হাদিস শাস্ত্রের প্রজ্জ্বলিত নক্ষত্র: ইমাম নাসায়ী (রহ.)-এর বিস্তৃত জীবনী
ইসলামি জ্ঞানার্জনের স্বর্ণযুগে যে কজন ক্ষণজন্মা মহাপুরুষ নিজের মেধা, নিষ্ঠা ও কঠোর সাধনার মাধ্যমে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র বাণী তথা হাদিস সংরক্ষণ ও যাচাই-বাছাইয়ে যুগান্তকারী অবদান রেখেছেন, তাঁদের মধ্যে ইমাম নাসাই (রহ.) অন্যতম। তাঁর পুরো নাম আবু আবদুর রহমান আহমদ ইবনে শুয়াইব ইবনে আলী ইবনে সিনান আল-নাসায়ী। তিনি হাদিস শাস্ত্রের ইতিহাসে এক অতন্দ্র প্রহরী এবং মুসলিম উম্মাহর নিকট সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য হাদিস গ্রন্থ ‘সিহাহ সিত্তাহ’ বা ছয়টি বিশুদ্ধ হাদিস গ্রন্থের অন্যতম গ্রন্থ ‘সুনানে নাসাই’ (সুনানুস সুগরা)-এর মহান সংকলক। ইলমে হাদিসে তাঁর অবদান ও অনন্য মর্যাদা তাঁকে যুগ যুগ ধরে অমর করে রেখেছে।
১. জন্ম ও বংশ পরিচয়
ইমাম নাসায়ী (রহ.) ২১৫ হিজরি মোতাবেক ৮৩০ খ্রিস্টাব্দে পারস্যের (বর্তমান মধ্য এশিয়া) বিখ্যাত খোরাসান অঞ্চলের ‘নাসা’ নামক শহরে জন্মগ্রহণ করেন। কোনো কোনো ঐতিহাসিক তাঁর জন্ম সাল ২১৪ হিজরি বা ৮২৯ খ্রিস্টাব্দ বলেও উল্লেখ করেছেন। তাঁর বংশধারা হলো: আহমদ ইবনে শুয়াইব ইবনে আলী ইবনে সিনান ইবনে বাহর আল-খুরাসানি আন-নাসাই। ‘নাসা’ শহরের দিকে সম্বন্ধ করে তাঁকে ‘নাসাই’ বা ‘নাসায়ী’ বলা হয়। তৎকালীন সময়ে নাসা শহরটি ছিল ইসলামি জ্ঞান ও সংস্কৃতির অন্যতম একটি প্রধান কেন্দ্র।
২. শৈশব ও প্রাথমিক শিক্ষা
ইমাম নাসাই (রহ.) এক সম্ভ্রান্ত ও দ্বীনি পরিবেশে বেড়ে ওঠেন। শৈশবেই তিনি অত্যন্ত তীক্ষ্ণ মেধার অধিকারী ছিলেন। স্বদেশে অবস্থানকালেই তিনি পবিত্র কুরআন হিফজ সম্পন্ন করেন এবং আরবি ভাষা ও সাহিত্যের প্রাথমিক জ্ঞান অর্জন করেন। নাসা শহরে তৎকালীন সময়ে হাদিসের যে প্রখ্যাত পণ্ডিতগণ মজলিস করতেন, শৈশবেই তিনি তাঁদের সান্নিধ্যে যান। নিজ শহরে তিনি বিখ্যাত শায়খ হুমাইদ ইবনে মাখলাদ এবং আম্মার ইবনুল হাসান (রহ.) প্রমুখের নিকট থেকে হাদিসের প্রাথমিক পাঠ গ্রহণ করেন।
৩. হাদিস অন্বেষণে দেশভ্রমণ (রিহলাহ)
ইলমে হাদিস অর্জনের জন্য তৎকালীন মুহাদ্দিসগণের অন্যতম প্রধান সুন্নাত বা রীতি ছিল দেশভ্রমণ করা, যা আরবিতে ‘রিহলাহ ফি তলাবিল হাদিস’ বলা হয়। ইমাম নাসাই মাত্র ১৫ বছর বয়সে (২৩০ হিজরি) সর্বপ্রথম জ্ঞানার্জনের উদ্দেশ্যে ঘর থেকে বের হন। তাঁর প্রথম দীর্ঘ সফর ছিল তৎকালীন প্রখ্যাত মুহাদ্দিস কুতাইবা ইবনে সাঈদ (রহ.)-এর দরবারে। তিনি দীর্ঘ এক বছর দুই মাস কুতাইবা ইবনে সাঈদের সান্নিধ্যে থেকে হাদিস শাস্ত্রের গভীর জ্ঞান অর্জন করেন।
