মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ খতিব আল-তাবরিজি (রহ.)

হাদিস শাস্ত্রের ইতিহাসে যে কয়টি গ্রন্থ যুগ যুগ ধরে মুসলিম উম্মাহ ও বিশেষ করে দ্বীনি মাদরাসাগুলোর শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের হৃদয়ে অনন্য স্থান দখল করে আছে, তার মধ্যে “মিশকাতুল মাসাবীহ” অন্যতম। আর এই অমূল্য রত্নটি যিনি উম্মাহর কল্যাণে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে বিন্যস্ত ও পরিমার্জিত করেছেন, তিনি হলেন আল্লামা ওয়ালীউদ্দীন আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ আল-খতিব আল-তাবরিজি (রহ.)। হাদিস সংকলন, বিন্যাস এবং ইলমে হাদিসের প্রসারে তার অবদান চিরস্মরণীয়।

জন্ম ও বংশ পরিচয়

আল্লামা খতিব আল-তাবরিজি (রহ.)-এর জন্ম ও প্রারম্ভিক জীবন সম্পর্কে ইতিহাসের পাতায় খুব বেশি বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায় না। তবে তার উপাধি ও বংশলতিকা থেকে তার পরিচয় স্পষ্ট হয়। তার পুরো নাম হলো মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে খতিব। তার লকব বা উপাধি ছিল “ওয়ালীউদ্দীন” (দ্বীনের অভিভাবক) এবং কুনিয়াত বা উপনাম ছিল “আবু আবদুল্লাহ”

তার নামের শেষে যুক্ত ‘আল-তাবরিজি’ শব্দ থেকে নিশ্চিত হওয়া যায় যে, তিনি তৎকালীন পারস্যের (বর্তমান ইরান) বিখ্যাত জ্ঞানকেন্দ্র তাবরিজ নগরীতে জন্মগ্রহণ করেন। ধারণা করা হয়, তিনি সপ্তম হিজরির শেষভাগে অথবা অষ্টম হিজরির শুরুর দিকে (১৩ শতকের শেষ বা ১৪ শতকের শুরুতে) জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা বা পূর্বপুরুষেরা তাবরিজ অঞ্চলের খতিব (মসজিদের ইমাম ও খুতবা প্রদানকারী) ছিলেন বলে তাকে ‘আল-খতিব’ বলা হতো।

শিক্ষাজীবন ও ইলম অর্জন

খতিব তাবরিজি (রহ.) এমন এক যুগে জন্মগ্রহণ করেছিলেন, যখন বাগদাদ, দামেস্ক ও পারস্যের বিভিন্ন অঞ্চল জুড়ে ইলমে হাদিস ও ফিকহের ব্যাপক চর্চা ছিল। তিনি বাল্যকালেই পবিত্র কুরআন হিফজ সম্পন্ন করেন এবং তৎকালীন তাবরিজের শ্রেষ্ঠ উলামাদের সান্নিধ্যে এসে আরবি ভাষা, ব্যাকরণ, ফিকহ এবং আকাইদের বুনিয়াদি শিক্ষা লাভ করেন।

পরবর্তীতে উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি সমকালীন শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস ও ফকিহদের দ্বারস্থ হন। ইলমে হাদিসের প্রতি তার অনুরাগ ছিল সীমাহীন। বিশেষ করে হাদিসের সনদ (বর্ণনাসূত্র), রাবী (বর্ণনাকারী) এবং হাদিসের বিশুদ্ধতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে তিনি গভীর পাণ্ডিত্য অর্জন করেন।

প্রধান উস্তাদ: ইমাম আল-তিবি (রহ.)

