থাপন করেছিলেন, যা বিচারককে কাদিয়ানীদের অমুসলিম ঘোষণা করতে বাধ্য করেছিল। তিনি বলতেন:

“যদি কেউ কেয়ামতের দিন রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর শাফায়াত পেতে চায়, তবে সে যেন খতমে নবুয়ত সুরক্ষার আন্দোলনে শরিক হয়।”

৯. অমর রচনাবলী ও ইলমি উত্তরাধিকার

আল্লামা কাশ্মীরী (রহ.) মুখে দরস দিতে বেশি পছন্দ করতেন, তবে তাঁর ছাত্রদের অনুলিপি এবং তাঁর নিজস্ব লেখনীর মাধ্যমে বেশ কিছু কালজয়ী কিতাব আত্মপ্রকাশ করেছে। তাঁর কিতাবগুলোর গভীরতা এত বেশি যে সাধারণ পাঠকদের জন্য তা অনুধাবন করা বেশ কঠিন।

গ্রন্থের নামবিষয়বস্তু ও বৈশিষ্ট্য
ফয়জুল বারী (فیض الباری)এটি বুখারী শরীফের ওপর তাঁর দেওয়া দরসের একটি সুবিশাল ও বিশ্বখ্যাত সংকলন (৪ খণ্ডে)। এতে তিনি ফিকহি মাসআলায় হানাফি মাযহাবের পক্ষে অত্যন্ত শক্তিশালী আধুনিক ও যৌক্তিক প্রমাণ উপস্থাপন করেছেন।
আনওয়ারুল বারীবুখারী শরীফের আরেকটি বিস্তারিত ব্যাখ্যাগ্রন্থ, যা তাঁর ছাত্ররা সংকলন করেছেন।
আল-আকীদাতুল ইসলামিয়াহইসলামী আকাইদ ও বিশ্বাসের ওপর লিখিত একটি মৌলিক কিতাব।
ইকফাতুল মুলহিদীনকাদিয়ানী ও ইসলাম বিরোধীদের কুফরি ও নাস্তিকতার মুখোশ উন্মোচন করে লেখা অনন্য গ্রন্থ।
আতত্বাসরীহ বিমা তাওয়াতারা ফী নুযুলিল মাসীহশেষ জামানায় হযরত ঈসা (আ.)-এর আকাশে জীবিত থাকা এবং পুনরায় পৃথিবীতে অবতরণ সম্পর্কিত মুতাওয়াতির (সর্বসম্মত) হাদিসগুলোর সংকলন।

১০. ইন্তেকাল ও দাফন

কাদিয়ানী ফিতনা বিরোধী আন্দোলন এবং ডাবেল মাদ্রাসায় অতিরিক্ত পরিশ্রমের কারণে আল্লামা কাশ্মীরী (রহ.)-এর স্বাস্থ্য ভেঙে পড়ে। তিনি লিভারের দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্ত হন। চিকিৎসার জন্য ১৯৩৩ খ্রিস্টাব্দে তিনি গুজরাটের ডাবেল থেকে পুনরায় দেওবন্দে ফিরে আসেন।

অবশেষে ১৯৩৩ খ্রিস্টাব্দের ২৮শে মে (১৩৫২ হিজরির ৩রা সফর) মাত্র ৫৮ বছর বয়সে এই ইলমি আকাশের উজ্জ্বল সূর্যটি চিরতরে অস্তমিত হয়। দারুল উলুম দেওবন্দের ঈদগাহ ময়দানে তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হয় এবং দেওবন্দের প্রধান কবরস্থানের বাইরে একটি বিশেষ স্থানে তাঁকে দাফন করা হয়, যা আজ ‘মাজারে আনওয়ারী’ নামে পরিচিত।

সমকালীন মনীষীদের মূল্যায়ন

তাঁর ইন্তেকালের পর মুসলিম বিশ্বের মহান কবি ও দার্শনিক ডক্টর আল্লামা ইকবাল গভীর শোক প্রকাশ করে বলেছিলেন:

“বিগত পাঁচশত বছরে ইসলামি বিশ্বে আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশ্মীরীর মতো এত বড় হাদিস বিশারদ ও ফকিহ আর দ্বিতীয় কেউ জন্মগ্রহণ করেননি। যদি স্পেনের ইমাম ইবনে হাজম বেঁচে থাকতেন, তবে তিনিও আনোয়ার শাহের মেধা দেখে বিস্ময় প্রকাশ করতেন।”

উপসংহার

আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশ্মীরী (রহ.) ছিলেন মেধা, আধ্যাত্মিকতা, আমল এবং সুন্নতের অনুসরণের এক জীবন্ত প্রতিমূর্তি। তিনি খুব বেশি দীর্ঘ জীবন পাননি, কিন্তু যে স্বল্প সময় পৃথিবীতে ছিলেন, তাতেই তিনি ইলমি দুনিয়ায় এমন এক গভীর রেখাপাত করে গেছেন, যা কিয়ামত পর্যন্ত মুসলিম উম্মাহকে সঠিক পথ দেখাবে। আল্লাহ তায়ালা দ্বীনের এই মহান খিদমতগারকে জান্নাতের সর্বোচ্চ মর্যাদা দান করুন। আমীন।

তার লিখিত কিতাব :

০১. ওরা কাফের কেন

লেখক :  আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশ্মীরি

ডাউনলোড করতে বা পড়তে ক্লিক করুন


"বাংলা ইসলামিক বইয়ের বিশাল পিডিএফ (PDF) আর্কাইভ"