বিংশ শতাব্দীতে অবিভক্ত বাংলা এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশে যে কজন বিশিষ্ট আলেমে দ্বীন সমাজ সংস্কার, খাঁটি তাওহীদের প্রচার এবং বিদআত উচ্ছেদে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন, মাওলানা আবু তাহের বর্ধমানী (রাহ.) তাদের মধ্যে অন্যতম। তিনি একাধারে ছিলেন একজন প্রথিতযশা লেখক, গবেষক, নির্ভীক সত্যপন্থী সম্পাদক এবং জামা‘আত আহলেহাদীসের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় মুরুব্বী ও পৃষ্ঠপোষক।
জন্ম ও বংশ পরিচয়
মাওলানা আবু তাহের বর্ধমানী ১৯২১ খ্রিষ্টাব্দে (১৩২৮ বঙ্গাব্দ) ব্রিটিশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বর্ধমান জেলার মঙ্গলকোট থানার অন্তর্গত ঐতিহ্যবাহী ‘শিমুলিয়া’ গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম মৌলভী মোহাম্মদ উসমান। তাঁর পিতা তৎকালীন সমাজের একজন ধার্মিক ও সম্মানিত ব্যক্তিত্ব ছিলেন, যাঁর ধর্মীয় অনুশাসন ও আদর্শ ছোটবেলা থেকেই আবু তাহের বর্ধমানীকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল।
শিক্ষাজীবন
পারিবারিক পরিবেশেই তাঁর প্রাথমিক শিক্ষার হাতেখড়ি হয়। এরপর তিনি শিমুলিয়া ও বর্ধমানের স্থানীয় বিভিন্ন মাদ্রাসায় ধর্মীয় শিক্ষার প্রাথমিক গণ্ডি পার করেন। মেধার স্বাক্ষর রেখে তিনি তৎকালীন উচ্চতর দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে আরবী ভাষা, সাহিত্য, তাফসীর, হাদীস এবং ফিকহ শাস্ত্রে গভীর পাণ্ডিত্য ও ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি প্রচলিত সিলেবাসের বাইরেও সমকালীন রাজনীতি, সমাজনীতি এবং বিভিন্ন মাযহাবের তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব নিয়ে প্রচুর পড়াশোনা করতেন।
কর্মজীবন ও সম্পাদনা শিল্পে অবদান
শিক্ষা জীবন সমাপ্তির পর তিনি নিজেকে দ্বীনের দাওয়াত এবং ইসলামী সাহিত্য প্রসারের কাজে নিয়োজিত করেন। বিশেষ করে মুসলিম সমাজের মুখপত্র হিসেবে বিভিন্ন সাময়িকী ও পত্রিকা সম্পাদনায় তিনি অনন্য ভূমিকা রাখেন:
- মাসিক তাওহীদ ও আহলে হাদীস (কলকাতা): কর্মজীবনের শুরুতে তিনি কলকাতা থেকে প্রকাশিত ‘মাসিক তাওহীদ’ পত্রিকার সম্পাদনার সাথে যুক্ত হন। পরবর্তীতে এই পত্রিকাটিই ‘আহলে হাদীস’ নামে আত্মপ্রকাশ করলে তিনি সেখানে চিন্তাশীল প্রবন্ধ ও নিবন্ধ লিখতেন।
- সাপ্তাহিক পয়গাম (কলকাতা): সমাজ ও রাজনীতির অসঙ্গতি দূর করতে এই পত্রিকায় তাঁর কলামগুলো দারুণ সমাদৃত হয়েছিল।
- মাসিক আল-মুজাহিদ (দিনাজপুর): বাংলাদেশে স্থায়ী হওয়ার পর তিনি দিনাজপুর থেকে প্রকাশিত এই পত্রিকার সম্পাদনার দায়িত্ব অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে পালন করেন এবং উত্তরবঙ্গে তাওহীদের দাওয়াত ছড়িয়ে দেন।
লেখনী, সাহিত্য সাধনা ও ঐতিহাসিক মামলা (১৯৫৮)
