হাদিস আকাশের উজ্জ্বল পূর্ণিমা: ইমাম মুসলিম (রহ.)-এর বিস্তৃত ও পূর্ণাঙ্গ জীবনী
ইসলামি জ্ঞান-বিজ্ঞানের ইতিহাসে পবিত্র হাদিস শাস্ত্রের সংগ্রহ, বিন্যাস ও বিশুদ্ধতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে যে কজন মনীষী যুগান্তকারী অবদান রেখেছেন, তাঁদের মধ্যে ইমাম বুখারী (রহ.)-এর পরেই যাঁর নাম প্রাতঃস্মরণীয়, তিনি হলেন ইমাম মুসলিম (রহ.)। তিনি মুসলিম উম্মাহর নিকট আল-কুরআনের পর সর্বাধিক বিশুদ্ধ দুই হাদিস গ্রন্থের অন্যতম ‘সহীহ মুসলিম’ (যা সহীহাইন-এর অংশ)-এর মহান সংকলক। হাদিসের বিশুদ্ধতা রক্ষা, সনদের সূক্ষ্ম ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং কোনো প্রকার পুনরাবৃত্তি ছাড়া একই স্থানে একটি বিষয়ের সমস্ত হাদিসকে সুসংগঠিত করার ক্ষেত্রে তাঁর প্রণীত পদ্ধতি হাদিস শাস্ত্রে এক অনন্য বিপ্লব ঘটিয়েছিল।
নিচে পূর্ববর্তী ইমামদের জীবনীর ধারাবাহিকতা বজায় রেখে ইমাম মুসলিম (রহ.)-এর জন্ম, বংশ পরিচয়, জ্ঞান-সাধনা, ইমাম বুখারীর প্রতি তাঁর গভীর ভক্তি, শিক্ষক ও ছাত্র সমাজ, ‘সহীহ মুসলিম’ সংকলনের ইতিহাস এবং তাঁর জীবনের শেষ দিনগুলোর এক বিস্তৃত বিবরণ তুলে ধরা হলো:
১. জন্ম ও বংশ পরিচয়
ইমাম মুসলিম (রহ.) ২০৪ হিজরি সালে (কোনো কোনো ঐতিহাসিকের মতে ২০২ বা ২০৬ হিজরিতে) আব্বাসীয় খিলাফতের আমলে প্রাচীন খোরাসানের বিখ্যাত ‘নিশাপুর’ (যা বর্তমানে ইরানের অন্তর্ভুক্ত) শহরের এক সম্ভ্রান্ত ও ঐতিহ্যবাহী আরব পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।
আরবীয় বংশানুক্রম অনুযায়ী তাঁর পুরো নাম হলো: আবু হুসাইন মুসলিম ইবনুল হাজ্জাজ ইবনে মুসলিম ইবনে ওয়ার্দ ইবনে কুশাইর আন-নিশাপুরী। তাঁর পূর্বপুরুষগণ আরবের বিখ্যাত ‘বনু কুশাইর’ গোত্রের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন, যা পরবর্তীতে খোরাসানে এসে স্থায়ী বসতি স্থাপন করে। নিশাপুর শহরে জন্ম ও দীর্ঘকাল অবস্থান করার কারণে তিনি বিশ্বজুড়ে ‘ইমাম মুসলিম’ বা ‘আন-নিশাপুরী’ নামে সমধিক পরিচিতি লাভ করেন।
২. শৈশব ও পারিবারিক পরিবেশ
ইমাম মুসলিম (রহ.) এক অত্যন্ত ধর্মীয় ও সচ্ছল পরিবারে বেড়ে ওঠেন। তাঁর পিতা হাজ্জাজ ইবনে মুসলিম নিজেই একজন আলেম এবং ধার্মিক ব্যক্তি ছিলেন, যিনি সমকালীন জ্ঞান মজলিসগুলোতে নিয়মিত যাতায়াত করতেন। পিতার অনুপ্রেরণায় শৈশবেই ইমাম মুসলিমের অন্তরে ইসলামি শিক্ষার বীজ রোপিত হয়। তিনি অত্যন্ত প্রখর মেধা ও নম্র স্বভাবের অধিকারী ছিলেন। মাত্র ১২ বা ১৪ বছর বয়সের মধ্যেই তিনি পবিত্র কুরআন হিফজ সম্পন্ন করেন এবং নিশাপুরের স্থানীয় আলেমদের কাছ থেকে আরবি ব্যাকরণ, ফিকহ এবং প্রাথমিক হাদিসের জ্ঞান অর্জন করেন। হিজরি ২১৮ সনে, অতি অল্প বয়সেই তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে হাদিসের দরসে বসা শুরু করেন।
৩. ইলমে হাদিসের সন্ধানে বিশ্বভ্রমণ (রিহলাহ)
