মুহাম্মদ কুতুব

বিশ শতকের ইসলামী রেনেসাঁ বা পুনর্জাগরণের ইতিহাসে যে ক’জন মহান চিন্তাবিদ, লেখক ও দার্শনিক মুসলিম উম্মাহর বুদ্ধিবৃত্তিক জগতকে গভীরভাবে আলোড়িত করেছেন, তাদের মধ্যে মুহাম্মদ কুতুব (Muhammad Qutb) অন্যতম। তিনি শুধু একজন প্রখ্যাত মিশরীয় ইসলামিক পণ্ডিতই ছিলেন না, বরং আধুনিক যুগের জটিল সামাজিক, মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক সংকটের মুখে ইসলামের শাশ্বত রূপটিকে অত্যন্ত যৌক্তিকভাবে বিশ্ববাসীর সামনে উপস্থাপন করেছিলেন। বিখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ ও শহীদ সাইয়েদ কুতুবের ছোট ভাই হিসেবে পরিচিত হলেও, তিনি নিজের অনন্য মেধা, গভীর মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ এবং প্রায় ৩৫টি কালজয়ী গ্রন্থের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে নিজস্ব এক স্বতন্ত্র স্থান তৈরি করে নিয়েছেন।

নিচে এই মহান মনীষীর জীবনের বিভিন্ন দিক বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো:

মুহাম্মদ কুতুব (১৯১৯-২০১৪). Source: The Sunrise Today

১. জন্ম ও পারিবারিক পটভূমি

মুহাম্মদ কুতুব ১৯১৯ সালের ২৬শে এপ্রিল মিশরের আসয়ুত প্রদেশের ‘মুশা’ নামক একটি ঐতিহাসিক গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর জন্মের বছরটি মিশরের ইতিহাসে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ছিল, কারণ ১৯১৯ সালেই মিশরে এক বিশাল ঐতিহাসিক গণজাগরণ ঘটে, যা ইংরেজ ঔপনিবেশিক শাসকদের মিশরের মাটি ছাড়তে বাধ্য করার পথ সুগম করেছিল। এই গণআন্দোলনের ঢেউ কেবল মিশরেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং সমগ্র আরব জাহান থেকে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর গুটিয়ে যাওয়ার পরিবেশ তৈরি করেছিল। ফলে মুহাম্মদ কুতুবের শৈশব ও কৈশোর কেটেছে এক উত্তাল জাতীয়তাবাদী ও রাজনৈতিক সচেতনতার পরিমণ্ডলে।

তাঁর পরিবার ছিল অত্যন্ত দ্বীনদার ও জ্ঞানপিপাসু। শৈশবেই পিতার মৃত্যুর পর তাঁর মা এক সাহসী ও দূরদর্শী সিদ্ধান্ত নেন। সন্তানদের উন্নত শিক্ষার উদ্দেশ্যে তিনি প্রত্যন্ত গ্রাম ছেড়ে রাজধানী কায়রোতে স্থানান্তরিত হওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। মায়ের এই একটি সিদ্ধান্তই কুতুব পরিবারের সন্তানদের ভবিষ্যৎ জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। মুহাম্মদ কুতুব তাঁর বড় ভাই সাইয়েদ কুতুব, বোন আমিনা কুতুব এবং হামিদা কুতুবের সাথে কায়রোতে এসে জীবনের এক নতুন অধ্যায় শুরু করেন।

২. শিক্ষাজীবন ও কর্মজীবনের প্রারম্ভ

কায়রোতে আসার পর মুহাম্মদ কুতুবের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাজীবন বেশ সফলতার সাথে অতিবাহিত হয়। তিনি কায়রোর স্থানীয় স্কুল থেকে অত্যন্ত সুনামের সাথে নিম্ন-মাধ্যমিক ও উচ্চ-মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। এরপর তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য মিশরের ঐতিহ্যবাহী কায়রো ইউনিভার্সিটিতে (Cairo University) ভর্তি হন এবং সেখান থেকে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যের ওপর অত্যন্ত কৃতিত্বের সাথে স্নাতক (Degree) অর্জন করেন।

