মুফতি হারুন ইজহার

বাংলাদেশের সমসাময়িক কওমি অঙ্গন, ধর্মীয় রাজনীতি এবং ইসলামী বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় যে ক’জন তরুণ আলেম ও চিন্তাবিদ অত্যন্ত আলোচিত ও সমালোচিত, তাদের মধ্যে মুফতি হারুন ইজহার অন্যতম। তিনি একাধারে একজন দেওবন্দি পণ্ডিত, বাগ্মী, কলামিস্ট, এবং হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের সাবেক প্রভাবশালী নেতা। তাঁর জীবনধারা, বৈপ্লবিক বক্তব্য এবং একাধিকবার কারাবরণের ঘটনা তাঁকে বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতি ও ধর্মীয় পরিমণ্ডলে একটি বিশেষ অবস্থানে দাঁড় করিয়েছে।

১. জন্ম ও পারিবারিক পরিচিতি

মুফতি হারুন ইজহার ১৯৭৭ সালে চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক লালখান বাজার এলাকায় একটি অত্যন্ত প্রভাবশালী এবং রাজনৈতিকভাবে সচেতন পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মুফতি ইজহারুল ইসলাম চৌধুরী বাংলাদেশের কওমি ঘরানার অন্যতম শীর্ষ আলেম, নেজামে ইসলাম পার্টির সভাপতি এবং হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের সাবেক নায়েবে আমীর। মুফতি ইজহারুল ইসলাম নব্বইয়ের দশকে ইসলামী ঐক্যজোটের অন্যতম প্রধান নেতা হিসেবে চার দলীয় জোট গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।

পারিবারিকভাবেই হারুন ইজহার একটি উগ্র-রাজনৈতিক ও ধর্মীয় আবহে বেড়ে ওঠেন। তাঁর পিতার প্রতিষ্ঠিত ‘আল জামিয়াতুল উলুম আল ইসলামিয়া লালখানবাজার মাদ্রাসা’কে কেন্দ্র করেই তাঁর শৈশব ও কৈশোরের মানসিক বিকাশ ঘটে।

২. শিক্ষাজীবন ও উচ্চতর ডিগ্রি

হারুন ইজহারের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা শুরু হয় পিতার প্রতিষ্ঠিত লালখান বাজার মাদ্রাসায়। কওমি ধারার প্রাথমিক পাঠ শেষ করার পর তিনি উচ্চতর শিক্ষার জন্য এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ কওমি বিদ্যাপীঠ আল-জামিয়াতুল আহলিয়া দারুল উলুম মুইনুল ইসলাম হাটহাজারী (হাটহাজারী মাদ্রাসা)-তে ভর্তি হন। সেখান থেকে দাওরায়ে হাদিস (মাস্টার্স সমমান) সমাপ্ত করার পর তিনি উচ্চতর শিক্ষার উদ্দেশ্যে বিদেশে গমন করেন।

তিনি পাকিস্তানের বিখ্যাত ইসলামী বিদ্যাপীঠ দারুল উলুম করাচী থেকে ‘ইফতা’ বা ফতোয়া বিষয়ের ওপর উচ্চতর ডিগ্রি (মুফতি) অর্জন করেন। পাকিস্তানের তৎকালীন শীর্ষ আলেমদের সান্নিধ্যে থেকে তিনি সমসাময়িক বিশ্ব রাজনীতি, ফিকহ এবং ভূ-রাজনীতি (Geopolitics) সম্পর্কে গভীর জ্ঞান অর্জন করেন। কওমি ঘরানার সাধারণ আলেমদের তুলনায় আধুনিক বিশ্বব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতি সম্পর্কে তাঁর পঠন-পাঠন ও বোঝাপড়া অত্যন্ত গভীর বলে মনে করা হয়।

৩. কর্মজীবন ও বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মকাণ্ড

শিক্ষাজীবন শেষ করে দেশে ফিরে মুফতি হারুন ইজহার চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী আল জামিয়া ইসলামিয়া লালখানবাজার মাদ্রাসার সহকারী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি তরুণ শিক্ষার্থীদের মনস্তাত্ত্বিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের জন্য কাজ শুরু করেন। কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের কেবল প্রথাগত শিক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে আধুনিক চিন্তাধারার সাথে পরিচিত করার উদ্যোগ নেন তিনি।

প্রকাশনা ও লেখালেখি

মুফতি হারুন ইজহার একজন সুলেখক এবং চিন্তক হিসেবে সুপরিচিত। কওমি তরুণদের মাঝে তাঁর বইগুলো বেশ জনপ্রিয়। তাঁর সম্পাদিত ও প্রকাশিত উল্লেখযোগ্য গ্রন্থসমূহ হলো:

  • চেতনার মানচিত্র: তরুণ মুসলিমদের বিশ্ববীক্ষা ও সমসাময়িক চিন্তার বিকাশ নিয়ে লেখা।
  • নুসুসের আলোকে জাহিলিয়া: আধুনিক সমাজ ও সংস্কৃতির নেতিবাচক দিকগুলোর ইসলামি বিশ্লেষণ।
  • দারসুল আকিদা: ইসলামি বিশ্বাসের মৌলিক বিষয়গুলোর ওপর অ্যাকাডেমিক আলোচনা।

