মির্জা ইয়াওয়ার বেগ (Mirza Yawar Baig) একাধারে একজন আন্তর্জাতিক মোটিভেশনাল স্পিকার, করপোরেট ট্রেইনার, লিডারশিপ কনসালট্যান্ট এবং লেখক। তিনি নিজেকে কোনো বড় আলেম দাবি করেন না, বরং নিজেকে একজন সাধারণ মানুষ মনে করেন যিনি বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা দিয়ে ইসলামের সৌন্দর্য এবং নেতৃত্বের মূলনীতি মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দিচ্ছেন।
আপনার দেওয়া তথ্যসূত্র ও তাঁর ব্যক্তিগত স্মৃতিকথার আলোকে মির্জা ইয়াওয়ার বেগের জীবনকাহিনী নিচে তুলে ধরা হলো:
১. জন্ম ও শৈশব
মির্জা ইয়াওয়ার বেগের শৈশব কেটেছে ভারতের হায়দরাবাদে, বিংশ শতকের পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে। মাত্র ছয় বছর বয়স থেকে তিনি হায়দরাবাদের বিখ্যাত ‘হায়দরাবাদ পাবলিক স্কুল’-এ একজন আবাসিক (বোর্ডিং) ছাত্র হিসেবে পড়াশোনা শুরু করেন। শৈশব থেকেই তিনি অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় ছিলেন এবং অরণ্য ও প্রকৃতির প্রতি তাঁর গভীর ভালোবাসা গড়ে ওঠে। এই সময়ে তিনি মোহিনি রাজন ও তাঁর ভাই ভেঙ্কট রাম রেড্ডিকে মেন্টর (পরামর্শদাতা) হিসেবে পান, যাঁদের কাছ থেকে তিনি মার্জিত আচরণ, সততা, নৈতিকতা এবং বন্য পরিবেশের পাঠ শেখেন।
২. তারুণ্যের রোমাঞ্চকর জীবন ও কর্মক্ষেত্র
ইয়াওয়ার বেগের তরুণ বয়সটি ছিল ভীষণ বৈচিত্র্যময় ও রোমাঞ্চে ভরপুর।
- গায়ানা সফর (১৯৭৭): মাত্র ১৯ বছর বয়সে ১৯৭৭ সালে তিনি ওসমানিয়া ইউনিভার্সিটিতে পড়ার পর গায়ানায় পাড়ি জমান। বিমানবন্দরে তাঁর সমস্ত লাগেজ হারিয়ে গেলেও তিনি দমে যাননি, বরং কোনো সাহায্য ছাড়াই নতুনভাবে জীবন গড়ার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেন।
- অ্যামাজনের রেইনফরেস্ট ও বন্যজীবন: তিনি দক্ষিণ ভারতের বনাঞ্চল থেকে শুরু করে অ্যামাজনের রেইনফরেস্টেও দীর্ঘ সময় কাটিয়েছেন। অ্যানাকোন্ডা, জাগুয়ার, হাতি, চিতাবাঘ, কিং কোবরাসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণীর মাঝে টিকে থাকার বাস্তব অভিজ্ঞতা তাঁর রয়েছে। তিনি ট্র্যাকিং করা, বুনো শুয়োর শিকার, ঘোড়া ও কুকুর বশ করা এবং ৫টি ভাষায় কথা বলা শেখেন। এমনকি বনাঞ্চলে চলাচলের জন্য ভারী বুলডোজার, ক্যাটারপিলার জঞ্জাল সরানোর ট্রাক এবং ল্যান্ড রোভার গাড়ি চালানোতেও তিনি পারদর্শী ছিলেন।
- চা-বাগান ও খনিতে কাজ: কমিউনিস্ট ইউনিয়নের সাথে যুক্ত থেকে তিনি পাঁচ বছর আকরিক খনিতে এবং পরবর্তী দশ বছর চা ও রাবারের বাগানে কাজ করেন। এই বৈরি ও বাস্তব পরিবেশ থেকেই তিনি নেতৃত্বের (Leadership) মূল সূত্রগুলো আয়ত্ত করেন।
৩. ইসলামকে বেছে নেওয়া ও দ্বীনি জ্ঞান অর্জন