ইংরেজি সাহিত্যে পড়াশোনা করার কারণে পশ্চিমা দর্শন, সংস্কৃতি ও চিন্তাধারার সাথে তাঁর গভীর পরিচয় ঘটে। তবে তিনি কেবল সাহিত্যেই সীমাবদ্ধ থাকেননি; মানুষের মনস্তত্ত্ব ও সমাজকে বোঝার জন্য তিনি এডুকেশন ইনস্টিটিউট থেকে শিক্ষা ও মনোবিজ্ঞানের (Education and Psychology) ওপর একটি বিশেষ ডিপ্লোমা কোর্স সম্পন্ন করেন। এই মনস্তাত্ত্বিক পড়াশোনা পরবর্তী জীবনে তাঁর ইসলামি চিন্তাধারা ও বইপত্র রচনায় ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল।

ডিপ্লোমা শেষ করার পর তিনি প্রথমে প্রায় চার বছর শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত থাকেন। শিক্ষকতার মাধ্যমে তরুণদের মনস্তত্ত্ব বোঝার পর তিনি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুবাদ শাখায় (Translation Office) কর্মজীবন শুরু করেন। পরবর্তীতে তিনি আরও দুই বছর শিক্ষকতায় ফিরলেও জ্ঞানচর্চার প্রতি অনুরাগের কারণে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ‘আলফ কিতাব’ (এক হাজার বই) নামক একটি বিশেষ সাহিত্য ও অনুবাদ প্রজেক্টে যুক্ত হন।

৩. ব্যক্তিত্ব ও বুদ্ধিবৃত্তিক গঠনে ত্রয়ী প্রভাব

মুহাম্মদ কুতুবের চিন্তার গভীরতা, লেখক সত্তা এবং মজবুত ব্যক্তিত্ব গঠনে মূলত তিনজন মানুষের অবদান সবচেয়ে বেশি ছিল। তিনি নিজেই বিভিন্ন সময়ে এই তিন ব্যক্তিত্বের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। তাঁরা হলেন:

  1. মামা আহমাদ হুসাইন আল মুশী: তিনি ছিলেন একজন প্রখ্যাত সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ ও কবি। তাঁর সাহিত্যিক প্রতিভা ও চমৎকার কাব্যচর্চা তরুণ মুহাম্মদ কুতুবকে সাহিত্যের রস আস্বাদন করতে শিখিয়েছিল।
  2. আব্বাস মাহমুদ আক্কাদ: মিশরের আধুনিক সাহিত্যের অন্যতম দিকপাল ও প্রখ্যাত চিন্তাবিদ আব্বাস মাহমুদ আক্কাদের সান্নিধ্য ও সাহিত্যকর্ম মুহাম্মদ কুতুবের চিন্তার পরিধিকে অনেক বিস্তৃত করেছিল।
  3. সাইয়েদ কুতুব (বড় ভাই): তবে এই সবার উর্ধ্বে যার অবদান মুহাম্মদ কুতুবের জীবনকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করেছে, তিনি হলেন তাঁর আপন বড় ভাই সাইয়েদ কুতুব।

বড় ভাইয়ের ছায়ায় শিক্ষা ও দীক্ষা

সাইয়েদ কুতুবের সাথে মুহাম্মদ কুতুবের সম্পর্ক কেবল ভাই ও ভাইয়ের ছিল না, বরং তা ছিল একজন আদর্শ শিক্ষক ও একনিষ্ঠ ছাত্রের মতো। মুহাম্মদ কুতুবের ব্যক্তিত্বের প্রতিটি পরতে বড় ভাইয়ের দিক-নির্দেশনা জড়িয়ে ছিল। সাইয়েদ কুতুবের শিক্ষাদান পদ্ধতি সম্পর্কে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি একবার বলেছিলেন:

“শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে আমার সাথে সাইয়েদের সম্পর্ক ছিল কখনো নমনীয়, আবার কখনো কঠিন। তিনি এতটা নরম হতেন না যাতে আমি বিগড়ে যাই, আবার এতটা কঠোরও হতেন না যাতে আমি তাঁর থেকে দূরে সরে যাই।”

সাইয়েদ কুতুব নিজে প্রচণ্ড বইপোকা ছিলেন এবং ছোট ভাইকেও শৈশব থেকেই বৈচিত্র্যময় বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে উদ্বুদ্ধ করতেন। উচ্চ-মাধ্যমিক পাস করার পর সাইয়েদ কুতুব তাঁর বিভিন্ন গভীর রাজনৈতিক ও দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি ছোট ভাইয়ের সাথে শেয়ার করতেন এবং মুহাম্মদ কুতুবকে সেসব বিষয়ে উন্মুক্ত আলোচনার সুযোগ দিতেন। এই অভ্যাসের ফলেই মুহাম্মদ কুতুবের নিজস্ব একটি মজবুত বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি গড়ে ওঠে।

