আবুল হাসান আলী নদভী

বিংশ শতাব্দীর মুসলিম বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চিন্তাবিদ, দূরদর্শী দাঈ, কালজয়ী লেখক এবং আধ্যাত্মিক সাধক ছিলেন মওলানা সাইয়্যেদ আবুল হাসান আলী হাসানী নদভী (রহ.)। ভারতীয় উপমহাদেশ ছাড়িয়ে আরব বিশ্ব তথা সমগ্র মুসলিম জাহানে তিনি “আলী মিয়াঁ” নামেও অত্যন্ত সমাদৃত ছিলেন।

তার ক্ষুরধার লেখনী এবং ভারসাম্যপূর্ণ ইসলামী চিন্তাধারা আধুনিক যুগের মুসলমানদের আত্মপরিচয় ও আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে অনন্য ভূমিকা পালন করেছে। নিচে এই মহান মনীষীর জীবন ও কর্ম বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো:


১. জন্ম ও বংশ পরিচয়

মওলানা আবুল হাসান আলী নদভী ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দের ৫ ডিসেম্বর (৬ মহররম ১৩৩২ হিজরি) ভারতের উত্তর প্রদেশের রায়বেরেলি জেলার তাকিয়া কালান নামক গ্রামের এক ঐতিহাসিক ও সম্ভ্রান্ত সাইয়্যেদ (রাসূলুল্লাহ সা.-এর বংশধর) পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা হাকিম সাইয়্যেদ আব্দুল হাই ছিলেন একজন বড় আলেম এবং বিখ্যাত ইতিহাসবিদ, যিনি আট খণ্ডের জীবনী-বিশ্বকোষ ‘নুযহাতুল খাওয়াতির’ রচনা করেছিলেন।


২. শিক্ষা জীবন

পারিবারিক পরিবেশেই তার শিক্ষার হাতেখড়ি হয়। মায়ের কাছে পবিত্র কুরআন এবং গৃহশিক্ষকের কাছে আরবী ও ফারসি ভাষা শেখার পর তিনি প্রাতিষ্ঠানিক উচ্চশিক্ষায় পদার্পণ করেন:

  • ভাষা ও সাহিত্য: তিনি অত্যন্ত অল্প বয়সে আরবী ভাষায় অসাধারণ দক্ষতা অর্জন করেন। আরবী সাহিত্যের প্রখ্যাত পণ্ডিত খলিল ইবন মুহাম্মদ আল আনসারী এবং মওলানা তাকীউদ্দীন হেলালী (মরক্কো)-এর কাছে তিনি আরবী ভাষা ও সাহিত্যের উচ্চতর পাঠ নেন।
  • দারুল উলুম নদওয়াতুল উলামা: ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দে তিনি ভারতের লখনৌতে অবস্থিত বিখ্যাত ইসলামী বিদ্যাপীঠ ‘দারুল উলুম নদওয়াতুল উলামা’-তে ভর্তি হন। এখানে তিনি ফিকহ, উসুল এবং অন্যান্য উচ্চতর জ্ঞান অর্জন করেন।
  • দারুল উলুম দেওবন্দ: ১৯৩২ খ্রিস্টাব্দে তিনি দারুল উলুম দেওবন্দে যান এবং সেখানে প্রখ্যাত মুহাদ্দিস মওলানা হুসাইন আহমদ মাদানী (রহ.)-এর অধীনে বুখারী শরীফ ও তিরমিযী শরীফের দরসে অংশ নেন। একই সাথে তিনি লাহোরে গিয়ে মওলানা আহমদ আলী লাহোরীর কাছে কুরআনের তাফসীর পড়েন।

৩. কর্মজীবন ও সাংগঠনিক নেতৃত্ব

মওলানা নদভীর কর্মজীবন ছিল অত্যন্ত বিস্তৃত এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে পরিব্যপ্ত:

  • অধ্যাপনা ও নদওয়ার মহাপরিচালক: ১৯৩৪ খ্রিস্টাব্দে মাত্র ২১ বছর বয়সে তিনি নিজের মাতৃপ্রতিষ্ঠান দারুল উলুম নদওয়াতুল উলামায় আরবী সাহিত্য ও হাদিসের শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। ১৯৬১ খ্রিস্টাব্দে তিনি এই প্রতিষ্ঠানের রেক্টর বা মহাপরিচালক নিযুক্ত হন এবং আমৃত্যু এই দায়িত্বে ছিলেন।
  • আন্তর্জাতিক অঙ্গনে: তিনি মদিনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার অন্যতম পরামর্শক এবং এর দীর্ঘকালীন সিনেট সদস্য ছিলেন। এছাড়াও তিনি রাবেতা আল-আলম আল-ইসলামী (মুসলিম ওয়ার্ল্ড লিগ)-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির ‘সেন্টার ফর ইসলামিক স্টাডিজ’-এর প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন।
  • সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন: ১৯৪০-এর দশকে তিনি মওলানা ইলিয়াস (রহ.)-এর সান্নিধ্যে এসে তাবলীগ জামাতের দাওয়াতী কাজে সক্রিয় হন। পরবর্তীতে তিনি মুসলমানদের আকিদা রক্ষা এবং আধুনিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ‘পয়গামে ইনসানিয়াত’ (মানবতার বার্তা) নামক একটি অসাম্প্রদায়িক আন্দোলন শুরু করেন, যা ভারতের বিভিন্ন ধর্মের মানুষের মাঝে সম্প্রীতি বাড়াতে কাজ করেছিল।

ছাত্রদের সঙ্গে আলী মিয়া নদভীর মতবিনিময়


৪. চিন্তা, দর্শন ও অবদান

মওলানা আবুল হাসান আলী নদভীর চিন্তার মূল ভিত্তি ছিল—“ইসলামের শাশ্বত ও গতিশীল রূপ”

  • তিনি মনে করতেন, মুসলমানরা যদি জ্ঞান-বিজ্ঞান, নেতৃত্ব এবং নৈতিকতা হারিয়ে ফেলে, তবে কেবল মুসলমানরাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে না, বরং গোটা মানবসভ্যতা ধ্বংসের মুখে পতিত হবে।
  • তিনি পশ্চিমা বস্তুবাদ এবং অন্ধ অনুকরণের তীব্র বিরোধী ছিলেন, তবে আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে ইসলামের কল্যাণে ব্যবহারের পক্ষে ছিলেন।
  • আরবরা যেন তাদের মূল দ্বীনি জযবা (উদ্যম) হারিয়ে না ফেলে, সেজন্য তিনি আরব বিশ্বকে বারবার তাদের ঐতিহাসিক দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দিতেন।

৫. কালজয়ী গ্রন্থাবলী

তিনি আরবী ও উর্দু ভাষায় প্রায় দেড় শতাধিক মূল্যবান গ্রন্থ রচনা করেছেন। তার বইগুলোর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো—এগুলোর আরবী ও সাহিত্যিক মান অত্যন্ত উচ্চ স্তরের। তার কয়েকটি বিশ্ববিখ্যাত বই হলো:

১. মুসলমানদের পতনে বিশ্ব কী হারালো? (Maza Khasira al-Alam bi-Inhitat al-Muslimin) – এটি তার জীবনের সবচেয়ে প্রভাববিস্তারকারী বই। এতে তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে মুসলমানদের পতনের পর বিশ্ব নৈতিক ও আধ্যাত্মিক সংকটে পড়েছে। বইটি প্রকাশের পর আরব বিশ্বে আলোড়ন তৈরি হয়েছিল।
২. নবীয়ে রহমত (Nabi-e-Rahmat) – আধুনিক যুগে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সীরাতের ওপর অন্যতম সেরা ও হৃদয়গ্রাহী সংকলন।
৩. তারীখে দাওয়াত ওয়া আজীমত (Saviours of Islamic Spirit) – পাঁচ খণ্ডের এই বিশাল গ্রন্থে তিনি ইসলামের ইতিহাসের মহান সংস্কারক ও ইমামদের (যেমন: ওমর ইবন আব্দুল আজীজ, হাসান বসরী, ইমাম গাজালী, ইবনে তায়মিয়াহ প্রমুখ) জীবনী ও অবদান তুলে ধরেছেন।
৪. পাশ্চাত্যের মুখোমুখি ইসলাম (Islam and the West)
৫. কাফেলায়ে ঈমান ও ইয়াকীন


