শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী

ইমামুল হিন্দ শাহ ওয়ালীউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী (রহ.)-এর জীবন ও কর্ম

অষ্টাদশ শতাব্দীর দক্ষিণ এশিয়ায় তথা ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলিম শাসন যখন পতনোন্মুখ, সমাজ যখন চরম নৈতিক বিপর্যয়, ধর্মীয় কুসংস্কার, রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা এবং আকিদাগত বিভ্রান্তিতে নিমজ্জিত, ঠিক সেই ক্রান্তিলগ্নে এক মহান সংস্কারকের আবির্ভাব ঘটেছিল। তিনি হলেন ‘ইমামুল হিন্দ’ শাহ ওয়ালীউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী (রহ.)। তিনি একাধারে ছিলেন একজন অনন্য সাধারণ মুহাদ্দিস, ফকীহ, সমাজবিজ্ঞানী, সুফি-সাধক, দার্শনিক ও দূরদর্শী রাজনৈতিক চিন্তাবিদ। উপমহাদেশে ইসলামের বিশুদ্ধ রূপ পুনরুদ্ধার এবং মুসলমানদের পুনর্জাগরণের পেছনে তাঁর অবদান একক ও অতুলনীয়। তিনি শুধু তাত্ত্বিক সংস্কারই করেননি, বরং ব্যবহারিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনের মাধ্যমে এমন এক ধারা তৈরি করে গেছেন, যা পরবর্তীকালে দারুল উলুম দেওবন্দ আন্দোলনসহ ভারতীয় উপমহাদেশের প্রায় সমস্ত খাঁটি ইসলামী আন্দোলনের মূল উৎস হিসেবে কাজ করেছে। তাকে উপমহাদেশের ইসলামি রেনেসাঁর অগ্রদূত এবং দ্বাদশ হিজরি শতকের মুজাদ্দিদ বা দ্বীনের সংস্কারক হিসেবে গণ্য করা হয়।

২. বংশপরিচয় ও জন্ম

শাহ ওয়ালীউল্লাহ দেহলভী (রহ.) ১১১৪ হিজরি সনের ১৪ই শাওয়াল (মোতাবেক ২১ ফেব্রুয়ারি ১৭০৩ খ্রিস্টাব্দ) দিল্লির অদূরে ফুলত নামক স্থানে তাঁর নানার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর মূল নাম ছিল আহমদ। ‘ওয়ালীউল্লাহ’ (আল্লাহর বন্ধু) ছিল তাঁর লকব বা উপাধি, যা পরবর্তী সময়ে তাঁর মূল নামের চেয়েও অধিক খ্যাতি লাভ করে। তাঁর পিতার নাম ছিল শাহ আবদুর রহীম (রহ.), যিনি তৎকালীন সময়ের একজন প্রখ্যাত আলেম, আধ্যাত্মিক সাধক এবং সম্রাট আওরঙ্গজেব আলমগীর কর্তৃক সংকলিত বিখ্যাত ফিকহ গ্রন্থ ‘ফাতাওয়া-ই-আলমগীরী’-এর অন্যতম প্রধান সংকলক ছিলেন।

শাহ ওয়ালীউল্লাহর বংশলতিকা ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমর ফারুক (রা.)-এর সাথে মিলিত হয়েছে। তাঁর পূর্বপুরুষগণ মধ্য এশিয়া থেকে ভারতবর্ষে আগমন করেছিলেন এবং তাঁরা জ্ঞান, বীরত্ব ও তাকওয়ার জন্য সমাজেও সুপরিচিত ছিলেন। তাঁর জন্মের পূর্বে তাঁর পিতা এক আধ্যাত্মিক স্বপ্নযোগে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সুসংবাদ পেয়েছিলেন এবং মহান সূফী সাধক খাজা কুতুবুদ্দিন বখতিয়ার কাকী (রহ.)-এর নামানুসারে তাঁর নাম ‘কুতুবুদ্দিন আহমদ’ রাখা হয়েছিল। মাতা ফখরুন নিসা ছিলেন অত্যন্ত পরহেযগার ও বিদুষী নারী।