এরপর তিনি জ্ঞানের পিপাসা মেটাতে সমগ্র ইসলামিক বিশ্ব চষে বেড়ান। তিনি একে একে খোরাসান, ইরাক, হিজাজ (মক্কা ও মদিনা), কুফা, বসরা, সিরিয়া, আল-জাজিরা এবং মিশর সফর করেন। দীর্ঘ পথ পরিক্রমা ও বিভিন্ন দেশের পণ্ডিতদের সান্নিধ্য লাভের পর তিনি শেষ পর্যন্ত মিশরে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। মিশরে তাঁর আগমন তৎকালীন জ্ঞানপিপাসুদের জন্য এক বিরাট আশীর্বাদ হিসেবে প্রমাণিত হয়।
৪. ইমাম নাসাই (রহ.)-এর শিক্ষকবৃন্দ (উস্তাদগণ)
ইমাম নাসাই (রহ.) তাঁর দীর্ঘ সফরে অসংখ্য যুগশ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিসের কাছ থেকে হাদিস শ্রবণ ও গ্রহণ করেছেন। হাফেজ ইবনে হাজার আল-আসকালানি (রহ.)-এর মতে, ইমাম নাসাইর শিক্ষকের সংখ্যা এত বেশি যে, তাঁদের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা গণনা করা প্রায় অসম্ভব। তবে তাঁর বেশিরভাগ শিক্ষকের নামই তাঁর সংকলিত সুনান গ্রন্থে স্থান পেয়েছে।
ঐতিহাসিক ইবনে আসাকিরের বর্ণনা অনুযায়ী, ইমাম নাসাইর শিক্ষকের সংখ্যা ৪৪৪ জন। তিনি তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘সুনানুুল কুবরা’-তে ৪০৩ জন এবং ‘সুনানুস সুগরা’-তে ৩৩৫ জন শায়খের সূত্রে হাদিস বর্ণনা করেছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য শিক্ষকদের মধ্যে কজন হলেন:
- কুতাইবা ইবনে সাঈদ: যার কাছে ইমাম নাসাই জীবনের প্রথম হাদিস শিক্ষা সফর শুরু করেন।
- ইসহাক ইবনে রাহওয়াইহ: যিনি ইমাম বুখারি (রহ.)-এরও অন্যতম প্রধান উস্তাদ ছিলেন।
- আবু দাউদ সিজিস্তানি: সুনানে আবু দাউদের বিশ্ববিখ্যাত সংকলক।
- আলী ইবনে হুজর আল-মারওয়াযি
- মুহাম্মাদ ইবনে বাশার (বুনদার)
- ইউনুস ইবনে আব্দুল আলা
- আবু যুরআ আর-রাযি এবং আবু হাতিম আর-রাযি: যাদের থেকে ইমাম নাসাইর হাদিস বর্ণনা প্রমাণিত।
- কোনো কোনো ইমামের মতে, ইমাম বুখারি (রহ.)-এর সাথেও তাঁর সাক্ষাৎ হয়েছিল এবং তিনি তাঁর থেকেও উপকৃত হয়েছিলেন।
৫. ইমাম নাসাই (রহ.)-এর ছাত্র সমাজ
মিশরে অবস্থানকালে ইমাম নাসাইর ইলমি খ্যাতি চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। দূর-দূরান্ত থেকে শিক্ষার্থীরা তাঁর কাছ থেকে হাদিস শোনার জন্য ভিড় জমাতে থাকে। তিনি বহু বছর মিশরে হাদিসের দরস দেন। তাঁর ছাত্রদের মধ্য থেকে পরবর্তীতে অনেকেই বিশ্ববিখ্যাত ইমাম ও মুহাদ্দিস হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। তাঁদের মধ্যে প্রধান কয়েকজন হলেন:
- ইমাম আবু জাফর আত-তাহাবী: বিখ্যাত হানাফি ফকিহ ও ‘আকিদাতুত তাহাবী’র লেখক।
- ইমাম আবুল কাসিম আত-তাবারানি: বিখ্যাত ‘মুজাম’ গ্রন্থত্রয়ের (আল-কুবরা, আল-আওসাত, আস-সুগরা) সংকলক।
- আবু আলী হোসাইন বিন মুহাম্মদ নিশাপুরী (আল-হাফেয আন-নিশাপুরী)
- ইব্রাহিম বিন মুহাম্মদ বিন সালিহ বিন সিনান
- মুহাম্মদ বিন মু’আভিয়া বিন আহমার আন্দালুসী
- হামযা আল-কিনানী
৬. ফিকহি মাযহাব
ইমাম নাসাই (রহ.) কোন মাযহাবের অনুসারী ছিলেন, তা নিয়ে ইসলামি স্কলারদের মধ্যে কিছুটা মতভেদ রয়েছে:
- শাফিঈ মাযহাব: শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী, শাহ আবদুল আজিজ দেহলভী এবং আল্লামা তকীউদ্দীন নাদভীসহ অধিকাংশ ঐতিহাসিক ও আলেম মনে করেন, ইমাম নাসাই ফিকহের ক্ষেত্রে ইমাম শাফিঈ (রহ.)-এর মাযহাবের অনুসারী ছিলেন এবং শাফিঈ মাযহাবের বিখ্যাত ফকিহদের কিতাবে তাঁর নাম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
- হাম্বলী মাযহাব: অপরদিকে, আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশ্মীরি এবং আল্লামা ইউসুফ বিন নূরী বিচার-বিশ্লেষণ করে মতামত দিয়েছেন যে, ইমাম আবু দাউদ ও ইমাম নাসাই উভয়ই মূলত হাম্বলী মাযহাবের অনুসারী ছিলেন।
- মুজতাহিদ মুতলাক: অনেক গবেষকের মতে, ইমাম নাসাই নিজেই একজন উচ্চপর্যায়ের ‘মুজতাহিদ’ (যিনি নিজেই কুরআন-হাদিস থেকে সরাসরি বিধান হুকুম আহকাম বের করতে পারেন) ছিলেন। হাদিসের বিশুদ্ধতা যাচাই ও ফিকহি মাসআলা ইস্তিম্বাতের ক্ষেত্রে তিনি কোনো নির্দিষ্ট মাযহাবের অন্ধ অনুকরণ না করে শক্তিশালী দলিলের ওপর নির্ভর করতেন।
৭. হাদিস শাস্ত্রে তাঁর অমর অবদান ও গ্রন্থাবলি
ইমাম নাসাই (রহ.) হাদিস, ফিকহ, রাবি বা বর্ণনাকারীদের জীবনী (জারহ ওয়াত তা’দীল) সহ বিভিন্ন বিষয়ে বহু মূল্যবান গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁর রচিত কিতাবসমূহের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
- আস-সুনানুল কুবরা: এটি ইমাম নাসাইর হাদিসের একটি বিশাল ও মৌলিক সংকলন।
- সুনানে নাসাই (সুনানুস সুগরা বা আল-মুজতাবা): এটিই মূলত সিহাহ সিত্তাহর অন্তর্ভুক্ত। মূলত ‘আস-সুনানুল কুবরা’ সংকলনের পর তৎকালীন আমির বা গভর্নর তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “এর মধ্যকার সব হাদিসই কি সহিহ?” ইমাম নাসাই উত্তর দিলেন, “না।” তখন আমিরের অনুরোধে তিনি সুনানুল কুবরা থেকে কেবল মাত্র সহিহ ও অত্যন্ত শক্তিশালী হাদিসগুলো বাছাই করে ‘আল-মুজতাবা’ বা ‘সুনানুস সুগরা’ সংকলন করেন। এই গ্রন্থে রাবিদের বা বর্ণনাকারীদের ত্রুটি এবং হাদিসের সূক্ষ্ম ইল্লত (ত্রুটি) এত চমৎকারভাবে দেখানো হয়েছে যে, মুহাদ্দিসগণের নিকট এর গ্রহণযোগ্যতা অনন্য।
- খাসাইসু আমিরিল মুমিনিন আলী ইবনে আবি তালিব: হযরত আলী (রা.)-এর ফজিলত ও মর্যাদা সংক্রান্ত একটি বিখ্যাত গ্রন্থ।
- ফাযায়েলে সাহাবা: সাহাবিদের মর্যাদা বিষয়ক সংকলন।
- আমালুল ইয়াওমি ওয়াল লাইলাহ: দিন-রাতের দোয়া ও আমল সংক্রান্ত কিতাব।
- কিতাবুজ জুয়াফা ওয়াল মাতরুকিন: দুর্বল ও পরিত্যাজ্য হাদিস বর্ণনাকারীদের পরিচিতিমূলক গ্রন্থ।
- মুসনাদে আলী ও মুসনাদে মালিক
- কিতাবুল জারহি ওয়াত তা’দীল
৮. ইমাম নাসাই (রহ.)-এর বৈশিষ্ট্য ও তাকওয়া