ইয়াওয়ার বেগ জন্মসূত্রে মুসলিম হলেও যৌবনে বহু বছরের পড়াশোনা, বিচার-বিশ্লেষণ ও নানা প্রশ্নের উত্তর খোঁজার মাধ্যমে সচেতনভাবে ইসলামকে নিজের জীবনব্যবস্থা হিসেবে বেছে নেন।
- অনুপ্রেরণা: সাইয়্যেদ কুতুবের লেখা আল-কোরআনের শেষ পারার অনুবাদ ও তাফসির এবং মার্টিন লিংস রচিত রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনী গ্রন্থটি তাঁর ইসলামকে জানার প্রধান দুয়ার খুলে দেয়।
- শিক্ষাগুরু: পরবর্তীতে তিনি শেখ উইসাম আব্দুল-বাকির অধীনে ইসলাম নিয়ে গভীর পড়াশোনা করেন এবং আমৃত্যু নিজেকে ইসলামের একজন শিক্ষার্থী হিসেবে পথ চলার সিদ্ধান্ত নেন।
৪. করপোরেট লিডারশিপ ও বক্তা হিসেবে আত্মপ্রকাশ
বাস্তব জীবনের কঠিন অভিজ্ঞতা থেকে ইয়াওয়ার বেগ শিখেছিলেন কীভাবে কর্তৃত্ব না খাটিয়ে মানুষকে প্রভাবিত করা যায়, কীভাবে প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হয় এবং চমৎকার দলগত নেতৃত্ব দেওয়া যায়। এই জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে তিনি পরবর্তী সময়ে একজন প্রথম সারির আন্তর্জাতিক করপোরেট ট্রেইনার ও লিডারশিপ কনসালট্যান্ট হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। তিনি বিশ্বের বহু নামী-দামী করপোরেট প্রতিষ্ঠান ও সংস্থাকে নেতৃত্বের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন।
একই সাথে তিনি একজন অসাধারণ বক্তা। মালয়েশিয়ার আন্তর্জাতিক ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো বড় বড় মঞ্চে হাজার হাজার শ্রোতা ও ইসলামি স্কলারদের সামনে তিনি খুতবা ও বক্তব্য দিয়েছেন, যেখানে তিনি বন্যজীবন ও প্রকৃতির রূপকের মাধ্যমে সৃষ্টিকর্তার মহিমা ফুটিয়ে তোলেন।
৫. সাহিত্যিক অবদান ও বাংলায় তাঁর বইসমূহ
মির্জা ইয়াওয়ার বেগ ইংরেজি ভাষায় বেশ কিছু চমৎকার বই লিখেছেন, যার মূল বিষয়বস্তু হলো ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে নেতৃত্ব (Leadership), তারবিয়াহ (পারিবারিক ও আত্মশুদ্ধিমূলক গঠন) এবং করপোরেট লাইফ। বাংলাদেশে তাঁর বেশ কিছু বই অনূদিত হয়ে পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য:
- নেতৃত্বের গুণাবলী (Leadership)
- ইসলামে নেতৃত্ব
- প্যারেন্টিং (সন্তান প্রতিপালন সংক্রান্ত বই)
- ক্যারিয়ার নাকি জীবন ইত্যাদি।
তিনি বিশ্বাস করেন, কেবল ক্লাসরুমে বসে নেতৃত্ব শেখা যায় না, বাস্তব ময়দানে ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে এবং নিজের জীবন ও কর্মকে ঝুঁকির মুখে রেখেই প্রকৃত লিডারশিপের পাঠ নিতে হয়। বর্তমানে তিনি বিশ্বজুড়ে মুসলিম তরুণ ও পেশাজীবীদের নৈতিকতা ও নেতৃত্বের দিকনির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছেন।
তার লিখিত কিছু বইয়ের লিংক :
০১. বিয়ে-স্বপ্ন থেকে অষ্টপ্রহর
লেখক : মির্জা ইয়াওয়ার বেগ
০২. লিডারশীপ লেসন্স
লেখক : মির্জা ইয়াওয়ার বেগ