মাওলানা আবু তাহের বর্ধমানী ছিলেন একজন অত্যন্ত তেজী ও স্পষ্টভাষী লেখক। সমাজে প্রচলিত পীরপূজা, মাজারপূজা, কবরপূজা এবং নানাবিধ কুসংস্কারের বিরুদ্ধে তাঁর লেখনী ছিল আপোষহীন।
‘সত্যের আলো’ ও রাষ্ট্রীয় মামলা:
১৩৬৪ বঙ্গাব্দে (মোতাবেক ১৯৫৮ খ্রিষ্টাব্দে) তাঁর সুপ্রসিড্ধু পুস্তিকা ‘সত্যের আলো’ প্রকাশিত হয়। এই বইটিতে তিনি তৎকালীন মুসলিম সমাজের ধর্মীয় বিচ্যুতি এবং বিদআতের অসারতা এতই জোরালোভাবে তুলে ধরেন যে, তৎকালীন ভারত সরকার একে উস্কানিমূলক ও বিপজ্জনক মনে করে শংকিত হয়ে পড়ে।
সরকার কর্তৃক তাঁর এই বইটির বিরুদ্ধে আদালতে মামলা দায়ের করা হয়। দীর্ঘ চার বছর ধরে এই ঐতিহাসিক আইনি লড়াই চলার পর, তৎকালীন সরকার বইটি বাজেয়াপ্ত ঘোষণা করে। তবে এই ঘটনার ফলে বইটি উভয় বঙ্গে (পশ্চিমবঙ্গ ও পূর্ব পাকিস্তান) ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং সাধারণ মানুষের চোখ খুলে দেয়।
তাঁর অন্যান্য উল্লেখযোগ্য বই:
১. কাট হুজ্জতির জওবাব: ধর্মীয় গোঁড়ামি ও অপযুক্তির বিরুদ্ধে কুরআন ও ছহীহ হাদীসের অকাট্য দলিলভিত্তিক জবাব।
২. পীরতন্ত্রের আজবলীলা: মাজার ও পীরপ্রথার নামে চলা ব্যবসার মুখোশ উন্মোচনকারী গ্রন্থ।
৩. সাধু সাবধান: মুসলিম সমাজকে ঈমানী ধোঁকা থেকে বাঁচানোর সতর্কতামূলক পুস্তিকা।
৪. প্রিয় নবীর প্রিয় কথা / প্রিয় নবীর অমিয়বাণী: রাসূলুল্লাহ (ছা.)-এর ছহীহ হাদীসসমূহের সহজ ও সাবলীল অনুবাদ।
বাংলাদেশে হিজরত ও স্থায়ী বসবাস
১৯৪৭ সালের দেশভাগের পরও তিনি জন্মভূমিতে থেকে তাঁর দাওয়াতী কাজ চালিয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে ১৯৬৪ খ্রিষ্টাব্দে পশ্চিমবঙ্গের প্রতিকূল সামাজিক ও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাজনিত পরিস্থিতির কারণে তিনি সপরিবারে বাংলাদেশে (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) হিজরত করেন।
বাংলাদেশে আসার পর তিনি উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার দিনাজপুর শহরকে তাঁর স্থায়ী বাসস্থান হিসেবে বেছে নেন। দিনাজপুর শহরের ‘পাটুয়াপাড়া’ মহল্লায় জমি ক্রয় করে বাড়ি নির্মাণ করেন এবং জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ওখান থেকেই দেশব্যাপী দ্বীনি কার্যক্রম পরিচালনা করেন।
সাংগঠনিক জীবন ও আদর্শিক অবস্থান
তিনি বিশুদ্ধ সালাফী আকীদা ও মানহাজের অনুসারী ছিলেন। বাংলাদেশে জামা‘আত আহলেহাদীসের প্রসারে তিনি আমৃত্যু কাজ করে গেছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, সুশৃঙ্খল সংগঠন ছাড়া দ্বীনের বড় সংস্কার সম্ভব নয়। তাই তিনি কেন্দ্রীয় জমিয়তে আহলেহাদীসের অন্যতম প্রধান উপদেষ্টা ও অভিভাবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর সুযোগ্য পুত্র হাফেয আতিকুর রহমান বিন আবু তাহের বর্ধমানীও বর্তমানে বাংলাদেশ জমিয়তে আহলেহাদীসের কেন্দ্রীয় জেনারেল কমিটির অন্যতম সদস্য হিসেবে দ্বীনের খেদমত করে যাচ্ছেন।
ইন্তেকাল
