শায়খ আলী তানতাবী

বিংশ শতাব্দীর আরব বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক, দূরদর্শী ফকীহ (আইনজ্ঞ), জনপ্রিয় মিডিয়া ব্যক্তিত্ব এবং সমাজ-সংস্কারক ছিলেন শায়খ আলী তানতাবী (আরবি: علي الطنطاوي; ইংরেজিতে সাধারণত Ali al-Tantawi হিসেবে পরিচিত)। তিনি তার অসাধারণ বাকপটুতা, প্রাঞ্জল সাহিত্যিক ভাষা এবং রেডিও ও টেলিভিশনের মাধ্যমে ইসলামের শাশ্বত বাণী সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার জন্য সমাদৃত ছিলেন। আরব বিশ্বে তাকে “আদীবুল ফুকাহা ওয়া ফাকীহুল উদাবা” (সাহিত্যিকদের মাঝে শ্রেষ্ঠ ফকীহ এবং ফকীহদের মাঝে শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক) বলে অভিহিত করা হতো।

নিছে এই মহান মনীষীর জীবন ও কর্ম বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো:


১. জন্ম ও বংশ পরিচয়

শায়খ আলী তানতাবী ১৯০৯ খ্রিস্টাব্দের ২৩ জুন (২৩ জমাদিউল আউয়াল ১৩২৭ হিজরি) সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কে এক অত্যন্ত ঐতিহ্যবাহী, দ্বীনি এবং সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পরিবার মূলত মিশরের তানতা অঞ্চলের অধিবাসী ছিলেন, যা পরবর্তীতে সিরিয়ায় স্থানান্তরিত হয়। তার পিতা শায়খ মুস্তফা তানতাবী ছিলেন দামেস্কের একজন শীর্ষস্থানীয় আলেম এবং ফকীহ। তার মাতুলালয়ও ছিল জ্ঞান-বিজ্ঞানের জন্য বিখ্যাত; আধুনিক সিরিয়ার অন্যতম শ্রেষ্ঠ আলেম শায়খ মুহিব্বুদ্দীন আল-খতীব ছিলেন তার আপন মামা।


২. শিক্ষা জীবন

পারিবারিক ঐতিহ্য অনুযায়ী শায়খ আলী তানতাবীর শিক্ষার সূচনা হয় খুব চমৎকার পরিবেশে।

  • হিফজ ও প্রাথমিক শিক্ষা: শৈশবেই তিনি পবিত্র কুরআন হিফজ সম্পন্ন করেন এবং দামেস্কের তৎকালীন ঐতিহ্যবাহী মাদ্রাসাগুলোতে আরবী ভাষা, সাহিত্য, ফিকহ ও হাদিসের প্রাথমিক পাঠ নেন।
  • আইন শাস্ত্রে উচ্চশিক্ষা: তিনি দামেস্কের বিখ্যাত ‘তাজহীয স্কুল’ থেকে মাধ্যমিক শিক্ষা শেষ করে প্রথমে বৈরুতে যান। পরবর্তীতে তিনি দামেস্ক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং ১৯৩৩ খ্রিস্টাব্দে সেখান থেকে আইন শাস্ত্রে (Law/Shariah) স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন।

তিনি প্রখ্যাত মুহাদ্দিস শায়খ বদরুদ্দীন আল-হাসানী-সহ সিরিয়ার সমকালীন শীর্ষস্থানীয় উলামাদের সান্নিধ্য লাভ করেছিলেন।


৩. কর্মজীবন ও বিচারালয়ে অবদান

শায়খ আলী তানতাবীর কর্মজীবন ছিল অত্যন্ত বৈচিত্র্যময় এবং বর্ণিল। তিনি প্রধানত তিনটি ক্ষেত্রে অবদান রাখেন:

  • শিক্ষকতা ও সাংবাদিকতা: আইন পাস করার পর তিনি সিরিয়া ও ইরাকের বিভিন্ন হাইস্কুল ও কলেজে আরবী সাহিত্য ও ইসলামী আইন পড়াতে শুরু করেন। একই সাথে তিনি ‘আল-ফাতাহ’ এবং ‘আল-আয়াম’ নামক বিখ্যাত পত্রিকাগুলোতে নিয়মিত কলাম লিখতে শুরু করেন। তার ক্ষুরধার সামাজিক ও রাজনৈতিক লেখাগুলো দ্রুতই পাঠকপ্রিয়তা লাভ করে।
  • বিচার বিভাগ (Judiciary): ১৯৪০-এর দশকে তিনি সিরিয়ার বিচার বিভাগে যোগ দেন। তিনি দীর্ঘ ২৫ বছর বিচারক (কাজী) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। কর্মজীবনে তিনি পদোন্নতি পেয়ে দামেস্কের প্রধান শরীয়াহ বিচারক (Grand Judge of Damascus) নিযুক্ত হন। সিরিয়ার পারিবারিক ও দেওয়ানি আইন (Personal Status Law) সংস্কার ও আধুনিকায়নে তিনি সবচেয়ে প্রধান ভূমিকা পালন করেছিলেন।

৪. সৌদি আরবে হিজরত ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব

১৯৬৩ খ্রিস্টাব্দে সিরিয়ায় রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও বাথ পার্টির উত্থানের পর শায়খ আলী তানতাবী সৌদি আরবে হিজরত করেন।

  • অধ্যাপনা: সৌদি আরবে আসার পর তিনি মক্কার ‘শরীয়াহ অনুষদ’ এবং রিয়াদের ‘ইমাম মুহাম্মদ ইবন সৌদ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়’-এ দীর্ঘকাল অধ্যাপনা করেন।
  • রেডিও ও টেলিভিশনের কিংবদন্তি: সৌদি আরবে থাকাকালীন তিনি মিডিয়াকে দাওয়াতের সবচেয়ে বড় মাধ্যম হিসেবে বেছে নেন। সৌদি রেডিওতে তার দৈনিক অনুষ্ঠান “মাসায়িল ওয়া মুশকিলাত” (প্রশ্ন ও সমস্যা) এবং সৌদি টেলিভিশনে দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে প্রচারিত তার সাপ্তাহিক রমজান ও সাধারণ অনুষ্ঠান “নূর ওয়া হিদায়াহ” (আলো ও হেদায়েত) আরব বিশ্বে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। তার কথা বলার সহজ ভঙ্গি, রসবোধ এবং বাস্তবসম্মত সমাধান কোটি কোটি মানুষের হৃদয় জয় করেছিল।

৫. চিন্তাধারা ও দাওয়াতী বৈশিষ্ট্য

শায়খ আলী তানতাবীর দাওয়াতের মূল বৈশিষ্ট্য ছিল—সহজীকরণ এবং মানবপ্রেম

  • তিনি জটিল ফিকহী বাহাস বা বিতর্ককে সাধারণ মানুষের সামনে অত্যন্ত সহজ ও সাবলীল ভাষায় উপস্থাপন করতেন, যাতে একজন সাধারণ রিকশাচালক থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক—সবাই তা বুঝতে পারে।
  • তিনি চরমপন্থা ও অন্ধ তাকলীদের বিরোধী ছিলেন এবং যুগের চাহিদাকে সামনে রেখে শরীয়তের মূল মাকাসিদ (উদ্দেশ্য) অনুধাবনের ওপর জোর দিতেন।
  • তরুণ প্রজন্মকে ইসলামের প্রতি আকর্ষিত করতে তিনি সাহিত্যের শৈল্পিক রূপকে দারুণভাবে ব্যবহার করেছেন।

৬. উল্লেখযোগ্য গ্রন্থাবলী

শায়খ আলী তানতাবী আরবী সাহিত্যের একজন প্রবাদপুরুষ ছিলেন। তার বর্ণাঢ্য জীবনে তিনি প্রায় ৪০টিরও বেশি অমূল্য গ্রন্থ রচনা করেছেন, যার বেশিরভাগই প্রবন্ধ, স্মৃতিচারণ এবং সমাজচিন্তামূলক। তার কয়েকটি বিখ্যাত বই হলো:

১. ইসলামের সাধারণ পরিচয় (Ta’rif bi-Din al-Islam) – অমুসলিম বা আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত তরুণদের জন্য ইসলামের মূল বিষয়গুলো অত্যন্ত যৌক্তিকভাবে বোঝানোর জন্য এটি একটি মাস্টারপিস গ্রন্থ। এটি বাংলাসহ বহু ভাষায় অনূদিত হয়েছে।
২. আমার স্মৃতিচারণ (Zikhrayat / Memories) – আট খণ্ডের এই বিশাল আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থে তিনি কেবল নিজের জীবনই নয়, বরং বিংশ শতাব্দীর সমগ্র আরব বিশ্বের ইতিহাস, সমাজ ও সংস্কৃতিকে ফুটিয়ে তুলেছেন।
৩. ইতিহাসের গল্পসমূহ (Qisas min al-Tarikh)
৪. জীবন ও মানুষ (Fil-Hayat wan-Nas)
৫. নারীর মর্যাদা ও অধিকার


৭. পুরস্কার ও জীবনের শেষ দিনগুলো

ইসলামী সংস্কৃতি, সাহিত্য এবং দাওয়াতে অনন্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৯০ খ্রিস্টাব্দে তাকে মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ “কিং ফয়সাল আন্তর্জাতিক পুরস্কার” (King Faisal International Prize) প্রদান করা হয়। জীবনের শেষ বছরগুলোতে তিনি বার্ধক্যজনিত কারণে জনসম্মুখ থেকে দূরে সরে যান, তবে তার পরিবার ও নাতি-নাতনিদের সাথে মক্কায় সময় কাটাতেন।

৮. ইন্তিকাল (মৃত্যু)

বিংশ শতাব্দীর এই মহান জ্ঞানসাধক ও আরবী সাহিত্যের উজ্জ্বল নক্ষত্র ১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দের ১৮ জুন (৪ রবীউস সানী ১৪২০ হিজরি) শুক্রবার রাতে ৯০ বছর বয়সে সৌদি আরবের জেদ্দার কিং ফাহদ হাসপাতালে ইন্তিকাল করেন। পরদিন মক্কার মসজিদুল হারামে জুমার নামাজের পর তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয় এবং মক্কার বিখ্যাত ‘আল-আদল কবরস্থানে’ তাকে দাফন করা হয়।

তার ইন্তিকালের মাধ্যমে আরব বিশ্ব কেবল একজন মহান ফকীহকেই হারায়নি, বরং আরবী গদ্য সাহিত্যের এক মহান জাদুকরকে হারিয়েছিল। তার রেখে যাওয়া সাহিত্য ও ভিডিও লেকচারগুলো আজও কোটি কোটি মানুষকে সঠিক পথের সন্ধান দিয়ে যাচ্ছে।

তার লিখিত কিছু কিতাব হলো :

১. তওবাকারী যুবক

লেখক : শায়খ আলী তানতাবী



২. বিয়ে নিয়ে কিছু কথা

লেখক : শায়খ আলী তানতাবী



৩. যুবকদের বাঁচাও

লেখক : শায়খ আলী তানতাবী



৪. লাভ ম্যারেজ

লেখক : শায়খ আলী তানতাবী



৫. লেট ম্যারেজ

লেখক : শায়খ আলী তানতাবী



৬. সফলতার রাজপথ

লেখক : শায়খ আলী তানতাবী



০৭. হে আমার ছেলে

লেখক : শায়খ আলী তানতাবী



৮. হে আমার মুসলিম ভাই

লেখক : শায়খ আলী তানতাবী



৯. হে আমার মেয়ে

লেখক : শায়খ আলী তানতাবী



১০.আলোর দিগন্তে হযরত উমর (রা.)

লেখক : শায়খ আলী তানতাবী



১১. ছাত্রদের বলছি

লেখক : শায়খ আলী তানতাবী



"বাংলা ইসলামিক বইয়ের বিশাল পিডিএফ (PDF) আর্কাইভ"