সাঈদ ইবন আলি ইবন ওহাফ আল কাহতানী

ইসলামী বিশ্বে প্রাত্যহিক দোয়ার সবচেয়ে জনপ্রিয় ও বহুল পঠিত বই “হিসনুল মুসলিম” (মুসলমানের দুর্গ)-এর রচয়িতা হিসেবে যিনি প্রতিটি মুসলিমের ঘরে ঘরে পরিচিত, তিনি হলেন আল্লামা ড. সাঈদ ইবন আলী ইবন ওয়াহাফ আল-কাহতানী (আরবি: سعيد بن علي بن وهف القحطاني)। তিনি সৌদি আরবের একজন প্রখ্যাত সুন্নী আলিম, গবেষক, ফকীহ এবং বহু কালজয়ী গ্রন্থের লেখক। তার জীবন, কর্ম এবং দ্বীনি অবদান বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো:

১. জন্ম ও বংশ পরিচয়

ড. সাঈদ আল-কাহতানী ১৯৫১ খ্রিস্টাব্দে (১৩৭১ হিজরি) সৌদি আরবের রিয়াদ অঞ্চলের দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত আসির প্রদেশের আল-আরিন নামক গ্রামে কাহতান গোত্রের এক সমাদৃত ও ধর্মপ্রাণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পুরো নাম সাঈদ ইবন আলী ইবন ওয়াহাফ আল-জুহায়রি আল-কাহতানী।

২. শিক্ষা জীবন ও উচ্চতর ডিগ্রি

জ্ঞান অন্বেষণের জন্য তিনি তৎকালীন সৌদি আরবের শীর্ষস্থানীয় উলামাদের সান্নিধ্য লাভ করেন। তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা জীবন ছিল অত্যন্ত সমৃদ্ধ:

  • স্নাতক (Graduation): তিনি রিয়াদের বিখ্যাত ‘ইমাম মুহাম্মদ ইবন সৌদ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়’ থেকে উসুলুদ-দ্বীন (Principles of Religion) অনুষদ থেকে ১৯৮৪ খ্রিস্টাব্দে (১৪০৪ হিজরি) স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন।
  • স্নাতকোত্তর (Master’s): ১৯৯২ খ্রিস্টাব্দে তিনি একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সুন্নাহ ও উলুমুল হাদিস (হাদিস বিজ্ঞান) বিষয়ে মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। তার থিসিসের বিষয় ছিল “রাসূলুল্লাহর (সা.) দাওয়াত পদ্ধতি”।
  • পিএইচডি (Ph.D): ১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দে (১৪২০ হিজরি) তিনি একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অত্যন্ত কৃতিত্বের সাথে ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন। তার ডক্টরেটের গবেষণার মূল বিষয় ছিল ইসলামী আইন ও দাওয়াহ সংক্রান্ত।

তার প্রধান শিক্ষকদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন সৌদি আরবের প্রাক্তন গ্র্যান্ড মুফতি শায়খ আবদুল আজিজ বিন আবদুল্লাহ বিন বাজ (রহ.)। তিনি শায়খ বিন বাজের অধীনে দীর্ঘদিন অত্যন্ত নিবিড়ভাবে ইলম অর্জন করেন এবং তার চিন্তাধারা দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হন।

৩. কর্মজীবন ও দাওয়াতী কার্যক্রম

ড. সাঈদ আল-কাহতানী তার পুরো জীবনকে শিক্ষকতা, গবেষণা এবং দ্বীনের দাওয়াতের জন্য উৎসর্গ করেছিলেন।

  • খতিব ও শিক্ষক: তিনি রিয়াদের জামে ইবন বাজ (ইবন বাজ মসজিদ)-এর ইমাম ও খতিব হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেন।
  • দাওয়াহ সফর: সৌদি আরবের ভেতরে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভিন্ন সেমিনার ও দাওয়াতী কনফারেন্সে তিনি নিয়মিত বক্তব্য রাখতেন। তার নম্র স্বভাব, সুন্নাহর প্রতি অবিচলতা এবং সহজ-সরল উপস্থাপনা শৈলী মানুষকে দারুণভাবে আকর্ষণ করত।

৪. কালজয়ী গ্রন্থ: “হিসনুল মুসলিম”

ড. সাঈদ আল-কাহতানীর জীবনের সবচেয়ে বড় এবং যুগান্তকারী কীর্তি হলো ‘হিসনুল মুসলিম মিন আজকারিল কিতাবি ওয়াস সুন্নাহ’ (حصن المسلم) নামক ছোট পকেট সাইজের বইটি সংকলন করা।

  • ১৯৮৯ খ্রিস্টাব্দে (১৪০৯ হিজরি) বইটি প্রথম প্রকাশিত হয়।
  • পবিত্র কুরআন ও সহীহ হাদিস থেকে সংকলিত এই দোয়ার বইটি এতোটাই মকবুলিয়াত (জনপ্রিয়তা) লাভ করে যে, এটি পৃথিবীর প্রায় ৪০টিরও বেশি প্রধান ভাষায় অনূদিত হয়েছে।
  • মক্কা-মদিনার হাজীদের থেকে শুরু করে বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তের সাধারণ মুসলমানের পকেটে বা মোবাইল অ্যাপে এই বইটি নিত্যদিনের সঙ্গী। রাসূলুল্লাহর (সা.) সুন্নাত মাফিক সকাল-সন্ধ্যার আজকার এবং প্রাত্যহিক দোয়ার জন্য এটিকে পৃথিবীর সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও সহজ সংকলন হিসেবে গণ্য করা হয়।