তিনি মূলত সমকালীন বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির প্রেক্ষাপটে ইসলামের অবস্থান এবং মুসলিম উম্মাহর সংকট ও সমাধান নিয়ে অনলবর্ষী বক্তব্য প্রদানের জন্য তরুণ প্রজন্মের কাছে বিশেষভাবে সমাদৃত।

৪. হেফাজতে ইসলামে ভূমিকা ও নেতৃত্ব

২০১০ সালে চট্টগ্রামের হাটহাজারী মাদ্রাসার তৎকালীন মহাপরিচালক আল্লামা শাহ আহমদ শফীর নেতৃত্বে ‘হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ’ গঠিত হলে হারুন ইজহার এর সাথে যুক্ত হন। ২০১৩ সালে শাপলা চত্বরের ঐতিহাসিক আন্দোলনের সময় তিনি মাঠপর্যায়ে অত্যন্ত সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।

পরবর্তীতে ২০২০ সালে আল্লামা আহমদ শফীর মৃত্যুর পর জুনায়েদ বাবুনগরীর নেতৃত্বে গঠিত কমিটিতে মুফতি হারুন ইজহারকে কেন্দ্রীয় শিক্ষা ও সংস্কৃতি বিষয়ক সম্পাদক (এবং কোনো কোনো সময় কেন্দ্রীয় গবেষণা সম্পাদক) হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি সংগঠনের কট্টরপন্থী অংশের অন্যতম প্রধান নীতিনির্ধারক ও তাত্ত্বিক নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও ইউটিউবে তাঁর ধারালো ও রাজনৈতিক বয়ানগুলো দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, যা দেশের কওমি যুবসমাজকে প্রবলভাবে আলোড়িত করে।

৫. আইনি জটিলতা, বিতর্ক ও দীর্ঘ কারাজীবন

মুফতি হারুন ইজহারের জীবন যেমন বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় সমৃদ্ধ, তেমনই তা রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর নজরদারি এবং দীর্ঘ কারাবাসের ইতিহাসে ঘেরা। তাঁর বিরুদ্ধে উগ্রপন্থা ও জঙ্গিবাদের সাথে সংশ্লিষ্টতার একাধিক মারাত্মক অভিযোগ রয়েছে।

২০০৯ সালের মার্কিন ও ভারতীয় দূতাবাসে হামলার অভিযোগ

২০০৯ সালের নভেম্বর মাসে চট্টগ্রামের লালখান বাজার মাদ্রাসার পেছনের পাহাড় থেকে লস্কর-ই-তৈয়বার সন্দেহভাজন দুই বিদেশি জঙ্গিসহ হারুন ইজহারকে প্রথম গ্রেফতার করে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। অভিযোগ ছিল, তিনি ঢাকায় অবস্থিত মার্কিন ও ভারতীয় দূতাবাসে বড় ধরনের হামলার পরিকল্পনার সাথে জড়িত ছিলেন। এই মামলায় তিনি দীর্ঘদিন কারাবরণ করেন।

২০১৩ সালের লালখান বাজার মাদ্রাসা বিস্ফোরণ

২০১৩ সালের ৭ই অক্টোবর লালখান বাজার মাদ্রাসার চারতলার একটি ছাত্রাবাসে এক ভয়াবহ ও রহস্যময় বিস্ফোরণ ঘটে। এই ঘটনায় দুই জন মাদ্রাসা ছাত্র নিহত হন এবং বেশ কয়েকজন আহত হন। প্রাথমিক অবস্থায় মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে এটিকে ল্যাপটপ বা আইপিএস বিস্ফোরণ বলে দাবি করা হলেও, পরবর্তীতে পুলিশ ও র‍্যাবের তল্লাশিতে সেখান থেকে তাজা হ্যান্ড গ্রেনেড, বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক তৈরির সরঞ্জাম এবং ১৮ বোতল অ্যাসিড উদ্ধার করা হয়। এই ঘটনায় খুলশী থানায় বিস্ফোরক ও অ্যাসিড আইনে মামলা দায়ের করা হয়, যার প্রধান আসামি ছিলেন মুফতি ইজহার ও তাঁর ছেলে মুফতি হারুন ইজহার। এই মামলাতেও তিনি গ্রেফতার হন এবং দীর্ঘ মেয়াদে কারাভোগ করেন।

২০২১ সালের মোদিবিরোধী আন্দোলন ও গণ-গ্রেফতার

২০২১ সালের মার্চ মাসে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরকে কেন্দ্র করে হেফাজতে ইসলাম দেশব্যাপী তীব্র আন্দোলন ও বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। এই আন্দোলনের সূত্র ধরে চট্টগ্রামের হাটহাজারী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া এবং ঢাকার বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক সহিংসতা, অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে।

