ইমাম মালিক ইবনে আনাস (রহ.)

হাদিস ও ফিকহের প্রোজ্জ্বল ভাস্কর: ইমাম মালিক ইবনে আনাস (রহ.)-এর বিস্তৃত জীবনী

ইসলামি আইনশাস্ত্র (ফিকহ) এবং হাদিস সংকলনের ইতিহাসে যে কজন মহান মনীষী নিজের মেধা, প্রজ্ঞা এবং অতুলনীয় সততার মাধ্যমে মদিনাতুল মুকাররমার ইলমি ঐতিহ্যকে বিশ্বজুড়ে পুনরুজ্জীবিত করেছেন, তাঁদের মধ্যে ইমাম মালিক ইবনে আনাস (রহ.) অন্যতম। তিনি আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামায়াহর চার প্রধান ইমামের দ্বিতীয় এবং ‘মালিকি মাযহাব’-এর মহান প্রতিষ্ঠাতা। তিনি ইসলামের ইতিহাসে প্রথম সুসংবদ্ধ ও সুবিন্যস্ত হাদিস গ্রন্থ ‘মুয়াত্তা’ (الموطأ)-এর অমর রচয়িতা। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শহর মদিনার ফিকহ ও হাদিস চর্চাকে তিনি এমন এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন যে, সমকালীন বিশ্ব তাঁকে ‘ইমামু দারিল হিজরাহ’ (হিজরতের বাসভূমির ইমাম) উপাধিতে ভূষিত করেছিল।

নিচে এই মহান ইমামের জন্ম, অলৌকিক শৈশব, জ্ঞান-সাধনা, শিক্ষক ও ছাত্র সমাজ, কালজয়ী গ্রন্থ ‘মুয়াত্তা’ সংকলনের ইতিহাস, উন্নত চরিত্র এবং জীবনের শেষ দিনগুলোর ওপর একটি বিস্তারিত ও তথ্যবহুল আলোচনা তুলে ধরা হলো:

১. জন্ম ও বংশ পরিচয়

ইমাম মালিক (রহ.) ৯৩ হিজরি মোতাবেক ৭১১ খ্রিস্টাব্দে (উমাইয়া খিলাফতের আমলে খলিফা ওয়ালিদ ইবনে আব্দুল মালিকের রাজত্বকালে) পবিত্র মদিনা নগরীতে একটি অত্যন্ত সম্ভ্রান্ত ও ঐতিহ্যবাহী আরব পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।

তাঁর পুরো নাম হলো: আবু আব্দুল্লাহ মালিক ইবনে আনাস ইবনে মালিক ইবনে আবি আমির আল-আসবাহী আল-মাদানি। তাঁর পূর্বপুরুষগণ ইয়েমেনের বিখ্যাত ‘আসবাহ’ গোত্রের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। তাঁর প্রপিতামহ আবু আমির (রা.) একজন সম্মানিত সাহাবি ছিলেন, যিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সাথে বিভিন্ন জিহাদে অংশ নিয়েছিলেন। পরবর্তীতে তাঁর পরিবার মদিনায় এসে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে। মদিনার আলো-বাতাসে জন্ম ও আজীবন সেখানে অবস্থান করার কারণে তিনি ‘আল-মাদানি’ নামেও বিশ্বজুড়ে সমধিক পরিচিতি লাভ করেন।

২. শৈশব ও পারিবারিক পরিবেশ

ইমাম মালিক (রহ.) এমন এক পরিবারে চোখ মেলেছিলেন, যা আগে থেকেই ইলমে হাদিস ও দ্বীনি চর্চার জন্য মদিনায় সুপরিচিত ছিল। তাঁর দাদা মালিক ইবনে আবি আমির ছিলেন একজন উচ্চ পর্যায়ের তাবেয়ি এবং বিখ্যাত মুহাদ্দিস। তাঁর পিতা আনাস এবং চাচা আবু সুহাইলও হাদিস বর্ণনাকারী ছিলেন।

শৈশবেই ইমাম মালিক অত্যন্ত প্রখর মেধা, ধীশক্তি ও অসাধারণ স্মরণশক্তির অধিকারী ছিলেন। তাঁর মা ছিলেন এক অত্যন্ত বুদ্ধিমতী ও দূরদর্শী নারী। প্রথম জীবনে ইমাম মালিকের ইচ্ছা ছিল তিনি গায়ক বা সুরকার হবেন। কিন্তু তাঁর মা তাঁকে ডেকে অত্যন্ত স্নেহের সাথে বলেছিলেন, “বাবা! সুরকারদের কদর সাময়িক, কিন্তু আলেমদের মর্যাদা চিরন্তন। তুমি কাপড়ের সুন্দর পোশাক পরে বিখ্যাত আলেম রাবিআতুর রায়ের মজলিসে যাও এবং তাঁর জ্ঞানের আগে তাঁর আদব ও চরিত্র শিক্ষা করো।” মায়ের এই একটি উপদেশ ইমাম মালিকের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয় এবং তিনি পুরোদমে দ্বীনি ইলম অর্জনে আত্মনিিয়োগ করেন।

৩. শিক্ষাজীবন ও মদিনার শায়খগণ

ইমাম মালিক (রহ.) চার ইমামের মধ্যে অনন্য এই কারণে যে, তিনি জ্ঞান অর্জনের জন্য মদিনার বাইরে অন্য কোনো দেশে দীর্ঘ সফরে যাননি। কারণ তৎকালীন সময়ে মদিনাই ছিল সমগ্র মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে বড় জ্ঞানকেন্দ্র, যেখানে শত শত সাহাবির সন্তান ও তাবেয়িগণ বসবাস করতেন। ইমাম মালিক মদিনার প্রায় ৯০০ জন উস্তাদের কাছ থেকে জ্ঞান লাভ করেছিলেন, যার মধ্যে ৩০০ জন ছিলেন তাবে-তাবেয়ি এবং ৬০০ জন ছিলেন সরাসরি তাবেয়ি।

তিনি দীর্ঘ সাত বছর মদিনার বিখ্যাত ফকিহ ইমাম ইবনে হুরমুজ (রহ.)-এর সান্নিধ্যে কাটান, যেখানে তিনি ফিকহের সূক্ষ্মতম বিষয়গুলো রপ্ত করেন। এছাড়া তাঁর উল্লেখযোগ্য কয়েকজন উস্তাদ হলেন:

  • নাফি’ মাওলা ইবনে উমর: যিনি প্রখ্যাত সাহাবি হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.)-এর মুক্তপ্রাপ্ত দাস ও প্রধান ছাত্র ছিলেন। হাদিস শাস্ত্রে নাফি’র সূত্রে ইমাম মালিকের বর্ণিত সনদকে ‘সিলসিলাতুয যাহাব’ বা ‘স্বর্ণালী সূত্র’ বলা হয়।
  • ইমাম ইবনে শিহাব আজ-জুহরি: তদানীন্তন যুগের অন্যতম প্রধান মুহাদ্দিস।
  • রাবিআতুর রায়: মদিনার বিখ্যাত ফকিহ ও যুক্তিবাদী আলেম।
  • ইমাম জাফর আস-সাদিক: আহলে বাইতের মহান ইমাম।

৪. শিক্ষকতা ও ফতোয়া প্রদানের কঠোর সততা

ইমাম মালিক (রহ.) যখন পড়াশোনা শেষ করে মদিনার মসজিদে নববীতে দরস (শিক্ষকতা) দেওয়া শুরু করেন, তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ২১ বছর। তবে তিনি হুট করেই ফতোয়া দেওয়া শুরু করেননি। তিনি নিজেই বলেছেন, “মদিনার ৭০ জন শীর্ষস্থানীয় আলেম ও ফকিহ যতক্ষণ না সাক্ষ্য দিয়েছেন যে আমি ফতোয়া দেওয়ার যোগ্য, ততক্ষণ আমি ফতোয়ার মসনদে বসিনি।”

মসজিদে নববীতে তাঁর হাদিসের মজলিস ছিল অত্যন্ত গাম্ভীর্যপূর্ণ। তিনি যখন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাদিস বর্ণনা করার ইচ্ছা করতেন, তখন প্রথমে গোসল করতেন, নতুন ও পবিত্র পোশাক পরিধান করতেন, সুগন্ধি মাখতেন এবং অত্যন্ত ধীরস্থিরভাবে বসতেন। মজলিসে কেউ জোরে কথা বলতে পারত না, কারণ ইমাম মালিক মনে করতেন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওফাতের পরেও তাঁর হাদিসের সামনে জোরে কথা বলা রাসুল (সা.)-এর দরবারে জোরে কথা বলার মতোই বেয়াদবি।

