ড. আবদুল আযীয আবদুর রহীম (Dr. Abdulazeez Abdulraheem) হলেন সমসাময়িক মুসলিম বিশ্বের একজন অত্যন্ত প্রভাবশালী শিক্ষাবিদ, গবেষক এবং সংস্কারক। পবিত্র কুরআনের ভাষা অর্থাৎ আরবিকে সাধারণ মানুষের জন্য সহজ, বোধগম্য এবং প্রাঞ্জল করার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান অবিস্মরণীয়। তাঁর প্রতিষ্ঠিত “আন্ডারস্ট্যান্ড কুরআন একাডেমি” (Understand Al-Qur’an Academy) বর্তমানে বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ মানুষকে অত্যন্ত সহজ পদ্ধতিতে কুরআনের ভাষা বোঝার আলো ছড়াচ্ছে। নিচে তাঁর জীবন, শিক্ষা, কর্মজীবন এবং কুরআন শিক্ষার প্রসারে তাঁর যুগান্তকারী অবদানের একটি বিস্তারিত ও তথ্যবহুল জীবনী উপস্থাপন করা হলো।
১. জন্ম ও প্রাথমিক জীবন
ড. আবদুল আযীয আবদুর রহীম ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশের (বর্তমান তেলেঙ্গানা) হায়দ্রাবাদে একটি সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশব থেকেই তিনি অত্যন্ত মেধাবী ও অনুসন্ধিৎসু মনের অধিকারী ছিলেন। তাঁর পারিবারিক পরিবেশ ছিল ধর্মীয় মূল্যবোধ ও শিক্ষার প্রতি গভীর অনুরাগে ঘেরা। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার গণ্ডি পেরোনোর সময় থেকেই তাঁর মধ্যে একই সাথে সাধারণ বিজ্ঞান এবং ইসলামিক জ্ঞানের প্রতি গভীর আগ্রহ লক্ষ্য করা যায়।
২. শিক্ষাজীবন ও উচ্চতর ডিগ্রি
ড. আবদুল আযীযের শিক্ষাজীবন ছিল অত্যন্ত গৌরবোজ্জ্বল। তিনি মূলত একজন প্রকৌশলী (Engineer) হিসেবে তাঁর উচ্চশিক্ষার যাত্রা শুরু করেন।
- স্নাতক ও স্নাতকোত্তর: তিনি ভারতের মর্যাদাপূর্ণ ওসমানিয়া বিশ্ববিদ্যালয় (Osmania University) থেকে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক (B.E.) ডিগ্রি লাভ করেন। এরপর তিনি একই বিষয়ে উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণ করেন।
- পিএইচডি (Ph.D.): পরবর্তীতে তিনি ভারতের আইআইটি (IIT) বা অনুরূপ শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান থেকে ডক্টরেট বা পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন।
- কর্মক্ষেত্রে দক্ষতা: শিক্ষাজীবন শেষ করে তিনি সৌদি আরবের কিং ফাহদ ইউনিভার্সিটি অব পেট্রোলিয়াম অ্যান্ড মিনারেলস (KFUPM)-এ অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর হিসেবে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করেন। প্রকৌশল বিদ্যায় তাঁর এই গভীর জ্ঞান ও কাঠামোগত চিন্তাভাবনা পরবর্তীতে কুরআন শিক্ষার সহজ পদ্ধতি আবিষ্কারে দারুণভাবে সাহায্য করেছিল।
৩. কুরআন শিক্ষার প্রতি অনুরাগের পটভূমি
একজন সফল প্রকৌশলী এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হওয়া সত্ত্বেও ড. আবদুল আযীযের মনে একটি গভীর শূন্যতা ও প্রশ্ন কাজ করত। তিনি লক্ষ্য করেন যে, বিশ্বের সিংহভাগ অ-আরবিভাষী মুসলিম (যেমন: ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও অন্যান্য দেশের মানুষ) প্রতিদিন সালাতে বা অন্য সময়ে কুরআন তিলাওয়াত করলেও এর অর্থ বোঝে না।
