ইসলামী ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ জ্ঞানসাধক, যুগশ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস, ইতিহাসবেত্তা এবং মুফাসসির আল-হাফিজ ইমাম ইবনে কাসির (রহ.)। পুরো মুসলিম বিশ্বে তাঁর নাম শোনেননি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। বিশেষ করে তাঁর অমর কীর্তি ‘তাফসীর ইবনে কাসীর’ এবং ইতিহাস গ্রন্থ ‘আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া’ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে জ্ঞানপিপাসুদের তৃষ্ণা মিটিয়ে আসছে। জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় তাঁর গভীরতা এবং তাঁর নিখুঁত বিশ্লেষণ ক্ষমতা তাঁকে ইতিহাসের পাতায় অমর করে রেখেছে।
আপনার দেওয়া লিংকের তথ্যের উদ্দেশ্য এবং ইসলামের ইতিহাসের নির্ভরযোগ্য উৎসসমূহের আলোকে আল্লামা ইবনে কাসির (রহ.)-এর এই বিশদ ও গবেষণাধারার জীবনীটি প্রস্তুত করা হলো।
১. নাম, উপাধি ও বংশ পরিচয়
ইমাম ইবনে কাসিরের পূর্ণ নাম হলো আবু আল-ফিদা ইসমাইল বিন উমর বিন কাসির আল-কুরাশী আল-বুসরাভি। দামেস্কে স্থায়ীভাবে বসবাস এবং সেখানে জ্ঞানচর্চার কারণে তাঁর নামের শেষে ‘আদ-দিমাশকী’ বা ‘দামেস্কী’ও যুক্ত করা হয়।
জ্ঞানজগতে তিনি বিভিন্ন সম্মানসূচক উপাধিতে ভূষিত হয়েছিলেন:
- ইমাদুদ্দীন (দ্বীনের স্তম্ভ): এটি ছিল তাঁর প্রধান লকব বা সম্মানসূচক উপাধি।
- আল-হাফিজ: হাদিস শাস্ত্রে অত্যন্ত উচ্চমাপের পাণ্ডিত্য এবং বিপুলসংখ্যক হাদিস সনদসহ মুখস্থ থাকার কারণে তাঁকে ‘হাফিজ’ বলা হতো।
- আল-মুহাদ্দিস ও আল-মুফাসসির: হাদিস ও তাফসীর শাস্ত্রে তাঁর অনন্য অবদানের জন্য তিনি এই উপাধিতে ভূষিত হন।
তাঁর বংশধারা আরবের বিখ্যাত কুরাইশ বংশের সাথে গিয়ে মিলিত হয়েছে। ফলে বংশগত দিক থেকে তিনি ছিলেন আল-কুরাশী।
২. জন্ম ও প্রাথমিক জীবন
ইমাম ইবনে কাসির আনুমানিক ৭০১ হিজরি (১৩০০ বা ১৩০১ খ্রিস্টাব্দ) মোতাবেক মামলুক সালতানাতের অধীনে সিরিয়ার বুসরা শহরের উপকণ্ঠে অবস্থিত ‘মিজদাল’ বা ‘মাজদাল’ নামক একটি ছোট গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।
পিতৃহীনতা ও বড় ভাইয়ের তত্ত্বাবধান
তাঁর শৈশবকাল খুব একটা সহজ ছিল না। তাঁর পিতা ছিলেন ওই অঞ্চলের একটি জামে মসজিদের খতিব এবং একজন সজ্জন আলেম। ইবনে কাসিরের বয়স যখন মাত্র চার বছর (৭০৫ হিজরি), তখন তাঁর পিতা ইন্তেকাল করেন। পিতার আকস্মিক মৃত্যুতে পরিবারটি বেশ সংকটে পড়ে।
পিতার মৃত্যুর পর তাঁর বড় ভাই শেখ কামালুদ্দীন আবদুল ওয়াহাব তাঁর অভিভাবকত্ব গ্রহণ করেন। বড় ভাই নিজেই একজন আলেম ছিলেন। তিনি ছোট ভাই ইসমাইলকে পরম স্নেহে আগলে রাখেন এবং তাঁর প্রাথমিক শিক্ষার ব্যবস্থা করেন। ৭০৬ হিজরিতে (মাত্র ৫ বছর বয়সে) তিনি ভাইয়ের সাথে সিরিয়ার জ্ঞান-বিজ্ঞানের মূল কেন্দ্র দামেস্কে স্থানান্তরিত হন। এখানেই মূলত তাঁর জীবনের মোড় ঘুরে যায় এবং তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা জীবনের সূচনা ঘটে।