৩. বাল্যকাল ও শিক্ষা জীবন

শাহ ওয়ালীউল্লাহ (রহ.) এক পরম জ্ঞানগর্ভ ও আধ্যাত্মিক পরিবেশে লালিত-পালিত হন। তাঁর প্রথম শিক্ষক ছিলেন তাঁর পিতা শাহ আবদুর রহীম। তিনি অত্যন্ত মেধারী ও প্রখর স্মৃতিশক্তির অধিকারী ছিলেন। মাত্র সাত বছর বয়সে তিনি পবিত্র কুরআন হিফজ সম্পন্ন করেন। এরপর অতি দ্রুত তিনি ফারসী ও আরবী ভাষার ব্যাকরণ, সাহিত্য ও অলংকার শাস্ত্রে পাণ্ডিত্য অর্জন করেন।

মাত্র পনের বছর বয়সের মধ্যে তিনি তৎকালীন প্রচলিত পাঠ্যক্রমের সমস্ত শাখা—যেমন ফিকহ (ইসলামী আইনশাস্ত্র), উসুল-ই-ফিকহ, তাফসীর, হাদীস, কালাম (ধর্মতত্ত্ব), দর্শন, তাসাউফ, গণিত ও চিকিৎসা শাস্ত্রে গভীর জ্ঞান অর্জন করেন এবং সমাবর্তন লাভ করেন। তাঁর মেধার গভীরতা দেখে তাঁর পিতা তাঁকে অল্প বয়সেই অধ্যাপনা ও ফতোয়া প্রদানের অনুমতি দেন। পিতার মৃত্যুর পর মাত্র সতের বছর বয়সে তিনি দিল্লির বিখ্যাত ‘মাদ্রাসা-ই-রাহিমিয়া’-এর প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন এবং দীর্ঘ বারো বছর অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে সেখানে শিক্ষাদান করেন।

৪. হারামাইন শরীফাইনে উচ্চশিক্ষা ও হাদীস চর্চা

১১৪৩ হিজরি (১৭৩১ খ্রিস্টাব্দে) শাহ ওয়ালীউল্লাহ পবিত্র হজ্জব্রত পালন এবং উচ্চতর জ্ঞানার্জনের উদ্দেশ্যে মক্কা ও মদিনায় (হারামাইন শরীফাইন) গমন করেন। সেখানে তিনি দীর্ঘ চৌদ্দ মাস অবস্থান করেন। এই প্রবাস জীবন তাঁর চিন্তাধারা ও জ্ঞানগত উৎকর্ষে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আনে। হিজাজের বিখ্যাত মুহাদ্দিসগণের সান্নিধ্যে এসে তিনি হাদীস শাস্ত্রের উচ্চতর শিক্ষা লাভ করেন।

মদিনায় তাঁর প্রধান শিক্ষক ছিলেন শায়খ আবু তাহের মুহাম্মদ বিন ইব্রাহিম কুর্দী মাদানী (রহ.)। শায়খ আবু তাহেরের অধীনে তিনি সিহাহ সিত্তাহসহ (হাদীসের প্রধান ছয়টি গ্রন্থ) মুয়াত্তা ইমাম মালিকের গভীর পাঠ গ্রহণ করেন এবং হাদীস বর্ণনার উচ্চতর সনদ ও ইজাজত লাভ করেন। শায়খ আবু তাহের তাঁর এই অসাধারণ ছাত্র সম্পর্কে মন্তব্য করেছিলেন: “তিনি আমার কাছ থেকে হাদীসের শব্দসমূহ গ্রহণ করেছেন, আর আমি তাঁর কাছ থেকে হাদীসের নিগূঢ় অর্থ ও মর্মার্থসমূহ বুঝেছি।” মক্কা ও মদিনার এই গভীর অধ্যয়ন ও আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা তাঁকে উপমহাদেশের সনাতন সংকীর্ণতা থেকে মুক্ত করে এক বৈশ্বিক, উদার ও ভারসাম্যपूर्ण ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি দান করে। ১৭৩২ খ্রিস্টাব্দে তিনি এক বিশাল জ্ঞানের ভাণ্ডার বুকে নিয়ে পুনরায় স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেন।