৪. রাজনৈতিক সংকট ও দীর্ঘ কারাজীবন

বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে মিশরের রাজনৈতিক অঙ্গন চরম উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। হাসান আল-বান্না প্রতিষ্ঠিত ‘ইখওয়ানুল মুসলিমিন’ বা মুসলিম ব্রাদারহুডের জনপ্রিয়তায় ভীত হয়ে মিশরের তৎকালীন সরকার দলটির ওপর চড়াও হয়। ১৯৪৮ সালের ৮ই ডিসেম্বর মিশরের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মাহমুদ ফাহমী মুসলিম ব্রাদারহুডের ওপর রাষ্ট্রীয় নিষেধাজ্ঞা জারি করেন এবং এর শীর্ষ নেতাদের গ্রেফতারের নির্দেশ দেন। এর মাত্র ২০ দিন পর, অর্থাৎ ২৮শে ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী মাহমুদ ফাহমী আততায়ীর হাতে নিহত হলে পুরো দায় ব্রাদারহুডের ওপর চাপানো হয় এবং দেশজুড়ে শুরু হয় ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ দমন-পীড়ন ও গণ-গ্রেফতার।

কুতুব পরিবারও এই দমন-পীড়নের বাইরে ছিল না। ইসলামি শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা এবং সেক্যুলার ও সমাজতান্ত্রিক সরকারের ইসলামবিদ্বোধী নীতির বিরুদ্ধে স্পষ্ট ও অনমনীয় অবস্থানের কারণে মুহাম্মদ কুতুব ও সাইয়েদ কুতুব সরকারের তীব্র নজরদারিতে পড়েন।

পরবর্তীতে ১৯৬৫ সালে জামাল আবদেল নাসেরের স্বৈরাচারী সরকার সেক্যুলার শাসনব্যবস্থাকে উৎখাতের ষড়যন্ত্রের মিথ্যা অভিযোগে মুহাম্মদ কুতুব ও সাইয়েদ কুতুবকে একসাথে গ্রেফতার করে। কারাগারে তাঁদের ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালানো হয়। এই চরম পরীক্ষার পর, ১৯৬৬ সালে বড় ভাই সাইয়েদ কুতুবকে ফাঁসি দিয়ে শহীদ করা হয়। ভাইয়ের এই শাহাদাত মুহাম্মদ কুতুবের হৃদয়কে ক্ষতবিক্ষত করলেও তাঁর ঈমানী অবিচলতাকে বিন্দুমাত্র দমাতে পারেনি। মুহাম্মদ কুতুবকে দীর্ঘ কয়েক বছর কারাগারে বন্দি রাখা হয় এবং অবশেষে ১৯৭২ সালে তিনি কারাগার থেকে মুক্তি লাভ করেন।

৫. সৌদি আরবে নির্বাসন ও জ্ঞানচর্চার নতুন দিগন্ত

১৯৭২ সালে কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর মিশরের দমবন্ধকর পরিবেশে তাঁর পক্ষে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফলে তিনি সৌদি আরবে হিজরত করেন এবং সেখানে রাজনৈতিক আশ্রয় নেন। সৌদি আরব সরকার ও দেশটির পণ্ডিত সমাজ এই মহান চিন্তাবিদকে অত্যন্ত মর্যাদার সাথে বরণ করে নেয়।

সৌদি আরবে এসে মুহাম্মদ কুতুব তাঁর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো শুরু করেন। তিনি মক্কার বিখ্যাত উম্মুল কুরা বিশ্ববিদ্যালয় (Umm al-Qura University) এবং জেদ্দার কিং আবদুল আজিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামি স্টাডিজের অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। এখানে শিক্ষকতাকালীন তিনি আধুনিক তরুণ প্রজন্মের মনস্তত্ত্বকে সামনে রেখে ইসলামের যৌক্তিক ব্যাখ্যা প্রদান শুরু করেন। সমকালীন সৌদি আরবের অনেক প্রখ্যাত আলেম ও চিন্তাবিদ তাঁর সরাসরি ছাত্র ছিলেন।

