মাওলানা উবায়দুর রহমান খান নদভী

মাওলানা উবায়দুর রহমান খান নদভী: জীবন, কর্ম ও অবদান

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের ইসলামি শিক্ষা, সংস্কৃতি, সাহিত্য, সাংবাদিকতা এবং সমাজ সংস্কারের ক্ষেত্রে যে কজন ব্যক্তিত্ব অগ্রণী ভূমিকা পালন করে চলেছেন, মাওলানা উবায়দুর রহমান খান নদভী তাদের মধ্যে অন্যতম। তিনি একাধারে একজন বিশিষ্ট ইসলামি চিন্তাবিদ, রাজনীতিবিদ, প্রতিভাবান শিক্ষাবিদ, যশস্বী লেখক, তীক্ষ্ণধী কলামিস্ট, পত্রিকা সম্পাদক এবং কওমি ধারার অন্যতম শীর্ষস্থানীয় অভিভাবক। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ কওমি মাদরাসা শিক্ষাবোর্ড “বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশ” (বেফাক)-এর মহাপরিচালক (DG) হিসেবে অত্যন্ত সুনামের সাথে দায়িত্ব পালন করছেন। বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী এই মনীষী তার ক্ষুরধার লিখনী এবং প্রাজ্ঞ নেতৃত্বের মাধ্যমে দেশে-বিদেশে ইসলামি অঙ্গনে এক সমাদৃত নাম।

জন্ম ও পারিবারিক পরিচিতি:

মাওলানা উবায়দুর রহমান খান নদভী ১৯৬৬ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর কিশোরগঞ্জ শহরের ঐতিহাসিক জামিয়া রোডে অবস্থিত তাদের নিজস্ব বাসভবন ‘নূর মঞ্জিল’-এ জন্মগ্রহণ করেন। তিনি একটি অত্যন্ত সম্ভ্রান্ত এবং বিখ্যাত দ্বীনি, রাজনৈতিক ও পন্ডিত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।

তার পিতা প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ, বরেণ্য রাজনীতিবিদ এবং জাতীয় সংসদের প্রাক্তন সদস্য (এমপি) খতীবে ইসলাম মাওলানা আতাউর রহমান খান (রহ.)। মাওলানা আতাউর রহমান খান নিজেও বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশের মহাসচিব হিসেবে এক দীর্ঘ সময় কওমি অঙ্গনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তার মাতা মুরশিদা-ই-আমিনা ছিলেন একজন ধর্মপ্রাণ পুণ্যবতী নারী। পারিবারিক এই ঐতিহ্যবাহী দ্বীনি পরিবেশেই উবায়দুর রহমান খান নদভীর শৈশব ও কৈশোর কাটে। বাংলাদেশের বিখ্যাত ইসলামি সংগীতশিল্পী, কবি ও বুদ্ধিজীবী মুহিব খান তার ছোট ভাই।

শিক্ষাজীবন:

পারিবারিক শিক্ষার পাঠ চুকিয়ে উবায়দুর রহমান খান নদভী কিশোরগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী আল জামিয়াতুল ইমদাদিয়া মাদরাসায় ভর্তি হন। সেখানে তিনি কওমি শিক্ষা ধারার সর্বোচ্চ স্তর দাওরায়ে হাদিস (মাস্টার্স সমমান) অত্যন্ত কৃতিত্বের সাথে ১৯৮৩ সালে সম্পন্ন করেন। এরপর উচ্চতর আরবি ভাষা ও সাহিত্যের প্রতি গভীর অনুরাগের কারণে তিনি চট্টগ্রামের বিখ্যাত আল জামিয়া আল ইসলামিয়া পটিয়ার উচ্চতর সাহিত্য বিভাগে ভর্তি হন এবং ১৯৮৪ সালে সেখান থেকে আরবি ভাষা ও সাহিত্যে উচ্চতর ডিগ্রি লাভ করেন।

