ড. ইয়াসির ক্বাদি

ড. ইয়াসির ক্বাদি সমকালীন বিশ্বের, বিশেষ করে পশ্চিমা মুসলিম সমাজের সবচেয়ে প্রভাবশালী ও প্রাজ্ঞ ইসলামিক স্কলার, ধর্ম তাত্ত্বিক এবং বুদ্ধিজীবীদের অন্যতম। একাধারে ঐতিহ্যবাহী ইসলামিক জ্ঞান এবং আধুনিক পশ্চিমা উচ্চশিক্ষার মেলবন্ধনে তিনি এমন এক অনন্য ধারার প্রতিনিধিত্ব করেন, যা বর্তমান যুগের জটিল সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রেক্ষাপটে ইসলামকে বুঝতে ও বোঝাতে দারুণ ভূমিকা রাখছে। তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের দ্য ইসলামিক সেমিনারি অব আমেরিকা-এর ডিন এবং ফিকহ কাউন্সিল অব নর্থ আমেরিকা-এর চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। আন্তর্জাতিকভাবে সমাদৃত বার্ষিক তালিকা ‘দ্য ৫০০ মোস্ট ইনফ্লুয়েনশিয়াল মুসলিমস’ (বিশ্বের ৫০০ প্রভাবশালী মুসলিম)-এ নিয়মিতভাবে তাঁর নাম অন্তর্ভুক্ত হয়ে আসছে। তাঁর জীবন, চিন্তা এবং ঐতিহ্যবাহী সালাফি মতাদর্শ থেকে আধুনিক মধ্যপন্থী বা ‘ওয়াসাতি’ চিন্তাধারায় রূপান্তর সমকালীন ইসলামিক স্কলারশিপের এক অত্যন্ত আকর্ষণীয় অধ্যায়।

২. প্রারম্ভিক জীবন ও পারিবারিক পটভূমি

ইয়াসির ক্বাদি ১৯৭৫ সালের ৩০ জানুয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের হিউস্টনে এক সম্ভ্রান্ত পাকিস্তানি অভিবাসী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ড. মাজহার কাজী (মৃত্যু: নভেম্বর ২০২৩) ছিলেন পেশায় একজন चिकित्सक এবং একই সাথে একজন নিবেদিতপ্রাণ দাঈ বা ধর্মপ্রচারক। হিউস্টন এলাকায় প্রথম মসজিদ ও ইসলামিক সেন্টার প্রতিষ্ঠার পেছনে তাঁর পিতার গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল। তাঁর মা ছিলেন একজন মাইক্রোবায়োলজিস্ট (অণুজীববিজ্ঞানী)। ড. ক্বাদির পূর্বপুরুষগণ মূলত ভারতের উত্তর প্রদেশের অধিবাসী ছিলেন, যা পরবর্তীতে ভারত বিভাগের সময় পাকিস্তানের করাচিতে স্থানান্তরিত হয়।

ইয়াসির ক্বাদির বয়স যখন মাত্র পাঁচ বছর, তখন তাঁর পিতা সৌদি আরবের একটি মেডিকেল কলেজের অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিন হিসেবে নিযুক্ত হন। ফলে তাঁদের পুরো পরিবার সৌদি আরবের জেদ্দায় স্থানান্তরিত হয়। জেদ্দায় তিনি একটি নামকরা ব্রিটিশ আন্তর্জাতিক স্কুলে পড়াশোনা করেন। পশ্চিমা ও আধুনিক প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি পারিবারিক পরিমণ্ডলে তাঁর ধর্মীয় শিক্ষার ভিত্তি গড়ে ওঠে। তাঁদের পরিবারে নিয়মিত কুরআনের হালাকা বা ঘরোয়া পাঠচক্র হতো এবং একজন ব্যক্তিগত হাফিজের তত্ত্বাবধানে তিনি কুরআন হিফজ করা শুরু করেন। অসাধারণ মেধার অধিকারী ইয়াসির ক্বাদি মাত্র ১৫ বছর বয়সে পবিত্র কুরআন সম্পূর্ণ হিফজ সম্পন্ন করেন এবং উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় তাঁর স্কুল থেকে প্রথম স্থান (ভ্যালিডিক্টোরিয়ান) অর্জন করে সাধারণ সময়ের দুই বছর আগেই গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করেন। কৈশোরেই তিনি তাঁর পিতার বিভিন্ন ইসলামিক প্রকাশনা ও গবেষণামূলক কাজে সক্রিয়ভাবে সহায়তা করতেন।