রাষ্ট্রীয় দমনপীড়ন শুরু হলে ২০২১ সালের ২৮শে এপ্রিল গভীর রাতে র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব) চট্টগ্রামের লালখান বাজার মাদ্রাসা থেকে মুফতি হারুন ইজহারকে পুনরায় গ্রেফতার করে। গ্রেফতারের ঠিক আগ মুহূর্তে তিনি তাঁর ব্যক্তিগত ফেসবুক পেজে একটি ‘গুডবাই’ ভিডিও ও মেসেজ পোস্ট করেন, যা সে সময় বেশ চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছিল। প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাঁকে মোদিবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম মূল ‘মদদদাতা’ ও ‘পরিকল্পনাকারী’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

৬. কারামুক্তি ও বর্তমান অবস্থান

২০২১ সালের এপ্রিল মাসে গ্রেফতার হওয়ার পর মুফতি হারুন ইজহারের বিরুদ্ধে হাটহাজারী থানা ও খুলশী থানাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সর্বমোট ২৮টি মামলা দায়ের ও বিচারাধীন করা হয়। দীর্ঘ দুই বছর আইনি লড়াইয়ের পর, ২০২৩ সালের মে মাসে (কারাগারের তথ্য অনুযায়ী ২২ মে ২০২৩) তিনি চট্টগ্রামের কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে প্রতিটি মামলায় মহামান্য আদালত কর্তৃক জামিন পেয়ে অবশেষে মুক্তি লাভ করেন।

মুক্তির পর তিনি রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে পুনরায় তাঁর মাদ্রাসা পরিচালনায় ও নিয়মিত ধর্মীয় দারস (যেমন: সাপ্তাহিক আল কুরআনের দারস) কার্যক্রমে মনোনিবেশ করেন। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি পুনরায় সামাজিক ও ধর্মীয় কর্মকাণ্ডে ব্যাপকভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠেন।

মুফতি হারুন ইজহারের জীবন পরিচিতি (এক নজরে)

বিষয়বিবরণ
নামমুফতি হারুন ইজহার (Mufti Harun Izhar)
জন্ম সাল১৯৭৭ খ্রিষ্টাব্দ
জন্মস্থানলালখান বাজার, চট্টগ্রাম, বাংলাদেশ
পিতার নামমুফতি ইজহারুল ইসলাম চৌধুরী (নেজামে ইসলাম পার্টির সভাপতি)
পেশা/পদবিসহকারী পরিচালক, আল জামিয়া ইসলামিয়া লালখানবাজার মাদ্রাসা
শিক্ষাহাটহাজারী মাদ্রাসা (বাংলাদেশ), জামিয়া আশরাফিয়া ও দারুল উলুম করাচী (পাকিস্তান)
রাজনৈতিক সম্পৃক্ততাহেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ (সাবেক শিক্ষা ও সংস্কৃতি সম্পাদক)
উল্লেখযোগ্য বইচেতনার মানচিত্র, নুসুসের আলোকে জাহিলিয়া, দারসুল আকিদা
মোট মামলার সংখ্যাপ্রায় ২৮টি (বেশিরভাগই জামিনপ্রাপ্ত)
প্রধান পরিচিতিসমকালীন ভূ-রাজনীতি বিশ্লেষক আলেম, ইসলামি বাগ্মী ও চিন্তক

সারসংক্ষেপ: মুফতি হারুন ইজহার বাংলাদেশের আধুনিক ইসলামি আন্দোলনের ইতিহাসের এক ব্যতিক্রমী চরিত্র। একদিকে তাঁর গভীর পান্ডিত্য, বৈশ্বিক রাজনীতি সচেতনতা ও সাংগঠনিক দক্ষতা তরুণ কওমি সমাজকে ব্যাপকভাবে আকৃষ্ট করে; অন্যদিকে উগ্রপন্থা, মাদ্রাসা বিস্ফোরণ ও রাষ্ট্রবিরোধী সহিংসতায় ইন্ধন দেওয়ার গুরুতর অভিযোগগুলো জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মহলে তাঁর ভাবমূর্তিকে অত্যন্ত বিতর্কিত করে তুলেছে। সব মিলিয়ে, তিনি বর্তমান বাংলাদেশের কওমি ঘরানার অন্যতম সবচেয়ে প্রভাবশালী অথচ দ্বিমুখী মূল্যায়িত এক ব্যক্তিত্ব।

তার লিখিত কিছু বই :

০১. চেতনার ইশতিহার

লেখক :  মুফতি হারুন ইজহার



০২. জীবনের অর্থগুলো

লেখক :  মুফতি হারুন ইজহার



০৩. দারসুল আকিদা আল আকিদাতুত তাহাবিয়্যাহ অবলম্বনে

লেখক :  মুফতি হারুন ইজহার



০৪. নুসূসের আলোকে জাহিলিয়্যাহ

লেখক : মুফতি হারুন ইজহার



"বাংলা ইসলামিক বইয়ের বিশাল পিডিএফ (PDF) আর্কাইভ"