রেহনুমা বিনত আনিস

রেহনুমা বিনতে আনিস: জীবন, সাহিত্যকর্ম ও চিন্তাধারা

বাংলা সমসাময়িক মননশীল, মোটিভেশনাল এবং পারিবারিক জীবনকেন্দ্রিক সাহিত্য অঙ্গনে ‘রেহনুমা বিনতে আনিস’ একটি অত্যন্ত সুপরিচিত ও সমাদৃত নাম। তিনি একাধারে লেখিকা, শিক্ষাবিদ ও সমাজচিন্তক। আধুনিক মুসলিম সমাজে পারিবারিক বন্ধন, নৈতিক অবক্ষয়, দাম্পত্য জীবন এবং তরুণ প্রজন্মের মনস্তাত্ত্বিক জটিলতাগুলো দূর করতে তাঁর লেখনি এক অনন্য ভূমিকা পালন করে আসছে। অত্যন্ত সাবলীল, প্রাঞ্জল ও বাস্তবসম্মত উপায়ে জীবনকে ব্যাখ্যা করার দক্ষতার কারণে বিশেষ করে তরুণ ও মধ্যবয়সী পাঠকদের মাঝে তিনি জনপ্রিয়তার শীর্ষস্থানে রয়েছেন।

জন্ম ও পারিবারিক পটভূমি

রেহনুমা বিনতে আনিসের জন্ম বাংলাদেশের বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামে। তাঁর জন্ম এমন এক পরিবারে যা ছিল আদর্শিক, উদারপন্থী এবং জ্ঞানানুসন্ধানী। শৈশবের দিনগুলো এক নিরাপদ, পরিশীলিত এবং রেশমের গুটির মতো সুরক্ষিত পরিবেশে কেটেছে। জ্ঞানচর্চার প্রতি গভীর অনুরাগ তিনি পারিবারিক আবহ থেকেই লাভ করেছিলেন। পারিবারিকভাবে সাহিত্য ও মূল্যবোধের একটি চমৎকার সমন্বয় তাঁর বেড়ে ওঠার ভিত্তি তৈরি করে দিয়েছিল, যা পরবর্তীতে তাঁর ব্যক্তিগত জীবন ও সাহিত্যকর্মে গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।

যাযাবর জীবন ও ভৌগোলিক বিস্তৃতি

রেহনুমা বিনতে আনিসের জীবন এক বিশাল ভৌগোলিক বৈচিত্র্যের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হয়েছে। চট্টগ্রামের আলো-বাতাসে জন্ম নিলেও তাঁর শৈশব কেটেছে রাজধানী ঢাকায়। এরপর কৈশোরের এক গুরুত্বপূর্ণ সময় তিনি অতিবাহিত করেন সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবিতে। কৈশোরের এই প্রবাস জীবন তাঁর চিন্তার জগতে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করে। এরপর পরিণত বয়সে তিনি ভারতে গমন করেন এবং উচ্চশিক্ষা ও জীবনের নানা অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ হন।

বিয়ের পর তিনি পুনরায় নিজ জন্মস্থান চট্টগ্রামে ফিরে আসেন। তবে ভৌগোলিক পরিবর্তনের চাকা এখানেই থেমে থাকেনি। জীবনের তাগিদে দীর্ঘ সময় তিনি কানাডায় প্রবাস জীবন কাটান। এক দেশের সংস্কৃতি থেকে অন্য দেশের সংস্কৃতিতে এই যে নিরন্তর রূপান্তর, তা তাঁর অভিজ্ঞতার ঝুলি অত্যন্ত সমৃদ্ধ করেছে। দীর্ঘ কানাডা প্রবাস শেষে বর্তমানে তিনি মালয়েশিয়াতে বসবাস করছেন। এই যাযাবর জীবন ও বিভিন্ন দেশের সমাজব্যবস্থাকে খুব কাছ থেকে দেখার কারণে তাঁর লেখায় দেশীয় ও আন্তর্জাতিক জীবনবোধের এক অপূর্ব সংমিশ্রণ লক্ষ্য করা যায়।