৬. পুরস্কার ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি

ইসলাম এবং মানবজাতির কল্যাণে অনন্য অবদানের জন্য তিনি বহু আন্তর্জাতিক সম্মাননায় ভূষিত হন:

  • কিং ফয়সাল আন্তর্জাতিক পুরস্কার (১৯৮০): ইসলাম সেবায় অবদানের জন্য তাকে এই মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার দেওয়া হয়। পুরস্কারের সমস্ত অর্থ তিনি আফগান শরণার্থী এবং বিভিন্ন দ্বীনি সংস্থায় দান করে দেন।
  • সুলতান ব্রুনাই আন্তর্জাতিক পুরস্কার (১৯৯৯)
  • দুবাই আন্তর্জাতিক পবিত্র কুরআন পুরস্কার (১৯৯৯): ইসলামিক পারসোনালিটি অব দ্য ইয়ার হিসেবে তিনি এই সম্মাননা লাভ করেন।

৭. ইন্তিকাল (মৃত্যু)

মুসলিম উম্মাহর এই মহান রাহবার ১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দের ৩১ ডিসেম্বর (২২ রমজান ১৪২০ হিজরি) শুক্রবার পবিত্র রমজান মাসে জুমার নামাজের আগে সূরা ইয়াসীন তিলাওয়াত করা অবস্থায় ইন্তিকাল করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৬ বছর। তার শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী তাকে তার জন্মভিটা তাকিয়া কালানে দাফন করা হয়। মক্কার মসজিদুল হারাম এবং মদিনার মসজিদে নববীতে তার অনুপস্থিতিতে গায়েবানা জানাজা অনুষ্ঠিত হয়েছিল, যা কোনো অনারব (আজমী) আলেমের জন্য এক বিরল সম্মান।

তার লিখিত কিছু কিতাব হলো :

