হারুন ইয়াহিয়া (Harun Yahya) বিশ্বজুড়ে একটি অত্যন্ত সুপরিচিত এবং একই সাথে তীব্র আলোচিত-সমালোচিত নাম। বিশেষ করে বিংশ শতাব্দীর শেষভাগ এবং একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে ইসলাম, আধুনিক বিজ্ঞান, সৃষ্টিতত্ত্ব (Creationism), এবং ডারউইনবাদের খণ্ডন নিয়ে তার রচিত শত শত বই বিশ্বব্যাপী মুসলিম তরুণ ও বুদ্ধিজীবী মহলে বিপুল আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। ‘হারুন ইয়াহিয়া’ মূলত একটি ছদ্মনাম, যার আসল নাম আদনান ওকতার (Adnan Oktar)। তিনি তুরস্কের আঙ্কারায় জন্মগ্রহণ করেন এবং সেখান থেকেই তার বৈচিত্র্যময় ও চড়াই-উতরাইপূর্ণ জীবনযাত্রার সূচনা হয়। বর্ণাঢ্য সাহিত্যিক জীবন, আন্তর্জাতিক স্তরে ইসলামি দাওয়াহ কার্যক্রম, সুদৃশ্য ই-বুক ও প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ এবং পরবর্তী সময়ে আইনি জটিলতা ও কারাদণ্ডে দণ্ডিত হওয়া—সব মিলিয়ে তার জীবনী অত্যন্ত নাটকীয় এবং শিক্ষণীয় তথ্যে ভরপুর।
জন্ম ও প্রাথমিক জীবন
আদনান ওকতার বা হারুন ইয়াহিয়া ২ ফেব্রুয়ারি, ১৯৫৬ সালে তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় জন্মগ্রহণ করেন। তার শৈশব এবং প্রাথমিক শিক্ষাজীবন আঙ্কারাতেই অতিবাহিত হয়। ছোটবেলা থেকেই তিনি অত্যন্ত মেধাবী এবং পড়াশোনার প্রতি প্রবল অনুরাগী ছিলেন। বিশেষ করে ধর্মীয় ইতিহাস, দর্শন এবং আধুনিক বিজ্ঞানের প্রতি তার গভীর আগ্রহ গড়ে ওঠে। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করার পর তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য ইস্তাম্বুলে চলে আসেন।
১৯৭৯ সালে তিনি ইস্তাম্বুলের বিখ্যাত ‘মিমার সিনান ইউনিভার্সিটি’ (Mimar Sinan University)-র ফাইন আর্টস বা চারুকলা অনুষদে ভর্তি হন। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালেই তার চিন্তাভাবনায় ব্যাপক পরিবর্তন আসে এবং তিনি চারপাশের তরুণ সমাজকে বস্তুবাদের প্রভাব থেকে মুক্ত করার জন্য এক ধরনের তাত্ত্বিক আন্দোলন শুরুর পরিকল্পনা করেন। পরবর্তীতে তিনি ইস্তাম্বুল বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগেও পড়াশোনা করেন, যদিও প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি সম্পন্ন করার চেয়ে মুক্ত গবেষণা এবং তরুণদের সংগঠিত করার দিকেই তার মনোযোগ বেশি ছিল।
নামকরণ ও ছদ্মনামের রহস্য