৫. সমकालीन রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট

শাহ ওয়ালীউল্লাহ যখন ভারত উপমহাদেশে ফিরে আসেন, তখন মুঘল সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক সূর্য অস্তমিত প্রায়। সম্রাট আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর দিল্লির সিংহাসন দুর্বল, অযোগ্য ও বিলাসপ্রিয় শাসকদের হাতে চলে যায়। চারদিক থেকে মারাঠা, জাঠ ও শিখদের ক্রমাগত আক্রমণ ও লুটপাটের কারণে মুসলিম শক্তির মেরুদণ্ড ভেঙে পড়েছিল। কেন্দ্রীয় শাসনব্যবস্থা দুর্বল হওয়ার সুযোগে সমাজজুড়ে চরম অরাজকতা ও নৈতিক অবক্ষয় দেখা দেয়।

ধর্মীয় ক্ষেত্রে মুসলমানরা কুরআন ও সুন্নাহর মৌলিক শিক্ষা থেকে দূরে সরে গিয়ে নানা প্রকার বিদআত, হিন্দুয়ানী কুসংস্কার এবং অন্ধ তাকলীদের (অন্ধ অনুকরণ) জালে বন্দি হয়ে পড়েছিল। উলামা সমাজও বিভিন্ন উপদলীয় কোন্দল ও ফিকহী মতবিরোধে লিপ্ত ছিলেন। এই বহুমুখী সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে শাহ ওয়ালীউল্লাহ উপলব্ধি করলেন যে, শুধু সশস্ত্র প্রতিরোধ বা বাহ্যিক ক্ষমতার পরিবর্তন মুসলমানদের রক্ষা করতে পারবে না; এর জন্য প্রয়োজন একটি আমূল বুদ্ধিবৃত্তিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলন।

৬. সংস্কারমূলক অবদান ও চিন্তাধারা

শাহ ওয়ালীউল্লাহ দেহলভী (রহ.)-এর সংস্কার আন্দোলন ছিল বহুমুখী ও সুদূরপ্রসারী। তাঁর প্রধান অবদানসমূহকে নিম্নোক্ত প্রধান শাখাগুলোতে ভাগ করা যায়:

ক. কুরআনের ফারসী অনুবাদ ও প্রচার

তৎকালীন সময়ে উপমহাদেশে সাধারণ মানুষের বোধগম্য ভাষা ছিল ফারসী, আর ধর্মীয় ভাষা ছিল আরবী। সাধারণ মুসলমানরা আরবী না বোঝার কারণে কুরআনের বাণী সরাসরি বুঝতে পারত না। অন্যদিকে, তৎকালীন রক্ষণশীল আলেম সমাজ মনে করতেন যে, আরবী ছাড়া অন্য কোনো ভাষায় কুরআনের অনুবাদ করা গুনাহ বা নিষিদ্ধ। শাহ ওয়ালীউল্লাহ এই অন্ধ সংস্কার ও গোঁড়ামি ভেঙে অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে পবিত্র কুরআনের ফারসী অনুবাদ করেন, যার নাম ‘ফাতহুর রহমান ফী তারজামাতিল কুরআন’। এর ফলে সাধারণ মানুষ সরাসরি আল্লাহর কালামের অর্থ বোঝার সুযোগ পায়। শুরুতে রক্ষণশীলরা তাঁর তীব্র বিরোধিতা করলেও এবং তাঁর ওপর হামলার চেষ্টা করলেও পরবর্তীতে এটিই উপমহাদেশের অন্যান্য ভাষায় (যেমন উর্দু ও বাংলা) কুরআন অনুবাদের পথ সুগম করে।