কোনো মাসআলা জানা না থাকলে তিনি নির্দ্বিধায় তা স্বীকার করতেন। একবার দূর দেশ থেকে এক ব্যক্তি দীর্ঘ ছয় মাস সফর করে ৪০টি জটিল প্রশ্ন নিয়ে ইমাম মালিকের নিকট আসেন। ইমাম মালিক অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে প্রশ্নগুলো শুনে মাত্র ৪টি প্রশ্নের উত্তর দিলেন এবং বাকি ৩৬টি প্রশ্ন সম্পর্কে বললেন, “লা আদরি” (আমি জানি না)। লোকটি বিস্মিত হয়ে বলল, “আমি পুরো দুনিয়াকে বলব যে মদিনার ইমাম বলেছেন তিনি জানেন না?” ইমাম মালিক শান্তভাবে বললেন, “হ্যাঁ, তুমি গিয়ে মানুষকে এটাই বলো যে মালিক জানে না; কারণ দ্বীনের ব্যাপারে আন্দাজে কথা বলার চেয়ে নিজের অজ্ঞতা স্বীকার করা অনেক উত্তম।”

৫. ‘মুয়াত্তা ইমাম মালিক’: হাদিস ইতিহাসের প্রথম আলোকবর্তিকা

ইমাম মালিক (রহ.)-এর জীবনের সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ এবং কালজয়ী কীর্তি হলো তাঁর সংকলিত গ্রন্থ ‘মুয়াত্তা’। ‘মুয়াত্তা’ শব্দের অর্থ হলো ‘সহজসাধ্য’ বা ‘সর্বসাধারণের জন্য সুগম’।

সংকলনের পটভূমি:

আব্বাসীয় খিলাফতের বিখ্যাত খলিফা আবু জাফর আল-মনসুর যখন হজে আসেন, তখন তিনি ইমাম মালিকের প্রজ্ঞা দেখে মুগ্ধ হন। খলিফা ইমাম মালিককে অনুরোধ করেন যেন তিনি এমন একটি কিতাব সংকলন করেন, যা চরমপন্থা ও শিথিলতার মাঝামাঝি একটি ভারসাম্যপূর্ণ রূপ হবে এবং যা দেখে সমগ্র মুসলিম উম্মাহর আইনি বিধি-বিধান পরিচালনা করা যাবে। খলিফার এই অনুরোধে ইমাম মালিক দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে কঠোর যাচাই-বাছাইয়ের পর ‘মুয়াত্তা’ সংকলন করেন।

গ্রন্থের বৈশিষ্ট্য:

মুয়াত্তা কেবল হাদিসের কিতাব নয়, বরং এটি একই সাথে হাদিস, সাহাবিদের ফাতওয়া, তাবেয়িদের আমল এবং মদিনার ইজমার এক অপূর্ব সমন্বয়। ইমাম শাফিঈ (রহ.) এই গ্রন্থ সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেছিলেন:

“আসমানের নিচে আল্লাহর কিতাব পবিত্র কুরআনের পর ইমাম মালিকের মুয়াত্তার চেয়ে বিশুদ্ধ ও উপকারী আর কোনো কিতাব নেই।” (উল্লেখ্য, এটি সহীহ বুখারী সংকলনের আগের উক্তি)

৬. ইমাম মালিক (রহ.)-এর ছাত্র সমাজ

ইমাম মালিকের দরসে শামিল হতে দূর-দূরান্ত থেকে রাজা-বাদশাহ থেকে শুরু করে সাধারণ শিক্ষার্থীরা মদিনায় ভিড় জমাতেন। তাঁর হাত ধরে হাজার হাজার মুহাদ্দিস ও ফকিহ তৈরি হয়েছেন। তাঁর ছাত্রদের মধ্যে সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্র ছিলেন ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে ইদরিস আশ-শাফিঈ (রহ.) (শাফিঈ মাযহাবের প্রতিষ্ঠাতা)। ইমাম শাফিঈ মাত্র ৯ দিন বয়সে পুরো মুয়াত্তা কিতাবটি মুখস্থ করে ইমাম মালিকের দরবারে এসেছিলেন। তাঁর অন্যান্য বিখ্যাত ছাত্রদের মধ্যে রয়েছেন:

