মাওলানা আসেম ওমর (রহ.)

মাওলানা আসেম ওমর (আসল নাম সানাউল হক) ছিলেন বৈশ্বিক সশস্ত্র সংগঠন আল-কায়েদার দক্ষিণ এশীয় শাখা—‘আল-কায়েদা ইন দ্য ইন্ডিয়ান সাবকন্টিনেন্ট’ (AQIS) বা জামায়াত কায়েদাতুল জিহাদ ফি শিবহিল কাররাতিল হিন্দিয়াহ-এর প্রথম প্রধান বা আমির। ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আল-কায়েদার তৎকালীন কেন্দ্রীয় প্রধান ড. আয়মান আল-জাওয়াহিরি একটি বিশেষ ভিডিও বার্তার মাধ্যমে ভারতীয় উপমহাদেশে আল-কায়েদার আনুষ্ঠানিক শাখা খোলার ঘোষণা দেন এবং আসেম ওমরকে এর আমির হিসেবে মনোনীত করেন। তিনি দীর্ঘদিন আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের উপজাতীয় সীমান্ত অঞ্চলে অবস্থান করে জিহাদি মতাদর্শ প্রচার, বই ও প্রবন্ধ রচনা এবং তাত্ত্বিক নির্দেশিকা প্রদানের কাজ পরিচালনা করেছিলেন। ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আফগানিস্তানের হেলমান্দ প্রদেশে মার্কিন ও আফগান বাহিনীর এক যৌথ সামরিক অভিযানে তিনি নিহত হন।

১. প্রাথমিক জীবন ও প্রকৃত পরিচয়

ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা এবং বৈশ্বিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর মাওলানা আসেম ওমরের প্রকৃত সামাজিক পরিচয় উদ্ঘাটিত হয়। তাঁর আসল নাম সানাউল হক। তিনি আনুমানিক ১৯৭০ এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে (কোনো কোনো নিরাপত্তা নথিতে ১৯৭৪ বা ১৯৭৬ সাল উল্লেখ করা হয়েছে) ভারতের উত্তর প্রদেশ রাজ্যের সম্ভল (Sambhal) জেলায় একটি সম্ভ্রান্ত ও মধ্যবিত্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পরিবার স্থানীয়ভাবে সুশিক্ষিত এবং সামাজিক মর্যাদার জন্য পরিচিত ছিল। উত্তর প্রদেশের সম্ভলেই তাঁর শৈশব ও কৈশোরের একটি বড় সময় অতিবাহিত হয়। আসেম ওমর পরবর্তীতে তাঁর ছদ্মনাম বা সাংগঠনিক নাম হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পান।

২. শিক্ষাগত পটভূমি ও ধর্মীয় শিক্ষা

সানাউল হক (পরবর্তীতে আসেম ওমর) ভারতের উত্তর প্রদেশের দেওবন্দ ধারার একটি স্থানীয় মাদ্রাসায় তাঁর প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের ধর্মীয় শিক্ষা শুরু করেন। পরবর্তীতে তিনি ভারতের ঐতিহ্যবাহী ইসলামি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দারুল উলুম দেওবন্দে ভর্তি হন বলে বিভিন্ন বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা নথিতে উল্লেখ করা হয়। দেওবন্দে শিক্ষা সমাপনের পর অথবা শিক্ষা চলাকালীনই তাঁর মাঝে সমকালীন আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি এবং ইসলামি আন্দোলনের প্রতি গভীর ঝোঁক তৈরি হয়।

নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে (আনুমানিক ১৯৯৫ খ্রিষ্টাব্দে) তিনি কাউকে কিছু না জানিয়ে হঠাৎ ভারত ত্যাগ করেন এবং পাকিস্তানের করাচিতে পাড়ি জমান। পাকিস্তানে গিয়ে তিনি খাইবার পখতুনখোয়া প্রদেশের নওশেরা অঞ্চলে অবস্থিত বিখ্যাত মাদ্রাসা ‘দারুল উলুম হাক্কানিয়া’-তে উচ্চতর ইসলামি ধর্মতত্ত্ব, ফিকহ ও হাদিস শাস্ত্রে অধ্যয়ন করেন। দারুল উলুম হাক্কানিয়াকে আফগান ও পাকিস্তানি অঞ্চলের বহু গুরুত্বপূর্ণ ইসলামি আন্দোলনের নেতাদের সূতিকাগার বলা হয়। এই প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নকালেই তিনি বৈশ্বিক প্রতিরোধ বা জিহাদি দর্শনের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত হন এবং নিজের পারিবারিক নাম গোপন করে ‘আসেম ওমর’ নাম ধারণ করেন।

৩. সশস্ত্র আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ততা

মাদ্রাসা শিক্ষা সমাপ্ত করার পর আসেম ওমর সরাসরি সক্রিয় সশস্ত্র ও তাত্ত্বিক আন্দোলনের সাথে যুক্ত হন। শুরুতে তিনি পাকিস্তানের কাশ্মীরমুখী সংগঠন ‘হরкат-উল-মুজাহিদিন’ (HuM) এবং পরবর্তীতে ‘হরкат-উল-জিহাদ আল-ইসলামি’ (HuJI)-এর সাথে কাজ শুরু করেন। তবে তিনি মূলত একজন মাঠপর্যায়ের যোদ্ধার চেয়ে একজন লেখক, অনুবাদক ও প্রশিক্ষক হিসেবে বেশি অবদান রাখতেন। এই সংগঠনগুলোর তাত্ত্বিক ও মিডিয়া গাইড হিসেবে তিনি দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেন। তিনি কাশ্মীরে সক্রিয় বিভিন্ন দলের যুবকদের জন্য সাংগঠনিক লিফলেট, আদর্শিক গাইডলাইন এবং অনুপ্রেরণামূলক বক্তব্য বা স্ক্রিপ্ট তৈরি করতেন।

২০০১ সালে আফগানিস্তানে মার্কিন আগ্রাসন (War on Terror) শুরু হলে আসেম ওমর পাকিস্তানের উপজাতীয় অঞ্চল বা ফাতায় (FATA) চলে যান এবং আফগান তালেবান ও আন্তর্জাতিক আল-কায়েদা নেটওয়ার্কের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পাহাড়ি অঞ্চলে আত্মগোপন করেন। তিনি তাঁর ক্ষুরধার লেখনী, চমৎকার বাগ্মিতা এবং তাত্ত্বিক দক্ষতার কারণে দ্রুতই আল-কায়েদার কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব, বিশেষ করে ওসামা বিন লাদেন ও আয়মান আল-জাওয়াহিরির ঘনিষ্ঠ মহলে স্থান করে নেন। তিনি আল-কায়েদার প্রধান মিডিয়া উইং ‘আসহাব মিডিয়া’ (As-Sahab Media)-এর জন্য উর্দু ভাষায় অসংখ্য সাংগঠনিক বার্তা, প্রবন্ধ ও আরবি বইয়ের অনুবাদের কাজ সম্পন্ন করেন।

৪. একিউআইএস (AQIS) এর আমির হিসেবে আত্মপ্রকাশ

২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আল-কায়েদার তৎকালীন প্রধান আয়মান আল-জাওয়াহিরি ৫৫ মিনিটের একটি বহুল আলোচিত ভিডিও বার্তায় ‘আল-কায়েদা ইন দ্য ইন্ডিয়ান সাবকন্টিনেন্ট’ (AQIS) প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন। এই নতুন শাখার মূল লক্ষ্য ছিল ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারসহ সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ায় আল-কায়েদার বিভিন্ন বিচ্ছিন্ন কার্যক্রমকে একটি একক কমান্ডের অধীনে সুসংগঠিত করা।