খ. হাদীস শাস্ত্রের পুনরুজ্জীবন

শাহ ওয়ালীউল্লাহর আগমনের পূর্বে উপমহাদেশে ফিকহ শাস্ত্রের ওপর অতিরিক্ত জোর দেওয়া হতো এবং হাদীসের সরাসরি চর্চা ছিল অত্যন্ত সীমিত। তিনি ‘মাদ্রাসা-ই-রাহিমিয়া’-কে হাদীস চর্চার প্রধান বৈশ্বিক কেন্দ্রে পরিণত করেন। তিনি প্রমাণ করেন যে, কোনো ফিকহী রায়ের চেয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সহীহ হাদীসের মর্যাদা অনেক ওপরে। তিনি ‘মুয়াত্তা ইমাম মালিক’-এর গুরুত্ব সর্বাগ্রে তুলে ধরেন এবং এর আরবী ও ফারসী ব্যাখ্যাগ্রন্থ রচনা করেন। তাঁর এই অসাধারণ ও ক্লান্তিহীন প্রচেষ্টার কারণেই তাঁকে ‘মুহাদ্দিসে দেহলভী’ বা দিল্লির শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস উপাধিতে ভূষিত করা হয় এবং আজ পর্যন্ত ভারতীয় উপমহাদেশের হাদীস চর্চার যত ধারা রয়েছে, তার সব ক’টিই শাহ ওয়ালীউল্লাহর সনদের সাথে গিয়ে মিলেছে।

গ. ফিকহী মতবিরোধ নিরসন ও ভারসাম্য নীতি

তৎকালীন সময়ে হানাফী, শাফেয়ী ইত্যাদি ফিকহী মাযহাবের অনুসারীদের মধ্যে চরম কট্টরতা ও কাদা ছোড়াছুড়ি বিদ্যমান ছিল। এক মাযহাবের মানুষ অন্য মাযহাবের পেছনে নামাজ পড়তে পর্যন্ত কুণ্ঠাবোধ করত। শাহ ওয়ালীউল্লাহ নিজে হানাফী মাযহাবের অনুসারী হওয়া সত্ত্বেও অন্ধ তাকলীদের বিরোধিতা করেন। তিনি তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘আল-ইনসাফ ফী বায়ানি আসবাবিল ইখতিলাফ’ এবং ‘ইকদুল জীদ’-এর মাধ্যমে মাযহাবসমূহের মধ্যকার দূরত্বের অবসান ঘটান এবং হাদীসের আলোকে ফিকহী মাসআলাসমূহের মধ্যে এক অপূর্ব সমন্বয় ও ভারসাম্য সাধন করেন। তিনি যুগের প্রয়োজনে উম্মাহর কল্যাণে ‘ইজতিহাদ’ বা নতুন গবেষণার দরজা উন্মুক্ত রাখার পক্ষে জোরালো মত ব্যক্ত করেন।

ঘ. তাসাউফ বা আধ্যাত্মিকতার সংশোধন

সে যুগে তাসাউফ বা পীর-মুরিদী প্রথার মধ্যে শরীয়ত বিরোধী বহু বিদআত, শিরক এবং ইউনানী বা গ্রীক দর্শনের কুসংস্কার প্রবেশ করেছিল। শাহ ওয়ালীউল্লাহ নিজে চিশতিয়া, নকশবন্দিয়া, কাদেরিয়া ও সোহরাওয়ার্দীয়া—এই প্রধান চারটি সূফী তরিকার গ্রন্থি ও খেলাফতপ্রাপ্ত ছিলেন। তিনি তাসাউফকে সমস্ত পঙ্কিলতা থেকে মুক্ত করে সম্পূর্ণ কুরআন ও সুন্নাহর অনুগামী বা শরীয়তসম্মত তাসাউফে রূপান্তর করেন। তিনি পরিষ্কার জানিয়ে দেন, শরীয়ত বর্জিত কোনো তরীকত বা তাসাউফ ইসলামে গ্রহণযোগ্য নয়।