৩. শিক্ষাজীবন: অনন্য এক সমন্বয়

ড. ইয়াসির ক্বাদির শিক্ষাজীবন বিজ্ঞান ও ধর্মتত্ত্বের এক অভূতপূর্ব সমন্বয়। উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করার পর তিনি প্রকৌশল বিদ্যায় পড়ার সিদ্ধান্ত নেন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে আসেন।

  • রাসায়নিক প্রকৌশলে উচ্চশিক্ষা: যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে এসে তিনি হিউস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ে (University of Houston) রাসায়নিক প্রকৌশল (Chemical Engineering) বিভাগে ভর্তি হন। সেখান থেকে তিনি অত্যন্ত কৃতিত্বের সাথে ব্যাচেলর অব সায়েন্স (B.Sc.) ডিগ্রি লাভ করেন। স্নাতক শেষ করার পর তিনি বিখ্যাত রাসায়নিক কোম্পানি ‘ডাও কেমিক্যাল’-এ প্রকৌশলী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। তবে প্রকৌশল পেশায় খুব বেশি দিন তিনি থিতু হননি; তাঁর ভেতরের গভীর ধর্মীয় জ্ঞানপিপাসা তাঁকে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক পথের দিকে পরিচালিত করে।
  • মদিনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘ নয় বছর: ১৯৯৬ সালে ইয়াসির ক্বাদি তাঁর প্রকৌশল পেশা ত্যাগ করে সম্পূর্ণ ধর্মীয় শিক্ষার উদ্দেশ্যে সৌদি আরবের পবিত্র মদিনা নগরীতে পাড়ি জমান। তিনি ঐতিহ্যবাহী মদিনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে (Islamic University of Madinah) ভর্তি হন। এখানে তিনি দীর্ঘ নয় বছর অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে পড়াশোনা করেন। প্রথমত, তিনি কলেজ অব হাদিস অ্যান্ড ইসলামিক সায়েন্সেস থেকে ‘হাদিস’ বিষয়ের ওপর ব্যাচেলর অব আর্টস (B.A.) ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর তিনি কলেজ অব দাওয়াহ থেকে ‘ইসলামিক থিওলজি’ বা ধর্মতত্ত্বের ওপর মাস্টার্স অব আর্টস (M.A.) ডিগ্রি লাভ করেন। মদিনায় অবস্থানকালে তিনি সৌদি আরবের প্রখ্যাত আলেমদের সান্নিধ্য লাভ করেন এবং অত্যন্ত গভীর ও পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে শাস্ত্রীয় ও ঐতিহ্যবাহী ইসলামিক ফিকহ, হাদিস ও আকিদা অধ্যয়ন করেন।
  • ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি: মদিনা থেকে সনাতন ইসলামিক বিদ্যায় পারদর্শিতা অর্জন করার পর ড. ক্বাদি আধুনিক পশ্চিমা অ্যাকাডেমিক পদ্ধতিতে ইসলামকে বিশ্লেষণ করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। এই উদ্দেশ্যে তিনি আমেরিকার বিখ্যাত আইভি লিগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ে (Yale University) ভর্তি হন। ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি ধর্মতত্ত্ব (Religious Studies) বিভাগে তাঁর দ্বিতীয় মাস্টার্স (M.A. এবং M.Phil.) সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে ২০১৩ সালে তিনি এই মর্যাদাপূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি (PhD) ডিগ্রি লাভ করেন। তাঁর ডক্টরাল থিসিসের মূল বিষয় ছিল ইসলামের ইতিহাসের মহান ইমাম ও চিন্তাবিদ ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহর (Ibn Taymiyyah) রাজনৈতিক ও ধর্মীয় চিন্তার বিশ্লেষণ। তাঁর এই পিএইচডি থিসিসটি পশ্চিমা অ্যাকাডেমিক মহলে বিপুল প্রশংসিত হয়।

৪. পেশাগত কর্মজীবন ও সাংগঠনিক অবদান

পিএইচডি সম্পন্ন করার পর ড. ইয়াসির ক্বাদি শিক্ষাদান এবং ইসলামিক দাওয়াহ কর্মতৎপরতায় নিজেকে পূর্ণাঙ্গভাবে নিয়োজিত করেন। তিনি রোডস কলেজের (Rhodes College) রিলিজিয়াস স্টাডিজ বিভাগে অধ্যাপক হিসেবে শিক্ষকতা করেন।

