ভারতবর্ষের ইসলামী ইতিহাসে এমন কিছু ক্ষণজন্মা ব্যক্তিত্বের আগমন ঘটেছে, যাঁরা তাঁদের বহুমুখী প্রতিভা, প্রজ্ঞা এবং কর্মতৎপরতার মাধ্যমে সমাজ সংস্কারে এক অবিস্মরণীয় অবদান রেখে গেছেন。 তাঁদের চিন্তাধারা কেবল সমসাময়িক সমাজকেই প্রভাবিত করেনি, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও আলোকবর্তিকা হিসেবে কাজ করছে。 এমনই একজন মহান রাহনুমা, কালজয়ী লেখক, দূরদর্শী শিক্ষাবিদ এবং প্রভাবশালী ইসলামি চিন্তাবিদ হলেন মাওলানা আবু সলীম মুহাম্মদ আব্দুল হাই。
তিনি ছিলেন জামায়াতে ইসলামী হিন্দের প্রথম যুগের অন্যতম শীর্ষ নেতা এবং এর কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরার সম্মানিত সদস্য। উর্দু ও হিন্দি ভাষায় সাহিত্য চর্চা, পত্রিকা সম্পাদনা, বহুসংখ্যক জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান কায়েম এবং বিশেষ করে পবিত্র কুরআনের প্রথম দিককার পূর্ণাঙ্গ হিন্দি অনুবাদ সম্পন্ন করার মাধ্যমে তিনি নিজেকে একটি ব্যক্তিসত্তা থেকে অনন্য এক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করেছিলেন।
বংশ পরিচয় ও প্রারম্ভিক জীবন
মাওলানা আবু সলীম মুহাম্মদ আব্দুল হাই ১৯১০ সালের ১ ডিসেম্বর ভারতের উত্তর প্রদেশের রামপুরে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পারিবারিক পটভূমি ছিল অত্যন্ত গৌরবময়। মূলত তিনি পাঞ্জাবের এক নওমুসলিম পরিবারে জন্ম নেন। তাঁর দাদা আব্দুল মুস্তাকিম ছিলেন অত্যন্ত পরহেজগার, ইবাদতগুজার এবং বুজুর্গ একজন আলেমে দ্বীন। অন্যদিকে তাঁর পিতা আব্দুল মালেক ছিলেন রামপুর শহরের অত্যন্ত সুশিক্ষিত ও সুপরিচিত ব্যক্তিত্ব, যিনি আরবি, উর্দু এবং ফারসি ভাষার ওপর গভীর জ্ঞান ও চমৎকার দখল রাখতেন। পিতার এই সাহিত্যিক ও ভাষাগত গুণাবলী এবং দাদার ধর্মীয় নিষ্ঠা শৈশবেই মুহাম্মদ আব্দুল হাইয়ের জীবনের ওপর গভীর প্রভাব বিস্তার করেছিল।
শিক্ষাজীবন ও মেধার স্বাক্ষর
শৈশব থেকেই মুহাম্মদ আব্দুল হাই পড়াশোনা ও নতুন কিছু জানার প্রতি তীব্র অনুরাগী ছিলেন। রামপুরের স্থানীয় মাদরাসায় তাঁর প্রাথমিক শিক্ষার হাতেখড়ি হয়। সে সময় শহরের বিখ্যাত আলেম মৌলভি আব্দুর রহমানের সান্নিধ্যে থেকে তিনি ফারসি সাহিত্যের বিখ্যাত কালজয়ী গ্রন্থ ‘গুলিস্তান’ ও ‘বোস্তান’ অত্যন্ত গভীরতার সাথে অধ্যয়ন করেন।
১৯২৩ সালের মে মাসে তিনি শেরপুরের একটি স্কুল থেকে প্রাথমিক পরীক্ষায় অত্যন্ত কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হন। এরপর উচ্চ শিক্ষার উদ্দেশ্যে তাঁকে রামপুর স্টেট হাই স্কুলে ভর্তি করা হয়। স্কুলে তাঁর মেধার দ্যুতি সবাইকে মুগ্ধ করে। প্রথম বছর নবম শ্রেণিতে অধ্যয়নকালেই তিনি পুরো স্কুলের মধ্যে মেধা তালিকায় শ্রেষ্ঠ স্থান বা সেরা শিক্ষার্থী হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। তাঁর এই অনন্য মেধার স্বীকৃতিস্বরূপ তৎকালীন রামপুরের নবাব হামিদ আলী খান তাঁকে বিশেষ রাষ্ট্রীয় শিক্ষাবৃত্তি প্রদান করেন।