পাশাপাশি তিনি আরেকটি ঐতিহাসিক দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন। মিশরের স্বৈরাচারী সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ ও বাজেয়াপ্ত হওয়া তাঁর ভাই শহীদ সাইয়েদ কুতুবের সমস্ত কালজয়ী বই (যেমন: ফি জিলালিল কুরআন, মাআলিম ফিত তারিক ইত্যাদি) তিনি সৌদি আরব থেকে পুনরায় সম্পাদনা ও প্রকাশের ব্যবস্থা করেন। এর ফলে সাইয়েদ কুতুবের বিপ্লবী চিন্তাধারা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে।

৬. সাহিত্যিক অবদান ও কালজয়ী গ্রন্থসমূহ

মুহাম্মদ কুতুব কেবল একজন শিক্ষক ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন একজন উর্বর মস্তিষ্কের লেখক। তিনি প্রায় ৩৫টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বই রচনা করেছেন। তাঁর লেখার মূল বৈশিষ্ট্য ছিল—তিনি পশ্চিমা বস্তুবাদী দর্শন (যেমন: পুঁজিবাদ, সমাজতন্ত্র, ফ্রয়েডীয় মনস্তত্ত্ব, সেক্যুলারিজম) ইত্যাদির অসারতা প্রমাণ করে ইসলামের মনস্তাত্ত্বিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক শ্রেষ্ঠত্ব অত্যন্ত আধুনিক ভাষায় ফুটিয়ে তুলতেন।

ইসলাম: দ্য মিসআন্ডারস্টুড রিলিজিয়ন (Islam: The Misunderstood Religion)

প্রধান কাজ

এটি তাঁর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও বিশ্বনন্দিত গ্রন্থ। পশ্চিমা বিশ্ব এবং আধুনিক শিক্ষিত সমাজ ইসলামকে নিয়ে যে সমস্ত ভুল ধারণায় (যেমন: নারীর অধিকার, তরবারির মাধ্যমে ইসলাম প্রচার, দাসপ্রথা ইত্যাদি) ভুগত, সেগুলোর দাঁতভাঙা ও যৌক্তিক জবাব দেওয়া হয়েছে এই বইটিতে।

ইগনোরেন্স অব দ্য টুয়েন্টিয়েথ সেঞ্চুরি (Jahiliyyat al-Qarn al-Ishrin)

দার্শনিক কাজ

এই বইটিতে তিনি দেখিয়েছেন যে, বিংশ শতাব্দীর আধুনিক মানুষ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে উন্নত হলেও মানসিকভাবে প্রাক-ইসলামী যুগের সেই অন্ধকার বা ‘জাহিলিয়াত’-এই ডুবে আছে। আল্লাহর দাসত্ব ছেড়ে মানুষের তৈরি মতবাদের দাসত্ব করাই যে আধুনিক জাহিলিয়াত, তা তিনি এখানে প্রমাণ করেন।

স্টাডিজ ইন হিউম্যান সাইকোলজি (Studies in Human Psychology)

মনস্তাত্ত্বিক কাজ

মনোবিজ্ঞানের ছাত্র হওয়ায় তিনি মানুষের মনস্তত্ত্বকে ইসলামের আলো can খুব চমৎকারভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। আধুনিক মনোবিজ্ঞান যেখানে মানুষকে কেবল একটি জৈবিক মেশিন মনে করে, সেখানে ইসলাম কীভাবে মানুষের আত্মা ও শরীরের চমৎকার সমন্বয় ঘটায়, তা এই বইয়ের মূল বিষয়।

ইসলাম অ্যান্ড দ্য ক্রাইসিস অব দ্য মডার্ন ওয়ার্ল্ড

সমসাময়িক বিশ্লেষণ

আধুনিক পৃথিবীর অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকটের একমাত্র টেকসই সমাধান যে কেবল ইসলামী জীবনব্যবস্থার মাধ্যমেই সম্ভব, তা এই গ্রন্থে অত্যন্ত তথ্যবহুলভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

তাঁর অন্যান্য বিখ্যাত বইগুলোর মধ্যে রয়েছে:

  • দ্য ফিউচার ইজ ফর ইসলাম (ভবিষ্যত কেবল ইসলামেরই)
  • ম্যান বিটুইন দ্য ম্যাটারিয়াল ওয়ার্ল্ড অ্যান্ড ইসলাম (বস্তুবাদী বিশ্ব ও ইসলামের মাঝে মানুষ)
  • দ্য কনসেপ্ট অব ইসলাম অ্যান্ড আওয়ার আন্ডারস্ট্যান্ডিং অব ইট (ইসলামের মূলভাব এবং আমাদের উপলব্ধি)

