শায়খ আবদুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ (রহঃ) ছিলেন সমসাময়িক মুসলিম বিশ্বের একজন অন্যতম শ্রেষ্ঠ হাদিস বিশারদ (মুহাদ্দিস) ও হানাফি ফিকহবিদ। বিংশ শতাব্দীতে ইসলামি সংস্কৃতির বিকাশ, হাদিস শাস্ত্রের তাহকিক (গবেষণা) এবং মুসলিম উম্মাহর বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণে তাঁর অবদান অবিস্মরণীয়। একই সাথে তিনি একজন সক্রিয় রাজনীতিবিদ এবং সমাজ সংস্কারক ছিলেন। সিরিয়ার ইসলামি আন্দোলনে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাঁর পাণ্ডিত্য ও আপসহীন নেতৃত্ব তাঁকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
জন্ম ও বংশ পরিচয়
শায়খ আবদুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ ১৯১৭ সালের ৯ মে সিরিয়ার ঐতিহাসিক আলেপ্পো নগরীতে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পুরো নাম—আব্দুল ফাত্তাহ বিন মুহাম্মদ বিন বশীর বিন হাসান আবু গুদ্দাহ।
তাঁর পিতা মুহাম্মদ আনসারী ছিলেন একজন অত্যন্ত ধার্মিক ব্যক্তি এবং পেশায় বস্ত্র ব্যবসায়ী। তাঁর দাদা বশীর আনসারীও ছিলেন আলেপ্পোর অন্যতম বৃহৎ কাপড় ব্যবসায়ী। পারিবারিক ঐতিহ্য ও ঐতিহাসিক সূত্রে ধারণা করা হয় যে, তাঁদের পরিবার ইসলামের মহান সেনাপতি ও রাসুলুল্লাহ (সাঃ)-এর বিখ্যাত সাহাবি হযরত খালিদ বিন ওয়ালিদ (রাঃ)-এর বংশোদ্ভূত।
প্রারম্ভিক জীবন ও শিক্ষা সফর
আলেপ্পোর দ্বীনি ও ব্যবসায়িক পরিবেশে শায়খ আবু গুদ্দাহর শৈশব ও কৈশোর অতিবাহিত হয়। প্রাথমিক পড়াশোনা শেষে তিনি স্থানীয় ‘ইসলামিক স্টাডিজ একাডেমি’-তে ভর্তি হন এবং সেখান থেকে মৌলিক ইসলামি শিক্ষার পাঠ সমাপন করেন।
উচ্চ শিক্ষার উদ্দেশ্যে তিনি মিশরের কায়রোতে গমন করেন এবং বিশ্ববিখ্যাত আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি শরিয়াহ ও ইসলামি আইনের ওপর উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেন। এর পাশাপাশি তিনি কায়রোতে মনোবিজ্ঞান (Psychology) বিষয়েও গভীর পড়াশোনা ও উচ্চ শিক্ষা লাভ করেন। জ্ঞান অর্জনের এই বহুমুখী ধারা তাঁর পরবর্তী কর্মজীবনে এবং গবেষণায় এক বিরাট প্রভাব ফেলেছিল।

শায়খ আবু গুদ্দাহর প্রখ্যাত উস্তাদবৃন্দ
জ্ঞান অন্বেষণের সফরে তিনি তৎকালীন সময়ের শ্রেষ্ঠ ও কালজয়ী সব পণ্ডিত ও আলেমের সান্নিধ্য লাভ করেন। তাঁর উস্তাদদের তালিকা অত্যন্ত দীর্ঘ এবং তাঁরা প্রত্যেকেই নিজ নিজ ক্ষেত্রে জ্ঞানের বিশাল সমুদ্র ছিলেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য কয়েকজন উস্তাদ হলেন:
- ইমাম মুহাম্মদ জাহিদ আল-কাওসারি (রহঃ): উসমানীয় সাম্রাজ্যের শেষ দিককার অন্যতম শ্রেষ্ঠ হানাফি ফিকহবিদ ও গবেষক, যাঁর সান্নিধ্য শায়খ আবু গুদ্দাহর জ্ঞানতাত্ত্বিক ভিত্তি গঠনে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখে।
- মুস্তফা সাবরি এফেন্দি (রহঃ): উসমানীয় খিলাফতের শেষ শায়খুল ইসলাম।