এই ঐতিহাসিক ঘোষণার সাথে সাথেই জাওয়াহিরি মাওলানা আসেম ওমরকে এই সমগ্র অঞ্চলের প্রধান বা আমির হিসেবে ঘোষণা করেন। আসেম ওমরের ভারতীয় বংশোদ্ভূত হওয়া, উর্দু ও আরবি ভাষায় সমান পারদর্শিতা এবং দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে দীর্ঘ দুই দশকের অভিজ্ঞতার কারণেই আল-কায়েদার কেন্দ্রীয় সুরা কাউন্সিল তাঁকে এই বিশাল দায়িত্ব অর্পণ করেছিল।

৫. তাত্ত্বিক কাজ, প্রচারণামূলক বই ও প্রকাশনা

মাওলানা আসেম ওমরকে নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা কেবল একজন সামরিক কমান্ডার হিসেবে দেখেননি, বরং তিনি ছিলেন মূলত একজন মিডিয়া স্ট্র্যাটেজিস্ট এবং প্রখ্যাত লেখক। আল-কায়েদার বুদ্ধিবৃত্তিক ও প্রচারণামূলক শাখায় তাঁর অবদান ছিল অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। তিনি উর্দু ভাষায় বেশ কয়েকটি বই এবং শত শত নিবন্ধ রচনা করেছেন, যা দক্ষিণ এশিয়ার চরমপন্থী যুবকদের আকৃষ্ট করার জন্য ব্যবহৃত হতো। তাঁর উল্লেখযোগ্য কিছু বই ও আলোচনার মূল থিমগুলো নিচে দেওয়া হলো:

  • দাজ্জাল সিরিজ (Anti-Christ Series): বিশ্ব রাজনীতি, পশ্চিমা গোপন সমাজ (Secret Societies) এবং ইসলামি শেষ জামানা (Eschatology) বা দাজ্জালের আগমন সংক্রান্ত বিষয়ে তিনি একাধিক বই ও দীর্ঘ প্রবন্ধ রচনা করেন। তাঁর লিখিত ‘দাজ্জাল’ বিষয়ক বইগুলো উপমহাদেশীয় চরমপন্থী সার্কেলে ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল।
  • আমেরিকার পতন (The Collapse of America): মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামরিক সাম্রাজ্যের পতন কেন অনিবার্য, সে বিষয়ে আন্তর্জাতিক নথির আলোকে তাঁর তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ।
  • শহীদি কাফেলার বীরগাথা: বিভিন্ন ফ্রন্টে নিহত যোদ্ধাদের সংক্ষিপ্ত জীবনী, যুদ্ধের ময়দানের ডায়েরি ও তাঁদের আদর্শের ওপর লেখা স্মারক গ্রন্থ।
  • দক্ষিণ এশিয়ার মুসলমানদের প্রতি আহ্বান: ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মুসলমানদের বৈশ্বিক জিহাদে শরিক হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি অসংখ্য অডিও ও ভিডিও বার্তা রিলিজ করেছিলেন।

৬. আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও বৈশ্বিক নজরদারি

AQIS-এর আমির নিযুক্ত হওয়ার পর আসেম ওমর আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর (যেমন মার্কিন সিআইএ এবং ভারতের র) শীর্ষ তালিকায় চলে আসেন। ২০১৬ সালের জুন মাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতর (U.S. Department of State) আসেম ওমরকে ‘বিশেষভাবে মনোনীত বৈশ্বিক সন্ত্রাসী’ (Specially Designated Global Terrorist – SDGT) হিসেবে তালিকাভুক্ত করে।