মাধ্যমিকের পাঠ চুকিয়ে তিনি আরও উচ্চতর শিক্ষার লক্ষ্যে এলাহাবাদের বিখ্যাত ‘এভিং ক্রিশ্চিয়ান কলেজে’ (Ewing Christian College) ভর্তি হন। সেখানে তিনি প্রচলিত মানবিক বিভাগের পরিবর্তে বিজ্ঞান বিভাগে উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তি হন এবং ১৯৩২ সালে কৃতিত্বের সাথে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন। এরপর ১৯৩৪ সালে এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সফলভাবে বিএসসি (B.Sc) ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। বিএসসি পাস করার পর মানবসেবার তাগিদে তাঁর প্রবল ইচ্ছা ছিল চিকিৎসা শাস্ত্রে (ডাক্তারি) উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করার। কিন্তু সে যুগে ডাক্তারি পড়া ছিল অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং তাঁর পরিবারের পক্ষে সেই বিপুল আর্থিক জোগান দেওয়া সম্ভব ছিল না। চরম আর্থিক সীমাবদ্ধতা ও নানাবিধ চড়াই-উৎরাইয়ের কারণে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ছাত্র হওয়ার সেই লালিত স্বপ্ন অপূর্ণ রেখেই তাঁকে রামপুরে ফিরে আসতে হয়।
ছাত্রজীবনের কষ্ট ও জ্ঞানসাধনা
মাওলানা আব্দুল হাইয়ের ছাত্রজীবন এবং অধ্যয়নকাল সুখকর ছিল না, বরং তা অতিবাহিত হয়েছে চরম দারিদ্র্য ও কষ্টের মধ্য দিয়ে। পরিবার থেকে প্রয়োজনীয় আর্থিক সহযোগিতা না পাওয়ায় তাঁকে নিজের যোগ্যতাবলে টিউশনি বা অন্যান্য উপায়ে পড়াশোনার খরচ চালাতে হতো। তবে এই কষ্ট তাঁর ইবাদত ও জ্ঞানচর্চায় কখনো বাধা হতে পারেনি। ছোটবেলা থেকেই তাঁর গভীর ইবাদত-বন্দেগির অভ্যাস ছিল। ছাত্রাবস্থায় প্রতিদিন ফজর নামাজের অনেক আগেই তিনি ঘুম থেকে জেগে উঠতেন। ভোররাতে উঠে অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত করতেন এবং পরবর্তীতে মসজিদে গিয়ে জামায়াতের সাথে ফজর নামাজ আদায় করতেন।
তাঁর একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য ছিল তাঁর বই পড়ার ধরন। কৈশোর থেকেই বইপত্র সংগ্রহের প্রতি তাঁর প্রবল ঝোঁক ছিল। তবে তিনি কেবল সময় কাটানোর জন্য হালকাভাবে বই পড়তেন না। যে বই-ই তিনি হাতে নিতেন, তা গভীরভাবে পড়ার সময় গুরুত্বপূর্ণ লাইনগুলো দাগিয়ে রাখতেন। এমনকি প্রয়োজন মনে করলে বইয়ের মার্জিনে বা খালি জায়গায় নিজের নিজস্ব চমৎকার মন্তব্য বা পর্যালোচনা লিখে রাখতেন। এই গভীর অধ্যয়নের অভ্যাসের ফলেই খুব কম বয়সে তাঁর মধ্যে অসাধারণ লেখালেখির দক্ষতা ও প্রখর বিশ্লেষণ ক্ষমতা গড়ে ওঠে এবং কৈশোরেই তিনি বিভিন্ন পত্রিকায় বৈচিত্র্যময় প্রবন্ধ লিখতে শুরু করেন। এছাড়া সংস্কৃতির প্রতি অনুরাগের কারণে তিনি শের-শায়েরি ও কবিতা পছন্দ করতেন এবং প্রায়শই সাহিত্যিকদের মুশায়রা বা কবি সম্মেলনে যোগ দিতেন।
সংশয়ের অন্ধকার থেকে ঈমানের আলোয় প্রত্যাবর্তন
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে পদার্পণের পর ১৯৩৩-৩৪ সালের দিকে তরুণ মুহাম্মদ আব্দুল হাইয়ের জীবনে এক চরম মানসিক ও আদর্শিক সংকট তৈরি হয়। পাশ্চাত্যের আধুনিক বিজ্ঞান, দর্শন এবং নাস্তিক্যবাদী যুক্তির প্রভাবে তিনি ধর্মীয় আকিদা ও বিশ্বাসের ক্ষেত্রে চরম সংশয় এবং অবিশ্বাসের আবর্তে পড়ে যান। একপর্যায়ে তিনি প্রচলিত ধর্মীয় রীতিনীতি, নামাজ-রোজা থেকে সাময়িকভাবে দূরে সরে যান এবং সম্পূর্ণভাবে ধর্মনিরপেক্ষ সাহিত্য, কবিতা ও ভাববিলাসী শায়েরির দিকে ঝুঁকে পড়েন। পরবর্তীতে তিনি নিজে অকপটে স্বীকার করেছেন যে, শৈশবে চমৎকার দ্বীনি ও ইবাদতের পরিবেশে বড় হলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তচিন্তা ও সংশয়বাদী দর্শন তাঁকে সাময়িকভাবে সত্যের পথ থেকে বিচ্যুত করে দিয়েছিল।
তবে মহান আল্লাহ যাঁর মাধ্যমে দ্বীনের বিশাল কাজ করিয়ে নেবেন, তাঁকে তো অন্ধকারে ফেলে রাখতে পারেন না। ১৯৪৩ সালে আমজাদ আলী নামক এক শুভাকাঙ্ক্ষীর মাধ্যমে তাঁর হাতে তৎকালীন বিখ্যাত ইসলামি চিন্তাবিদ মাওলানা আবুল আ’লা মওদূদীর কিছু বই আসে। বিশেষ করে মাওলানা মওদূদীর লেখা ‘নতুন শিক্ষা ব্যবস্থা’ এবং ‘ইসলাম পরিচিতি’ (যা পরবর্তীতে ‘দ্বীন ইসলাম’ বা ‘ইসলাম ধর্ম’ নামে পরিচিত হয়) গ্রন্থ দুটি তাঁর চিন্তাজগতে এক প্রবল ও ওলটপালট করা বিপ্লব ঘটিয়ে দেয়। আধুনিক বিজ্ঞানের যুক্তি দিয়ে ইসলামের সৌন্দর্য ও প্রয়োজনীয়তা বুঝতে পেরে তাঁর মনের সব সংশয়ের মেঘ কেটে যায়। তিনি পূর্ণ উদ্যমে এবং গভীর অনুশোচনা নিয়ে ঈমানের আলোয় ফিরে আসেন। এরপর থেকে তিনি নিজের জীবনকে সম্পূর্ণরূপে দাওয়াহ, সমাজ সংস্কার এবং ইসলামের বুদ্ধিবৃত্তিক সেবায় উৎসর্গ করার দৃঢ় সিদ্ধান্ত নেন।
কর্মজীবন
শিক্ষা জীবন শেষ করার পর জীবিকা নির্বাহের জন্য তিনি প্রথমে রামপুরে প্রাইভেট টিউশনি শুরু করেন。 পরবর্তীতে তিনি রামপুর আলিয়া মাদরাসায় ইংরেজি ভাষার শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। এর পাশাপাশি তাঁর বইয়ের প্রতি ভালোবাসা এবং দক্ষতার কারণে ঐতিহ্যবাহী ‘রেজা লাইব্রেরি’-তে ক্যাটালগিং সহকারী (Cataloging Assistant) হিসেবেও কিছুকাল কাজ করেন। পরবর্তীতে তিনি সরকারি চাকরিতে প্রবেশ করেন এবং কৃষি বিভাগে অত্যন্ত সুনামের সাথে ‘ডেপুটি ডিরেক্টর’ (Deputy Director) পদমর্যাদায় দায়িত্ব পালন করেন। তবে সরকারি চাকরিতে থাকলেও তাঁর মূল মনোযোগ ও হৃদয়ের টান ছিল সর্বদা দ্বীনের দাওয়াত ও জ্ঞানচর্চার প্রতি।
সাহিত্য সাধনা ও কালজয়ী রচনাবলী
মাওলানা আবু সলীম মুহাম্মদ আব্দুল হাই ছিলেন একাধারে সুদূরপ্রসারী চিন্তার অধিকারী লেখক, সম্পাদক ও অনুবাদক। অমুসলিমদের কাছে ইসলামের বাণী পৌঁছে দেওয়া এবং মুসলিম সমাজকে সচেতন করার লক্ষ্যে তিনি উর্দু ও হিন্দি ভাষায় ব্যাপক সাহিত্য রচনা করেন। তাঁর লেখা ও অনুবাদ কর্মের একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ নিচে দেওয়া হলো:
১. কুরআনের হিন্দি তরজমা: এটি ছিল তাঁর জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ ও সবচেয়ে যুগান্তকারী অবদান। হিন্দিভাষী বিশাল জনগোষ্ঠীর কাছে আল্লাহর বাণী পৌঁছে দেওয়ার জন্য তিনি দীর্ঘ পাঁচ বছরের অক্লান্ত পরিশ্রম ও গবেষণার মাধ্যমে পবিত্র কুরআনের হিন্দি অনুবাদ সম্পন্ন করেন, যা ১৯৬৬ সালে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়।
২. হায়াতে তাইয়িবা (রাসূলুল্লাহ সা.-এর বিপ্লবী জীবন): এটি সিরাত সাহিত্যের ইতিহাসে এক অনন্য ও অত্যন্ত জনপ্রিয় গ্রন্থ। নবী করীম (সা.)-এর পবিত্র জীবনকে তিনি এই বইয়ে এক বিপ্লবী ও প্রায়োগিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ফুটিয়ে তুলেছেন।
৩. আদর্শ কিভাবে প্রচার করতে হবে: দ্বীনের দাঈদের জন্য একটি চমৎকার দিকনির্দেশনামূলক বই, যেখানে দাওয়াতের কৌশল ও পদ্ধতি আলোচনা করা হয়েছে।
৪. মানুষের কাহিনী: মানব জীবনের সৃষ্টি, উদ্দেশ্য এবং পরিণতির ওপর লেখা এক হৃদয়গ্রাহী বই।
৫. পত্রিকা সম্পাদনা ও প্রকাশনা: বিভিন্ন বয়সী পাঠকদের দ্বীনি তরবিয়তের জন্য তিনি তিনটি অত্যন্ত প্রভাবশালী সাময়িকী বা পত্রিকা নিয়মিত প্রকাশ ও সম্পাদনা করতেন:
- হাদি (হিন্দি মাসিক – ১৯৬২): হিন্দিভাষী পাঠকদের মাঝে ইসলামের সঠিক পরিচয় তুলে ধরার পত্রিকা।
- হেলাল (উর্দু শিশু সাহিত্য – ১৯৬৩): শিশুদের জন্য চমৎকার ও শিক্ষণীয় গল্প-কবিতার পত্রিকা।
- বাতোল (মহিলা বিষয়ক মাসিক – ১৯৬৪): মুসলিম নারীদের অধিকার, কর্তব্য ও ইসলামি জীবন গঠনে দিকনির্দেশনামূলক জনপ্রিয় ম্যাগাজিন।
শিক্ষা বিস্তার ও সাংগঠনিক অবদান
মাওলানা আব্দুল হাই কেবল একজন নিভৃতচারী লেখক ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন দক্ষ জনশক্তি তৈরি এবং প্রাতিষ্ঠানিক সমাজ সংস্কারের রূপকার। তিনি সমাজ থেকে অজ্ঞতা দূর করতে নারী শিক্ষার ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দিয়েছিলেন। তাঁরই একক প্রচেষ্টা ও দূরদর্শী চিন্তার ফসল হিসেবে ১৯৭৯ সালে ভারতের রামপুরে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘জামেয়া সালেহাত রামপুর’। এটি তৎকালীন সময়ে মুসলিম নারীদের উচ্চতর দ্বীনি ও আধুনিক শিক্ষার এক অনন্য বিপ্লব তৈরি করে, যা আজও অত্যন্ত সুনামের সাথে মুসলিম নারীদের আদর্শ নাগরিক ও দ্বীনের দাঈ হিসেবে গড়ে তুলতে অনন্য ভূমিকা পালন করে আসছে। এছাড়া ১৯৭২ সালে তিনি ভারতের বহুত্ববাদী সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে একটি ‘আন্তঃধর্মীয় সংগঠন’ গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছিলেন, যদিও নানাবিধ প্রতিকূলতার কারণে তা পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়নি।