আল্লামা খতিব তাবরিজি (রহ.)-এর জীবনে সবচেয়ে বড় প্রভাব ছিল তার প্রধান উস্তাদ এবং আধ্যাত্মিক রাহবার ইমাম শরফুদ্দিন আল-হুসাইন ইবনে আবদুল্লাহ আল-তিবি (রহ.)-এর। ইমাম তিবি ছিলেন তৎকালীন যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস, মুফাসসির এবং সুফী সাধক। খতিব তাবরিজি তার উস্তাদের সান্নিধ্যে দীর্ঘ সময় কাটান এবং তার কাছ থেকে হাদিসের গভীর তত্ত্ব ও সুক্ষ্ম জ্ঞান লাভ করেন। বস্তুত, ইমাম তিবির প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধান ও অনুপ্রেরণাতেই খতিব তাবরিজি (রহ.) তার জীবনের শ্রেষ্ঠ কীর্তি ‘মিশকাতুল মাসাবীহ’ রচনায় হাত দিয়েছিলেন।

কালজয়ী কর্ম: মিশকাতুল মাসাবীহ রচনা

আল্লামা খতিব তাবরিজি (রহ.)-এর খ্যাতির মূল ভিত্তি হলো ‘মিশকাতুল মাসাবীহ’। এর একটি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট রয়েছে। ইমাম আবু মুহাম্মদ আল-হুসাইন ইবনে মাসউদ আল-বাগাভী (রহ.) (মৃত্যু: ৫১৬ হিজরি) পূর্বে “মাসাবীহুস সুন্নাহ” নামে একটি চমৎকার হাদিস গ্রন্থ সংকলন করেছিলেন। গ্রন্থটি অত্যন্ত জনপ্রিয় হলেও তাতে দুটি প্রধান সীমাবদ্ধতা ছিল:

১. হাদিসগুলোর শেষে বর্ণনাকারী সাহাবীর নাম উল্লেখ ছিল না।

২. হাদিসগুলো সিহাহ সিতাহ (ছয়টি বিশুদ্ধ গ্রন্থ) বা অন্য কোন কিতাব থেকে নেওয়া হয়েছে, তার সুনির্দিষ্ট উৎস বা হাওয়ালা ছিল না।

খতিব তাবরিজি (রহ.) তার উস্তাদ ইমাম তিবির পরামর্শে এই অভাব দূর করার উদ্যোগ নেন। তিনি মূল গ্রন্থের বিন্যাস ঠিক রেখে প্রতিটি হাদিসের সাথে বর্ণনাকারী সাহাবীর নাম যুক্ত করেন এবং হাদিসটি বুখারী, মুসলিম, তিরমিজি, আবু দাউদ, নাসায়ি নাকি ইবনে মাজাহ থেকে নেওয়া—তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করে দেন।

পাশাপাশি, তিনি মূল গ্রন্থের প্রতিটি অধ্যায়ে (Chapter) তিনটি করে পরিচ্ছেদ (Section) তৈরি করেন:

  • প্রথম পরিচ্ছেদ: ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিম (রহ.) কর্তৃক যৌথভাবে বা এককভাবে বর্ণিত হাদিস (মুত্তাফাকুন আলাইহি)।
  • দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ: অন্যান্য প্রধান মুহাদ্দিসগণের (যেমন তিরমিজি, আবু দাউদ) বর্ণিত হাদিস।
  • তৃতীয় পরিচ্ছেদ: অধ্যায়ের বিষয়ের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ অন্যান্য হাদিস ও আসার (সাহাবিদের বাণী)।

তিনি এই পরিমার্জিত ও সমৃদ্ধ রূপটির নাম দেন “মিশকাতুল মাসাবীহ” (যার অর্থ: প্রদীপের আলো রাখার তাক)। ৭৩৭ হিজরির রমজান মাসে এই মহান গ্রন্থের সংকলন কাজ সমাপ্ত হয়।

অন্যান্য সাহিত্যকর্ম

‘মিশকাতুল মাসাবীহ’ ছাড়াও আল্লামা খতিব তাবরিজি (রহ.) ইসলামি জ্ঞানবিজ্ঞানের অন্যান্য শাখায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। বিশেষ করে আরবি সাহিত্য, ব্যাকরণ ও প্রাচীন কবিতার ব্যাখ্যায় তার গভীর পাণ্ডিত্য ছিল। তার অন্যান্য উল্লেখযোগ্য রচনার মধ্যে রয়েছে:

  • শরহু দিওয়ানিল হামাসাহ: বিখ্যাত কবি আবু তাম্মামের ‘হামাসাহ’ নামক কবিতা সংকলনের অত্যন্ত সুললিত ও তাত্ত্বিক ব্যাখ্যাগ্রন্থ।
  • শরহুল কাসাইদিল আশর: আরবের প্রাচীন দশটি বিখ্যাত ঝুলন্ত কবিতার (মুয়াল্লাকা) চমৎকার ব্যাখ্যা।
  • আল-ইকমাল ফী আসমাইর রিজাল: মিশকাতুল মাসাবীহ গ্রন্থে যেসকল সাহাবী ও রাবীদের নাম এসেছে, তাদের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি ও জীবনী নিয়ে লেখা একটি আকর গ্রন্থ।