  • ইমাম মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান আশ-শায়বানি (ইমাম আবু হানিফার প্রধান ছাত্র, যিনি ইমাম মালিকের কাছ থেকেও মুয়াত্তা পড়েছিলেন)
  • আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক (যুগশ্রেষ্ঠ জাহিদ ও মুহাদ্দিস)
  • আব্দুর রহমান ইবনুল কাসিম এবং ইমাম আশহাব (যাঁরা মালিকি ফিকহকে আফ্রিকায় ছড়িয়ে দিয়েছিলেন)
  • ইয়াহইয়া ইবনে ইয়াহইয়া আল-লাইসী (যাঁর বর্ণিত মুয়াত্তার সংস্করণটি বর্তমানে সবচেয়ে বেশি প্রচলিত)

৭. হকের পক্ষে অনড় অবস্থান ও অমানুষিক নির্যাতন

ইমাম মালিক (রহ.) খলিফাদের অত্যন্ত সম্মান করতেন, কিন্তু দ্বীনের ও হকের প্রশ্নে তিনি কখনো আপস করেননি। আব্বাসীয় খলিফা আবু জাফর আল-মনসুরের আমলে একটি রাজনৈতিক মাসআলা তৈরি হয়েছিল যে, “জোরপূর্বক বা বাধ্য করে নেওয়া কসম বা বায়আত কার্যকর হয় না।” ইমাম মালিক রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাদিসের আলোকে ফতোয়া দিলেন যে, বলপ্রয়োগে নেওয়া তালাক যেমন কার্যকর হয় না, তেমনি জোরপূর্বক নেওয়া রাজনৈতিক বায়আতও বৈধ নয়।

এই ফতোয়া খলিফার শাসনের বিরুদ্ধে যাওয়ায় মদিনার তৎকালীন গভর্নর জাফর ইবনে সুলাইমান ইমাম মালিককে এই ফতোয়া দিতে নিষেধ করেন। কিন্তু ইমাম মালিক খলিফার রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে প্রকাশ্যে এই হাদিস বর্ণনা করতে থাকেন। ফলশ্রুতিতে গভর্নর তাঁকে বন্দি করেন এবং শাস্তিস্বরূপ তাঁর দুই হাত পিঠের দিকে মুচড়ে চাবুক মারার নির্দেশ দেন। চাবুকের আঘাতে তাঁর হাত দুটি কাঁধ থেকে স্থানচ্যুত হয়ে যায়। এত নির্যাতনের পরেও তিনি চাবুক খাওয়া অবস্থায় মদিনার বাজারে দাঁড়িয়ে উচ্চস্বরে বলছিলেন, “যে আমাকে চেনে সে তো চেনেই, আর যে চেনে না সে জেনে রাখো—আমি মালিক ইবনে আনাস; আর আমি ফতোয়া দিচ্ছি যে জোরপূর্বক নেওয়া বায়আত বাতিল!” পরবর্তীতে খলিফা মনসুর নিজের ভুল বুঝতে পেরে ইমাম মালিকের কাছে ক্ষমা চেয়েছিলেন।

৮. রাজকীয় প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান ও ইলমের মর্যাদা রক্ষা

খলিফা হারুন উর রশীদ যখন খিলাফতের দায়িত্বে আসেন, তখন তিনি ইমাম মালিকের ‘মুয়াত্তা’ গ্রন্থটিকে কাবার দেয়ালে ঝুলিয়ে দিয়ে সারা বিশ্বের মুসলমানদের জন্য হানাফি বা অন্য মাযহাব বাদ দিয়ে কেবল এই একটি কিতাব বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব দেন। কিন্তু ইমাম মালিকের সংকীর্ণতা ছিল না। তিনি খলিফাকে বললেন, “হে আমিরুল মুমিনীন! এমনটি করবেন না। কারণ সাহাবিগণ বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়েছেন এবং তাঁদের মাধ্যমে বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের কাছে রাসুল (সা.)-এর ভিন্ন ভিন্ন হাদিস ও মাসআলা পৌঁছেছে। মানুষ যা অনুসরণ করছে তা তাঁদের অবস্থানেই থাকতে দিন।” খলিফা হারুন উর রশীদ একবার তাঁর দুই সন্তান আমিন ও মামুনকে ইলম শেখানোর জন্য ইমাম মালিককে রাজপ্রাসাদে আসার আমন্ত্রণ জানান। ইমাম মালিক খলিফাকে ঐতিহাসিক এক জবাব দিয়েছিলেন:

“হে খলিফা! ইলম বা জ্ঞান কারও দরজায় যায় না, বরং জ্ঞানপিপাসুকেই জ্ঞানের দরজায় আসতে হয়।”

এই কথা শুনে খলিফা লজ্জিত হন এবং তাঁর দুই সন্তানকে সাধারণ ছাত্রদের মতো ইমাম মালিকের মাদরাসায় পাঠিয়ে ইলম শিক্ষা দেন।

৯. তাকওয়া, দুনিয়াবিমুখতা ও জীবনের শেষ দিনগুলো

ইমাম মালিক (রহ.) অত্যন্ত সুঠাম ও সুদর্শন দেহের অধিকারী ছিলেন। তিনি সবসময় সুন্দর ও পরিষ্কার পোশাক পরতেন। তিনি মদিনা নগরীকে এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর স্মৃতিকে এতটাই সম্মান করতেন যে, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি মদিনার মাটিতে কখনো জুতো পায়ে দেননি বা কোনো পশুর (ঘোড়া বা গাধা) ওপর চড়েননি; তিনি বলতেন, “যে মাটিতে আমার রাসুল (সা.) হেঁটে গেছেন, সেই মাটিকে আমি জুতো বা পশুর ক্ষুর দিয়ে অবমাননা করতে পারব না।”

জীবনের শেষ কয়েক বছর তিনি অসুস্থতার কারণে গৃহবন্দী হয়ে পড়েন এবং মসজিদে নববীতে যাওয়া বন্ধ করে দেন। তবে তিনি ঘরে বসেই ইবাদত ও ইলমি খিদমত জারি রেখেছিলেন।

১০. ওফাত ও শেষ শয্যা

অবশেষে, ১৭৯ হিজরির ১৪ সফর (মোতাবেক ৭৯৫ খ্রিস্টাব্দ) ৮৬ বছর বয়সে ইলমে হাদিস ও ফিকহের এই মহান সম্রাট মদিনাতুল মুকাররমায় ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুর সময় তাঁর জিহ্বায় কেবল আল্লাহর তাওহীদের বাণী উচ্চারিত হচ্ছিল। মদিনার গভর্নর আব্দুল্লাহ ইবনে জয়নব তাঁর জানাজার নামাজ পড়ান। জানাজা শেষে মদিনার বিখ্যাত ‘জান্নাতুল বাকী’ গোরস্থানে উম্মাহর এই মহান অভিভাবককে দাফন করা হয়।

উপসংহার

ইমাম মালিক ইবনে আনাস (রহ.) আজ দুনিয়ায় নেই, কিন্তু তাঁর সুসংবদ্ধ ‘মুয়াত্তা’ এবং তাঁর প্রতিষ্ঠিত ‘মালিকি মাযহাব’ আজো উত্তর আফ্রিকা, হিজাজ এবং সুদানসহ বিশ্বের কোটি কোটি মুসলমানকে শরিয়তের সঠিক পথ দেখাচ্ছে। মদিনার খাঁটি ঐতিহ্য ও সুন্নাহ সুরক্ষায় তাঁর অবদান কিয়ামত পর্যন্ত মুসলিম উম্মাহ গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করবে। মহান আল্লাহ তাআলা ইমাম মালিককে জান্নাতুল ফিরদাউসের সর্বোচ্চ মাকাম দান করুন। আমীন।

তার লিখত বিশ্ববিখ্যাত কিতাব মুয়াত্তা ইমাম মালিক 

সংকলক : মালিক ইবনে আনাস (রহ.)

বিশুদ্ধ হাদিস সংকলনের ইতিহাসে মুয়াত্তা ইমাম মালিক এক ঐতিহাসিক এবং প্রারম্ভিক স্তম্ভ। এটি হাদিস শাস্ত্রের ইতিহাসে প্রথম সুশৃঙ্খল এবং প্রামাণ্য গ্রন্থ হিসেবে স্বীকৃত। সিহাহ সিত্তাহর গ্রন্থগুলো সংকলনেরও প্রায় ১০০ বছর আগে এই মহান কিতাবটি রচিত হয়েছে।

ইমাম মালিক (রহ.)-এর সংক্ষিপ্ত জীবনী

ইমাম মালিকের পূর্ণ নাম মালিক ইবনে আনাস। তিনি ৯৩ হিজরিতে পবিত্র মদিনা মুনাওয়ারায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন ‘দারুল হিজরত’ বা মদিনার শ্রেষ্ঠ ইমাম। মদিনার শ্রেষ্ঠ সাতজন ফকিহ এবং বড় বড় তাবিঈদের কাছে তিনি ইলম অর্জন করেন।

ইমাম মালিক সারাজীবন মদিনার বাইরে অন্য কোথাও ইলম অর্জনে যাননি, কারণ সেই সময়ের প্রায় সব বড় আলেম মদিনায় অবস্থান করতেন। তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি এতটাই শ্রদ্ধাশীল ছিলেন যে, মদিনার রাস্তায় কখনো সওয়ারিতে চড়তেন না এবং ওজু ও সুগন্ধি ছাড়া হাদিস বর্ণনা করতেন না। ১৭৯ হিজরিতে তিনি মদিনাতেই ইন্তেকাল করেন এবং জান্নাতুল বাকিতে তাঁকে দাফন করা হয়।


মুয়াত্তা ইমাম মালিক: প্রথম প্রামাণ্য সংকলন

‘মুয়াত্তা’ শব্দের অর্থ হলো ‘যা সহজবোধ্য করা হয়েছে’ অথবা ‘যাতে একমত হওয়া হয়েছে’। আব্বাসীয় খলিফা মনসুরের অনুরোধে ইমাম মালিক এই গ্রন্থটি সংকলন করেন যাতে সাধারণ মানুষ একটি সুশৃঙ্খল আইন বা গাইডলাইন পেতে পারে।

এই গ্রন্থের প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ:

  • মদিনার আলেমদের ঐকমত্য: ইমাম মালিক তাঁর সংকলিত হাদিসগুলো মদিনার ৭০ জন ফকিহকে দেখিয়েছিলেন। তারা সবাই এর সাথে একমত পোষণ করেছিলেন বলেই এর নাম রাখা হয় ‘মুয়াত্তা’।
  • হাদিস ও আসার: এই কিতাবে কেবল রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাদিসই নয়, বরং সাহাবায়ে কেরাম এবং তাবিঈদের ফতোয়া ও আমলও (আসার) অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
  • মানদণ্ড: ইমাম বুখারি (রহ.)-এর মতে, ‘মুয়াত্তা’-এর সনদ বা বর্ণনাকারী সূত্রগুলো বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সূত্র। বিশেষ করে ইমাম মালিক থেকে নাফে এবং নাফে থেকে ইবনে উমর (রা.)—এই ধারাটিকে ‘স্বর্ণশৃঙ্খল’ বা গোল্ডেন চেইন বলা হয়।
  • ফিকহি বিন্যাস: এটি মূলত একটি ফিকহ বা আইন বিষয়ক হাদিস গ্রন্থ। ইমাম মালিক অধ্যায়গুলো এমনভাবে সাজিয়েছেন যাতে মদিনাবাসীদের আমল এবং সুন্নাহর প্রতিফলন ঘটে।
  • হাদিসের সংখ্যা: বিভিন্ন বর্ণনাভেদে এই গ্রন্থে হাদিস ও আসারের সংখ্যা প্রায় ১,৭২০ থেকে ১,৮৫০টির মতো।

ইমাম শাফিঈ (রহ.) এই কিতাব সম্পর্কে বলেছিলেন, “আসমানের নিচে পবিত্র কুরআনের পর মুয়াত্তা ইমাম মালিকের চেয়ে অধিকতর বিশুদ্ধ আর কোনো কিতাব নেই।” (এটি সহিহ বুখারি সংকলনের আগের সময়ের মন্তব্য)। আধুনিক যুগেও গবেষক ও আলেমদের কাছে এই কিতাবটি এক অমূল্য সম্পদ।

ডাউনলোড লিংক :

ক্র: নংখণ্ড নম্বরডাউনলোড
০১প্রথম খণ্ড 
ডাউনলোড
০২দ্বিতীয় খণ্ড ডাউনলোড


"বাংলা ইসলামিক বইয়ের বিশাল পিডিএফ (PDF) আর্কাইভ"