০১. সংগ্রামী সাধকদের ইতিহাস

লেখক : আবুল হাসান আলী নদভী



২. কারওয়ানে যিন্দেগী

লেখক : আবুল হাসান আলী নদভী



০৩. ঈমানের দাবী

লেখক : আবুল হাসান আলী নাদভী

ডাউনলোড করতে বা পড়তে ক্লিক করুন


০৩. আমার আম্মা

লেখক : আবুল হাসান আলী নদভী



০৪. আরব জাতি ইসলামের পূর্বে ও পরে

লেখক : আবুল হাসান আলী নদভী



০৫. আলোর রাজপথ

লেখক : আবুল হাসান আলী নদভী



০৬. আল্লাহর পথের ঠিকানা

লেখক : আবুল হাসান আলী নদভী



০৭. ইসলাম ও পাশ্চাত্য সভ্যতার দ্বন্দ

লেখক : আবুল হাসান আলী নদভী



০৮. ইসলাম ধর্ম সমাজ সংস্কৃতি

লেখক : আবুল হাসান আলী নদভী



০৯. ইসলামী রেনেসাঁর অগ্রপথিক

লেখক : আবুল হাসান আলী নদভী



১০. ঈমান ও বস্তুবাদের সংঘাত

লেখক : আবুল হাসান আলী নদভী



১১. ঈমান যখন জাগলো

লেখক : আবুল হাসান আলী নদভী



১২. ঈমানদীপ্ত কিশোর কাহিনী

লেখক : আবুল হাসান আলী নদভী



১৩. ঈমানের দাবী

লেখক : আবুল হাসান আলী নদভী



১৪. ওলী আল্লাহদের মা

লেখক : আবুল হাসান আলী নদভী



১৫. কাদিয়ানী সম্প্রদায় তত্ত্ব ও ইতিহাস

লেখক : আবুল হাসান আলী নদভী



১৬. কাদিয়ানীদের স্বরূপ

লেখক : আবুল হাসান আলী নদভী



১৭. কাবুল থেকে আম্মান

লেখক : আবুল হাসান আলী নদভী



১৮. কারওয়ানে মদিনা

লেখক : আবুল হাসান আলী নদভী



১৯. জীবন পথের পাথেয়

লেখক : আবুল হাসান আলী নদভী



২০. তাজা ঈমানের ডাক

লেখক : আবুল হাসান আলী নদভী



২১. তারুণ্যের প্রতি হৃদয়ের তপ্ত আহবান

লেখক : আবুল হাসান আলী নদভী



২২. ধর্ম ও কৃষ্টি

লেখক : আবুল হাসান আলী নদভী



২৩. নতুন তুফান ও তার প্রতিরোধ

লেখক : আবুল হাসান আলী নদভী



২৪. নতুন দাওয়াত নতুন পয়গাম

লেখক : আবুল হাসান আলী নদভী



২৫. নতুন পৃথিবীর জন্মদিবস

লেখক : আবুল হাসান আলী নদভী



২৬. নবীয়ে রহমত

লেখক : আবুল হাসান আলী নদভী



২৭. নবুয়ত ও আম্বিয়া-ই কিরাম

লেখক : আবুল হাসান আলী নদভী



২৮. নয়া খুন

লেখক : আবুল হাসান আলী নদভী



২৯. নির্বাচিত আরবী সাহিত্য সংকলন

লেখক : আবুল হাসান আলী নদভী



৩০. পশ্চিমা বিশ্বের নামে খোলা চিঠি

লেখক : আবুল হাসান আলী নদভী



৩১. প্রাচ্যের উপহার

লেখক : আবুল হাসান আলী নদভী



৩২. বর্তমান প্রেক্ষাপটে মুসলমানদের করণীয়

লেখক : আবুল হাসান আলী নদভী



৩৩. বিধ্বস্ত মানবতা

লেখক : আবুল হাসান আলী নদভী



৩৪. বিশ্ব সভ্যতায় রসূলে আকরাম

লেখক : আবুল হাসান আলী নদভী



৩৫. ভারতবর্ষে মুসলমানদের অবদান

লেখক : আবুল হাসান আলী নদভী



৩৬. মধ্যপ্রাচ্যের ডায়েরী

লেখক : আবুল হাসান আলী নদভী



৩৭. মহানবী সাঃ ও সভ্য পৃথিবীর ঋণ স্বীকার

লেখক : আবুল হাসান আলী নদভী



৩৮. মুসলমানদের পতনে বিশ্ব কি হারালো

লেখক : আবুল হাসান আলী নদভী



৩৯. মুসলিম বিশ্বে ইসলাম ও পাশ্চাত্য সভ্যতার দ্বন্দ্ব

লেখক : আবুল হাসান আলী নদভী



৪০. রিসালাতে মুহাম্মদী ও বর্তমানে পশ্চিমা বিশ্ব

লেখক : আবুল হাসান আলী নদভী



৪১. সাত যুবকের গল্প

লেখক : আবুল হাসান আলী নদভী



৪২. সীরাতে রসূল আকরাম (সা.)

লেখক : আবুল হাসান আলী নদভী



৪৩. হজরত খাজা নিজামুদ্দীন আওলিয়া রহ.

লেখক : আবুল হাসান আলী নদভী



৪৪. হযরত মুজাদ্দিদ আলফে ছানী রহ.

লেখক : আবুল হাসান আলী নদভী



৪৫. হযরত শাহ ওয়ালী উল্লাহ্ দেহলবী

লেখক : আবুল হাসান আলী নদভী



৪৬. হায়াতে শায়খুল হাদীছ মাওলানা যাকারিয়া

লেখক : আবুল হাসান আলী নদভী



"বাংলা ইসলামিক বইয়ের বিশাল পিডিএফ (PDF) আর্কাইভ"