সাধারণ মানুষের ধারণা ছিল যে, কুরআনের ভাষা বা আরবি ব্যাকরণ শেখা অত্যন্ত কঠিন এবং এর জন্য বছরের পর বছর মাদ্রাসায় পড়াশোনা করতে হবে। এই প্রচলিত ধারণাটি ড. আবদুল আযীযকে গভীরভাবে ব্যথিত করে। তিনি চিন্তা করতে শুরু করেন—যে কিতাব আল্লাহ তাআলা মানবজাতির হেদায়েতের জন্য এত সহজ করে নাজিল করেছেন, তা শেখা কেন মানুষের কাছে এত কঠিন মনে হবে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে তিনি দীর্ঘ কয়েক বছর গবেষণা করেন। তিনি পবিত্র কুরআনের শব্দভাণ্ডার (Vocabulary) এবং ব্যাকরণ (Grammar) নিয়ে গভীরভাবে কাজ শুরু করেন।
৪. ‘আন্ডারস্ট্যান্ড কুরআন একাডেমি’ প্রতিষ্ঠা
সৌদি আরবে শিক্ষকতা করার পাশাপাশি তিনি একটি অভিনব ও বৈজ্ঞানিক শিক্ষা পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন। ১৯৯৮ সালের দিকে তিনি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে Understand Al-Qur’an Academy (আন্ডারস্ট্যান্ড কুরআন একাডেমি) প্রতিষ্ঠা করেন। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল—“সবচেয়ে সহজ এবং দ্রুততম উপায়ে কুরআনের ভাষা শেখানো।”
তাঁর এই উদ্যোগের পেছনে কিছু অনন্য বৈশিষ্ট্য ছিল:
- ফ্রিকোয়েন্সি অ্যানালাইসিস (শব্দের পুনরাবৃত্তি): তিনি হিসাব করে দেখান যে, কুরআনে মোট প্রায় ৭৮,০০০ শব্দ রয়েছে। কিন্তু এর মধ্যে বহু শব্দ বারবার এসেছে। মাত্র ৩০০ থেকে ৪০০টি মৌলিক শব্দ শিখলে কুরআনের প্রায় ৭০% থেকে ৮০% শব্দের অর্থ বোঝা সম্ভব!
- টিপিআই পদ্ধতি (Total Physical Interaction): তিনি ব্যাকরণ বা গ্রামার শেখানোর জন্য একটি অভিনব শারীরিক অঙ্গভঙ্গির পদ্ধতি (TPI) আবিষ্কার করেন। হাত, চোখ, কান এবং মস্তিষ্কের যৌথ ব্যবহারের মাধ্যমে আরবি সর্বনাম ও ক্রিয়ার রূপান্তর (যেমন: হুয়া, হুম, আনতা, আনতুম) খেলাচ্ছলে কয়েক মিনিটে মুখস্থ করিয়ে দেওয়ার পদ্ধতিটি বিশ্বজুড়ে দারুণ জনপ্রিয় হয়।
৫. বিভিন্ন কোর্স ও সিলেবাস প্রণয়ন
ড. আবদুল আযীয আবদুর রহীমের সিলেবাসটি এমনভাবে সাজানো হয়েছে যা একজন প্রাথমিক স্তরের মানুষ থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষিত যে কেউ সহজে আয়ত্ত করতে পারে। তাঁর প্রধান কোর্সগুলোর মধ্যে রয়েছে:
ক. কোর্স-১: সালাত ও দৈনন্দিন দোয়ার মাধ্যমে কুরআন বুঝুন
এটি একাডেমির সবচেয়ে জনপ্রিয় কোর্স। এখানে নামাযে পঠিত সূরা ফাতেহা, শেষ দিকের কয়েকটি ছোট সূরা, রুকু-সিজদার তাসবিহ এবং আযানের মাধ্যমে মাত্র ২০ থেকে ২৫ ঘণ্টার মধ্যে কুরআনের প্রায় ৫০% শব্দ শিখিয়ে দেওয়া হয়।
খ. কোর্স-২, ৩, ৪ ও ৫: গভীর ব্যাকরণ ও সূরা বাকারা
প্রথম কোর্স শেষ করার পর শিক্ষার্থীরা ক্রমান্বয়ে কুরআনের আরও গভীরে প্রবেশ করে। সূরা বাকারা ও অন্যান্য সূরার মাধ্যমে সম্পূর্ণ কুরআনের শব্দার্থ ও ব্যাকরণগত নিয়মগুলো সহজ ছকে শেখানো হয়।
৬. আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে প্রভাব ও গণমাধ্যম
ড. আবদুল আযীযের এই সহজ পদ্ধতিটি দ্রুত আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করে। বিশ্বের বিভিন্ন নামী টেলিভিশন চ্যানেলে তাঁর এই কোর্সটি প্রচারিত হতে থাকে।
- পিস টিভি (Peace TV): পিস টিভির ইংরেজি, উর্দু ও বাংলা চ্যানেলে তাঁর “Understand Quran” সিরিজটি দীর্ঘ বছর ধরে সম্প্রচারিত হয়, যার মাধ্যমে কোটি কোটি মানুষ ঘরে বসে কুরআনের ভাষা শেখার সুযোগ পায়।
- অনলাইন প্ল্যাটফর্ম: তাঁর তৈরি ওয়েবসাইট ও ইউটিউব চ্যানেলের মাধ্যমে বর্তমানে ইংরেজি, আরবি, উর্দু, বাংলা, ফরাসি, ইন্দোনেশীয় ইত্যাদি প্রধান প্রধান ভাষায় এই কোর্সটি ফ্রিতে বা নামমাত্র মূল্যে শেখানো হচ্ছে।