৭. আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও পুরস্কার

ইসলামী চিন্তাধারা, সাহিত্য, শিক্ষা এবং মুসলিম উম্মাহর বুদ্ধিবৃত্তিক পুনর্জাগরণে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ মুহাম্মদ কুতুব ১৯৮৮ সালে বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ ‘বাদশাহ ফয়সাল আন্তর্জাতিক পুরস্কার’ (King Faisal International Prize) লাভ করেন। এই পুরস্কার তাঁর বিশ্বব্যাপী গ্রহণযোগ্যতা এবং ইসলামী চিন্তাজগতে তাঁর কাজের গভীরতার এক অনস্বীকার্য প্রমাণ।

৮. ইন্তেকাল ও শেষ বিদায়

জীবনভর জেল, জুলুম, নির্বাসন আর বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ের পর, এই মহান ইসলামী পণ্ডিত ২০১৪ সালের ৪ঠা এপ্রিল (মতান্তরে ৬ই এপ্রিল সংবাদ প্রকাশিত হয়) শুক্রবার মিশরের সময় অনুযায়ী ভোরে সৌদির জেদ্দায় অবস্থিত ‘জেদ্দা ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল সেন্টারে’ চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯৫ বছর। পরবর্তীতে পবিত্র মক্কা নগরীতে তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হয় এবং জেদ্দাতেই তাঁকে দাফন করা হয়। তাঁর মৃত্যুর মাধ্যমে বিংশ শতাব্দীর ইসলামী পুনর্জাগরণ আন্দোলনের একটি সোনালী অধ্যায়ের অবসান ঘটে।

মুহাম্মদ কুতুবের জীবনপঞ্জি (এক নজরে)

বিষয়বিবরণ
পূর্ণ নামমুহাম্মদ কুতুব (Muhammad Qutb)
জন্ম তারিখ ও স্থান২৬ এপ্রিল ১৯১৯; মুশা গ্রাম, আসয়ুত, মিশর
শিক্ষাগত যোগ্যতাইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতক (কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়), শিক্ষা ও মনোবিজ্ঞানে ডিপ্লোমা
প্রধান অনুপ্রেরণাসাইয়েদ কুতুব (বড় ভাই)
কারাবরণ১৯৪৮ সালের অস্থিরতা এবং পরবর্তীতে ১৯৬৫ সালে জামাল আবদেল নাসেরের আমলে দীর্ঘ কারাবাস
নির্বাসন জীবন১৯৭২ সাল থেকে মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত সৌদি আরবে স্থায়ী বসবাস ও অধ্যাপনা
মোট গ্রন্থ সংখ্যাপ্রায় ৩৫টি (ইংরেজি, আরবিসহ বহু ভাষায় অনূদিত)
সর্বোচ্চ সম্মাননাবাদশাহ ফয়সাল আন্তর্জাতিক পুরস্কার (১৯৮৮)
মৃত্যু ও দাফন৪ এপ্রিল ২০১৪ (বয়স ৯৫ বছর); জেদ্দা, সৌদি আরব

উপসংহার: মুহাম্মদ কুতুবের জীবন থেকে বর্তমান মুসলিম তরুণদের জন্য সবচেয়ে বড় শিক্ষার বিষয় হলো—যুগ যত আধুনিকই হোক না কেন, ইসলামের চিরন্তন আদর্শকে সমকালীন ভাষা, যুক্তি ও বিজ্ঞানের আলোকে উপস্থাপন করতে হবে। তিনি তরবারির চেয়ে কলমের শক্তিকে বেশি প্রাধান্য দিয়েছিলেন এবং প্রমাণ করেছিলেন যে, চিন্তার লড়াইয়ে ইসলামকে পরাজিত করা অসম্ভব।

তার লিখিত কিছু কিতাব :

০১. আমরা কি মুসলমান?

লেখক :  মুহাম্মদ কুতুব



০২. কেন এই অধঃপতন

লেখক :  মুহাম্মদ কুতুব



০৩. চিন্তার পরিশুদ্ধি

লেখক :  মুহাম্মদ কুতুব



০৪. বিংশ শতাব্দীর জাহেলিয়াত

লেখক : মুহাম্মদ কুতুব



"বাংলা ইসলামিক বইয়ের বিশাল পিডিএফ (PDF) আর্কাইভ"