তার মেধার স্বাক্ষর ছড়িয়ে পড়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও। আরবি সাহিত্য ও ইসলামি জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রাণকেন্দ্র ভারতের লখনউতে অবস্থিত বিশ্বখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয় ‘দারুল উলুম নদওয়াতুল উলামা’ থেকে তিনি ১৯৮৫-৮৬ সালে ইসলামি শিক্ষা ও আরবি সাহিত্যে স্নাতক সম্পন্ন করেন। এই ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের ফলেই তার নামের শেষে ‘নদভী’ উপাধি যুক্ত হয়। এছাড়াও তিনি ভারতের বিখ্যাত দারুল উলুম দেওবন্দ থেকে সম্মানসূচক সনদ লাভ করেন।

কওমি ধারার পাশাপাশি তিনি আধুনিক শিক্ষায়ও শিক্ষিত হন। তিনি ১৯৯৪ সালে বাংলাদেশের জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিষয়ে প্রথম শ্রেণীতে এম.এ ডিগ্রি অর্জন করেন।

উচ্চশিক্ষা ও আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবে তিনি সৌদি আরবের মদিনা ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের দাওয়াহ অনুষদ থেকে “দাওয়াহ ও কালচারাল কোর্সে” বিশেষ প্রশিক্ষণ লাভ করেন। সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) থেকে তিনি রাজনীতি বিষয়ে বিশেষ ডিপ্লোমা করেন এবং সৌদি আরব থেকে মিডিয়া ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের (International Relations) ওপর বিশেষ ডিগ্রি অর্জন করেন।

ভাষাগত দক্ষতা:

উবায়দুর রহমান খান নদভী বহুভাষাবিদ হিসেবে পরিচিত। তিনি মাতৃভাষা বাংলা ছাড়াও আরবি, উর্দু, ফারসি, হিন্দি এবং ইংরেজি ভাষায় সমান পারদর্শী। এই সবকটি ভাষায় তার অনর্গল কথা বলার ও সাবলীল লেখালেখির চমৎকার যোগ্যতা রয়েছে, যা তাকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ও কওমি ধারার প্রতিনিধিত্ব করার অসামান্য সুযোগ করে দিয়েছে।

কর্মজীবন ও সাংবাদিকতা:

মাওলানা উবায়দুর রহমান খান নদভীর কর্মজীবন অত্যন্ত বৈচিত্র্যময় এবং বর্ণিল। তিনি শিক্ষকতা, সাংবাদিকতা, সম্পাদনা এবং গবেষণা—সব ক্ষেত্রেই তার মেধার স্বাক্ষর রেখেছেন।

  • শিক্ষকতা: একজন শিক্ষক হিসেবে তার কর্মজীবনের পথচলা অত্যন্ত দীর্ঘ। তিনি ঢাকার ঐতিহ্যবাহী জামিয়া আরাবিয়া ইমদাদুল উলুম ফরিদাবাদ, জামিয়া ইসলামিয়া দারুল উলুম মাদানিয়া যাত্রাবাড়ী এবং আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান মারকাজুদ্দাওয়াহ আল ইসলামিয়াসহ দেশের শীর্ষস্থানীয় বহু মাদরাসায় শিক্ষক ও অধ্যাপক হিসেবে যুক্ত ছিলেন। এছাড়াও তিনি দেশ-বিদেশের বিভিন্ন ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় ও সেমিনারে অতিথি অধ্যাপক (Guest Lecturer) হিসেবে বক্তৃতা প্রদান করেন।
  • সাংবাদিকতা ও সম্পাদনা: সাংবাদিকতা এবং কলামিস্ট হিসেবে উবায়দুর রহমান খান নদভী বাংলাদেশে এক অনন্য স্থান দখল করে আছেন। তিনি দীর্ঘ সময় ধরে বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় জাতীয় দৈনিক “দৈনিক ইনকিলাব”-এর সিনিয়র সহকারী সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। তার ক্ষুরধার ও সময়োপযোগী কলাম পাঠকমহলে অত্যন্ত জনপ্রিয়। এর আগে, ১৯৯১ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত তিনি প্রখ্যাত ইসলামি সাপ্তাহিক “মুসলিম জাহান”-এর নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে কওমি ও ইসলামি সাংবাদিকতায় এক নবযুগের সূচনা করেন। বর্তমানে তিনি ঐতিহ্যবাহী মাসিক “নেয়ামত” পত্রিকার উপদেষ্টা সম্পাদক হিসেবেও যুক্ত আছেন।