প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনের পর উচ্চতর জ্ঞান এবং উচ্চ সনদের সন্ধানে ইমাম মুসলিম (রহ.) দেশভ্রমণ বা ‘রিহলাহ’ শুরু করেন। হিজরি ২২০ সনে, মাত্র ১৬ বছর বয়সে তিনি সর্বপ্রথম পবিত্র হজ পালনের উদ্দেশ্যে মক্কাতুল মুকাররমায় গমন করেন। সেখানে অবস্থানকালে তিনি হিজাজের বড় বড় মুহাদ্দিসের কাছ থেকে হাদিস শ্রবণ করেন।
হজের সফর শেষ করে তিনি জ্ঞান অন্বেষণের এক দীর্ঘ পরিক্রমায় বের হন। তিনি একে একে ইরাক (বাগদাদ, কুফা, বসরা), হিজাজ (মক্কা ও মদিনা), মিশর, সিরিয়া (দামেস্ক), ফিলিস্তিন এবং রায় (বর্তমান তেহরান) অঞ্চল চষে বেড়ান। তিনি বাগদাদে একাধিকবার সফর করেন এবং সেখানকার মুহাদ্দিসদের সাথে গভীর বৈজ্ঞানিক আলোচনায় অংশ নেন। তবে তিনি উত্তর আফ্রিকা (মাগরিব) বা আন্দালুসিয়া সফর করেননি বলে ঐতিহাসিক বর্ণনায় জানা যায়। এই দীর্ঘ সফরে তিনি সমকালীন প্রায় সকল শীর্ষস্থানীয় হাদিস বিশারদের সান্নিধ্য লাভ করেন।
৪. ইমাম বুখারী (রহ.)-এর প্রতি অনন্য ভক্তি ও ভালোবাসা
ইমাম মুসলিম (রহ.) অসংখ্য উস্তাদের কাছ থেকে শিক্ষা লাভ করলেও, তাঁর জীবনে সবচেয়ে বড় বৈপ্লবিক প্রভাব ফেলেছিলেন ‘আমিরুল মুমিনীন ফিল হাদিস’ ইমাম বুখারী (রহ.)। জীবনের শেষভাগে ইমাম বুখারী যখন তাঁর জন্মভূমি থেকে নির্বাসিত হয়ে নিশাপুরে আগমন করেন, তখন ইমাম মুসলিম তাঁর দরবারে নিয়মিত যাতায়াত শুরু করেন। তিনি ইমাম বুখারিকে নিজের আধ্যাত্মিক ও ইলমি পিতা মনে করতেন।
ইমাম বুখারীর প্রতি তাঁর ভক্তি এত গভীর ছিল যে, একবার নিশাপুরের এক বড় মজলিসে ইমাম মুসলিম দাঁড়িয়ে সকলের সামনে ইমাম বুখারীর কপালে চুমু খেয়ে বলেছিলেন:
“হে উস্তাদদের উস্তাদ! হে মুহাদ্দিসদের নেতা এবং হাদিসের সূক্ষ্ম ত্রুটিসমূহের চিকিৎসক! আপনি আমাকে অনুমতি দিন, আমি যেন আপনার দুটি পায়ে চুমু খেতে পারি।”
পরবর্তীতে নিশাপুরে যখন ইমাম বুখারীর বিরুদ্ধে কিছু ঈর্ষাপরায়ণ লোক অপবাদ ছড়ায় এবং স্থানীয় প্রধান মুহাদ্দিস মুহাম্মদ ইবনে ইয়াহইয়া আজ-যুহলী ঘোষণা করেন যে, “যে ব্যক্তি বুখারীর মজলিসে যাবে, সে যেন আমার মজলিসে না আসে।” ইমাম মুসলিম এই অন্যায় ঘোষণার প্রতিবাদে তৎক্ষণাৎ মজলিস থেকে উঠে দাঁড়ান এবং উস্তাদ যুহলীর কাছ থেকে ইতিপূর্বে যত হাদিস লিখেছিলেন, তা সব একটি গাধার পিঠে চড়িয়ে তাঁর বাড়িতে ফেরত পাঠিয়ে দেন। তিনি হকের পক্ষে এবং নিজের প্রিয় উস্তাদ ইমাম বুখারীর সম্মানে নিজের দীর্ঘদিনের শিক্ষক যুহলীর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করতেও দ্বিধা করেননি।
৫. ইমাম মুসলিম (রহ.)-এর শিক্ষক ও ছাত্র সমাজ
ইমাম মুসলিম (রহ.) তাঁর দীর্ঘ সফরে বিশ্বের শত শত প্রখ্যাত মুহাদ্দিসের কাছ থেকে হাদিস সংগ্রহ করেছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য কয়েকজন উস্তাদ হলেন:
- ইমাম বুখারী (রহ.) (যাঁকে তিনি নিজের প্রধান মেন্টর মনে করতেন)
- আহমাদ ইবনে হাম্বল (রহ.)