৩. শিক্ষাজীবন ও মহান উস্তাদবৃন্দ (শিক্ষকগণ)
দামেস্কে আসার পর ইবনে কাসির অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে জ্ঞানার্জনে আত্মনিয়োগ করেন। সে যুগের দামেস্ক ছিল বিশ্বখ্যাত আলেম ও মুহাদ্দিসদের মিলনমেলা। তিনি তৎকালীন সময়ের শ্রেষ্ঠতম পন্ডিতদের সান্নিধ্য লাভ করেন।
কুরআন ও ফিকহ শিক্ষা
তিনি শৈশবেই পবিত্র কুরআনুল কারীম হিফজ সম্পন্ন করেন। এরপর তিনি ফিকহ শাস্ত্র (ইসলামী আইনশাস্ত্র) অধ্যয়ন শুরু করেন। ইমাম ইবনে কাসির আইনশাস্ত্রের ক্ষেত্রে ইমাম শাফেয়ী (রহ.)-এর মাযহাব বা শাফেয়ী ফিকহ অনুসরণ করতেন। তিনি বুরহান উদ্দীন ইব্রাহিম বিন আবদুর রহমান (যিনি ইবনে আল-ফিরকাহ নামে পরিচিত, মৃত্যু ৭২৯ হিজরি) এর নিকট ফিকহ শাস্ত্রের উচ্চতর পাঠ গ্রহণ করেন।
হাদিস শাস্ত্র ও ইলমুর রিজাল
হাদিস শাস্ত্রে পারদর্শিতা অর্জনের জন্য তিনি দামেস্কের বড় বড় মুহাদ্দিসদের দরবারে যাতায়াত শুরু করেন। তিনি ঈসা বিন আল-মুতইম, আহমদ বিন আবি তালিব (ইবনে আশ-শাহনাহ), ইবনুল হাজার এবং হাফিজ বাহা উদ্দীন আল-কাসিম বিন আসাকিরের মতো বিশ্বস্ত রাবীদের (বর্ণনাকারী) কাছ থেকে সরাসরি হাদিস শ্রবণ করেন।
জীবনের প্রধান চারজন শিক্ষক
ইমাম ইবনে কাসিরের চিন্তাধারা, লেখনী এবং জ্ঞানতাত্ত্বিক গঠনে চারজন শিক্ষকের প্রভাব ছিল সবচেয়ে বেশি:
১. ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহ.) -> (প্রধান তাত্ত্বিক গুরু ও আধ্যাত্মিক শিক্ষক)
২. ইমাম আল-মিজ্জি (রহ.) -> (হাদিস ও ইলমুর রিজাল শাস্ত্রের শিক্ষক)
৩. ইমাম আদ-দাহাবী (রহ.) -> (ইতিহাস ও হাদিস সমালোচনার শিক্ষক)
৪. ইবনে আল-কাইয়িম (রহ.) -> (সহপাঠী ও সমকালীন চিন্তাবিদ)
১. শায়খুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহ.)
ইবনে কাসিরের জীবনের সবচেয়ে বড় আদর্শ এবং শিক্ষক ছিলেন শায়খুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (মৃত্যু ৭২৮ হিজরি)। ইবনে কাসির তাঁর এই উস্তাদের জ্ঞান, সাহসিকতা এবং সংস্কারবাদী চিন্তাধারার প্রতি চরমভাবে অনুরক্ত ছিলেন। ইবনে তাইমিয়্যাহর সান্নিধ্য তাঁর মধ্যে অন্ধ তাকলীদ (অন্ধ অনুকরণ) পরিহার করে দলিল-প্রমাণের ভিত্তিতে ইসলামকে বোঝার মানসিকতা তৈরি করেছিল। উস্তাদের বিপদের দিনগুলোতেও ইবনে কাসির তাঁর পাশে ছিলেন এবং উস্তাদের আকীদা ও চিন্তাধারাকে আজীবন ধারণ করেছেন।
২. হাফিজ জামালুদ্দীন আল-মিজ্জি (রহ.)
তিনি ছিলেন সে যুগের সিরিয়ার সবচেয়ে বড় হাদিস বিশারদ এবং ‘দারুল হাদিস আল-আশরাফিয়্যাহ’-এর প্রধান। ইবনে কাসির তাঁর কাছে সুদীর্ঘকাল হাদিসের জটিল তত্ত্ব, সনদ এবং ‘ইলমুর রিজাল’ (হাদিস বর্ণনাকারীদের জীবনবৃত্তান্ত ও নির্ভরযোগ্যতা যাচাইয়ের বিজ্ঞান) শেখেন। আল-মিজ্জি ইবনে কাসিরের মেধায় এতটাই মুগ্ধ ছিলেন যে, পরবর্তীতে তিনি নিজের মেয়ে জয়নাবকে ইবনে কাসিরের সাথে বিয়ে দেন। জামাতা হওয়ার পর উস্তাদের লাইব্রেরি এবং সান্নিধ্য তাঁর জন্য আরও সহজ হয়ে যায়।
৩. ইমাম শামসুদ্দীন আদ-দাহাবী (রহ.)
ইসলামী ইতিহাসের অন্যতম সেরা ইতিহাসবিদ এবং মুহাদ্দিস ইমাম আদ-দাহাবীর কাছে ইবনে কাসির ইতিহাস তত্ত্ব ও হাদিসের নির্ভরযোগ্যতা যাচাইয়ের নিয়মাবলী শেখেন। আদ-দাহাবী নিজেই তাঁর ছাত্র ইবনে কাসির সম্পর্কে প্রশংসামূলক বাণী লিখে গেছেন।
৪. কর্মজীবন ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব
শিক্ষা সমাপনের পর ইমাম ইবনে কাসির দামেস্কের শিক্ষাব্যবস্থা ও বিচার বিভাগের সাথে জড়িয়ে পড়েন। তাঁর যোগ্যতা ও গভীর জ্ঞানের কারণে মামলুক সালতানাতের রাষ্ট্রীয় ও ধর্মীয় নানা গুরুত্বপূর্ণ পদে তাঁকে দায়িত্ব দেওয়া হয়।
- তদন্ত কমিশনে অন্তর্ভুক্তি (১৩৪১ খ্রি.): ১৩৪১ সালে তৎকালীন সরকারের পক্ষ থেকে গঠিত একটি বিশেষ ধর্মীয় ও বিচারিক তদন্ত কমিশনে তিনি সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হন, যার কাজ ছিল সমসাময়িক বিভিন্ন ধর্মীয় বিভ্রান্তি বা ধর্মদ্রোহিতার বিচার করা।
- মসজিদের খতিব (১৩৪৫ খ্রি.): ১৩৪৫ সালে তিনি দামেস্কের মিজ্জা এলাকার নবনির্মিত একটি বড় মসজিদের প্রধান খতিব (Preacher) হিসেবে নিযুক্ত হন। এই এলাকাটি ছিল তাঁর শ্বশুর ইমাম আল-মিজ্জির আদি নিবাস।
- প্রধান অধ্যাপকের পদ (১৩৬৬ খ্রি.): এটি ছিল তাঁর কর্মজীবনের সবচেয়ে বড় প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি। ১৩৬৬ সালের জুন/জুলাই মাসে তিনি দামেস্কের ঐতিহাসিক ‘গ্র্যান্ড মস্ক’ বা জামে উমাইয়্যার প্রধান শিক্ষকের (Professorial position) দায়িত্ব লাভ করেন।
- দারুল হাদিসের প্রধান: ইমাম আদ-দাহাবী এবং ইমাম তাজউদ্দীন আস-সুবকীর ইন্তেকালের পর তিনি দামেস্কের বিখ্যাত হাদিস একাডেমি ‘দারুল হাদিস আল-আশরাফিয়্যাহ’ এবং ‘সালেহিয়্যাহ স্কুল’-এর প্রধান শায়খ বা অধ্যক্ষের পদ অলঙ্কৃত করেন।
তিনি আমৃত্যু ফতোয়া প্রদান, ছাত্রদের পাঠদান এবং গ্রন্থ রচনার কাজে নিজেকে ব্যস্ত রেখেছিলেন।
৫. কালজয়ী সাহিত্যকর্ম ও অনন্য অবদান
ইমাম ইবনে কাসির (রহ.) বিভিন্ন বিষয়ে বহু মূল্যবান গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁর লেখার গভীরতা, নিরপেক্ষতা এবং সহজ উপস্থাপন শৈলীর কারণে তাঁর বইগুলো তাঁর জীবদ্দশাতেই মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছিল।
তার প্রধান এবং সবচেয়ে বিখ্যাত গ্রন্থগুলোর বিস্তারিত বিবরণ নিচে দেওয়া হলো:
১. তাফসীরুল কুরআনিল আজীম (তাফসীর ইবনে কাসীর)
এটি বিশ্বজুড়ে ‘তাফসীর ইবনে কাসীর’ নামে পরিচিত। পবিত্র কুরআনের ব্যাখ্যার ইতিহাসে এটিকে অন্যতম শ্রেষ্ঠ এবং নির্ভরযোগ্য তাফসীর গ্রন্থ হিসেবে গণ্য করা হয়। ইমাম ইবনে জারীর আত-তাবারীর ‘তাফসীর আত-তাবারী’-এর পরেই এর স্থান।
তাফসীরের পদ্ধতি (Methodology): ইমাম ইবনে কাসির তাঁর এই গ্রন্থে ‘তাফসীর বিল মা’সুর’ বা বর্ণনাভিত্তিক তাফসীর পদ্ধতি অনুসরণ করেছেন। তিনি কুরআনকে ব্যাখ্যা করার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক ক্রমিক নীতি ব্যবহার করেছেন, যা তিনি তাঁর উস্তাদ ইবনে তাইমিয়্যাহর কাছ থেকে শিখেছিলেন:
১. কুরআন দ্বারা কুরআনের তাফসীর: একটি আয়াতের ব্যাখ্যা কুরআনের অন্য আয়াত দ্বারা করা।
২. হাদিস দ্বারা তাফসীর: রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সহীহ সুন্নাহ বা হাদিসের মাধ্যমে ব্যাখ্যা।
৩. সাহাবিদের বাণী: সাহাবায়ে কেরামের (রা.) ব্যাখ্যা ও মতামত উপস্থাপন।
৪. তাবেয়ীদের মতামত: সাহাবিদের পরবর্তী প্রজন্মের বক্তব্য আমলে নেওয়া।
- ইসরাইলি রেওয়ায়াতের বর্জন: এই তাফসীরের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, তিনি পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের (ইহুদি ও খ্রিস্টানদের প্রাচীন গল্প বা Isra’iliyyat) অবৈজ্ঞানিক ও কাল্পনিক কিতাবী গল্পগুলোকে কঠোরভাবে সমালোচনা ও বর্জন করেছেন।
- হাদিসের মান নির্ণয়: একজন দক্ষ মুহাদ্দিস হওয়ায় তিনি আয়াতের নিচে উল্লেখিত হাদিসগুলোর সনদ বা সূত্র সহীহ (বিশুদ্ধ) নাকি যয়ীফ (দুর্বল)—তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করে দিয়েছেন।
২. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া (শুরু ও শেষ)
এটি ১৪ খণ্ডের একটি বিশাল বিশ্বকোষীয় ইতিহাস গ্রন্থ। ইসলামের ইতিহাসে এত ব্যাপক ও তথ্যসমৃদ্ধ ইতিহাস গ্রন্থ খুব কমই রচিত হয়েছে। বইটির নাম থেকেই এর পরিধি বোঝা যায়—সৃষ্টির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত।
- প্রথম অংশ (আল-বিদায়া): এতে আরশের সৃষ্টি, আসমান-জমিন, ফেরেশতা, জিন জাতি, হযরত আদম (আ.) থেকে শুরু করে সকল নবী-রাসূলদের বিস্তারিত ইতিহাস এবং প্রাচীন জাতিসমূহের উত্থান-পতনের কাহিনী বর্ণিত হয়েছে।
- দ্বিতীয় অংশ (সীরাত ও ইতিহাস): এই অংশে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর পবিত্র জীবন (সীরাত) অত্যন্ত নিখুঁতভাবে আলোচনা করা হয়েছে। এরপর খোলাফায়ে রাশেদীন, উমাইয়া খিলাফত, আব্বাসী খিলাফত এবং লেখকের সমসাময়িক কাল (হিজরি অষ্টম শতাব্দী) পর্যন্ত প্রতি বছরের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সামরিক ঘটনাবলী কালানুক্রমিকভাবে (Year by year) লিপিবদ্ধ করা হয়েছে।
- তৃতীয় অংশ (ওয়ান নিহায়া): এই অংশে কেয়ামতের আলামত বা লক্ষণসমূহ, দাজ্জাল, হযরত ঈসা (আ.)-এর আগমন, হাশরের ময়দান, জান্নাত এবং জাহান্নামের বিবরণ বিস্তারিতভাবে কুরআন ও হাদিসের আলোকে আলোচনা করা হয়েছে।
৩. আল-সীরাহ আন-নাবাবিয়্যাহ (নবীজীর জীবনী)
মূলত ‘আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া’ গ্রন্থের সীরাত অংশটিকে পরবর্তীতে আলাদা গ্রন্থ হিসেবে রূপ দেওয়া হয়। এটি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনের ওপর লেখা অন্যতম প্রামাণ্য দলিল, যেখানে প্রতিটি ঘটনার ঐতিহাসিক সত্যতা হাদিসের সনদের আলোকে যাচাই করা হয়েছে।
৪. আত-তাকমীল ফী মা’রিফাতিস সিকাতি ওয়াশ শুয়াফা ওয়াল মাজাহিল
এটি হাদিস শাস্ত্রের ‘ইলমুর রিজাল’ বিষয়ক একটি অনন্য বিশ্বকোষ। ইমাম ইবনে কাসির তাঁর দুই মহান উস্তাদ ইমাম আল-মিজ্জি এবং ইমাম আদ-দাহাবীর দুটি বিখ্যাত গ্রন্থকে একত্রিত করে, নিজের গবেষণালব্ধ তথ্য যোগ করে এটি তৈরি করেন। এতে হাজার হাজার হাদিস বর্ণনাকারীর জীবনী এবং তাদের নির্ভরযোগ্যতার মান (Jarh wa Ta’dil) নির্ধারণ করা হয়েছে।
৫. অন্যান্য উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ
- জামেউল মাসানীদ ওয়াস সুনান: ইমাম আহমদ বিন হাম্বলের মুসনাদসহ অন্যান্য হাদিস গ্রন্থকে বর্ণনানুক্রমিক বিন্যাস করার একটি অসমাপ্ত মেগা প্রজেক্ট।
- ত্ববকাতুশ শাফেঈয়্যাহ: শাফেয়ী মাযহাবের বিখ্যাত আলেম ও ইমামদের জীবনীমূলক গ্রন্থ।
- ইখতিসার উলূমিল হাদিস: হাফিজ ইবনুস সালাহ-এর হাদিস বিজ্ঞানের ওপর লেখা কঠিন বইটির একটি চমৎকার সহজ ও সংক্ষিপ্ত রূপ।
- কিতাবুল ফিতান: কেয়ামতের পূর্বে মুসলিম উম্মাহর মধ্যে ঘটিতব্য বিভিন্ন ফিতনা ও যুদ্ধ-বিগ্রহের বিবরণ।
৬. আকীদা ও ধর্মতাত্ত্বিক অবস্থান
ইমাম ইবনে কাসির (রহ.) ধর্মীয় বিশ্বাসের ক্ষেত্রে ‘আসলাফ’ বা সালাফে সালেহীনের (প্রথম যুগের মুসলিম মনিষী) আকীদা পোষণ করতেন, যা মূলত ‘আসারী’ (Athari Creed) নামে পরিচিত।
- তাফউইদ ও ইসবাত: আল্লাহর নাম ও গুণাবলীর (Attributes of Allah) ক্ষেত্রে তিনি কোনো প্রকার মানবীয় সাদৃশ্য (Anthropomorphism) বা যুক্তিভিত্তিক বিকৃত ব্যাখ্যা (Ta’wil) প্রদান করতেন না। কুরআন ও হাদিসে আল্লাহর যেসব গুণ যেভাবে বর্ণিত হয়েছে, কোনো রকম রূপক বা দার্শনিক ব্যাখ্যা ছাড়াই সেগুলোকে যেভাবে আছে সেভাবে বিশ্বাস করতেন, পাশাপাশি স্রষ্টাকে সৃষ্টির সাথে তুলনা করা থেকে বিরত থাকতেন।
- যুক্তির চেয়ে দলিলের প্রাধান্য: তিনি কালামশাস্ত্র বা গ্রীক দর্শনভিত্তিক যুক্তিবিদ্যার (Rationalistic theology) চেয়ে কুরআন ও সুন্নাহর অকাট্য টেক্সট বা দলিলের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভর করতেন। এই ক্ষেত্রে তিনি তাঁর উস্তাদ ইবনে তাইমিয়্যাহর চিন্তাধারার হুবহু অনুসারী ছিলেন।
৭. সমকালীন মনীষীদের দৃষ্টিতে ইবনে কাসির (উক্তি ও মূল্যায়ন)
ইমাম ইবনে কাসিরের সমসাময়িক এবং পরবর্তী যুগের বড় বড় পন্ডিতগণ তাঁর জ্ঞান, স্মরণশক্তি এবং সততার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।
- ইমাম আদ-দাহাবী (রহ.) তাঁর ছাত্র সম্পর্কে লিখেছেন:”তিনি হলেন একাধারে ফকীহ (আইনবিদ), মুফতি, বিশিষ্ট মুহাদ্দিস এবং তাফসীর শাস্ত্রে একজন পারদর্শী পন্ডিত। তিনি বহু উপকারী গ্রন্থ রচনা করেছেন এবং খুব অল্প বয়সেই সমসাময়িকদের ওপর প্রাধান্য বিস্তার করেছেন।”
- হাফিজ ইবনে হাজার আল-আসকালানী (রহ.) তাঁর বিখ্যাত ‘আদ-দুরার আল-কামিনাহ’ গ্রন্থে লিখেছেন:”ইবনে কাসির হাদিসের মতন (মূল পাঠ) এবং সনদ (সূত্র)—উভয় বিষয়ের ওপর অসাধারণ কাজ করেছেন। তাঁর স্মরণশক্তি ছিল প্রখর এবং তাঁর জীবদ্দশাতেই তাঁর বইগুলো চারদিকে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। তাঁর ইন্তেকালের পর মানুষ তাঁর লেখনী দ্বারা ব্যাপকভাবে উপকৃত হচ্ছে।”
- ঐতিহাসিক ইবনে তাগরী বার্দী তাঁর ‘আল-মানহাল আস-সাফী’ গ্রন্থে লিখেছেন:”তিনি ছিলেন ইলমের সাগর। হাদিস, তাফসীর, ফিকহ এবং আরবি ব্যাকরণে তাঁর জ্ঞান ছিল সীমাহীন। তিনি আমৃত্যু ফতোয়া ও শিক্ষাদানের কাজে নিয়োজিত ছিলেন। বিশেষ করে ইতিহাস ও হাদিস শাস্ত্রে তিনি ছিলেন তাঁর যুগের অন্যতম রেফারেন্স।”
- তাঁর ছাত্র ইবনে হাজ্জী বর্ণনা করেন:”আমি যতবারই তাঁর মজলিসে বসেছি, ততবারই নতুন কোনো জ্ঞান বা উপকার লাভ করেছি। হাদিসের মতন মুখস্থ রাখার ক্ষেত্রে তাঁর চেয়ে বড় হাফিজ আমি আর দেখিনি।”
৮. শেষ জীবন ও ইন্তেকাল
জীবনের শেষভাগে এসে ইমাম ইবনে কাসির (রহ.) চোখের দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেন (অন্ধ হয়ে যান)। অতিরিক্ত রাত জেগে পড়াশোনা এবং কিতাব লেখার কারণে তাঁর চোখের ওপর প্রচণ্ড চাপ পড়েছিল। বিশেষ করে ইমাম আহমদ বিন হাম্বলের বিখ্যাত ‘মুসনাদ’ গ্রন্থটিকে রাবীদের নামের পরিবর্তে বিষয়ভিত্তিক (Topical arrangement) নতুন করে সাজানোর জন্য তিনি রাতের পর রাত মোমবাতির আলোয় কাজ করেছিলেন। এই কঠিন পরিশ্রমের কারণেই জীবনের শেষ দিনগুলোতে তিনি দৃষ্টিহীন হয়ে পড়েন।
অবশেষে জ্ঞানজগতের এই উজ্জ্বল নক্ষত্র ৭৭৪ হিজরির ২৬শে শাবান (২৮শে ফেব্রুয়ারি, ১৩৭৩ খ্রিস্টাব্দ) রোজ বৃহস্পতিবার সিরিয়ার দামেস্কে ইন্তেকাল করেন।
দাফন
তাঁর অসিয়ত বা শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী, দামেস্কের বিখ্যাত ‘বাবুত তূমা’ (Bab al-Tuma) কবরস্থানে তাঁর প্রিয় উস্তাদ শায়খুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রহ.)-এর কবরের ঠিক পাশেই তাঁকে দাফন করা হয়। ওফাতের পর সালাফী ও শাফেয়ী ধারার হাজার হাজার মানুষ তাঁর জানাজায় শরিক হন।
৯. সারসংক্ষেপ ও বর্তমান বিশ্বে তাঁর প্রভাব
ইমাম ইবনে কাসির (রহ.)-এর জীবন ছিল এক অবিরাম সাধনার নাম। চার বছর বয়সে পিতাকে হারিয়ে একজন এতিম শিশু হিসেবে যে জীবনের শুরু হয়েছিল, তা শেষ হয়েছিল তৎকালীন বিশ্বের শ্রেষ্ঠতম স্কলার বা পণ্ডিত হিসেবে।
আজকের আধুনিক বিশ্বেও তাঁর প্রভাব অপরিসীম। মক্কা-মদিনা থেকে শুরু করে উপহাদেশের সাধারণ মাদ্রাসা কিংবা পশ্চিমা বিশ্বের বড় বড় ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার—সব জায়গাতেই ‘তাফসীর ইবনে কাসীর’ এবং ‘আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া’ ইসলামকে জানার প্রধানতম ও নির্ভরযোগ্য উৎস হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। বিশেষ করে আধুনিক যুগে সালাফী বা আহলে হাদিস আন্দোলন এবং সাধারণ সুন্নী ঘরানার গবেষকদের কাছে তাঁর বইগুলো ইসলামের মৌলিক ভিত্তি বোঝার জন্য অপরিহার্য। তিনি তাঁর লেখনী ও সততার মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহর হৃদয়ে কিয়ামত পর্যন্ত বেঁচে থাকবেন।
তথ্যসূত্র: ইমাম ইবনে কাসিরের এই জীবনীটি তাঁর নিজের লেখা ‘আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া’র ভূমিকা, হাফিজ ইবনে হাজার আল-আসকালানীর ‘আদ-দুরার আল-কামিনাহ’, ইমাম আদ-দাহাবীর ‘আল-মু’জাম আল-মুখতাস’ এবং বিশ্বকোষীয় ঐতিহাসিক তথ্যের ওপর ভিত্তি করে সংকলিত।
তার লিখিত কিছু কিতাব :
০১. তাফসিরে ইবনে কাসির

তাফসিরে ইবনে কাসির ইসলামি শাস্ত্রের ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রভাবশালী একটি গ্রন্থ। হাফেজ ইমাদউদ্দীন ইবনে কাসির (রহ.) ছিলেন একাধারে প্রখ্যাত মুহাদ্দিস, ইতিহাসবিদ এবং মুফাসসির। তাঁর পুরো নাম আবুল ফিদা ইসমাইল বিন উমর বিন কাসির। তিনি ৭০১ হিজরি মোতাবেক ১৩০১ খ্রিস্টাব্দে সিরিয়ার দামেস্কের ‘মাজদাল’ নামক গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।
শৈশবেই তিনি পিতৃহারা হন এবং বড় ভাইয়ের তত্ত্বাবধানে দামেস্কে শিক্ষালাভ করেন। তিনি তৎকালীন শ্রেষ্ঠ আলেমদের সান্নিধ্য পান, যার মধ্যে বিখ্যাত শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) অন্যতম। তাঁর চিন্তা ও দর্শনে ইবনে তাইমিয়ার গভীর প্রভাব লক্ষ্য করা যায়।
তিনি ইলমে হাদিস, ফিকহ এবং ইতিহাসে অগাধ পাণ্ডিত্যের অধিকারী ছিলেন। তাঁর রচিত ইতিহাস গ্রন্থ ‘আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া’ বিশ্ববিখ্যাত
তাফসিরে ইবনে কাসির-এর পরিচয় ও বৈশিষ্ট্য
কুরআন মাজিদের ব্যাখ্যাগ্রন্থগুলোর মধ্যে ‘তাফসিরুল কুরআনিল আজিম’ (যা সাধারণভাবে ‘তাফসিরে ইবনে কাসির’ নামে পরিচিত) সর্বাধিক সমাদৃত। এর বিশেষত্ব হলো এটি ‘তাফসির বিল মাসুর’ বা বর্ণনাভিত্তিক তাফসিরের সর্বোত্তম উদাহরণ।
প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ:
- কুরআন দ্বারা কুরআনের তাফসির: তিনি একটি আয়াতের ব্যাখ্যায় সংশ্লিষ্ট অন্য আয়াতগুলোকে প্রথমে উপস্থাপন করেছেন। এটি তাফসিরের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি।
- হাদিস দ্বারা ব্যাখ্যা: আয়াতের মর্মার্থ স্পষ্ট করতে তিনি অসংখ্য নির্ভরযোগ্য হাদিস ও সাহাবায়ে কেরামের আছার (উদ্ধৃতি) উল্লেখ করেছেন।
- হাদিসের মান যাচাই: মুহাদ্দিস হওয়ার কারণে তিনি বর্ণিত হাদিসগুলোর সত্যতা ও মান (সহিহ বা জয়িফ) যাচাই করে মন্তব্য করেছেন, যা অন্য অনেক তাফসিরে পাওয়া যায় না।
- ইসরায়েলি বর্ণনা বর্জন: তিনি অতিরঞ্জিত বা ভিত্তিহীন ইসরায়েলি (বনি ইসরাইল সংক্রান্ত) বর্ণনা থেকে এই তাফসিরকে পবিত্র রাখার চেষ্টা করেছেন এবং যেখানে এনেছেন সেখানে সেগুলোর অসারতা প্রমাণ করেছেন।
- সহজবোধ্য ভাষা: কিতাবটি পাণ্ডিত্যপূর্ণ হলেও এর ভাষা অত্যন্ত প্রাঞ্জল, যা সাধারণ পাঠক ও গবেষক—উভয়ের জন্যই সমান উপযোগী।
সারকথা: তাফসিরে ইবনে কাসির কেবল একটি বই নয়, বরং এটি কুরআন বুঝার জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্বকোষ। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের আলেমদের নিকট এটি একটি আকর গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত।
ইসলামিক ফাউন্ডেশন থেকে প্রকাশিত সকল খন্ডের ডাউনলোড লিংক হলো :
প্রথম খল্ড। দ্বিতীয় খল্ড। তৃতীয় খল্ড। চতুর্থ খল্ড। পঞ্চম খল্ড। ষষ্ঠ খল্ড। সপ্তম খল্ড। অষ্টম খল্ড। নবম খল্ড। দশম খল্ড। একাদশ খল্ড।
তাফসির ইবনে কাসির : অনুবাদক : ড. মুহাম্মাদ মুজীবুর রহমান, প্রকাশক : তাফসির পাবলিকেশন কমিটি।

ড. মুহাম্মাদ মুজীবুর রহমান অনুদিত এবং তাফসির পাবলিকেশন কমিটি কর্তৃক প্রকাশি তাফসির ইবনে কাসিরের ডাউনলোড নিংক হলো :
| খণ্ড নম্বর | ডাউনলোড |
| প্রথম খণ্ড | ডাউনলোড |
| দ্বিতীয় ও তৃতীয় খণ্ড | ডাউনলোড |
| চতুর্থ , পঞ্চম, ষষ্ঠ ও সপ্তম খণ্ড | ডাউনলোড |
| অষ্টম, নবম, দশম ও একদশ খণ্ড | ডাউনলোড |
| দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ খণ্ড | ডাউনলোড |
| চতুর্দশ খণ্ড | ডাউনলোড |
| পঞ্চদশ খণ্ড | ডাউনলোড |
| ষোড়ষ খণ্ড | ডাউনলোড |
| সপ্তদশ খণ্ড | ডাউনলোড |
| অষ্টদশ খণ্ড | ডাউনলোড |
০২. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া
ইমাম ইবনে কাসীর (রহ.)-এর অমর সৃষ্টি ‘আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া’ বা ‘ইতিহাসের শুরু ও শেষ’ মুসলিম উম্মাহর জ্ঞানভাণ্ডারে এক অমূল্য রত্ন।

আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: সৃষ্টির আদি-অন্তের প্রামাণ্য ইতিহাস
ইসলামি ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম ও সর্বাধিক নির্ভরযোগ্য আকর গ্রন্থগুলোর মধ্যে ‘আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া’ অন্যতম। প্রখ্যাত মুফাসসির, মুহাদ্দিস ও ইতিহাসবেত্তা আল্লামা হাফিজ ইবনে কাসীর (রহ.) কর্তৃক প্রণীত এই গ্রন্থটি কেবল একটি সাধারণ ইতিহাস বই নয়, বরং এটি সৃষ্টিজগতের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এক মহাকাব্যিক পথরেখা। লেখক এতে কুরআন, সুন্নাহ এবং নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক বর্ণনার আলোকে মহাবিশ্বের জন্ম থেকে শুরু করে কিয়ামত পরবর্তী পরকাল পর্যন্ত সবটুকু চিত্র তুলে ধরেছেন।
গ্রন্থের কাঠামো ও বিন্যাস
বিশাল এই গ্রন্থটি সাধারণত ১০ টি খণ্ডে বিন্যস্ত (প্রকাশনা ভেদে ভিন্ন হতে পারে)। লেখক তাঁর এই বিশাল গবেষণাকর্মকে প্রধানত তিনটি মৌলিক ভাগে বিভক্ত করেছেন:
- প্রথম ভাগ (সৃষ্টির আদি কথা ও নবুওয়াত): এতে আরশ, কুরসী, লওহে মাহফুজ, আসমান-জমিন এবং এদের মধ্যবর্তী যা কিছু আছে—যেমন ফেরেশতা, জিন ও শয়তানের সৃষ্টিতত্ত্ব আলোচনা করা হয়েছে। এরপর মানবজাতির পিতা আদম (আ.) থেকে শুরু করে যুগে যুগে প্রেরিত নবী-রাসূলগণের দাওয়াতি জীবন ও তাঁদের উম্মতদের কাহিনী বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে। এই ভাগের সমাপ্তি ঘটেছে সর্বশ্রেষ্ঠ নবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর পবিত্র সীরাত বা জীবন-চরিত আলোচনার মাধ্যমে।
- দ্বিতীয় ভাগ (ইসলামের স্বর্ণযুগ ও সমকাল): রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওফাত পরবর্তী সময় থেকে শুরু করে লেখকের নিজ সময় (৭৬৮ হিজরী) পর্যন্ত সুদীর্ঘ কালের রাজনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় ইতিহাস এখানে স্থান পেয়েছে। সাহাবায়ে কেরাম, তাবেঈন এবং পরবর্তী যুগের প্রখ্যাত মনিষীদের জীবনী ও কর্ম এখানে অত্যন্ত বস্তুনিষ্ঠভাবে চিত্রায়িত হয়েছে।
- তৃতীয় ভাগ (ভবিষ্যৎ ও পরকাল): এই অংশটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও কৌতূহলোদ্দীপক। এতে কিয়ামতের নিকটবর্তী সময়ের বিভিন্ন ফিতনা-ফাসাদ, যুদ্ধ-বিগ্রহ, দাজ্জালের আবির্ভাব, ঈসা (আ.)-এর অবতরণসহ কিয়ামতের আলামতসমূহ আলোচনা করা হয়েছে। সবশেষে হাশর-নশর, বিচার দিবস এবং জান্নাত ও জাহান্নামের বিশদ বিবরণের মাধ্যমে গ্রন্থটি সমাপ্ত হয়েছে।
গ্রন্থের অনন্য বৈশিষ্ট্য ও গ্রহণযোগ্যতা
আল্লামা ইবনে কাসীর (রহ.) তাঁর এই গ্রন্থে প্রতিটি বর্ণনা কুরআন, হাদীস, সাহাবাগণের আসার এবং নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক তথ্যসূত্র দ্বারা সমৃদ্ধ করেছেন। তথ্যের বিশুদ্ধতা যাঁচাইয়ে তিনি তাঁর মুহাদ্দিসসুলভ প্রজ্ঞা ব্যবহার করেছেন, যা একে অন্যান্য সাধারণ ইতিহাস গ্রন্থ থেকে আলাদা করে তুলেছে।
বিখ্যাত মুহাদ্দিস ও ইতিহাসবিদ ইবনে হাজার আসকালানী (রহ.), ইবনুল ইমাদ আল-হাম্বলী (রহ.) প্রমুখ মনিষী এই গ্রন্থের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। এর গুরুত্ব উপলব্ধি করে বদরুদ্দীন আইনী হানাফী (রহ.) এবং ইবনে হাজার আসকালানী (রহ.) গ্রন্থটির সার-সংক্ষেপও রচনা করেছেন।
‘আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া’ কেবল মুসলিম পাঠকদের জন্যই নয়, বরং বিশ্ব ইতিহাসের যেকোনো গবেষকের জন্য এক অপরিহার্য উৎস। এটি আমাদের যেমন শেকড়ের সন্ধান দেয়, তেমনি ভবিষ্যতের পরকালীন জীবনের পাথেয় সংগ্রহে সতর্ক করে।
বিখ্যাত এই গ্রন্থটির ১-১৪ খন্ড অনুবাদ প্রকাশ করেছে ইসলামিক ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ। নিচে এ গ্রন্থগুলোর ডাউনলোড লিংক দেওয়া হলো :
| ক্র: নং | খণ্ড নম্বর | ডাউনলোড |
| ০১ | প্রথম খণ্ড | ডাউনলোড |
| ০২ | দ্বিতীয় খণ্ড | ডাউনলোড |
| ০৩ | তৃতীয় খণ্ড | ডাউনলোড |
| ০৪ | চতুর্থ খণ্ড | ডাউনলোড |
| ০৫ | পঞ্চম খণ্ড | ডাউনলোড |
| ০৬ | ষষ্ঠ খণ্ড | ডাউনলোড |
| ০৭ | সপ্তম খণ্ড | ডাউনলোড |
| ০৮ | অষ্টম খণ্ড | ডাউনলোড |
| ০৯ | নবম খণ্ড | ডাউনলোড| |
| ১০ | দশম খণ্ড | ডাউনলোড |
| ১১ | একদশ খণ্ড | ডাউনলোড |
| ১২ | দ্বাদশ খণ্ড | ডাউনলোড |
| ১৩ | ত্রয়োদশ খণ্ড | ডাউনলোড |
| ১৪ | চতুর্দশ খণ্ড | ডাউনলোড |