- স্কুল সিলেবাস: ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ এবং মধ্যপ্রাচ্যের বহু নামী ইসলামিক ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে তাঁর তৈরি বই ও সিলেবাস পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
৭. ড. আবদুল আযীযের রচিত বই ও উপকরণ
তিনি কুরআন শিক্ষাকে সহজ করার জন্য অসংখ্য বই, ফ্ল্যাশ কার্ড, ওয়ার্কবুক এবং অডিও-ভিডিও ম্যাটেরিয়াল তৈরি করেছেন। তাঁর লেখা প্রধান বইগুলোর মধ্যে অন্যতম:
১. Understand Quran and Salah – The Easy Way
২. Easy Steps to Quranic Arabic
৩. کھیل کھیل میں عربی گرامر (উর্দুতে খেলাচ্ছলে আরবি ব্যাকরণ)
৪. দৈনন্দিন সালাতের মাধ্যমে কুরআন বুঝুন (বাংলা অনুবাদ)
তাঁর এই বইগুলো অত্যন্ত চমৎকার গ্রাফিক্স ও টেবিল ব্যবহার করে তৈরি, যা যেকোনো সাধারণ পাঠককে আকৃষ্ট করে।
৮. তাঁর চিন্তাধারা ও সমাজ সংস্কার
ড. আবদুল আযীয আবদুর রহীম কেবল একজন শিক্ষক নন, তিনি একজন সমাজ সংস্কারকও বটে। তিনি বিশ্বাস করেন:
- কুরআনের সাথে সরাসরি সম্পর্ক: প্রত্যেক মুসলিমের উচিত অনুবাদের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল না হয়ে সরাসরি আল্লাহর কালামের ভাষা বোঝা। এতে সালাতে মনোযোগ (খুশু-খুযু) বহুগুণ বৃদ্ধি পায়।
- আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার: তিনি ইসলামের দাওয়াহ ও শিক্ষাদানে আধুনিক প্রযুক্তি, অ্যানিমেশন, মোবাইল অ্যাপ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ব্যবহারের ওপর জোর দেন।
- সহজীকরণ: দ্বীনের জ্ঞানকে কঠিন বা জটিল করে উপস্থাপন না করে মানুষের মনস্তত্ত্ব বুঝে সহজভাবে উপস্থাপন করা।
৯. বর্তমান কার্যক্রম ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
বর্তমানে ড. আবদুল আযীয আবদুর রহীম হায়দ্রাবাদে তাঁর একাডেমির মূল কেন্দ্র থেকে বিশ্বব্যাপী কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। তিনি নিয়মিত বিভিন্ন দেশে আন্তর্জাতিক সেমিনার, শিক্ষক প্রশিক্ষণ কর্মশালা (Teacher’s Training) এবং লাইভ ক্লাসের আয়োজন করে যাচ্ছেন। তাঁর মূল লক্ষ্য হলো—বিশ্বের প্রতিটি মুসলিম পরিবারে অন্তত একজন ব্যক্তি যেন এমন থাকেন, যিনি সরাসরি কুরআন পড়ে এর অর্থ বুঝতে পারেন।
উপসংহার
ড. আবদুল আযীয আবদুর রহীম মুসলিম উম্মাহর জন্য এক অনন্য নেয়ামত। যেখানে মানুষ কর্মব্যস্ততার অজুহাতে বা কঠিন নিয়মের ভয়ে কুরআন শেখা থেকে দূরে সরে যাচ্ছিল, সেখানে তিনি মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কাঠামোগত পদ্ধতিকে কুরআন শিক্ষায় প্রয়োগ করে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছেন। তাঁর এই মহৎ কর্মের ফসল আজ পৃথিবীর আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে পড়েছে। আল্লাহ তাআলা তাঁর এই অক্লান্ত পরিশ্রম ও খিদমতকে কবুল করুন এবং তাঁকে উত্তম জাযা দান করুন। আমীন।
তার লিখিত কিতাব হলো :
০১. কুরআন ও সালাত অনুধাপন ১.৫
লেখক : ড. আবদুল আযীয আবদুর রহীম
০২. কুরআন ও সালাত অনুধাপন ২.৭
লেখক : ড. আবদুল আযীয আবদুর রহীম
০৩. কুরআন ও সালাত অনুধাপন
লেখক : ড. আবদুল আযীয আবদুর রহীম
০৪. কুরআন পড়ুন
লেখক : ড. আবদুল আযীয আবদুর রহীম