- ইসহাক ইবনে রাহওয়াইহ
- ইয়াহইয়া ইবনে মা’ঈন
- কুতাইবা ইবনে সাঈদ
- আবু বকর ইবনে আবি শায়বাহ ও উসমান ইবনে আবি শায়বাহ
- হারমালা ইবনে ইয়াহইয়া (ইমাম শাফিঈর ছাত্র)
অপরদিকে ইমাম মুসলিমের দরসগাহ থেকেও বহু বিশ্ববিখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফকিহ তৈরি হয়েছিলেন, যাঁরা পরবর্তীতে ইসলামের স্তম্ভ হিসেবে কাজ করেছেন। তাঁর প্রধান কয়েকজন ছাত্র হলেন:
- ইমাম আবু ঈসা আত-তিরমিযী (রহ.) (সুনানে তিরমিযির সংকলক, যিনি একই সাথে ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিমের ছাত্র ছিলেন)
- ইবনু আবি হাতিম আর-রাযী
- ইব্রাহিম ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে সুফিয়ান (যিনি সহীহ মুসলিমের প্রধান রাবি বা বর্ণনাকারী)
- আবু আওয়ানা আল-ইসফাহায়িনি (সহিহ আবু আওয়ানার রচয়িতা)
- মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক ইবনে খুযায়মাহ (সহিহ ইবনে খুযায়মাহর লেখক)
৬. ‘সহীহ মুসলিম’: হাদিস শাস্ত্রের এক অনুপম বিস্ময়
ইমাম মুসলিম (রহ.)-এর জীবনের শ্রেষ্ঠতম এবং অমর কীর্তি হলো তাঁর সংকলিত ‘আল-জামি আস-সহীহ’ বা ‘সহীহ মুসলিম’।
সংকলনের পটভূমি ও সতর্কতা:
ইমাম মুসলিম তাঁর মুখস্থ থাকা প্রায় ৩ লক্ষ হাদিসের এক বিশাল সমুদ্র থেকে কঠোর যাচাই-বাছাই ও স্ক্রিনিংয়ের মাধ্যমে দীর্ঘ ১৫ বছরের নিরলস সাধনায় এই কিতাবটি সংকলন করেন। এই গ্রন্থে দ্বিরুক্তিসহ মোট হাদিস সংখ্যা প্রায় ৭,৫৬৩টি এবং পুনরাবৃত্তি ছাড়া একক হাদিসের সংখ্যা প্রায় ৪,০০০টি। তিনি নিজে বলেছেন, “আমি এখানে কেবল সেইসব হাদিসই অন্তর্ভুক্ত করেছি, যার বিশুদ্ধতার ওপর সমকালীন মুহাদ্দিসগণের সর্বসম্মত ঐক্যমত (ইজমা) ছিল।”
সহীহ মুসলিমের অনন্য বৈশিষ্ট্য (তাজউইব ও বিন্যাস):
মুহাদ্দিস ও হাদিস গবেষকদের মতে, কিছু কিছু ক্ষেত্রে সহীহ মুসলিমের বিন্যাস পদ্ধতি সহীহ বুখারীর চেয়েও বেশি পাঠকবান্ধব ও চমৎকার। এর প্রধান কারণসমূহ হলো:
- পুনরাবৃত্তির অনুপস্থিতি: ইমাম বুখারী যেখানে একটি হাদিসকে ফিকহি মাসআলার প্রয়োজনে বিভিন্ন অধ্যায়ে টুকরো টুকরো করে বারবার এনেছেন, ইমাম মুসলিম সেখানে একই হাদিসের সমস্ত শব্দ ও বিভিন্ন সূত্রকে (সনদ) এক জায়গায় একত্রিত করে দিয়েছেন। ফলে পাঠক এক নজরেই ওই বিষয়ের সমস্ত সুত্র পেয়ে যান।
- শব্দগত নিখুঁত সতর্কতা: বর্ণনাকারীদের শব্দের সামান্যতম তারতম্য বা হেরফেরও (যেমন: ‘হাদ্দাসানা’ এবং ‘আখবারানা’ শব্দের সূক্ষ্ম পার্থক্য) তিনি অত্যন্ত সততার সাথে কিতাবে স্পষ্ট করে দিয়েছেন।
- সূক্ষ্ম মুকাদ্দিমা (ভূমিকা): কিতাবের শুরুতে তিনি হাদিসের উসূল বা মূলনীতির ওপর একটি বিশ্ববিখ্যাত ভূমিকা লিখেছেন, যা হাদিস বিজ্ঞানের এক অনন্য দলিল।
৭. তাঁর অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থাবলী
হাদিস, রাবিদের জীবনী এবং ফিকহের ওপর ইমাম মুসলিম বহু মূল্যবান কিতাব রচনা করেছেন। তাঁর রচিত প্রধান গ্রন্থসমূহ হলো:
- আল-জামি আস-সহীহ (সহীহ মুসলিম)
- কিতাবুল ইলাল: হাদিসের সূক্ষ্ম ও গোপন ত্রুটিসমূহ চিহ্নিত করার কিতাব।
- কিতাবুল উমদান মিনাল মুহাদ্দিসীন: সমকালীন প্রধান মুহাদ্দিসদের পরিচিতি।
- কিতাবুল আসমা ওয়াল কুনা: রাবিদের নাম ও উপাধির বিবরণ।
- কিতাবুত তমিয়ীয: হাদিস যাচাইয়ের চমৎকার নিয়মাবলী।
- কিতাবুল মুসনাদিল কাবীর আলা আসমায়ির রিজাল
৮. উন্নত চরিত্র, ব্যবসায়িক সততা ও তাকওয়া
ইমাম মুসলিম (রহ.) কেবল একজন তাত্ত্বিক পণ্ডিতই ছিলেন না; তিনি ছিলেন একজন সফল ব্যবসায়ী এবং অত্যন্ত আল্লাহভীরু মানুষ। কাপড়ের পাইকারি ব্যবসা ছিল তাঁর জীবিকার উৎস। নিশাপুরের কাপড়ের বাজারে তাঁর সততা ও বিশ্বস্ততা ছিল প্রবাদতুল্য। তিনি কখনো ওজনে কম দিতেন না এবং পণ্যের কোনো ত্রুটি থাকলে তা ক্রেতার সামনে স্পষ্ট করে দিতেন।
ব্যবসার লভ্যাংশের একটি বড় অংশ তিনি অভাবী আলেম, ছাত্র এবং এতিমদের মাঝে গোপনে বিলিয়ে দিতেন। তিনি অত্যন্ত মৃদুভাষী, পরোপকারী এবং উদার হৃদয়ের মানুষ ছিলেন। সমসাময়িক ঐতিহাসিক হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.) লিখেছেন, “তিনি ছিলেন অত্যন্ত খোদাভীরু, সুন্নাহর একনিষ্ঠ অনুসারী এবং নিজ যুগের এক অনন্য রত্ন।”
৯. ইন্তেকালের অলৌকিক ও ঐতিহাসিক ঘটনা
ইমাম মুসলিম (রহ.)-এর ইন্তেকালের ঘটনাটি ইতিহাসের পাতায় অত্যন্ত অদ্ভুত এবং স্মরণীয় হিসেবে লিপিবদ্ধ রয়েছে। এটি মূলত তাঁর ইলমি পিপাসা ও গবেষণার গভীরতার এক অনন্য প্রমাণ।
২৬১ হিজরি সালের এক রাতে ইমাম মুসলিমের নিকট একটি হাদিসের দরসে এমন একটি হাদিস নিয়ে আলোচনা ওঠে, যা তিনি তাৎক্ষণিকভাবে সম্পূর্ণ মনে করতে পারছিলেন না। মজলিস শেষে তিনি ঘরে ফিরে আসেন এবং সেই হাদিসটির মূল সূত্র বা সনদটি খুঁজে বের করার জন্য তাঁর বিশাল কিতাবের লাইব্রেরিতে বসেন। ওই রাতেই এক ব্যক্তি ভালোবেসে তাঁকে এক ঝুড়ি খেজুর উপহার দিয়ে যান।
ইমাম মুসলিম কিতাবের পাতা উল্টে গভীর মনোযোগ দিয়ে হাদিসটি খুঁজছিলেন আর অবচেতন মনে এক এক করে ঝুড়ি থেকে খেজুর মুখে দিচ্ছিলেন। হাদিসটি খুঁজে পাওয়ার গভীর নেশা এবং ইলমি গবেষণায় তিনি এতটাই মগ্ন ছিলেন যে, তিনি যে এক এক করে পুরো ঝুড়ির সমস্ত খেজুর খেয়ে ফেলেছেন, তা টেরই পাননি। অতিরিক্ত খেজুর খাওয়ার ফলে তাঁর পাকস্থলীতে তীব্র প্রতিক্রিয়া ও ইনফেকশন দেখা দেয় এবং তিনি মারাত্মকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন।
১০. শেষ শয্যা
এই অসুস্থতাই তাঁর জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। কিতাবের পাতায় হাদিস অন্বেষণ করতে করতে অসুস্থ হওয়ার পর, ২৬১ হিজরি সালের ২৫ রজব, রোজ রবিবার (মোতাবেক মে, ৮৭৫ খ্রিস্টাব্দ) মাত্র ৫৭ বছর বয়সে ইলমে হাদিসের এই মহান দিকপাল নিশাপুর শহরে ইন্তেকাল করেন। পরদিন সোমবার নিশাপুরের ‘নাসরাবাদ’ নামক শহরতলীতে এক বিশাল জানাজা শেষে তাঁকে দাফন করা হয়। তাঁর মৃত্যুতে সমগ্র খোরাসান তথা মুসলিম বিশ্বে শোকের ছায়া নেমে এসেছিল।
উপসংহার
ইমাম মুসলিম (রহ.) দুনিয়া থেকে বিদায় নিলেও তাঁর রেখে যাওয়া ‘সহীহ মুসলিম’ আজো বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মুসলমানের হৃদয়ে আলোর মশাল জ্বেলে রেখেছে। হাদিসের বিশুদ্ধতা রক্ষা এবং বর্ণনাকারীদের সূক্ষ্ম ধারাবাহিকতা বজায় রাখার যে নিখুঁত মানদণ্ড তিনি স্থাপন করে গেছেন, তা কিয়ামত পর্যন্ত অক্ষুণ্ণ থাকবে। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইমাম মুসলিমকে জান্নাতুল ফিরদাউসের সর্বোচ্চ মাকাম দান করুন এবং সুন্নাহর এই খিদমতের জন্য তাঁকে সর্বোত্তম প্রতিদান দিন। আমীন।
তার লিখিত কিছু কিতাব :
০২. সহিহ মুসলিম
আবুল হুসাইন মুসলিম ইবনুল হাজ্জাজ আল-কুশাইরি।

ইসলামি শরিয়তের ইতিহাসে সহিহ বুখারি-র ঠিক পরেই যে কিতাবটির স্থান, তা হলো সহিহ মুসলিম। সিহাহ সিত্তার অন্যতম প্রধান এই স্তম্ভটি তার চমৎকার বিন্যাস এবং বিশুদ্ধতার জন্য বিশ্বজুড়ে সমাদৃত।
এ কালজয়ী গ্রন্থের সংকলক ইমাম মুসলিমের পূর্ণ নাম আবুল হুসাইন মুসলিম ইবনুল হাজ্জাজ আল-কুশাইরি। তিনি ২০৪ হিজরিতে (মতান্তরে ২০৬ হি.) ইরানের নিশাপুরে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ইমাম বুখারি (রহ.)-এর অন্যতম প্রধান এবং অনুগত ছাত্র ছিলেন।
জ্ঞানের সন্ধানে তিনি ইরাক, হিজাজ, সিরিয়া ও মিশর সফর করেন। তাঁর সমকালীন আলেমগণ তাঁকে হাদিস শাস্ত্রের এক অনন্য সম্রাট হিসেবে অভিহিত করতেন। তিনি অত্যন্ত বিনয়ী ও সত্যনিষ্ঠ মানুষ ছিলেন। ২৬১ হিজরিতে নিজ জন্মভূমি নিশাপুরেই এই মহান মনীষী ইন্তেকাল করেন।