ঙ. অর্থনৈতিক ও সামাজিক দর্শন

শাহ ওয়ালীউল্লাহ বিশ্বের প্রথম সারির সমাজবিজ্ঞানীদের অন্যতম। তিনি তাঁর কিতাবে দেখিয়েছেন যে, কোনো সমাজের পতন তখনই ঘটে যখন অর্থনৈতিক বৈষম্য চরম আকার ধারণ করে এবং মেহনতি মানুষের ওপর অতিরিক্ত করের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হয়। তিনি শ্রমিকের অধিকার, ন্যায়ভিত্তিক কর ব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ভারসাম্যের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।

৭. রাজনৈতিক দর্শন ও আহমদ শাহ আবদালীর আগমন

শাহ ওয়ালীউল্লাহ কেবল একজন নির্জনবাসী সাধক বা শিক্ষক ছিলেন না, বরং মুসলিম উম্মাহর রাজনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষায় তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিলেন। ভারতের মুঘল শক্তির দুর্বলতার সুযোগে যখন মারাঠারা দিল্লি ও তার চারপাশের মুসলিম এলাকাগুলো দখল করে ব্যাপক গণহত্যা ও লুটপাট চালাচ্ছিল এবং মুসলিম অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলে দেয়, তখন তিনি রাজনৈতিক দূরদর্শিতার পরিচয় দেন।

তিনি দিল্লির মুঘল সম্রাট এবং নজিবুদ্দৌলার মতো মুসলিম আমীরদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান। একই সাথে তিনি কান্দাহারের (আফগানিস্তান) পরাক্রমশালী শাসক আহমদ শাহ আবদালীকে (দুররানী) ভারতবর্ষে এসে মজলুম মুসলিমদের রক্ষা করার জন্য এক ঐতিহাসিক ও দীর্ঘ চিঠি লেখেন। চিঠিতে তিনি ভারতের ভৌগোলিক, রাজনৈতিক ও সামরিক পরিস্থিতি নিখুঁতভাবে বিশ্লেষণ করেন এবং মুসলিম উম্মাহর ক্রান্তিলগ্নে তাঁর দায়িত্ব স্মরণ করিয়ে দেন। তাঁর এই দূরদর্শী আহ্বানে সাড়া দিয়ে আহমদ শাহ আবদালী ১৭৬১ খ্রিস্টাব্দে পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধে মারাঠাদের মুখোমুখি হন এবং তাদের চূড়ান্তভাবে পরাজিত করেন। এই যুদ্ধ ভারতের ইতিহাসে মুসলমানদের অস্তিত্বকে আরও দীর্ঘস্থায়ী করতে সাহায্য করেছিল।

৮. বিখ্যাত গ্রন্থাবলী

শাহ ওয়ালীউল্লাহ দেহলভী (রহ.) আরবী ও ফারসী ভাষায় প্রায় অর্ধেকেরও বেশি (মতান্তরে শতাধিক) অনন্যসাধারণ গ্রন্থ রচনা করে গেছেন। তাঁর প্রতিটি গ্রন্থই গভীর জ্ঞান ও তীক্ষ্ণ গবেষণার স্বাক্ষর বহন করে। তাঁর উল্লেখযোগ্য কয়েকটি গ্রন্থের পরিচয় নিচে দেওয়া হলো:

  • হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ (حجة الله البالغة): এটি তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ ও কালজয়ী শাহকার। আরবী ভাষায় রচিত এই গ্রন্থে তিনি ইসলামী শরীয়তের বিধি-বিধান, হিকমত, ইবাদতের অন্তর্নিহিত রহস্য, দর্শন এবং মানব সমাজের অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিয়মের যৌক্তিক ও বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন। এটি ইসলামী দর্শনের এক অতুলনীয় বিশ্বকোষ।
  • ফাতহুর রহমান ফী তারজামাতিল কুরআন: পবিত্র কুরআনের প্রথম সাবলীল ফারসী অনুবাদ ও সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা, যা উপমহাদেশে কুরআন চর্চায় বিপ্লব এনেছিল।
  • আল-ফাওযুল কাবীর ফী উসুলিত তাফসীর: তাফসীর শাস্ত্রের মূলনীতি বা উসুলের ওপর রচিত একটি সংক্ষিপ্ত কিন্তু অত্যন্ত আকর গ্রন্থ, যা আজ পর্যন্ত উপমহাদেশের বিভিন্ন উচ্চতর মাদ্রাসার পাঠ্যসূচিতে বাধ্যতামূলকভাবে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
  • ইযালাতুল খাফা আন খিলাফাতিল খুলাফা: ইসলামের প্রথম চার খলিফার খিলাফতের সত্যতা, রাশেদ খিলাফতের রাজনৈতিক রূপরেখা এবং ইসলামের ইতিহাসে তাঁদের অবদান ফারসী ভাষায় সবিস্তারে আলোচনা করা হয়েছে।
  • আল-ইনসাফ ফী বায়ানি আসবাবিল ইখতিলাফ: বিভিন্ন ফিকহী মাযহাবের উৎপত্তির ইতিহাস এবং ফকীহদের মধ্যকার মতবিরোধের যৌক্তিক ও তাত্ত্বিক কারণসমূহ বিশ্লেষণ।
  • লামাহাত ও সাতাআত: ইসলামী দর্শন, সৃষ্টিতত্ত্ব এবং মেটাফিজিক্স বা অধিবিদ্যা বিষয়ক গভীর তাত্ত্বিক গ্রন্থ।
  • আল বুদুরুল বাযিগাহ: তাওহীদ এবং আল্লাহর অস্তিত্বের প্রমাণাদিসহ আকীদা ও দর্শনের ওপর রচিত কালজয়ী কিতাব।

৯. পারিবারিক জীবন ও যোগ্য উত্তরসূরি

শাহ ওয়ালীউল্লাহর পারিবারিক জীবনও ছিল অত্যন্ত বরকতময়। তাঁর চার পুত্র ছিলেন উপমহাদেশের ইলমী আকাশের একেকটি উজ্জ্বল নক্ষত্র, যাঁরা পিতার ইন্তেকালের পর তাঁর শুরু করা সংস্কার আন্দোলনকে সাফল্যের চূড়ায় নিয়ে যান। তাঁরা হলেন:

১. শাহ আবদুল আজীজ মুহাদ্দিসে দেহলভী (রহ.): পিতার যোগ্যতম উত্তরাধিকারী, যিনি দীর্ঘকাল দিল্লির মুহাদ্দিস হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি শিয়া মতবাদের খণ্ডনে ‘তুহফা ইছনা আশারিয়া’ ও বিখ্যাত তাফসীর গ্রন্থ ‘তাফসীরে আযীযী’ রচনা করেন এবং ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে ভারতকে ‘দারুল হরব’ ঘোষণা করে ঐতিহাসিক জিহাদের ফতোয়া দেন।

২. শাহ রফিউদ্দিন দেহলভী (রহ.): যিনি পবিত্র কুরআনের সর্বপ্রথম উর্দু শব্দানুবাদ সম্পন্ন করে উর্দুভাষী মানুষের মাঝে আলোড়ন সৃষ্টি করেন।

৩. শাহ আবদুল কাদির দেহলভী (রহ.): যিনি কুরআনের বিখ্যাত ও জনপ্রিয় উর্দু ভাবানুবাদ ও তাফসীর ‘মুযিহুল কুরআন’ রচনা করেন।

৪. শাহ আবদুল গনী দেহলভী (রহ.): যিনি হাদীস ও ফিকহ চর্চায় আজীবন মগ্ন ছিলেন।

শাহ ওয়ালীউল্লাহর পৌত্র শাহ ইসমাইল শহীদ (রহ.) এবং তাঁর চিন্তাধারার অনুসারী সৈয়দ আহমদ বেরলভী (রহ.) পরবর্তীতে এই পরিবার ও চিন্তার আলোকেই বিখ্যাত ‘বালাকোট আন্দোলন’ বা শিখ ও ব্রিটিশ বিরোধী ঐতিহাসিক জিহাদ আন্দোলন পরিচালনা করে শাহাদাত বরণ করেছিলেন।