- মুহাম্মদ রাগিব আল-তাবাখ (রহঃ): সিরিয়ার প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ ও মুহাদ্দিস।
- মুফতি শফি উসমানি (রহঃ): অবিভক্ত ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফকিহ এবং পাকিস্তানের সাবেক গ্র্যান্ড মুফতি (যাঁর বিখ্যাত তাফসির গ্রন্থ ‘মাআরেফুল কুরআন’)।
- আল্লামা ইউসুফ বানুরী (রহঃ): বিশ্বখ্যাত হাদিস বিশারদ এবং পাকিস্তানের জামিয়াতুল উলুমিল ইসলামিয়ার প্রতিষ্ঠাতা।
- এছাড়াও তিনি ঈসা আল-বায়ানুনি, ইব্রাহিম আল-সালকিনি, মুহাম্মদ আল-নাশিদ, মুহাম্মদ সাঈদ আল ইদলিবি, মুস্তফা আল-জারকা এবং মুহাম্মদ নাজিব সিরাজ উদ্দিনের মতো মহান মনীষীদের নিকট থেকে সরাসরি জ্ঞান অর্জন করেন।
মুসলিম ব্রাদারহুড ও রাজনৈতিক জীবন
১৯৪৪ থেকে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত মিশরে অবস্থানকালে শায়খ আবু গুদ্দাহ মুসলিম ব্রাদারহুড (ইখওয়ানুল মুসলিমিন)-এর প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রথম প্রধান পথপ্রদর্শক (মুরশিদে আম) হাসান আল-বান্নার সংস্পর্শে আসেন। হাসান আল-বান্নার আদর্শ, প্রজ্ঞা এবং ইসলামি পুনর্জাগরণের চেতনা তরুণ আবু গুদ্দাহকে গভীরভাবে আলোড়িত করে। তিনি হাসান আল-বান্নার হাত ধরেই মুসলিম ব্রাদারহুডে যোগদান করেন।
১৯৫০ সালে শিক্ষা সমাপন করে সিরিয়ায় ফিরে আসার পর তিনি সিরিয়ান মুসলিম ব্রাদারহুডের একজন প্রথম সারির সক্রিয় সদস্য হিসেবে কাজ শুরু করেন। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি তাঁর মেধা, সাংগঠনিক দক্ষতা ও খুতবার মাধ্যমে আলেপ্পোর ইসলামি পরিমণ্ডলে অত্যন্ত জনপ্রিয় ও প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন।
সিরিয়ান ব্রাদারহুডের নেতৃত্ব লাভ
তিনি সিরীয় মুসলিম ব্রাদারহুডের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও নীতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তৎকালীন সর্বোচ্চ উপদেষ্টা ইসাম আল-আজহারের কিছু একক ও কর্তৃত্ববাদী নীতির বিরুদ্ধে তিনি সমালোচনা করেছিলেন। পরবর্তীতে ১৯৬২ সালে যখন আল-আজহার পদত্যাগ করেন, তখন দলের অনুরোধে আবু গুদ্দাহ তাঁকে পুনরায় সুপ্রিম উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন। অবশেষে ১৯৭৩ সালে তিনি নিজেই ইসাম আল-আজহারের স্থলাভিষিক্ত হয়ে সিরিয়ান মুসলিম ব্রাদারহুডের তৃতীয় সর্বোচ্চ উপদেষ্টা (General Guide/Supervisor) নির্বাচিত হন এবং ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত এই দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৬১ সালের সিরিয়ার সংসদ নির্বাচনে তিনি অংশ নেন এবং জনগণের ব্যাপক সমর্থন লাভ করেন। তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও পাণ্ডিত্যের কারণে সিরিয়ার তৎকালীন রাষ্ট্রপতি নাজিম আল-কুদসি তাঁকে আলেপ্পোর অফিশিয়াল ‘মুফতি’ হিসেবে নিযুক্ত করেন।
একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে সংগ্রাম ও কারাজীবন