শিক্ষাজীবন ও পেশা

তিনি ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যে সম্মান (Honors) ও স্নাতকোত্তর (Masters) ডিগ্রি অর্জন করেন। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শেষ করে তিনি শিক্ষাকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নেন। দীর্ঘ সময় তিনি চট্টগ্রামের অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান ‘ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব চিটাগাং’ (IIUC)-এ শিক্ষকতা করেছেন। এছাড়াও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও ইংরেজি মাধ্যম স্কুলেও শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর। পেশাগতভাবে শিক্ষক হওয়ার কারণে তিনি তরুণ প্রজন্ম, শিক্ষার্থী এবং তাঁদের অভিভাবকদের মনস্তত্ত্ব অত্যন্ত নিখুঁতভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছেন। তাঁর এই শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা এবং শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সরাসরি মিথস্ক্রিয়া তাঁর পরবর্তী সাহিত্যিক জীবনে গভীর প্রভাব ফেলেছে।

লেখার হাতেখড়ি ও সাহিত্যে প্রত্যাবর্তন

রেহনুমা বিনতে আনিসের লেখার হাতেখড়ি হয়েছিল আবুধাবিতে থাকাকালীন সময়ে। তৎকালীন আবুধাবির জনপ্রিয় ম্যাগাজিন ‘ইয়াং টাইমস’ (Young Times)-এ তিনি নিয়মিত কন্ট্রিবিউটর বা লেখিকা হিসেবে লিখতেন। তবে মাঝের বেশ কিছু বছর পড়াশোনা, সংসার, প্রবাস জীবন ও শিক্ষকতার ব্যস্ততার কারণে তিনি নিয়মিত লেখালেখি থেকে কিছুটা দূরে সরে যান।

দীর্ঘ বিরতির পর তাঁর পুনরায় লেখালিখিতে ফিরে আসার পেছনে মূল অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছিল তাঁর ছাত্র-ছাত্রীদের ভালোবাসা ও ক্রমাগত অনুরোধ। শিক্ষকতা করার সময় তাঁর বিভিন্ন উপদেশমূলক ও জীবনমুখী আলাপচারিতা শিক্ষার্থীদের এতটাই মুগ্ধ করত যে, তারা ম্যামকে এই চিন্তাগুলো বই আকারে প্রকাশের জন্য ক্রমাগত চাপ দিতে থাকে। ছাত্র-ছাত্রীদের সেই ভালোবাসার প্রতি সাড়া দিয়েই তিনি আবার কলম ধরেন এবং সমসাময়িক বাংলা ইসলামিক ও মননশীল ধারার সাহিত্যে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করেন।

সাহিত্যিক পরিচয় ও উল্লেখযোগ্য বইসমূহ

মূলত নিজেকে একজন ‘মুখচোরা বইপোকা’ হিসেবে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করা এই লেখিকা সমাজের নানান অসংগতি, নৈতিক অবক্ষয় এবং মানুষের রূপ পরিবর্তনের গল্পগুলো তাঁর লেখনীতে তুলে এনেছেন। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থগুলো পাঠকসমাজে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। তাঁর কয়েকটি উল্লেখযোগ্য বই হলো:

১. বিয়ে: এটি রেহনুমা বিনতে আনিসের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও পাঠকনন্দিত বইগুলোর একটি। ২০১২ সালে প্রকাশিত এই বইটিতে তিনি আধুনিক সমাজব্যবস্থায় বিয়ের প্রকৃত সংজ্ঞা, দাম্পত্য জীবনের বোঝাপড়া, বর-কনে নির্বাচনের সঠিক মানদণ্ড এবং পারিবারিক শান্তির উপায়গুলো অত্যন্ত চমৎকারভাবে তুলে ধরেছেন। এতে কোনো তাত্ত্বিক উপদেশের চেয়ে বাস্তব জীবনের গল্প এবং উদাহরণের মাধ্যমে সুস্থ পারিবারিক কাঠামোর রূপরেখা আঁকা হয়েছে।

২. নট ফর সেল (Not For Sale): ২০১৫ সালে প্রকাশিত এই বইটি বর্তমান বস্তুবাদী সমাজের গালে এক চপেটাঘাত। মানুষের আবেগ, অনুভূতি, সম্পর্ক এবং নৈতিকতা কীভাবে দিন দিন পণ্যে রূপান্তরিত হচ্ছে এবং কীভাবে এই স্রোতের বিপরীতে গিয়ে নিজের আত্মমর্যাদা ও ইমান ধরে রাখা যায়, তা নিয়ে এই বইয়ে আলোচনা করা হয়েছে।

৩. ওপারে: ২০১৫ সালে প্রকাশিত এই বইটিতে জীবনের নশ্বরতা, পরকালীন জবাবদিহিতা এবং আত্মশুদ্ধির নানা দিক নিয়ে আলোকপাত করা হয়েছে।