ইমাম নাসাই (রহ.) কেবল একজন পণ্ডিতই ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন একজন আবেদ, জাহিদ ও অত্যন্ত মুত্তাকী মানুষ। সমসাময়িক ঐতিহাসিকদের মতে, তিনি দাউদি রোজা রাখতেন, অর্থাৎ একদিন পর পর রোজা রাখতেন। তিনি বিলাসিতা পছন্দ করতেন না এবং সর্বদা সুন্নাত অনুযায়ী জীবনযাপন করার চেষ্টা করতেন। তাঁর ইবাদত ও বীরত্বগাথাও ইতিহাসে প্রসিদ্ধ। তিনি যখন মিশরের সেনাবাহিনীর সাথে জিহাদে যেতেন, তখন ফ্রন্টলাইনে থেকে অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে যুদ্ধ করতেন এবং সৈন্যদের সুন্নাহর শিক্ষা দিতেন।
৯. জীবনের শেষ দিনগুলো ও শাহাদাত
ইমাম নাসাই (রহ.) জীবনের শেষভাগে মিশর ছেড়ে দামেস্কে (সিরিয়া) গমন করেন। সেখানে গিয়ে তিনি লক্ষ্য করেন যে, বনু উমাইয়ার কিছু লোক হযরত আলী (রা.)-এর শান ও মর্যাদার ব্যাপারে বিরূপ ধারণা পোষণ করে এবং তাঁর প্রতি বিদ্বেষ ভাবাপন্ন। এই পরিস্থিতি দেখে তিনি উম্মাহর সংশোধনের উদ্দেশ্যে হযরত আলী (রা.)-এর মর্যাদা সংক্রান্ত তাঁর বিখ্যাত কিতাব ‘খাসাইসু আলী’ রচনা করেন এবং তা দামেস্কের মসজিদে পাঠ করে শোনানো শুরু করেন।
কিন্তু তৎকালীন চরমপন্থী ও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত একদল লোক তাঁর এই মহৎ উদ্যোগকে ভুল বোঝে। তারা ৩০২ হিজরির দিকে দামেস্কের এক মসজিদে খুতবা বা আলোচনার সময় তাঁর ওপর চড়াও হয়। তারা এই বৃদ্ধ বয়সে (উনার বয়স তখন ৮৭ বা ৮৮ বছর) ইমাম নাসাইকে নির্মমভাবে আঘাত ও প্রহার করে। গুরুতর আহত অবস্থায় তিনি বুঝতে পারেন তাঁর সময় ঘনিয়ে এসেছে।
তিনি তখন অনুসারীদের অনুরোধ করেন যেন তাঁকে মক্কায় নিয়ে যাওয়া হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় পথিমধ্যে বা মক্কায় পৌঁছানোর পর হিজরি ৩০৩ সনের ১৩ সফর (৯১৫ খ্রিস্টাব্দ) সোমবার মহান এই মুহাদ্দিস শাহাদাত বরণ করেন। তাঁর মৃত্যুর স্থান নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে কিছুটা মতভেদ রয়েছে; কেউ বলেন তিনি ফিলিস্তিনের রামাল্লায় পথিমধ্যে মারা যান এবং সেখান থেকে মক্কায় নিয়ে দাফন করা হয়, আবার অধিকাংশের মতে তিনি মক্কাতুল মুকাররমায় পৌঁছানোর পর ইন্তেকাল করেন এবং সাফা ও মারওয়ার মধ্যবর্তী স্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।
উপসংহার
ইমাম নাসাই (রহ.)-এর শাহাদাতের মাধ্যমে ইলমে হাদিসের আকাশ থেকে একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র খসে পড়েছিল। তবে তাঁর রেখে যাওয়া ‘সুনানে নাসাই’ আজো কোটি কোটি মুসলমানকে হেদায়েতের আলো ছড়াচ্ছে। হাদিসের চুলচেরা বিশ্লেষণ, বর্ণনাকারীদের চুলচেরা পরীক্ষা এবং সূক্ষ্ম ফিকহি অনুচ্ছেদ বিন্যাসের কারণে কিয়ামত পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে ইসলামি স্কলার ও সাধারণ মুসলিমদের হৃদয়ে ইমাম নাসাই (রহ.) গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার আসনে সমাসীন থাকবেন। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন এই মহান ইমামকে জান্নাতুল ফিরদাউসের উচ্চ মাকাম দান করুন। আমীন।