১৯৬৬ সালে সিরিয়ায় একটি সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সালাহ জাদিদ ক্ষমতায় আসেন। সালাহ জাদিদের সমাজতান্ত্রিক ও সহিংস নীতি এবং দমনপীড়নের বিরুদ্ধে শায়খ আবু গুদ্দাহ তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। তিনি সিরিয়ার উলামা সমাজ ও সাধারণ জনগণকে একত্রিত করেন এবং এই অবৈধ রাষ্ট্রীয় শক্তিকে বয়কট করার ডাক দেন।
আলেপ্পোর জামে মসজিদে জুমার খুতবায় তিনি জাদিদ সরকারের অনৈসলামিক ও স্বৈরাচারী নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার কণ্ঠে আওয়াজ তোলেন। তিনি প্রকাশ্যে ঘোষণা করেন যে, সালাহ জাদিদের এই শাসন সিরিয়ার জনগণের প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব করে না। এর ফলশ্রুতিতে বাথ সরকারের কোপানলে পড়ে তিনি গ্রেফতার হন এবং সিরিয়ার কুখ্যাত ও দূরবর্তী ‘তাদমোর’ কারাগারে বন্দী হন। এই ভয়াবহ কারাগারে দীর্ঘ ১১ মাস অমানুষিক নির্যাতন সহ্য করার পর, ১৯৬৭ সালের আরব-ইসরায়েল (ছয় দিনের যুদ্ধ) যুদ্ধের পর সাধারণ ক্ষমার অধীনে তিনি অন্যান্য রাজনৈতিক বন্দীদের সাথে মুক্তি লাভ করেন।
নির্বাসিত জীবন ও শিক্ষাদান
কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর সিরিয়ার শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির কারণে তিনি দেশ ছাড়তে বাধ্য হন এবং সৌদি আরবে রাজনৈতিক আশ্রয় নেন। সৌদি আরবে তাঁর জীবনের এক নতুন এবং অত্যন্ত উর্বর অধ্যায় শুরু হয়।
তিনি রিয়াদের বাদশাহ সৌদ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামি বিজ্ঞান অনুষদে দীর্ঘ সময় অধ্যাপনা ও উচ্চতর গবেষণা পরিচালনা করেন। এছাড়াও তিনি জেদ্দা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন এবং সুদানের ওমদুরমান ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ে অতিথি অধ্যাপক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ লেকচার প্রদান করেন।
১৯৭৬ থেকে ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত সিরিয়ায় যখন হাফেজ আল-আসাদ সরকারের বিরুদ্ধে ইসলামি বিদ্রোহ চলছিল, তখন তিনি নির্বাসনে থেকেই দূর থেকে মুসলিম ব্রাদারহুডের সাধারণ পরিদর্শক হিসেবে এর তাত্ত্বিক ও নৈতিক নির্দেশনা দেন। তবে এই সশস্ত্র বিদ্রোহ ব্যর্থ হওয়ার পর এবং সিরিয়ার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ বদলে যাওয়ার পর শায়খ আবু গুদ্দাহ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে ধীরে ধীরে নিজেকে গুটিয়ে নেন এবং সম্পূর্ণ সময় ও মনোযোগ একাডেমিয়া, শিক্ষাদান ও গ্রন্থ রচনায় নিবেশ করেন।
শিক্ষকতা ও উল্লেখযোগ্য ছাত্রসমাজ
শিক্ষক হিসেবে শায়খ আবু গুদ্দাহ ছিলেন এক জীবন্ত কিংবদন্তি। তাঁর দরস ও লেকচার শোনার জন্য দূর-দূরান্ত থেকে শিক্ষার্থীরা ছুটে আসত। বর্তমান বিশ্বের বহু শীর্ষস্থানীয় আলেম সরাসরি তাঁর ছাত্র ছিলেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য কয়েকজন ছাত্র হলেন:
১. মুফতি মুহাম্মদ তাকি উসমানি: বর্তমান মুসলিম বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফকিহ, ইসলামি অর্থনীতিবিদ এবং পাকিস্তানের শরিয়াহ বোর্ডের চেয়ারম্যান। তিনি শায়খ আবু গুদ্দাহর ইলমি গভীরতার দ্বারা অত্যন্ত প্রভাবিত ছিলেন।
২. শায়খ মুহাম্মদ আব্দুল মালেক: বাংলাদেশের প্রখ্যাত হাদিস বিশারদ ও ফকিহ।
৩. ড. সালমান আল-হুসাইনি নদভী: ভারতের বিখ্যাত আলেম ও চিন্তাবিদ।
সাহিত্যকর্ম ও অনন্য গ্রন্থাবলী
শায়খ আবদুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ (রহঃ) একাধারে মৌলিক লেখক এবং প্রাচীন পাণ্ডুলিপির শ্রেষ্ঠ সম্পাদক (মুহাক্কিক) ছিলেন। হাদিস, ফিকহ, ইসলামি শিষ্টাচার ও ইতিহাসের ওপর তাঁর প্রায় ৬০টিরও বেশি মূল্যবান গ্রন্থ রয়েছে।
লেখক হিসেবে তাঁর বিখ্যাত কিছু বই:
- صفحات من صبر العلماء على شدائد العلم والتحصيل (علماء كرام) – [علماء كرام বা জ্ঞান অর্জনে উলামাদের ধৈর্য্য]: এই কালজয়ী গ্রন্থে তিনি প্রাচীন যুগের মনীষীদের জ্ঞান অর্জনের পথে যে চরম কষ্ট, ক্ষুধা ও ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছিল, তা চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।
- الرسول المعلم وأساليبه في التعليم (আল-রাসুলুল মুয়াল্লিম): শিক্ষক হিসেবে রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এর শিক্ষাদান পদ্ধতি, মনস্তত্ত্ব ও কৌশল নিয়ে লেখা একটি অসাধারণ গ্রন্থ।
- قيمة الزمن عند العلماء (কিমাতুজ জামান ইন্দাল উলামা): উলামাদের নিকট সময়ের মূল্য কেমন ছিল এবং তাঁরা কীভাবে প্রতিটি মুহূর্ত কাজে লাগাতেন, তার এক অনন্য দলিল।
- أدب الإسلام (আদাবুল ইসলাম): ইসলামি শিষ্টাচার ও সামাজিক রীতিনীতির ওপর সংক্ষিপ্ত ও অত্যন্ত প্রয়োজনীয় একটি বই।
সম্পাদক ও টীকা লেখক হিসেবে (তাহকিক):
প্রাচীনকালের বহু কঠিন ও জটিল গ্রন্থকে তিনি আধুনিক যুগের পাঠকদের জন্য সহজবোধ্য ও তাহকিক করে প্রকাশ করেছেন। এর মধ্যে ইমাম আল-কুদুরি, ইমাম তিরমিজি, এবং ইমাম কাওসারির বহু গ্রন্থের ওপর তাঁর চমৎকার টীকা ও ব্যাখ্যা গ্রন্থ রয়েছে।
কিমাতুজ জামান ইন্দাল উলামা’ (علماء كرام বা উলামাদের নিকট সময়ের মূল্য) সম্পর্কে একটি মতামত :
শায়খ আবদুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ (রহঃ) রচিত ‘কিমাতুজ জামান ইন্দাল উলামা’ (علماء كرام বা উলামাদের নিকট সময়ের মূল্য) মুসলিম সাহিত্যের একটি অনন্য ও মোটিভেশনাল গ্রন্থ। বইটিতে তিনি ইসলামের সোনালী যুগের মনীষী, মুহাদ্দিস ও ফকিহদের জীবনের বাস্তব সব ঘটনা তুলে ধরেছেন—যাঁরা সময়ের প্রতিটি সেকেন্ডকে ইবাদত, জ্ঞান অর্জন এবং মানবজাতির কল্যাণে বিলিয়ে দিয়েছিলেন।
নিচে এই কালজয়ী গ্রন্থের মূল বক্তব্য ও প্রধান শিক্ষাসমূহ বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো।
১. সময়ের গুরুত্ব ও জীবনের উদ্দেশ্য
বইটির মূল সুর হলো—সময়ই মানুষের জীবন। শায়খ আবু গুদ্দাহ (রহঃ) সুফি ও সালাফদের একটি বিখ্যাত উক্তি দিয়ে এটি বুঝিয়েছেন:
“সময় একটি তরবারি, তুমি যদি তাকে না কাটো (সঠিক ব্যবহার না করো), তবে সে তোমাকে কেটে ফেলবে।”
ইসলামে সময়ের অপচয়কে এক প্রকার আত্মহনন হিসেবে দেখা হয়েছে। একজন মানুষের জীবনে অর্থ বা সম্পদ হারালে তা ফিরে পাওয়া সম্ভব, কিন্তু চলে যাওয়া এক সেকেন্ডও কখনো ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়। তাই জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য সফল করতে সময়ের সঠিক মূল্যায়ন ফরজের মতোই গুরুত্বপূর্ণ।
২. জ্ঞান অর্জনে উলামাদের অবিশ্বাস্য ত্যাগ ও সময় সচেতনতা
বইটিতে এমন সব মনীষীদের জীবনের বিস্ময়কর সত্য ঘটনা সংকলিত হয়েছে, যা সাধারণ মানুষকে তাক লাগিয়ে দেয়। সময়ের প্রতি তাঁদের নিষ্ঠা কেমন ছিল, তার কয়েকটি মূল উদাহরণ এখানে দেওয়া হলো:
- খাওয়া ও গোসলের সময় সাশ্রয়: অনেক আলেম চিবিয়ে খাওয়ার সময় বাঁচানোর জন্য রুটি পানিতে ভিজিয়ে ছাতুর মতো করে গিলে খেতেন, যাতে চিবানোর কয়েক মিনিট সময়ও বেঁচে যায় এবং তা কিতাব লেখায় বা পড়ায় লাগানো যায়।
- হাঁটার সময়ও পড়ালেখা: ইমাম ইবনু আকিল (রহঃ) বা ইবনে তাইমিয়া (রহঃ) এর মতো মনীষীরা যখন রাস্তা দিয়ে হেঁটে যেতেন বা টয়লেটে যেতেন, তখন তাঁদের ছাত্রদের বলতেন বাইরে দাঁড়িয়ে কিতাব জোরে পড়তে, যাতে ওই সময়টুকুও ইলম শোনার মধ্যে কাটে।
- মৃত্যুশয্যাতেও ইলমি আলোচনা: ইমাম আবু ইউসুফ (রহঃ)—যিনি ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) এর প্রধান ছাত্র এবং প্রধান বিচারপতি ছিলেন—যখন মৃত্যুশয্যায় ছটফট করছিলেন, তখনও তাঁর পাশে বসা এক ছাত্রের সাথে ফিকহের একটি জটিল মাসআলা নিয়ে আলোচনা করছিলেন। এর কয়েক মিনিট পরেই তিনি ইন্তেকাল করেন।
৩. দীর্ঘ ও বিশাল গ্রন্থাবলীর রহস্য
আজকের যুগে আমরা ভাবি, প্রাচীনকালের আলেম বা ইমামগণ কীভাবে একেকজন ৫০ বা ১০০ খণ্ডের বিশাল কিতাব লিখে গেছেন! শায়খ আবু গুদ্দাহ এই বইয়ে গাণিতিক হিসাব করে দেখিয়েছেন যে, এটি কোনো অলৌকিক জাদু ছিল না, বরং এটি ছিল সময়ের বারাকাহ (بركة) এবং নিয়মানুবর্তিতা।
যেমন, ইমাম ইবনে জারির আত-তবারি (রহঃ) বা ইমাম ইবনুল জাওজি (রহঃ) এর মতো উলামাদের জীবনের মোট দিন এবং তাঁদের লিখিত পৃষ্ঠার সংখ্যা ভাগ করলে দেখা যায়, তাঁরা বালেগ হওয়ার পর থেকে মৃত্যু পর্যন্ত প্রতিদিন গড়ে ৫০ থেকে ৬০ পৃষ্ঠা করে লিখেছেন! এটি সম্ভব হয়েছিল কেবল তখনই, যখন তাঁরা আড্ডা, অনর্থক কথা এবং অলসতায় একটি মুহূর্তও নষ্ট করেননি।
৪. বইটির মূল শিক্ষাসমূহ (Takeaways)
এই গ্রন্থ থেকে আধুনিক যুগের একজন পাঠক, বিশেষ করে শিক্ষার্থী ও গবেষকদের জন্য বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে:
- অনর্থক আড্ডা ও গীবত বর্জন: ইসলামে ‘লা-ইয়ানি’ বা অর্থহীন কাজ বলতে যা বোঝানো হয়েছে, তা থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বা অলস আড্ডায় সময় নষ্ট করা জীবনের সবচেয়ে বড় ক্ষতি।