আজীবন তাওহীদের এই অকুতোভয় সৈনিক, গবেষক ও লেখক ২০০৩ খ্রিষ্টাব্দের ২৯শে নভেম্বর (১৪ই অগ্রহায়ণ, ১৪১০ সন) ইহকাল ত্যাগ করে মহান আল্লাহর সান্নিধ্যে চলে যান। দিনাজপুরের মাটিতেই এই মহান মনীষীকে সমাহিত করা হয়।
তার জীনের ঘটানবহুল মূল্যায়ন
১. তাওহীদের মশালবাহী: তিনি আজীবন শিরক, বিদআত এবং মাজার সংস্কৃতির বিরুদ্ধে সমাজে বিশুদ্ধ তাওহীদ ও সুন্নাহর বাণী প্রচার করেছেন।
২. আপোষহীন লেখক: ‘সত্যের আলো’ এবং ‘পীরতন্ত্রের আজবলীলা’ গ্রন্থের মাধ্যমে তিনি সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে থাকা কুসংস্কারের বিরুদ্ধে তীব্র লেখনী আক্রমণ চালিয়েছেন।
৩. বিপ্লবী চরিত্র: নিজের আদর্শ ও সত্য প্রকাশের কারণে ১৯৫৮ সালে ভারত সরকারের দায়ের করা ৪ বছরের দীর্ঘ মামলার ধকল ও বই বাজেয়াপ্ত হওয়ার ঘটনাটি তিনি বীরত্বের সাথে মোকাবেলা করেন।
৪. দক্ষ সম্পাদক: কলকাতা ও বাংলাদেশের একাধিক প্রথম সারির দ্বীনি পত্রিকার সফল সম্পাদনা করে ইসলামী সাংবাদিকতায় অনন্য অবদান রেখেছেন।
5. আদর্শিক হিজরতকারী: ঈমান, আমল ও দাওয়াতী মিশনকে স্বাধীনভাবে টিকিয়ে রাখার স্বার্থে ১৯৬৪ সালে নিজের চেনা জন্মভূমি ত্যাগ করে বাংলাদেশে হিজরত করেন।
৬. উত্তরবঙ্গের দ্বীনি মুরুব্বী: দিনাজপুরে স্থায়ীভাবে বসবাসের মাধ্যমে সমগ্র উত্তরবঙ্গে ছহীহ আকীদার আন্দোলনকে সুসংগঠিত ও বেগবান করেন।
৭. গবেষক ও বহুভাষাবিদ: আরবী, ফারসী ও বাংলা ভাষায় সমান পারদর্শী এই আলেম ইসলামী ফিকহ ও হাদীস শাস্ত্রের জটিল বিষয়গুলো সহজ বাংলায় আমজনতার কাছে তুলে ধরেছেন।
৮. সাংগঠনিক পথপ্রদর্শক: জামা‘আত আহলেহাদীসের অন্যতম শীর্ষ উপদেষ্টা হিসেবে দলের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও তরুণ দাঈদের দিকনির্দেশনা দিয়েছেন।
৯. প্রচারবিমুখ ও অনাড়ম্বর জীবন: বিপুল জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও অত্যন্ত সাদামাটা, লোভহীন এবং অহংকারমুক্ত জীবনযাপন করতেন।
১০. চিরস্থায়ী উত্তরাধিকার: তাঁর রেখে যাওয়া সাহিত্যকর্ম এবং আদর্শিক সন্তান ও শাগরেদগণ আজও এদেশের দ্বীনি অঙ্গনে আলো ছড়িয়ে যাচ্ছেন।
উপসংহার
মাওলানা আবু তাহের বর্ধমানী (রাহ.) ছিলেন জ্ঞান ও সাহসের এক অপূর্ব সংমিশ্রণ। রাষ্ট্রীয় চাপ বা সামাজিক বাধা কোনো কিছুই তাঁকে সত্যের পথ থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। ২০০৩ সালে তাঁর ইন্তেকালের মাধ্যমে বাঙালি মুসলিম সমাজ একজন প্রকৃত মুখলেছ আলেম ও অভিভাবককে হারিয়েছে। তবে তাঁর লিখিত বইসমূহ এবং তাঁর সংস্কারবাদী আন্দোলন সুন্নাহপ্রেমী মানুষের হৃদয়ে তাঁকে চিরকাল বাঁচিয়ে রাখবে। মহান আল্লাহ তাঁকে জান্নাতুল ফিরদাউস নসীব করুন। আমীন।
তার লিখিত কিছু কিতাব :
০১. অধঃপতনের অতল তলে
লেখক : আবু তাহের বর্ধমানী
০২. কুরআনের আয়াত দ্বারা মোনাজাত ও ও ১০০ দোয়া
লেখক : আবু তাহের বর্ধমানী
০৩. পীরতন্ত্রের আজবলীলা
লেখক : আবু তাহের বর্ধমানী
০৪. মুসলিম জীবনাদর্শ
লেখক : আবু তাহের বর্ধমানী