তার লিখিত বিশ্ববিখ্যাত হাদিস গ্রন্থ : সুনানে নাসায়ি
সংকলক : আহমদ ইবনে শুআইব আল-নাসায়ি।

ইলম-ই-হাদিসের ভাণ্ডারে ‘সিহাহ সিত্তাহ’ বা ছয়টি বিশুদ্ধতম গ্রন্থের মধ্যে সুনানে নাসায়ি অন্যতম মর্যাদাশীল একটি কিতাব। ইমাম নাসায়ি (রহ.) অত্যন্ত কঠোর ও সূক্ষ্ম মানদণ্ড অনুসরণ করে এই হাদিস গ্রন্থটি সংকলন করেছেন।
ইমাম নাসায়ির পূর্ণ নাম আহমদ ইবনে শুআইব আল-নাসায়ি। তিনি ২১৫ হিজরিতে বর্তমান তুর্কমেনিস্তানের ‘নাসা’ নামক শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি জ্ঞানের সন্ধানে তৎকালীন বিশ্বের প্রায় প্রতিটি ইলমি কেন্দ্র (হেজাজ, সিরিয়া, ইরাক, মিশর) সফর করেন। তিনি যেমন বড় মুহাদ্দিস ছিলেন, তেমনি সমকালীন সময়ের একজন শ্রেষ্ঠ ফকিহ বা আইনজ্ঞও ছিলেন। ৩০৩ হিজরিতে তিনি ফিলিস্তিনে ইন্তেকাল করেন।
সুনানে নাসায়ি-এর বৈশিষ্ট্য
সুনানে নাসায়ি মূলত ইমাম নাসায়ির বৃহৎ সংকলন ‘আস-সুনানুল কুবরা’-এর একটি সংক্ষিপ্ত ও পরিমার্জিত রূপ, যাকে ‘আস-সুনানুস সুগরা’ বা ‘আল-মুজতাবা’ বলা হয়। এই কিতাবটি বর্তমানে ‘সুনানে নাসায়ি’ নামেই বিশ্বজুড়ে পরিচিত।
এই গ্রন্থের উল্লেখযোগ্য কিছু বৈশিষ্ট্য:
- কঠোর শর্ত: ইমাম নাসায়ি হাদিসের বর্ণনাকারীদের (রাবি) নির্ভরযোগ্যতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে অত্যন্ত কঠোর ছিলেন। অনেক মুহাদ্দিসের মতে, তাঁর এই মানদণ্ড ইমাম মুসলিমের শর্তের কাছাকাছি এবং ইমাম আবু দাউদ ও ইমাম তিরমিজি অপেক্ষা অধিকতর কঠিন।
- ফিকহ ও ইস্তিমবাত: ইমাম বুখারির মতো তিনিও হাদিসের শিরোনাম বা ‘বাব’ বিন্যাসে তাঁর ফিকহি গভীরতা দেখিয়েছেন। তিনি একটি হাদিসের বিভিন্ন সূত্র এবং সূক্ষ্ম পার্থক্যগুলো একই স্থানে তুলে ধরতে পারদর্শী ছিলেন।
- সুন্নাতের বিন্যাস: এই কিতাবে ইবাদত, আমল এবং দৈনন্দিন সুন্নাতের ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে পরিচ্ছন্নতা (তাহারাত) এবং নামাজের খুঁটিনাটি বিষয়গুলো এখানে অত্যন্ত বিস্তারিতভাবে এসেছে।
- হাদিসের সংখ্যা: সুনানে নাসায়ি (আল-মুজতাবা) গ্রন্থে প্রায় ৫,৭০০ এর মতো হাদিস রয়েছে।
ইসলামি আইন ও সুন্নাহর গবেষণায় সুনানে নাসায়ি একটি অপরিহার্য রেফারেন্স হিসেবে গণ্য হয়। বিশেষ করে ইলম-ই-হাদিসের জটিল বিষয় যেমন ‘ইলাল’ বা হাদিসের সূক্ষ্ম ত্রুটি নির্ণয়ে ইমাম নাসায়ির এই কাজ অতুলনীয়।
ডাউনলোড:
| ক্র: নং | খণ্ড নম্বর | ডাউনলোড |
| ০১ | প্রথম খণ্ড | ডাউনলোড |
| ০২ | দ্বিতীয় খণ্ড | ডাউনলোড |
| ০৩ | তৃতীয় খণ্ড | ডাউনলোড |
| ০৪ | চতুর্থ খণ্ড | ডাউনলোড |
| ০৫ | পঞ্চম খণ্ড | ডাউনলোড |
বাংলাদেশ ইসলামি সেন্টার :