লেখক হিসেবে তিনি কেন ‘হারুন ইয়াহিয়া’ নাম বেছে নিলেন, তার পেছনে একটি গভীর আদর্শিক কারণ রয়েছে। ইসলামি ঐতিহ্য অনুযায়ী, হযরত হারুন (আঃ) ছিলেন তার ভাই হযরত মুসা (আঃ)-এর সহযোগী, যিনি ফিরাউনের খোদাদ্রোহী এবং নাস্তিক্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে সত্যের বাণী প্রচার করেছিলেন। অন্যদিকে, হযরত ইয়াহিয়া (আঃ) ছিলেন একজন মহান নবী যিনি চরম প্রতিকূলতার মধ্যেও সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে অবিচল ছিলেন। আদনান ওকতার মনে করতেন, আধুনিক যুগে নাস্তিক্যবাদ, বস্তুবাদের প্রসার এবং ডারউইনের বিবর্তনবাদ হলো আধুনিক ‘ফিরাউনি’ ব্যবস্থা। এই ব্যবস্থার তাত্ত্বিক ভিত্তি ভেঙে দেওয়ার লড়াইয়ে নিজেকে নিয়োজিত করার প্রতীক হিসেবেই তিনি এই যুগল নাম বেছে নেন। একই সাথে তার বইগুলোতে তিনি রাসুলুল্লাহ (সাঃ)-এর সীলমোহর ব্যবহার করতেন, যা তার কাজের মূল অনুপ্রেরণাকে নির্দেশ করত।
দাওয়াহ কার্যক্রম ও সাইন্স রিসার্চ ফাউন্ডেশন (BAV)
১৯৮০-এর দশকে আদনান ওকতার ইস্তাম্বুলের তরুণ ও ধনাঢ্য পরিবারের সন্তানদের মাঝে ইসলামের মৌলিক শিক্ষা এবং আধুনিক বিজ্ঞানের সামঞ্জস্য নিয়ে আলোচনা শুরু করেন। ১৯৮৬ সালে তিনি তার বৈজ্ঞানিক ও ধর্মীয় চিন্তাভাবনাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার উদ্দেশ্যে ‘বিলিম আরাশতিরমা ভাকফি’ (Bilim Araştırma Vakfı – BAV) বা ‘সাইন্স রিসার্চ ফাউন্ডেশন’ প্রতিষ্ঠা করেন।
এই ফাউন্ডেশনের মূল উদ্দেশ্য ছিল আধুনিক বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের আলোকে ইসলামের সত্যতা প্রমাণ করা এবং তরুণ সমাজকে নাস্তিক্যবাদের প্রভাব থেকে রক্ষা করা। এই সংস্থার মাধ্যমে তিনি শত শত সেমিনার, কনফারেন্স এবং প্রদর্শনীর আয়োজন করেন। অতি দ্রুত তুরস্কের সীমানা ছাড়িয়ে তার এই দাওয়াহ মডেল আন্তর্জাতিক রূপ লাভ করে। তার আকর্ষণীয় উপস্থাপনা এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার মুসলিম বিশ্বের কোটি কোটি মানুষকে আকৃষ্ট করতে সক্ষম হয়।
সাহিত্যিক অবদান ও গ্রন্থসম্ভার
হারুন ইয়াহইয়ার নামে প্রায় ৩০০-এরও বেশি বই প্রকাশিত হয়েছে। তার বইগুলোর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো—এগুলো অত্যন্ত উচ্চমানের কাগজে, রঙিন ছবি এবং চমৎকার গ্রাফিক্স সহযোগে মুদ্রিত। সাধারণ পাঠক থেকে শুরু করে গবেষক পর্যন্ত সবার কাছেই তার বইগুলোর আবেদন ছিল ব্যাপক। তার বইগুলো বিশ্বের প্রায় ৭৩টিরও বেশি ভাষায় অনুবাদ করা হয়েছে।
প্রধান প্রধান বিষয়বস্তু:
- ডারউইনবাদ ও বিবর্তনবাদের খণ্ডন: তার সবচেয়ে আলোচিত কাজ হলো ডারউইনের বিবর্তনবাদের অসারতা প্রমাণ করা। তার মতে, বিবর্তনবাদ কোনো বিজ্ঞান নয়, বরং এটি নাস্তিক্যবাদ ও বস্তুবাদের একটি সুপরিকল্পিত মতাদর্শ।
- সৃষ্টির রহস্য ও আল্লাহর অস্তিত্ব: ‘The Creation of Universe’, ‘The Miracle in the Atom’, ‘The Miracle of the Honeybee’ ইত্যাদি বইয়ে তিনি আধুনিক বিজ্ঞানের জটিল বিষয়গুলোকে সহজ ভাষায় উপস্থাপন করে আল্লাহর অস্তিত্ব ও কুদরত প্রমাণ করেছেন।
- ইসলামি নৈতিকতা ও জীবনবিধান: মানুষের আধ্যাত্মিক উন্নয়ন, পারিবারিক সুখ এবং সামাজিক শান্তির জন্য ইসলামের নৈতিক শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে তিনি বহু গ্রন্থ রচনা করেন।
- শেষ জামানা ও মাহদি তত্ত্ব: শেষ জামানায় হযরত ঈসা (আঃ) এবং ইমাম মাহদির আগমন, দাজ্জালের ফিতনা এবং ইসলামের চূড়ান্ত বিজয় নিয়ে তার বেশ কিছু গবেষণাধর্মী বই রয়েছে।
‘দ্য অ্যাটলাস অব ক্রিয়েশন’ এবং বৈশ্বিক আলোড়ন
২০০৬ সালে হারুন ইয়াহইয়ার পক্ষ থেকে ‘The Atlas of Creation’ (সৃষ্টির অ্যাটলাস) নামক এক বিশাল আকৃতির এবং অত্যন্ত ব্যয়বহুল বই প্রকাশ করা হয়। প্রায় ৮০০ পৃষ্ঠার এই বইটিতে হাজার হাজার রঙিন ছবি এবং প্রাচীন জীবাশ্মের (Fossils) বিবরণ দিয়ে দাবি করা হয় যে, কোটি কোটি বছর ধরে জীবজগতে কোনো পরিবর্তন বা বিবর্তন ঘটেনি। জীবসমূহ যেভাবে সৃষ্টি হয়েছিল, আজও ঠিক সেভাবেই বিদ্যমান রয়েছে।
এই বইটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপের বিভিন্ন নামী বিশ্ববিদ্যালয়, বিজ্ঞানী, গবেষক এবং ফ্রান্সের হাজার হাজার স্কুলে বিনামূল্যে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এই ঘটনা পশ্চিমা বিজ্ঞানী এবং শিক্ষা মহলে এক বিরাট তোলপাড় সৃষ্টি করে। রিচার্ড ডকিন্সসহ তৎকালীন শীর্ষস্থানীয় বিবর্তনবাদী বিজ্ঞানীরা এই বইয়ের তীব্র সমালোচনা করেন, তবে সাধারণ মানুষের কাছে এটি সৃষ্টির সপক্ষে এক বিরাট দলিল হিসেবে গৃহীত হয়।
টেলিভিশন চ্যানেল ‘A9’ ও বিতর্কিত জীবনধারা
২০১১ সালে আদনান ওকতার নিজস্ব স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেল ‘A9 TV’ চালু করেন। এই চ্যানেলের মাধ্যমে তিনি নিয়মিত লাইভ টকশো ও ধর্মীয় আলোচনা প্রচার করতে শুরু করেন। তবে এই সময় থেকেই তার প্রচারণায় এবং জীবনযাত্রায় এক আমূল ও অদ্ভুত পরিবর্তন লক্ষ করা যায়।
তার অনুষ্ঠানে ঐতিহ্যগত ইসলামি সংস্কৃতির বিপরীতে পশ্চিমা আধুনিক পপ সংস্কৃতির মিশ্রণ দেখা যায়। তিনি তার নারী সহযোগীদের (যাদের তিনি ‘Kittens’ বা বিড়ালছানা বলে ডাকতেন) অত্যন্ত আধুনিক ও পশ্চিমা পোশাকে তার চারপাশে বসিয়ে ধর্মীয় ও রাজনৈতিক আলোচনা করতেন। এই অদ্ভুত এবং বিতর্কিত উপস্থাপনা বিশ্বজুড়ে সনাতনপন্থী মুসলিম আলেম সমাজ এবং সাধারণ মুসলমানদের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দার ঝড় তোলে। অনেকেই তাকে ইসলামের অবমাননাকারী এবং বিকৃত মানসিকতার অধিকারী বলে আখ্যায়িত করেন।
আইনি জটিলতা, গ্রেফতার ও দীর্ঘ কারাদণ্ড
২০১৮ সালের জুলাই মাসে তুরস্কের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এক বিশাল অভিযান চালিয়ে ইস্তাম্বুল থেকে আদনান ওকতার এবং তার শত শত অনুসারীকে গ্রেফতার করে। তার বিরুদ্ধে অপরাধ চক্র পরিচালনা, জালিয়াতি, ব্ল্যাকমেইল, যৌন নিপীড়ন, শিশুদের ওপর নির্যাতন, রাজনৈতিক ও সামরিক গোয়েন্দাগিরি এবং কর ফাঁকিসহ অসংখ্য গুরুতর অভিযোগ আনা হয়।