পশ্চিমা মুসলিম তরুণদের মাঝে ইংরেজি ভাষায় পদ্ধতিগত ইসলামিক জ্ঞান ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে ২০০১ সালে ‘আল-মাগরিব ইনস্টিটিউট’ (AlMaghrib Institute) প্রতিষ্ঠিত হলে, ড. ক্বাদি এর সাথে যুক্ত হন এবং দীর্ঘ ১৫ বছর এর একাডেমিক ডিন ও প্রধান ইনস্ট্রাক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। আল-মাগরিবের মাধ্যমে তিনি হাজার হাজার পশ্চিমা মুসলিম তরুণ-তরুণীকে ইসলামের বুনিয়াদি ও উচ্চতর জ্ঞান দান করেন।

২০১৯ সালে তিনি টেক্সাসের ডালাস মেট্রোপলিটন এলাকায় স্থানান্তরিত হন এবং ‘ইস্ট প্ল্যানো ইসলামিক সেন্টার’ (EPIC)-এর রেসিডেন্ট স্কলার হিসেবে যোগ দেন। বর্তমানে তিনি উত্তর আমেরিকার অন্যতম শীর্ষস্থানীয় উচ্চতর ইসলামিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ‘দ্য ইসলামিক সেমিনারি অব আমেরিকা’ (The Islamic Seminary of America)-এর একাডেমিক ডিন হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, যা পশ্চিমা প্রেক্ষাপটে ইসলামিক নেতা ও ইমাম তৈরির কাজ করে যাচ্ছে। এছাড়াও তিনি উত্তর আমেরিকার মুসলমানদের শরিয়াহ ও ফিকহ সংক্রান্ত সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম ‘ফিকহ কাউন্সিল অব নর্থ আমেরিকা’ (Fiqh Council of North America)-এর চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন।

৫. আদর্শিক ও বৈচারিক বিবর্তন: সালাফিবাদ থেকে ‘ওয়াসাতিয়াহ’

ড. ইয়াসির ক্বাদির জীবনের অন্যতম আলোচিত দিক হলো তাঁর চিন্তাধারার বিবর্তন। মদিনা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার কারণে স্বভাবতই তাঁর প্রাথমিক জ্ঞানতাত্ত্বিক ভিত্তি গড়ে উঠেছিল কঠোর সালাফি (Salafi) ধারার ওপর। আশির ও নব্বইয়ের দশকে তিনি সালাফি আন্দোলনের অন্যতম প্রধান ইংরেজিভাষী প্রবক্তা ছিলেন। তবে ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন এবং সমকালীন বিশ্ব রাজনীতির জটিলতা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণের পর তাঁর চিন্তাভাবনায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসে।

ড. ক্বাদি লক্ষ্য করেন যে, ঐতিহ্যবাহী সালাফি ধারার অনমনীয়তা, সংকীর্ণতা এবং অন্য দলগুলোকে পুরোপুরি বর্জন করার প্রবণতা বর্তমান যুগের মুসলমানদের বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জগুলোর সমাধান দিতে পারছে না। ফলে ২০১০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে সালাফি আন্দোলন থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নেন। তিনি নিজেকে মূলধারার সুন্নি ইসলামের অন্তর্গত ‘ওয়াসাতিয়াহ’ (Wasatist) বা মধ্যপন্থী ধারার অনুসারী হিসেবে ঘোষণা করেন। তিনি মনে করেন, কুরআন ও সুন্নাহর মৌলিক টেক্সটের প্রতি অবিচল আনুগত্য বজায় রেখেও সমসাময়িক সামাজিক, রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বাস্তবতার সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়া সম্ভব। তাঁর এই রূপান্তর পশ্চিমা বিশ্বের বহু মুসলিম তরুণকে চরমপন্থা এড়িয়ে ইসলামের ভারসাম্যপূর্ণ ও উদার রূপ ধারণ করতে অনুপ্রাণিত করেছে। আকীদার ক্ষেত্রে তিনি সুন্নিদের প্রাচীন ‘আতারি’ (Athari) ধারা এবং ফিকহের ক্ষেত্রে ‘হাম্বলি’ (Hanbali) মাযহাবের বৈজ্ঞানিক ও উদার ব্যাখ্যাকে প্রাধান্য দেন।