সত্যের পথে পরীক্ষা ও কারাবরণ
দ্বীনের দাওয়াত ও হকের পথে চলতে গিয়ে মাওলানা আব্দুল হাইকে শাসকের কোপানলে পড়তে হয়েছে এবং একাধিকবার কারাবরণ করতে হয়েছে。 রাজনৈতিক অস্থিরতা ও জরুরি অবস্থার প্রেক্ষাপটে তিনি ১৯৫৪, ১৯৬৫, ১৯৭১ এবং সর্বশেষে ১৯৭৫ সালে কারাবন্দি হন। তবে কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠও তাঁর কলম ও চেতনাকে স্তব্ধ করতে পারেনি। বরং তিনি কারাগারের সময়কে আল্লাহর ইবাদত ও গ্রন্থ রচনায় কাজে লাগিয়েছিলেন。 তাঁর জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সিরাত গ্রন্থ ‘হায়াতে তাইয়িবা’ তিনি কারাগারে বন্দি থাকা অবস্থাতেই রচনা করেছিলেন。
শেষ জীবন ও মহাপ্রয়াণ
জীবনের শেষ দিনগুলোতে মাওলানা আব্দুল হাই বার্ধক্যজনিত নানাবিধ শারীরিক অসুস্থতায় আক্রান্ত হন। ধীরে ধীরে তাঁর চোখের দৃষ্টিশক্তি এবং স্মৃতিশক্তি অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়ে。 কিন্তু এত শারীরিক কষ্টের মাঝেও দ্বীনের প্রতি তাঁর ভালোবাসা ও নিষ্ঠা বিন্দুমাত্র কমেনি。 জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি অত্যন্ত কষ্টের সাথে হলেও মসজিদে গিয়ে জামায়াতের সাথে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করার আপ্রাণ চেষ্টা করতেন。
অবশেষে ১৯৮৭ সালের ১৬ জুলাই এই মহান দাঈ, কালজয়ী সিরাত গবেষক এবং সমাজ সংস্কারক ইহকাল ত্যাগ করে মহান আল্লাহর সান্নিধ্যে (ইন্তেকাল) গমণ করেন।
উপসংহার
মাওলানা আবু সলীম মুহাম্মদ আব্দুল হাইয়ের জীবন প্রতিটি মানুষের জন্য, বিশেষ করে আধুনিক যুবসমাজের জন্য এক পরম অনুপ্রেরণার উৎস। উচ্চশিক্ষার অহংকার ও সংশয়বাদের অন্ধকার থেকে যেভাবে তিনি কুরআনের আলোয় ফিরে এসেছিলেন এবং পরবর্তীতে নিজের পুরো মেধা ও জীবনকে দ্বীনের জন্য বিলিয়ে দিয়েছিলেন, তা এককথায় অবিশ্বাস্য। তাঁর প্রতিষ্ঠিত জামেয়া সালেহাত, তাঁর হিন্দি অনুবাদ এবং তাঁর লিখিত গ্রন্থসমূহ আজও কোটি কোটি মানুষকে সত্যের পথ দেখাচ্ছে। তিনি এই নশ্বর পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেও তাঁর রেখে যাওয়া ইলমি মিরাস বা কর্মের মাধ্যমে তিনি যুগে যুগে বেঁচে থাকবেন।
তার কিছু বইয়ের লিংক :
০১. আদর্শ কিভাবে প্রচার করতে হবে
লেখক : আবু সালীম মুহাম্মদ আবদুল হাই
০২. মানুষের কাহিনী
লেখক : আবু সালীম মুহাম্মদ আবদুল হাই
০৩. রাসুলুল্লাহ সাঃ এর বিপ্লবী জীবন
লেখক : আবু সালীম মুহাম্মদ আবদুল হাই