একই সাথে মার্কিন সরকার বিশ্বব্যাপী তাঁর সমস্ত অর্থনৈতিক লেনদেন বা সম্পদ ফ্রিজ করার নির্দেশ দেয় এবং তাঁর অবস্থান বা তথ্যদাতার জন্য বড় অঙ্কের পুরস্কার ঘোষণা করে। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদও (UNSC) তাঁর ওপর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। অন্যদিকে ভারত সরকার এবং দেশটির জাতীয় তদন্ত সংস্থা (NIA) তাঁর বিরুদ্ধে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের পরিকল্পনা ও যুবকদের উসকানি দেওয়ার অভিযোগে একাধিক মামলা দায়ের করে।

৭. মৃত্যু ও অবসান

২০ইউনাইটেড ৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আফগানিস্তানের হেলমান্দ প্রদেশের মুসা কালা (Musa Qala) জেলায় আফগান স্পেশাল ফোর্সেস এবং মার্কিন বিমান বাহিনীর একটি অত্যন্ত গোপন ও যৌথ স্থল-আকাশ সামরিক অভিযান পরিচালিত হয়। এই অভিযানে তালেবান ও আল-কায়েদার একটি যৌথ আস্তানাকে টার্গেট করা হয়েছিল।

২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯ তারিখে আফগান সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা অধিদপ্তর (NDS) আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করে যে, ওই অভিযানে আল-কায়েদার উপমহাদেশীয় প্রধান মাওলানা আসেম ওমর তাঁর আরও কয়েকজন উচ্চপদস্থ পাকিস্তানি ও আফগান সহযোগীসহ নিহত হয়েছেন। পরবর্তীতে আল-কায়েদার নিজস্ব মিডিয়া উইং আসহাবের পক্ষ থেকেও তাঁদের এই আঞ্চলিক প্রধানের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয় এবং তাঁর স্মরণে দীর্ঘ শোকবার্তা প্রকাশ করা হয়। তাঁর মৃত্যুর মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ায় আল-কায়েদার প্রথম প্রজন্মের শীর্ষ নেতৃত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের অবসান ঘটে।

৮. সামগ্রিক মূল্যায়ন

নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, মাওলানা আসেম ওমর ছিলেন দক্ষিণ এশীয় জিহাদী নেটওয়ার্কের সবচেয়ে প্রভাবশালী ও ক্ষুরধার তাত্ত্বিকদের একজন। তিনি প্রথাগত মাদ্রাসার শিক্ষা এবং আধুনিক আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিকে মিলিয়ে এমন এক প্রচারণামূলক কাঠামো তৈরি করেছিলেন, যা উপমহাদেশে আল-কায়েদার আদর্শিক ভিত্তি বিস্তারে বড় ভূমিকা রেখেছিল। তাঁর মৃত্যুর পর AQIS-এর সাংগঠনিক কাঠামোতে বড় ধাক্কা লাগে এবং পরবর্তীকালে ওসামা মেহমুদকে সংগঠনটির নতুন আমির হিসেবে ঘোষণা করা হয়। তবে আসেম ওমরের লিখিত বই, প্রবন্ধ ও অডিও বার্তাগুলো এখনো বিভিন্ন আন্ডারগ্রাউন্ড অনলাইন ফোরাম ও প্রচারণায় ব্যবহৃত হতে দেখা যায়।

তার লিখিত কিছু বই :

০১. ইমাম মাহদীর দোস্ত ও দুশমন

লেখক :  মাওলানা আসেম ওমর



০২. ইসলাম ও গনতন্ত্র

লেখক :  মাওলানা আসেম ওমর



০৩. তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ ইমাম মাহদী ও দাজ্জাল

লেখক : মাওলানা আসেম ওমর



০৪. ধ্বংসের দারপ্রান্তে একবিংশ শতাব্দীর গনতন্ত্র

লেখক : মাওলানা আসেম ওমর



০৫. বড়দের স্মরণে

লেখক : মাওলানা আসেম ওমর



০৬.ব্ল্যাক ওয়াটার


"বাংলা ইসলামিক বইয়ের বিশাল পিডিএফ (PDF) আর্কাইভ"