৪. নানান রঙের মানুষ: ২০১৩ সালে প্রকাশিত এই গ্রন্থে তিনি তাঁর দীর্ঘ যাযাবর জীবনে দেখা বিভিন্ন সমাজ, দেশ এবং বিচিত্র স্বভাবের মানুষের মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ তুলে ধরেছেন।

৫. জীবনের সহজ পাঠ: এটি একটি অত্যন্ত সুন্দর মোটিভেশনাল ও জীবনমুখী বই, যেখানে জীবনের জটিল বিষয়গুলোকে খুব সহজ ও সাবলীল ভাষায় পাঠকদের সামনে উপস্থাপন করা হয়েছে।

৬. প্রত্যাবর্তন (যৌথ): এই বিখ্যাত বইটিতেও সহ-লেখক হিসেবে তাঁর চিন্তাশীল কন্ট্রিবিউশন পাঠকদের বিশেষভাবে মুগ্ধ করেছে।

জীবনদর্শন ও চিন্তাধারা

রেহনুমা বিনতে আনিসের লেখার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো ‘নৈতিকতা ও মূল্যবোধের পুনরুদ্ধার’। তিনি বিশ্বাস করেন, একটি শিশুর সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার জন্য যেমন অন্ন, বস্ত্র ও শিক্ষার প্রয়োজন, ঠিক তেমনি তার চেয়েও বেশি প্রয়োজন নৈতিক শিক্ষার।

তাঁর একটি বিখ্যাত ব্লগপোস্ট এবং চিন্তাধারায় তিনি উল্লেখ করেছেন যে, আধুনিক সমাজ আজ প্রথমত জাগতিক শিক্ষাকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে নৈতিক শিক্ষাকে অবহেলা করছে। তিনি মনে করেন, ছোটবেলায় যদি কোনো শিশুকে অন্যায় এবং ন্যায়ের মধ্যকার পার্থক্য না শেখানো হয়, তবে বড় হয়ে সে কেবল নিজের স্বার্থের জন্য যেকোনো অনৈতিক কাজকে ‘নিজের অধিকার’ বলে চালিয়ে দেবে। যেমন—পরীক্ষায় নকল করা, চাকরিতে ঘুষ নেওয়া কিংবা বিয়েতে যৌতুক নেওয়াকে মানুষ তখন অনৈতিক মনে না করে নিজের সামাজিক অধিকার মনে করতে শুরু করে। এই নৈতিক দৈন্যদশা থেকে সমাজকে মুক্ত করার জন্য তিনি পারিবারিক অনুশাসন ও মুরুব্বীদের দায়িত্বশীল ভূমিকার ওপর জোর দিয়েছেন।

তিনি তাঁর ব্লগ “A Few Thoughts to Share” (afewthoughtstoshare.blogspot.com) এর মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে তাঁর পাঠকদের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত ডায়েরির পাতা, জীবনের উপলব্ধি এবং নৈতিক চিন্তাভাবনাগুলো ভাগ করে আসছেন।

উপসংহার

রেহনুমা বিনতে আনিস কেবল একজন জনপ্রিয় লেখিকাই নন, বরং তিনি আধুনিক মুসলিম সমাজের একজন নীরব সংস্কারক। যেখানে বর্তমান সাহিত্যজগৎ বহুলাংশে সস্তা বিনোদন কিংবা অবাস্তব কল্পকাহিনীর দিকে ঝুঁকছে, সেখানে রেহনুমা বিনতে আনিস মাটির কাছাকাছি থাকা বাস্তব জীবনের গল্প, পারিবারিক মূল্যবোধ এবং ইমানি চেতনার কথা বলেন। তাঁর বৈচিত্র্যময় জীবন-অভিজ্ঞতা, প্রবাস জীবনের গভীর পর্যবেক্ষণ এবং শিক্ষকতার প্রজ্ঞা—সবকিছুর মিশেলে তাঁর সাহিত্যিক অবদান বাংলা মননশীল সাহিত্যের পরিমণ্ডলকে সমৃদ্ধ করেছে এবং আগামী প্রজন্মের জন্য এক আলোর দিশারী হিসেবে কাজ করছে।

তার লিখিত কিছু বইয়ের লিংক :

০১. নট ফর সেল

লেখক :  রেহনুমা বিনতে আনিস



০২. বিয়ে

লেখক :  রেহনুমা বিনতে আনিস



"বাংলা ইসলামিক বইয়ের বিশাল পিডিএফ (PDF) আর্কাইভ"