৬. গুরুত্বপূর্ণ বুদ্ধিবৃত্তিক মতামত ও গবেষণা

  • জিহাদ ও ইবনে তাইমিয়্যাহর ফতোয়ার পুনঃব্যাখ্যা: ড. ক্বাদি চরমপন্থী সংগঠনগুলোর দ্বারা জিহাদের ভুল ব্যাখ্যার তীব্র সমালোচনা করেছেন। ২০০৯ সালে এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে তিনি একটি গবেষণাপত্র পাঠ করেন, যেখানে তিনি দেখান যে, ত্রয়োদশ-চতুর্দশ শতাব্দীর মহান আলেম ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ মঙ্গোল আক্রমণের সময় যে বিখ্যাত ‘মার্দিন ফতোয়া’ দিয়েছিলেন, তা আধুনিক যুগের উগ্রপন্থী এবং চরম শান্তিবাদী উভয় দলই নিজেদের স্বার্থে ভুলভাবে ব্যবহার করছে। তিনি প্রমাণ করেন যে, ইসলামের ক্লাসিক্যাল জিহাদ তত্ত্বকে আধুনিক জাতিরাষ্ট্রের যুগে হুবহু প্রয়োগ করা যায় না।
  • সুফিবাদ ও মাজার জিয়ারত সংক্রান্ত উদার দৃষ্টিভঙ্গি: কট্টর সালাফি আলেমগণ সুফিদের মাজার জিয়ারত এবং আউলিয়াদের উসিলা ধরাকে সরাসরি ‘শিরক’ (আল্লাহর সাথে অংশীদারিত্ব) এবং ইসলাম থেকে বহিষ্কারের কারণ হিসেবে গণ্য করেন। কিন্তু ড. ক্বাদি এই বিষয়ে ভিন্ন ও নরম অবস্থান গ্রহণ করেছেন। তিনি মনে করেন, সাধারণ সুফি মুসলমানরা যখন মাজার জিয়ারত করে বা সাহায্য চায়, তারা মাজারের মৃত ব্যক্তিকে ঈশ্বর মনে করে না কিংবা স্বাধীন ক্ষমতার অধিকারী ভাবে না। তাই তাদের এই কাজকে ‘হারাম’, ‘বিদআত’ বা শিরকের পথ বলা গেলেও একে সরাসরি ‘বড় শিরক’ বলা এবং তাদেরকে ইসলামের গণ্ডি থেকে বের করে দেওয়া চরম অন্যায়। তাঁর এই মতামত মুসলিম উম্মাহর ভেতরের শিয়া-সুন্নি-সালাফি বিভেদ কমানোর ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রেখেছে।
  • আহরুফ ও কিরাআত বিতর্ক: ২০২০ সালের জুন মাসে এক সাক্ষাৎকারে ড. ক্বাদি কুরআনের বিভিন্ন ‘কিরাআত’ (পঠনশৈলী) ও ‘আহরুফ’ (আঞ্চলিক উপভাষা) সংক্রান্ত ঐতিহ্যবাহী ধারণার কিছু জটিলতা নিয়ে কথা বলেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, কুরআনের নিখুঁত সংরক্ষণের বিষয়ে মুসলিম সমাজে যে সাধারণ ও সরলীকৃত বয়ান (Standard Narrative) প্রচলিত রয়েছে, তার মধ্যে কিছু অ্যাকাডেমিক প্রশ্ন ও অস্পষ্টতা (Holes) রয়েছে। এই বক্তব্যটি নিয়ে তখন বিশ্বজুড়ে তোলপা়ড় সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে ২০২৪ সালে প্রকাশিত একটি গ্রন্থে তিনি তাঁর অবস্থান পরিষ্কার করেন। তিনি ঐতিহ্যবাহী ‘ডিকটেশন মডেল’-এর পরিবর্তে ইমাম শাফেয়ী ও ইমাম তহাবীর চিন্তার আলোকে একটি বিকল্প ‘ডিভাইন পারমিশন মডেল’ (Divine Permission Model) প্রস্তাব করেন, যা কুরআনের কিরাআতের বৈচিত্র্যকে সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করে।

৭. বিতর্ক, জীবনশঙ্কা ও সাহসিকতা

একজন স্পষ্টভাষী স্কলার হিসেবে ড. ইয়াসির ক্বাদিকে বহুবার বিতর্ক ও বিপদের মুখোমুখি হতে হয়েছে। উগ্রপন্থী জঙ্গি সংগঠন ‘আইসিস’ (ISIS)-এর চরমপন্থী ও সহিংস মতাদর্শের বিরুদ্ধে শুরু থেকেই ড. ক্বাদি কঠোর অবস্থান নেন। এর ফলশ্রুতিতে ২০১৬ সালের এপ্রিল মাসে আইসিসের অফিসিয়াল প্রোপাগান্ডা ম্যাগাজিন ‘দাবিক’ (Dabiq)-এ ড. ইয়াসির ক্বাদিকে ‘মুরতাদ’ (ধর্মত্যাগী) ঘোষণা করা হয় এবং তাঁকে হত্যার সরাসরি হুমকি দেওয়া হয়। এই জীবনশঙ্কার মাঝেও তিনি ইসলামের শান্তির বাণী প্রচার থেকে দমে যাননি।