৫. অন্যান্য উল্লেখযোগ্য রচনাবলী

অনেকে কেবল ‘হিসনুল মুসলিম’-এর লেখক হিসেবে তাকে চিনলেও, তিনি ইসলাম, আকীদা, ফিকহ এবং সীরাতের ওপর ৮০টিরও বেশি মূল্যবান গ্রন্থ রচনা করে গেছেন। তার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বই হলো:

১. নবীজির সালাতের বিবরণ (Sifat Salat al-Nabi) – সুন্নাহর আলোকে সালাত আদায়ের বিশুদ্ধ নিয়ম।

২. ইসলামে দাওয়াতের পদ্ধতি (Al-Dawah ila Allah) – তার মাস্টার্সের গবেষণালব্ধ বই।

৩. আল-খুশু ফিস সালাত (Humility in Prayer) – নামাজে মনোযোগ ও একাগ্রতা অর্জনের উপায়।

৪. আর-রিবা (Usury/Riba) – আধুনিক অর্থনীতি ও সুদের অপকারিতা নিয়ে শরী’আহ ভিত্তিক আলোচনা।

৫. জিকির, দোয়া ও চিকিৎসার মাধ্যম (Al-Zikr wal-Dua wal-Ilaj bil-Ruqa) – কুরআন ও হাদিসের আলোকে ঝাড়ফুঁক (রুকইয়াহ)-এর বিধান।

৬. ইন্তিকাল (মৃত্যু)

মুসলিম উম্মাহর এই মহান মুখলিস গবেষক ও দ্বীনের দায়ী ২০১৮ খ্রিস্টাব্দের ১ অক্টোবর (২১ মহররম ১৪৪০ হিজরি) সোমবার ভোর Proposals রিয়াদে ইন্তিকাল করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৬৭ বছর। তিনি লিভার ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন ছিলেন।

রিয়াদের বিখ্যাত ‘ইমাম তুর্কি বিন আবদুল্লাহ মসজিদে’ তার জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয় এবং রিয়াদের ‘আল-রাজহি কবরস্থানে’ তাকে দাফন করা হয়। তার জানাজায় সৌদি আরবের শীর্ষস্থানীয় উলামা, সরকারি কর্মকর্তা এবং হাজার হাজার সাধারণ মানুষ অংশ নেন।

ড. সাঈদ আল-কাহতানী আজ আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তার সংকলিত “হিসনুল মুসলিম” বইটি পড়ে প্রতিদিন কোটি কোটি মানুষ আল্লাহকে স্মরণ করছে, যা তার জন্য একটি বহমান সদকায়ে জারিয়া (Continuous Charity) হিসেবে কিয়ামত পর্যন্ত জারি থাকবে, ইনশাআল্লাহ।

তার লিখিত কিছু কিতাব হলো :

১. আযান ও ইকামত

লেখক : আলি ইবন ওহাফ আল কাহতানী



২. আল্লাহর দিকে রাসুল (সা.)এর দাওয়াতের বাস্তব কিছু নমুনা

লেখক : আলি ইবন ওহাফ আল কাহতানী



০৩. জান্নাত ও জাহান্নাম

লেখক : আলি ইবন ওহাফ আল কাহতানী



০৪. জামায়াতের সাথে সালাত আদায়ের তাৎপর্য ফযিলত ও আদব সমূহ

লেখক : আলি ইবন ওহাফ আল কাহতানী



০৫. বিপদ-আপদ ও দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তির দুআ

লেখক : আলি ইবন ওহাফ আল কাহতানী



০৬. মসজিদের ফযিলত বিধিবিধান ও আদব

লেখক : আলি ইবন ওহাফ আল কাহতানী



০৭. মহাসাফল্য ও বড় ব্যর্থতা

লেখক : আলি ইবন ওহাফ আল কাহতানী



০৮. রাতের সালাত প্রভুর সান্নিধ্যে

লেখক : আলি ইবন ওহাফ আল কাহতানী



০৯. শব্দে শব্দে হিসনুল মুসলিম

লেখক : আলি ইবন ওহাফ আল কাহতানী



১০. সালাত আদায়ের পদ্ধতি

লেখক : আলি ইবন ওহাফ আল কাহতানী



১১. সুদের ক্ষতি অপকার কুপ্রভাব

লেখক : আলি ইবন ওহাফ আল কাহতানী



১২. সুন্নাতের আলো ও বিদাতের আঁধার

লেখক : আলি ইবন ওহাফ আল কাহতানী



১৩. হিসনুল মুসলিম

লেখক : আলি ইবন ওহাফ আল কাহতানী



১৪. হিসনুল মুসলিম

লেখক : আলি ইবন ওহাফ আল কাহতানী


"বাংলা ইসলামিক বইয়ের বিশাল পিডিএফ (PDF) আর্কাইভ"