১০. ইন্তেকাল ও সমাধি

সুদীর্ঘকাল জ্ঞান বিতরণ, সমাজ সংস্কার, কুসংস্কারের বিরুদ্ধে আপসহীন সংগ্রাম ও উম্মাহর বুদ্ধিবৃত্তিক সেবা করার পর এই মহান মনীষী ২৯শে মহররম, ১১৭৬ হিজরি (মোতাবেক ২০ আগস্ট, ১৭৬২ খ্রিস্টাব্দ) মাত্র ৬০ বছর বয়সে দিল্লিতে ইন্তেকাল করেন। দিল্লির বিখ্যাত ‘মেহেন্দিয়ান’ কবরস্থানে তাঁর পিতা শাহ আবদুর রহীমের পাশেই তাঁকে পরম শ্রদ্ধায় সমাহিত করা হয়। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর যোগ্য পুত্র, পৌত্র ও শাগরিদগণ তাঁর মিশনকে যুগ যুগ ধরে জিন্দা রাখেন।

১১. মূল্যায়ন ও উপসংহার

শাহ ওয়ালীউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী (রহ.) কেবল একজন ব্যক্তি বা লেখক ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন একটি সম্পূর্ণ জীবন্ত আন্দোলন, একটি অনন্য পাঠশালা এবং একটি স্বর্ণালী যুগের নির্মাতা। যখন মুসলিম সমাজ চিন্তার স্থবিরতায় ভুগছিল, তখন তিনি ইজতিহাদ ও যুক্তিবাদের আলো নিয়ে হাজির হয়েছিলেন। তিনি ধর্মীয় উগ্রতা, গোষ্ঠীগত কোন্দল ও সংকীর্ণতার অবসান ঘটান এবং উম্মাহর সামগ্রিক ঐক্যের ডাক দিয়েছিলেন। তাঁর চিন্তা ও দর্শনের ওপর ভিত্তি করেই পরবর্তীতে দেওবন্দী, আহলে হাদীসসহ ভারতীয় উপমহাদেশের প্রধান প্রধান ইসলামি চিন্তাধারা ও শিক্ষা সংস্কারের ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হয়।

আজকের দিনেও ইসলামের সঠিক মর্মার্থ অনুধাবন, ফিকহ ও হাদীসের মধ্যে চমৎকার সমন্বয় সাধন এবং আধুনিক মুসলিম সমাজের সামগ্রিক পুনর্গঠনে শাহ ওয়ালীউল্লাহর দর্শন, কর্মপন্থা ও গ্রন্থাবলী সমানভাবে প্রাসঙ্গিক ও পথপ্রদর্শক। দক্ষিণ এশিয়ার ইসলামি ইতিহাসে তিনি চিরকাল এক দেদীপ্যমান নক্ষত্র এবং মুসলিম রেনেসাঁর মহান অগ্রনায়ক হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। আল্লাহ তাআলা এই মহান মুজাদ্দিদকে জান্নাতুল ফিরদাউসের সর্বোচ্চ মাকাম দান করুন। আমীন।

তার লিখিত কিছু কিতাব :

০১. কুরআন ব্যাখ্যার মুলনীতি

লেখক :  শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভী



০২. মুসলিম বোন ও পর্দার হুকুম

লেখক :  শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভী



০৩. মতবিরোধ পূর্ণ বিষয়ে সঠিক পন্থা অবলম্বনের উপায়

লেখক : শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভী



০৪. হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ

লেখক :শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভী



"বাংলা ইসলামিক বইয়ের বিশাল পিডিএফ (PDF) আর্কাইভ"