এছাড়াও তাঁর ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে (২০০১ সালের দিকে) হলোকস্ট (Holocaust) এবং ইহুদিদের নিয়ে কিছু অসতর্ক মন্তব্য করার কারণে তিনি বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন। পরবর্তীতে তিনি তাঁর ভুল স্বীকার করেন এবং দুঃখ প্রকাশ করে বলেন যে, যুবসুলভ ক্ষোভ ও ভুল তথ্যের কারণে তিনি ওই মন্তব্য করেছিলেন। ২০১০ সালে তিনি মার্কিন ইমামদের একটি প্রতিনিধি দলের সাথে পোল্যান্ডের আউশভিৎজ (Auschwitz) কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প পরিদর্শন করেন এবং ইহুদি নিধনের সেই ভয়াবহ অপরাধকে মানবতার বিরুদ্ধে অন্যতম নিকৃষ্ট অপরাধ হিসেবে নিন্দা জানান।

৮. উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্ম ও গ্রন্থতালিকা

ড. ইয়াসির ক্বাদি ইংরেজি ভাষায় বহু গুরুত্বপূর্ণ বই, গবেষণাপত্র এবং অনুবাদের কাজ করেছেন যা বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। নিচে তাঁর কয়েকটি উল্লেখযোগ্য বইয়ের তালিকা দেওয়া হলো:

  1. An Introduction to the Sciences of the Qura’an (১৯৯৯): উলুমুল কুরআন বা কুরআন বিজ্ঞানের ওপর ইংরেজি ভাষায় রচিত অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও বিস্তারিত আকর গ্রন্থ।
  2. Du’a: The Weapon of the Believer (২০০১): দোয়ার গুরুত্ব, ফজিলত এবং দোয়া কবুলের শর্তাবলী নিয়ে রচিত একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় বই।
  3. Riyaa: Hidden Shirk (১৯৯৬): অন্তরের লোকদেখানো ইবাদত বা ‘রিয়া’ এর ভয়াবহতা নিয়ে লেখা ড. ক্বাদির অন্যতম প্রাথমিক কাজ।
  4. 15 Ways to Increase Your Earnings (২০০২): কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে হালাল জীবিকা ও বরকত বৃদ্ধির উপায়সমূহ।
  5. An Explanation of Kashf al-Shubuhat (২০০৩): মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল ওয়াহাবের আকীদা বিষয়ক গ্রন্থের বিস্তারিত ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ।

বই লেখার পাশাপাশি ড. ক্বাদির ‘সيرة’ (পবিত্র নবীর জীবনী) ভিডিও সিরিজ ইউটিউবে অত্যন্ত জনপ্রিয়, যা কোটি কোটি মানুষ ইসলামের সঠিক ইতিহাস জানার জন্য নিয়মিত দেখে থাকেন।

৯. উপসংহার

ড. ইয়াসির ক্বাদির জীবন ও কর্ম আধুনিক বিশ্বের মুসলমানদের জন্য এক আলোকবর্তিকা। তিনি অন্ধ অনুকরণ কিংবা অন্ধ আধুনিকতা—উভয় চরমপন্থাকে বর্জন করে ইসলামের ঐতিহ্যবাহী জ্ঞানভাণ্ডারকে সমকালীন যুগের যুক্তি ও দর্শনের আলোকে উপস্থাপন করেছেন। সালাফিজম থেকে মধ্যপন্থায় তাঁর রূপান্তর প্রমাণ করে যে, একজন প্রকৃত জ্ঞানপিপাসু সবসময় সত্য ও উপযোগিতার সন্ধান করেন। জীবনের বহু উত্থান-পতন, বিতর্ক এবং আইসিসের মতো উগ্রপন্থীদের মৃত্যুদণ্ডের হুমকি উপেক্ষা করে তিনি যেভাবে উত্তর আমেরিকায় প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়ে ইসলাম প্রচার করছেন, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। বর্তমান মুসলিম উম্মাহর বুদ্ধিবৃত্তিক সংকট দূরীকরণে এবং অমুসলিমদের কাছে ইসলামের প্রকৃত রূপ তুলে ধরতে ড. ইয়াসির ক্বাদির অবদান ইতিহাসের পাতায় চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

তার লিখিত কিছু বইয়ের লিংক :

০১.

লেখক :  ড. ইয়াসির ক্বাদি



০২. জ্ঞান ও পবিত্রতায় ভাস্বর এক মহীয়সী আয়িশা রা.

লেখক :  ড. ইয়াসির ক্বাদি



০৩. দাম্পত্য রসায়ন

লেখক :  ড. ইয়াসির ক্বাদি



"বাংলা ইসলামিক বইয়ের বিশাল পিডিএফ (PDF) আর্কাইভ"