গুণাবলী ও চরিত্র

ব্যক্তিজীবনে খতিব তাবরিজি (রহ.) ছিলেন অত্যন্ত মুত্তাকী, পরহেজগার, বিনয়ী এবং মুখলিস (একনিষ্ঠ) একজন মানুষ। তিনি পার্থিব খ্যাতি বা ধন-সম্পদের মোহ থেকে দূরে থেকে সারাজীবন ইলমের খেদমতে মগ্ন ছিলেন। তার উস্তাদ ইমাম তিবি (রহ.) তাকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন এবং তার সততা ও মেধার উচ্চ প্রশংসা করতেন। মিশকাত গ্রন্থটি লেখার পেছনে তার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল সাধারণ মুসলিম ও শিক্ষার্থীদের জন্য রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহকে সহজলভ্য করা।

ইন্তেকাল

এই মহান মনীষী ও হাদিস বিশারদের মৃত্যুর সঠিক তারিখ নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে সামান্য মতভেদ রয়েছে। তবে অধিকাংশ নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক ও জীবনীকারের মতে, তিনি ৭৪১ হিজরি (মোতাবেক ১৩৪০ খ্রিস্টাব্দ) অথবা তার কিছু পরে ইন্তেকাল করেন।

যুগান্তকারী প্রভাব ও মূল্যায়ন

আল্লামা খতিব তাবরিজি (রহ.) আজ থেকে প্রায় সাতশত বছর আগে দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন, কিন্তু তার রেখে যাওয়া কাজ আজও জীবন্ত। বিশেষ করে ভারতীয় উপমহাদেশ (বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান), আরব বিশ্ব এবং মধ্য এশিয়ার দ্বীনি মাদরাসাগুলোতে ‘মিশকাতুল মাসাবীহ’ কুতুবে সিতাহ বা প্রধান ছয়টি হাদিস গ্রন্থে প্রবেশের মূল তোরণ বা সেতু হিসেবে পড়ানো হয়। হাদিস শাস্ত্রের এই মহান খাদেমের নাম পৃথিবীর বুকে যতদিন ইলমে হাদিসের চর্চা থাকবে, ততদিন অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করা হবে।

সংকলক : শায়খ ওয়ালীউদ্দীন আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ বিন আব্দুল্লাহ আল-খতীব আল-উমরী আত-তাবরিজী (রহ.)।

হাদিস সাহিত্যের বিশাল ভাণ্ডারে ‘মিশকাতুল মাসাবীহ’ একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং গুরুত্বপূর্ণ সংকলন। হাদিস শাস্ত্রের ইতিহাসে ‘মিশকাতুল মাসাবীহ’ একটি অনন্য নাম। মূল গ্রন্থটি ছিল ইমাম বগভী (রহ.) সংকলিত ‘মাসাবীহুস সুন্নাহ’। তবে সেখানে হাদিসের সূত্র বা রাবীদের নাম উল্লেখ ছিল না এবং হাদিসের মান (সহীহ, হাসান, যঈফ) স্পষ্ট করা ছিল না। পরবর্তীতে অষ্টম হিজরির প্রখ্যাত মুহাদ্দিস আল্লামা ওয়ালীউদ্দীন মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল্লাহ আল-খতীব আল-তাবরিজী (রহ.) এই অভাব পূরণ করেন। তিনি মূল গ্রন্থের সাথে আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ হাদিস যুক্ত করেন এবং প্রতিটি হাদিসের সূত্র ও মান সুনির্দিষ্ট করে গ্রন্থটিকে পূর্ণতা দান করেন। আরবি শব্দ ‘মিশকাত’ মানে হলো এমন তাক বা কুলুঙ্গি যেখানে প্রদীপ রাখা হয়; গ্রন্থটি যেন হাদিসের প্রদীপগুলো রাখার এক নিরাপদ আধার।