সহিহ মুসলিম: বিন্যাস ও বৈশিষ্ট্যের অনন্য স্মারক
ইমাম মুসলিম তাঁর সংগৃহীত ৩ লক্ষ হাদিস থেকে দীর্ঘ ১৫ বছরের পরিশ্রমে এই মহান গ্রন্থটি সংকলন করেন। কিতাবটির বেশ কিছু স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য একে অন্য সব হাদিস গ্রন্থ থেকে আলাদা করেছে:
- চমৎকার বিন্যাস: ইমাম মুসলিমের কিতাব বিন্যাস পদ্ধতি অত্যন্ত আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত। তিনি একই বিষয়ের ওপর বর্ণিত সকল হাদিস এবং সেগুলোর বিভিন্ন সূত্রকে (Sanad) একই স্থানে একত্রিত করেছেন। এতে পাঠক খুব সহজে একটি নির্দিষ্ট বিষয়ের সব হাদিস এক জায়গায় পেয়ে যান।
- সংক্ষিপ্ত ভূমিকা: কিতাবটির শুরুতে ইমাম মুসলিম একটি মূল্যবান ভূমিকা লিখেছেন, যেখানে তিনি হাদিস শাস্ত্রের মূলনীতি, রাবিদের বিশ্বস্ততা এবং হাদিস গ্রহণের শর্তাবলি অত্যন্ত চমৎকারভাবে বর্ণনা করেছেন।
- সূক্ষ্মতা: হাদিসের শব্দ বা বর্ণনার সামান্যতম পার্থক্যও (যেমন: ‘হাদ্দাসানা’ এবং ‘আখবারানা’ শব্দের ব্যবহার) তিনি অত্যন্ত আমানতদারিতার সাথে আলাদা করে উল্লেখ করেছেন।
- হাদিসের সংখ্যা: পুনরাবৃত্তিসহ এই গ্রন্থে প্রায় ৭,৫০০টি হাদিস রয়েছে। তবে পুনরাবৃত্তি বাদ দিলে মূল হাদিসের সংখ্যা প্রায় ৪,০০০।
মুসলিম উম্মাহর সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, কোরআন মাজিদের পর সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম হচ্ছে জগতের সবচেয়ে বিশুদ্ধ গ্রন্থ। এই কিতাবটি হাদিস গবেষণার ক্ষেত্রে এক অপরিহার্য মাইলফলক।
ডাউনলোড লিংক :
| ক্র: নং | খণ্ড নম্বর | ডাউনলোড |
| ০১ | প্রথম খণ্ড | ডাউনলোড |
| ০২ | দ্বিতীয় খণ্ড | ডাউনলোড |
| ০৩ | তৃতীয় খণ্ড | ডাউনলোড |
| ০৪ | চতুর্থ খণ্ড | ডাউনলোড |
| ০৫ | পঞ্চম খণ্ড | ডাউনলোড |
| ০৬ | ষষ্ঠ খণ্ড | ডাউনলোড |
| ০৭ | সপ্তম খণ্ড | ডাউনলোড |
| ০৮ | অষ্টম খণ্ড | ডাউনলোড |
আহলে হাদিস লাইব্রারী প্রকাশনি :
| ক্র: নং | খণ্ড নম্বর | ডাউনলোড |
| ০১ | প্রথম খণ্ড | ডাউনলোড |
| ০২ | দ্বিতীয় খণ্ড | ডাউনলোড |
| ০৩ | তৃতীয় খণ্ড | ডাউনলোড |
| ০৪ | চতুর্থ খণ্ড | ডাউনলোড |
| ০৫ | পঞ্চম খণ্ড | ডাউনলোড |
| ০৬ | ষষ্ঠ খণ্ড | ডাউনলোড |
০২. আল লু-লু ওয়াল মারজান
লেখক : ইমাম বুখারী (রহ.) ও ইমাম মুসলিম (রহ.)
ডাউনলোড করতে বা পড়তে ক্লিক করুন