বেফাকের মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ:

বাংলাদেশের কওমি মাদরাসাসমূহের সবচেয়ে বড় এবং মূল শিক্ষাবোর্ড “বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশ” (বেফাক)-এর শিক্ষা সংস্কার এবং প্রশাসনিক কাঠামোকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে ২০২২ সালের ১৭ অক্টোবর এক গুরুত্বপূর্ণ সভায় মাওলানা উবায়দুর রহমান খান নদভীকে বেফাকের মহাপরিচালক (Director General) হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। পূর্বসূরি মাওলানা মুহাম্মদ জোবায়ের (ভারপ্রাপ্ত)-এর পর তিনি এই দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। তার এই নিয়োগের মাধ্যমে বেফাকের প্রশাসনিক ও শিক্ষাগত কার্যক্রমে এক নতুন গতিশীলতা ফিরে আসে। কওমি মাদরাসার সনদের সরকারি স্বীকৃতি ও শিক্ষাদানের মান উন্নয়নে তিনি নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন।

আধ্যাত্মিক জীবন ও তাসাউফ:

জ্ঞানচর্চার পাশাপাশি মাওলানা নদভী আধ্যাত্মিক সাধনা বা তাসাউফের বুজুর্গদের সান্নিধ্য লাভ করেছেন। তিনি তাসাউফের প্রধান চার তরিকায় (চিশতিয়া, নকশবন্দিয়া, সোহরাওয়ার্দীয়া ও কাদেরিয়া) খেলাফত ও ইজাযাত লাভ করেছেন। বিশ্ববিখ্যাত বহু সূফী-সাধক ও শায়খের কাছ থেকে তিনি এই আত্মশুদ্ধির দীক্ষা পান, যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন:

১. শাইখ আব্দুল আযিয মাক্কি আল কুরাইশী

২. আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রহমান আল খওলানি

৩. আহমদ এফেন্দি শাযলি তুর্কি

৪. শায়খুল হাদিস মাওলানা মাহমুদুল হাসান

৫. শায়খ শিরাজ ইবনে গােলাম মুহাম্মদ দীনপুর

৬. মাওলানা ইসহাক ইমামাবাদি

৭. বর্তমান বিশ্বের অন্যতম আধ্যাত্মিক রাহবার হযরত মাওলানা জুলফিকার আহমদ নকশবন্দী (দা.বা.)।

সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড ও বিশ্বভ্রমণ:

উবায়দুর রহমান খান নদভী বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ইসলামি সংগঠনের সাথে সক্রিয়ভাবে জড়িত। তিনি ‘দেশ অধ্যয়ন কেন্দ্র’-এর সভাপতি, বিশ্ববিখ্যাত আরবি সাহিত্য সংগঠন ‘রাবেতাতুল আদাবুল ইসলামি’ (বিশ্ব ইসলামি সাহিত্য সংগঠন)-এর বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের সেক্রেটারি জেনারেল এবং বিএসআরসি (BSRC)-এর প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

দ্বীনি দাওয়াত, আন্তর্জাতিক সেমিনার, রাজনৈতিক ও মিডিয়া সংক্রান্ত আলোচনায় অংশগ্রহণের জন্য তিনি বিশ্বের বহু দেশ সফর করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ভারত, পাকিস্তান, তুরস্কসহ মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশ।

সাহিত্য সাধনা ও গ্রন্থাবলী:

মাওলানা উবায়দুর রহমান খান নদভী একাধারে একজন প্রখ্যাত চিন্তাবিদ ও শক্তিশালী লেখক। বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পত্র-পত্রিকায় তার শত শত গবেষণা প্রবন্ধ ও নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। তার সমসাময়িক রাজনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় বিশ্লেষণগুলো পাঠক সমাজকে দারুণভাবে আলোড়িত করে। এ পর্যন্ত তার চল্লিশের অধিক মৌলিক ও অনূদিত গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। তার কয়েকটি উল্লেখযোগ্য বই হলো:

  • ইসলামের ব্যবসায় ও বাণিজ্য আইন (ইসলামি অর্থনীতি ও আধুনিক বাণিজ্য ব্যবস্থার একটি প্রামাণ্য গ্রন্থ)
  • ইসলাম এতো সুন্দর!
  • ইতিহাসের কান্না
  • নবীজী সা. কেমন ছিলেন
  • অন্যদের চোখে আমাদের নবিজি সা.
  • কোরান ও হাদিসের আলোকে আমাদের ২৪ ঘন্টার জিন্দেগী

তার লেখার মূল বৈশিষ্ট্য হলো—সহজ, সরল, প্রাঞ্জল অথচ গভীর ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ ভাষা, যা সাধারণ পাঠক থেকে শুরু করে বিদগ্ধ সমাজ সবাইকে সহজে আকৃষ্ট করে।

মনীষীদের প্রভাব:

তার চিন্তা, চেতনা ও কর্মজীবনে সবচেয়ে বেশি প্রভাব বিস্তার করেছেন তার পিতা মাওলানা আতাউর রহমান খান। এছাড়াও বিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ ইসলামি চিন্তাবিদ ও সাহিত্যিক সাইয়্যেদ আবুল হাসান আলী হাসানী নদভী (রহ.), শায়খুল ইসলাম আল্লামা শাহ আহমদ শফী (রহ.), আমীরুশ শরীয়ত হযরত মাওলানা মোহাম্মদ উল্লাহ হাফেজ্জী হুজুর (রহ.), দৈনিক ইনকিলাবের প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা আব্দুল মান্নান (রহ.) এবং প্রখ্যাত আরবি সাহিত্যিক আল্লামা সুলতান যওক নদভী (দা.বা.)-এর গভীর প্রভাব রয়েছে তার জীবনে। তার আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে তার ছোট ভাই কবি মুহিব খানসহ সমসাময়িক তরুণ প্রজন্মের অনেকেই ইসলামি সাহিত্য ও সংস্কৃতি অঙ্গনে অবদান রাখছেন।

উপসংহার:

মাওলানা উবায়দুর রহমান খান নদভী বর্তমান বাংলাদেশের ইসলামি জাগরণের এক পুরোধা ব্যক্তিত্ব। প্রথাগত মাদরাসা শিক্ষার পাশাপাশি আধুনিক শিক্ষায় জ্ঞানার্জন করে এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতি, মিডিয়া ও সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে তিনি যেভাবে মুসলিম উম্মাহ ও দেশের সেবা করে যাচ্ছেন, তা সত্যিই বিরল। বিশেষ করে বেফাকের মহাপরিচালক হিসেবে কওমি মাদ্রাসা শিক্ষার আধুনিকায়ন ও দ্বীনি ঐতিহ্য রক্ষার সমন্বয় সাধনে তার ভূমিকা অনবদ্য। এই মনীষী আজীবন তার জ্ঞান, লিখনী ও কর্মের মাধ্যমে এদেশের মানুষের হৃদয়ে আলো ছড়িয়ে যাবেন—এটাই সকলের প্রত্যাশা।

তার লেখা কিছু বই :

০১. অমুসলিম মনুষীর চোখে আমাদের প্রিয় নবী

লেখক :  উবায়দুর রহমান খান নদভী



০২. আফগানিস্তানে আমি আল্লাহকে দেখেছি

লেখক :  উবায়দুর রহমান খান নদভী



০৩. মোল্লা ওমরের আফগানিস্তান

লেখক :  উবায়দুর রহমান খান নদভী



০৪. রক্ত ভেজা গুজরাট

লেখক : উবায়দুর রহমান খান নদভী



০৫

"বাংলা ইসলামিক বইয়ের বিশাল পিডিএফ (PDF) আর্কাইভ"