এই মহান সংস্কারক ও সংকলকের পূর্ণ নাম শায়খ ওয়ালীউদ্দীন আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ বিন আব্দুল্লাহ আল-খতীব আল-উমরী আত-তাবরিজী (রহ.)। তিনি ছিলেন হিজরি অষ্টম শতাব্দীর একজন প্রথিতযশা আলেম ও হাদিস বিশারদ। তিনি ইলমে হাদিসের পাশাপাশি আরবি সাহিত্য ও ব্যাকরণেও অত্যন্ত দক্ষ ছিলেন। তাঁর সততা, আল্লাহভীতি এবং হাদিস চর্চায় একাগ্রতা তাকে মুসলিম উম্মাহর কাছে চিরস্মরণীয় করে রেখেছে।

গ্রন্থের গুরুত্ব

মিশকাত শরীফে সিহাহ সিত্তাহসহ (বুখারী, মুসলিম প্রভৃতি) অন্যান্য নির্ভরযোগ্য হাদিস গ্রন্থ থেকে হাদিস চয়ন করা হয়েছে। কিতাবটি মূলত তিনটি খণ্ডে বিভক্ত:

  1. প্রথম খণ্ডে বুখারী ও মুসলিমের হাদিস।
  2. দ্বিতীয় খণ্ডে অন্যান্য সুনান গ্রন্থের (তিরমিযী, আবু দাউদ ইত্যাদি) হাদিস।
  3. তৃতীয় খণ্ডে বিষয়বস্তুর পরিপূরক আরও কিছু হাদিস।

সুন্দর বিন্যাস এবং প্রায় সকল বিষয়ের হাদিস অন্তর্ভুক্ত থাকায় এটি কওমি ও আলিয়া মাদ্রাসার পাঠ্যতালিকায় অন্যতম প্রধান কিতাব হিসেবে গণ্য হয়। যারা সংক্ষিপ্ত পরিসরে হাদিসের বিশাল জ্ঞান ভাণ্ডার সম্পর্কে ধারণা পেতে চান, তাদের জন্য মিশকাতুল মাসাবীহ এক অপরিহার্য নির্দেশিকা।

আধুনিক প্রকাশনি :

ক্র: নংখণ্ড নম্বরডাউনলোড
০১প্রথম খণ্ড ডাউনলোড
০২দ্বিতীয় খণ্ড ডাউনলোড
০৩তৃতীয় খণ্ড ডাউনলোড
০৪চতুর্থ খণ্ড ডাউনলোড

হাদিস একাডেমি

ক্র: নংখণ্ড নম্বরডাউনলোড
০১প্রথম খণ্ড ডাউনলোড
০২দ্বিতীয় খণ্ড ডাউনলোড
০৩তৃতীয় খণ্ড ডাউনলোড

সোলেমানিয়া বুক হাউজ কর্তুক প্রকাশিত :

ক্র: নংখণ্ড নম্বরডাউনলোড
০১প্রথম খণ্ড ডাউনলোড
০২দ্বিতীয় খণ্ড ডাউনলোড
০৩তৃতীয় খণ্ড ডাউনলোড
০৪চতুর্থ খণ্ড ডাউনলোড
০৫পঞ্চম খণ্ড ডাউনলোড
০৬ষষ্ঠ খণ্ড ডাউনলোড
০৭সপ্তম খণ্ড ডাউনলোড
০৮অষ্টম খণ্ড ডাউনলোড
০৯নবম খণ্ড ডাউনলোড
১০দশম খণ্ড ডাউনলোড
১১একদশ খণ্ড ডাউনলোড
১২দ্বাদশ খণ্ড ডাউনলোড

মিশকাতে বর্ণিত জাল ও যঈফ হাদিস :

ক্র: নংখণ্ড নম্বরডাউনলোড
০১প্রথম খণ্ড ডাউনলোড
০২দ্বিতীয় খণ্ড ডাউনলোড

তাহক্বীক মিশকাতুল মাসাবীহ

ক্র: নংখণ্ড নম্বরডাউনলোড
০১প্রথম খণ্ড ডাউনলোড
০২দ্বিতীয় খণ্ড ডাউনলোড
০৩তৃতীয় খণ্ডডাউনলোড


"বাংলা ইসলামিক বইয়ের বিশাল পিডিএফ (PDF) আর্কাইভ"