দীর্ঘ শুনানির পর, ২০২১ সালের জানুয়ারি মাসে ইস্তাম্বুলের একটি আদালত তাকে ১,০৭৫ বছরের কারাদণ্ড প্রদান করে। পরবর্তীতে ২০২২ সালের নভেম্বর মাসে মামলার পুনঃবিচারে অপরাধের ভয়াবহতা বিবেচনা করে আদালত তার শাস্তির মেয়াদ বাড়িয়ে ৮,৬৫৮ বছরের কারাদণ্ড নির্ধারণ করে। বর্তমানে তিনি তুরস্কের উচ্চ নিরাপত্তাবেষ্টিত কারাগারে সাজা ভোগ করছেন। এর মাধ্যমে তার চার দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা আধিপত্য ও প্রচারণার সাম্রাজ্যের অবসান ঘটে।
মূল্যায়ন ও সমাপ্তি
হারুন ইয়াহিয়া তথা আদনান ওকতারের জীবনকে দুটি সুষ্পষ্ট ভাগে ভাগ করে মূল্যায়ন করা হয়। একভাগে রয়েছে তার প্রথম জীবনের অসামান্য সাহিত্যিক কর্ম, যা কোটি কোটি মানুষকে নাস্তিক্যবাদের জোয়ার থেকে বাঁচিয়ে ইসলামের পথে ধরে রাখতে সাহায্য করেছিল। বিশেষ করে আধুনিক বিজ্ঞান ও কুরআনের অলৌকিকত্ব নিয়ে তার বইগুলো চিরকাল মুসলিম সাহিত্যের এক অনন্য সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হবে। অন্যদিকে, তার শেষ জীবনের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড, নৈতিক অবক্ষয় এবং আইনি পতন বিশ্বজুড়ে ইসলামি দাঈ ও চিন্তাবিদদের জন্য এক পরম সতর্কবার্তা। ব্যক্তি হারুন ইয়াহইয়ার পতন ঘটলেও, ‘হারুন ইয়াহিয়া’ ছদ্মনামে প্রকাশিত বিশুদ্ধ জ্ঞানগর্ভ বইগুলো আজও বিশ্বের বহু মানুষের জ্ঞানতৃষ্ণা নিবারণ করে চলেছে। হারুন ইয়াহিয়ার বায়োগ্রাফী
তার লিখিত কিছু কিতাব :
০১. আল্লাহর অনেক নাম
লেখক : হারুন ইয়াহিয়া
০২. ইসলাম সন্ত্রাসকে নিন্দা করে
লেখক : হারুন ইয়াহিয়া
০৩. কিয়ামতের আলামত
লেখক : হারুন ইয়াহিয়া
০৪. কুরআন মাজীদের কিছু গোপণ রহস্য
লেখক : হারুন ইয়াহিয়া
০৫. কুরআনে নৈতিক মুল্যবোধ
লেখক : হারুন ইয়াহিয়া
০৬. কুরআনের অলৌকিকত্ব
লেখক : হারুন ইয়াহিয়া
০৭. কুরআনের আদর্শ বাস্তবায়নেই আছে সব সমস্যার সমাধান
লেখক : হারুন ইয়াহিয়া
০৮. ডারউইনবাদ : বিশ্বমানবতার অভিশাপ
লেখক : হারুন ইয়াহিয়া
০৯. নাস্তিকতাবাদের পতন
লেখক : হারুন ইয়াহিয়া
১০. নুহ আঃ মহাপ্লাবন এবং নিমজ্জিত ফেরাউন
লেখক : হারুন ইয়াহিয়া
১১. পিপড়াদের রাজ্যে
লেখক : হারুন ইয়াহিয়া
১২. মহান আল্লাহর মারিফাত
লেখক : হারুন ইয়াহিয়া
১৩. মানব দেহের অলৌকিক রহস্য
লেখক : হারুন ইয়াহিয়া
১৪. মানব সৃষ্টির বিস্ময়কর ঘটনা
লেখক : হারুন ইয়াহিয়া
১৫. রাসুল মুহাম্মদ (সা.) এর মুজেজা
লেখক : হারুন ইয়াহিয়া
১৬. হযরত ইমাম মাহদী এর আবির্ভাবের নিদর্শন সমূহ
লেখক : হারুন ইয়াহিয়া
১৭. হযরত ঈসা (আ.) এর পৃথিবীতে প্রত্যাবর্তন
লেখক : হারুন ইয়াহিয়া
