- বহুমুখী কাজের অভ্যাস (Multitasking): কোনো শারীরিক কাজ বা ভ্রমণের সময় জিকির, ইলমি অডিও শোনা বা চিন্তাভাবনার মাধ্যমে সেই সময়টাকে জীবন্ত রাখা।
- পড়াশোনায় ধারাবাহিকতা: প্রতিদিন অল্প হলেও নির্দিষ্ট নিয়মে পড়ালেখা বা কোনো ভালো কাজ করা। দীর্ঘ বিরতির চেয়ে অল্প কিন্তু নিয়মিত কাজ অনেক বড় ফলাফল এনে দেয়।
- অবসর সময়ের সদ্ব্যবহার: অসুস্থতা বা বৃদ্ধ বয়স আসার আগেই যৌবন ও সুস্থতার সময়টুকুকে সর্বোচ্চ কাজে লাগানো।
স্বদেশে প্রত্যাবর্তন এবং শেষ জীবন
শায়খ আবু গুদ্দাহ বই পড়তে, লিখতে এবং দুর্লভ কিতাব সংগ্রহ করতে অসম্ভব ভালোবাসতেন। নির্বাসনে থাকাকালীন তিনি আলেপ্পোতে ফেলে আসা তাঁর বিশাল ব্যক্তিগত লাইব্রেরিটিকে খুব মিস করতেন।
দীর্ঘ ২৯ বছর নির্বাসিত জীবন কাটানোর পর, ১৯৯৫ সালের ডিসেম্বরে সিরিয়া সরকারের সাথে একটি বিশেষ চুক্তির মাধ্যমে তিনি স্বদেশে ফেরার অনুমতি পান। শর্ত ছিল তিনি কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়াবেন না, বরং কেবল একাডেমিয়া ও ধর্মীয় কাজেই সীমাবদ্ধ থাকবেন। স্বদেশে ফেরার পর সিরিয়ার জনগণ ও উলামা সমাজ তাঁকে অশ্রুসিক্ত নয়নে বরণ করে নেয়।
মৃত্যু ও দাফন
১৯৯৭ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি (১৪১৭ হিজরির ৯ শাওয়াল) এই মহান মনীষী সৌদি আরবের রিয়াদে ৭৯ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। তাঁর মৃত্যুর সংবাদে সমগ্র মুসলিম বিশ্বে শোকের ছায়া নেমে আসে।
তাঁর অসিয়ত বা শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী, তাঁর পবিত্র মরদেহ মদিনাতুল মুনাওয়ারায় নিয়ে যাওয়া হয়। মসজিদে নববীতে জানাজা শেষে তাঁকে ইসলামের ইতিহাসের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ কবরস্থান জান্নাতুল বাকি-তে দাফন করা হয়। সাহাবি, তাবেয়ি ও ইসলামের মহান মনিষীদের পাশে তিনি চিরনিদ্রায় শায়িত হন।
মূল্যায়ন
শায়খ আবদুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ (রহঃ) কেবল একজন ব্যক্তি ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন একটি আলোকবর্তিকা। তিনি হানাফি ফিকহের একনিষ্ঠ অনুসারী হলেও কট্টরপন্থী ছিলেন না, বরং ইমাম ইবনে তাইমিয়া ও ইমাম আজ-জাহাবির মতো মনীষীদের সাথে কোনো কোনো বিষয়ে মতপার্থক্য থাকলেও জ্ঞান জগতের সকলের প্রতিই তাঁর সম্মান ছিল অটুট। তাঁর বিনয়, সুন্নাহর প্রতি অগাধ ভালোবাসা এবং মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের প্রচেষ্টা তাঁকে যুগ যুগ ধরে অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে বাঁচিয়ে রাখবে।
তার লিখিত কিছু বই :
০১. ফিতনার যুগে মুক্তির পথ
লেখক : শায়খ আবদুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ
০২. আকাবিরদের জ্ঞান সাধনার স্বরূপ
লেখক : শায়খ আবদুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ
০৩.
লেখক : শায়খ আবদুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ


