আব্দুল্লাহ ইবনে মাহমুদ

আব্দুল্লাহ ইবনে মাহমুদ: জীবন, সাহিত্যকর্ম ও চিন্তাধারা

বর্তমান বাংলা সাহিত্য ও অনুবাদ শাখায় যে কজন তরুণ লেখক ও গবেষক নিজেদের মৌলিক কাজ এবং বস্তুনিষ্ঠ অনুবাদের মাধ্যমে পাঠকমহলে এক বিশেষ স্থান তৈরি করে নিয়েছেন, তাদের মধ্যে আব্দুল্লাহ ইবনে মাহমুদ (Abdullah Ibn Mahmud) অন্যতম। তিনি একাধারে একজন প্রকৌশলী, লেখক, অনুবাদক ও গবেষক। ধর্মতাত্ত্বিক ইতিহাস, পুরাণ, ভূ-রাজনীতি, সমকালীন বিশ্ব পরিস্থিতি এবং অতিপ্রাকৃত বিষয়ের ওপর তার লেখনী ও গবেষণা পাঠক সমাজকে এক নতুন চিন্তার খোরাক জুগিয়েছে।

জন্ম ও শৈশব

আব্দুল্লাহ ইবনে মাহমুদ ১৯৯২ সালের ৩০শে সেপ্টেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। তার জীবনের শুরুর দিকের অধ্যায়টি কাটে প্রবাসে। শৈশবের প্রথম ছয় বছর তিনি সংযুক্ত আরব আমিরাতের বাণিজ্যিক নগরী দুবাইতে অতিবাহিত করেন। মধ্যপ্রাচ্যের এই বৈচিত্র্যময় পরিবেশ সম্ভবত তার মনের মধ্যে শৈশবেই বিশ্ব ইতিহাস ও সংস্কৃতির প্রতি একধরনের সুপ্ত আগ্রহের জন্ম দিয়েছিল। পরবর্তীতে তিনি স্থায়ীভাবে বাংলাদেশে ফিরে আসেন।

শিক্ষাজীবন

বাংলাদেশে ফিরে আসার পর তার প্রথাগত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাজীবন শুরু হয়। তিনি পড়াশোনায় অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন। মাধ্যমিক শিক্ষার গণ্ডি পেরিয়ে তিনি ঢাকার ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ ‘নটর ডেম কলেজ’-এ ভর্তি হন। ২০১১ সালে তিনি নটর ডেম কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে কৃতিত্বের সাথে উচ্চ মাধ্যমিক (এইচএসসি) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। কলেজের নিয়মতান্ত্রিক ও কঠোর পাঠাভ্যাস তার পরবর্তী জীবনের শৃঙ্খলা এবং গভীর গবেষণার ভিত্তি তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এরপর তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য প্রকৌশল বিদ্যায় ভর্তি হন এবং সফলভাবে একজন পেশাদার প্রকৌশলী হিসেবে গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করেন। পেশাগতভাবে প্রকৌশলী হওয়া সত্ত্বেও সাহিত্যের প্রতি তার গভীর টান এবং অনুসন্ধিৎসু মন তাকে পুরোদস্তুর লেখক ও গবেষক হিসেবে গড়ে তোলে।

লেখক ও গবেষক হিসেবে আত্মপ্রকাশ

আব্দুল্লাহ ইবনে মাহমুদের লেখার মূল ক্ষেত্র হলো—ধর্মতাত্ত্বিক ইতিহাস (Theological History), পুরাণ (Mythology), আন্তর্জাতিক রাজনীতি, বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বদের জীবনী এবং সমকালীন ঘটনাপ্রবাহ। যেকোনো জটিল ঐতিহাসিক ঘটনাকে সহজ, সাবলীল এবং আকর্ষণীয় গদ্যে রূপান্তর করার এক অসাধারণ ক্ষমতা রয়েছে তার। ইসলামি ইতিহাস, খ্রিস্টধর্মের আদি কথা এবং ইহুদি জাতির বিবর্তন নিয়ে তার চুলচেরা বিশ্লেষণ ও নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি তরুণ পাঠকদের বিশেষভাবে আকৃষ্ট করেছে।

তিনি শুধু একজন শুষ্ক ইতিহাস গবেষক নন, বরং একজন গল্পকারও বটে। তার রচনায় ইতিহাসের চরিত্রগুলো জীবন্ত হয়ে ওঠে। একই সাথে তিনি প্রাচীন ও সমকালীন রহস্য, গোয়েন্দা কাহিনী এবং অতিপ্রাকৃত বিষয় নিয়েও কাজ করেছেন।

উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্ম ও গ্রন্থতালিকা

আব্দুল্লাহ ইবনে মাহমুদের প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা বিপুল। তার বইগুলো দেশের শীর্ষস্থানীয় অনলাইন বুকশপ (যেমন- ওয়াফিলাইফ, রকমারি) এবং প্রকাশনীগুলোর বেস্টসেলার তালিকায় স্থান করে নিয়েছে। নিচে তার উল্লেখযোগ্য কিছু বইয়ের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি তুলে ধরা হলো:

১. ইতিহাস ও ধর্মতত্ত্ব বিষয়ক গ্রন্থ:

  • আফটার কারবালা: ইসলামের ইতিহাসের এক ট্র্যাজিক ও টার্নিং পয়েন্ট ‘কারবালার যুদ্ধ’। এই যুদ্ধের পরবর্তী রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট নিয়ে তিনি এই বইয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।
  • আইয়ামে জাহিলিয়া: ইসলাম-পূর্ব আরব সমাজের সমাজব্যবস্থা, কুসংস্কার, সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক অবস্থা কেমন ছিল—তা অত্যন্ত বস্তুনিষ্ঠভাবে এই গ্রন্থে তুলে ধরা হয়েছে।
  • বেথেলহেমের নক্ষত্র: খ্রিস্টধর্মের ইতিহাস: খ্রিস্টধর্মের উৎপত্তি, যিশু খ্রিস্টের আগমন এবং এর ঐতিহাসিক বিবর্তনের এক নিখুঁত দলিল এই গ্রন্থটি।
  • মক্কা মদিনা জেরুজালেম: ইসলাম এবং আব্রাহামিক ধর্মের তিনটি পবিত্রতম নগরীর ইতিহাস ও আধ্যাত্মিক গুরুত্ব নিয়ে চমৎকার একটি সংকলন।
  • ইহুদী জাতির ইতিহাস ও ইসরাইলের উত্থান-পতন: বর্তমান বিশ্ব রাজনীতির অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু ইসরায়েল ও ইহুদি জাতির প্রাচীন ইতিহাস থেকে শুরু করে আধুনিক যুগে তাদের প্রভাব ও ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে রচিত দুটি আকর গ্রন্থ।
  • গাযার গর্জন: ফিলিস্তিন ও গাজা ভূখণ্ডের সাম্প্রতিক সংঘাত ও দীর্ঘস্থায়ী সংকটের পটভূমি নিয়ে সমকালীন একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বই।

২. অনুবাদ কর্ম:

আব্দুল্লাহ ইবনে মাহমুদ বিশ্বখ্যাত বেশ কিছু বই অত্যন্ত সাবলীল ভাষায় বাংলায় রূপান্তর করেছেন। তার অনুবাদের ভাষা এতই প্রাঞ্জল যে, তা অনুবাদ বলে মনেই হয় না।

  • দ্য প্রফেক্ট, আফটার দ্য প্রফেট ও প্রফেট ট্রিলজি: লেজলি হেইজেলটোন-এর বিশ্বখ্যাত ও বহুল আলোচিত এই বইগুলো তিনি যৌথ বা এককভাবে অনুবাদ করেছেন, যা ইসলামের প্রাথমিক যুগের রাজনৈতিক টানাপোড়েন বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
  • প্রমিজেস টু কিপ: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের আত্মজীবনীমূলক বইয়ের বাংলা অনুবাদ। এর মাধ্যমে মার্কিন রাজনীতির ভেতরের অনেক গল্প বাঙালি পাঠক জানতে পেরেছে।
  • মিসকোটিং মুহাম্মাদ (স.): ড. জোনাথন এসি ব্রাউন-এর এই বিখ্যাত বইটির অনুবাদ ইসলামি আইন, হাদিস শাস্ত্র এবং আধুনিক পশ্চিমা সমালোচনার জবাব তৈরিতে পাঠকদের সাহায্য করে।
  • বাইবেল, কুরআন ও বিজ্ঞান: ড. মরিস বুকাইলির কালজয়ী আধুনিক ক্লাসিক গ্রন্থের নতুন আঙ্গিকে অনুবাদ।
  • দ্য সেয়িংস অফ মুহাম্মাদ (স.): আল্লামা স্যার আবদুল্লাহ আল-মামুন সোহরাওয়ার্দির সংকলিত বাণীর সঙ্কলন।

৩. কল্পবিজ্ঞান, অতিপ্রাকৃত ও অন্যান্য:

  • অতিপ্রাকৃতের সন্ধানে (১ম ও ২য় খণ্ড): অতিপ্রাকৃত ঘটনা, অলৌকিক রহস্য এবং পৃথিবীর অমীমাংসিত নানা রহস্যের বৈজ্ঞানিক ও ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ নিয়ে তৈরি এই সিরিজটি ব্যাপক জনপ্রিয়।
  • এলিরিন: তার কল্পবিজ্ঞান বা রহস্য ঘরানার একটি ভিন্নধর্মী কাজ।
  • নিকোলা টেসলা: মানব ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও রহস্যময় বিজ্ঞানী নিকোলা টেসলার জীবন ও তার বৈপ্লবিক আবিষ্কারগুলোর সহজ পাঠ।

লিখনশৈলী ও চিন্তাধারা

আব্দুল্লাহ ইবনে মাহমুদের লিখনশৈলীর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো—নিরপেক্ষতা ও তথ্যসূত্রনির্ভরতা। তিনি যখন কোনো ঐতিহাসিক বা ধর্মীয় বিষয় নিয়ে লেখেন, তখন ভাবাবেগের ঊর্ধ্বে উঠে তথ্যের সত্যতা যাচাই করেন। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের বিভিন্ন নামী গবেষকদের রেফারেন্স বা উৎস তিনি তার লেখায় ব্যবহার করেন, যা তার বইগুলোকে সাধারণ পাঠকের পাশাপাশি গবেষকদের কাছেও গ্রহণযোগ্য করে তোলে।

তিনি মনে করেন, অতীতকে না জানলে বর্তমানকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা অসম্ভব। তাই তিনি বর্তমান প্রজন্মের কাছে বিশ্ব ইতিহাস, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাস ও ভূ-রাজনীতিকে সহজ ভাষায় পৌঁছে দেওয়ার ব্রত নিয়েছেন।

ব্যক্তিগত জীবন ও বর্তমান ব্যস্ততা

ব্যক্তিগত জীবনে আব্দুল্লাহ ইবনে মাহমুদ একজন অত্যন্ত নিভৃতচারী ও পড়াশোনাপ্রিয় মানুষ। তিনি নিজেকে একজন ‘লেখক, গল্পকার এবং আজীবন পাঠক’ হিসেবে পরিচয় দিতে পছন্দ করেন। বর্তমানে তিনি রাজধানী ঢাকায় বসবাস করছেন। লেখালেখির পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও নিজের ব্যক্তিগত ওয়েবসাইটের মাধ্যমে পাঠকদের সাথে যুক্ত থাকেন, নিয়মিত ব্লগ লেখেন এবং জ্ঞানভিত্তিক কনটেন্ট বা ভিডিও তৈরি করেন।

উপসংহার

সংক্ষেপে বলতে গেলে, আব্দুল্লাহ ইবনে মাহমুদ বাংলা মননশীল ও গবেষণা সাহিত্যের একজন শক্তিশালী কণ্ঠস্বর। প্রকৌশলের ছাত্র হয়েও যেভাবে তিনি ইতিহাস, ধর্মতত্ত্ব ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির জটিল গোলকধাঁধাকে সাধারণ মানুষের পাঠোপযোগী করে তুলেছেন, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। তার বয়স এবং কাজের পরিধি বিবেচনা করলে এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, আগামী দিনে বাংলাদেশের জ্ঞানভিত্তিক সাহিত্যজগৎকে তিনি আরও বহু সমৃদ্ধ গ্রন্থ উপহার দেবেন। তরুণ প্রজন্মের পাঠকদের চিন্তা ও মনন গঠনে তার অবদান দীর্ঘকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

তার লিখিত কিছু বইয়ের লিংক :

০১. ইসরাইলের উত্থান পতন

লেখক :  আব্দুল্লাহ ইবনে মাহমুদ



০২.ইহুদি জাতির ইতিহাস

লেখক :  আব্দুল্লাহ ইবনে মাহমুদ



০৩. সিক্রেট মিশনস মোসাদ স্টোরিজ

লেখক :  আব্দুল্লাহ ইবনে মাহমুদ



"বাংলা ইসলামিক বইয়ের বিশাল পিডিএফ (PDF) আর্কাইভ"